আমদানির সময় কেজিপ্রতি যে মাল্টার দাম ধরা হয় ৮৭ টাকা, চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে সেটিই এখন বিক্রি হচ্ছে ৪৮০ থেকে ৫২০ টাকায়। অর্থাৎ ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে ফলটির দাম বেড়েছে পাঁচ গুণেরও বেশি। বাজারে এখন যে হলুদ মাল্টা মিলছে, তার বড় অংশ আসছে দক্ষিণ আফ্রিকা ও মিসর থেকে।
দাম বাড়ার প্রথম ধাপটি তৈরি হচ্ছে বন্দরেই। বাংলাদেশ কাস্টমসের হিসাবে, কমলা ও মাল্টাজাতীয় তাজা ফল আমদানিতে এখন মোট করভার ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এর মধ্যে আছে আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর ও অগ্রিম আয়কর। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্য বলছে, কেজিপ্রতি গড় আমদানি মূল্য ৮৭ টাকার ওপর শুল্ক-কর গুনতে হয় প্রায় ১০৭ টাকা। ফলে খালাসের সময়ই কেজিপ্রতি খরচ দাঁড়ায় ১৯৩ থেকে ১৯৪ টাকা। বন্দর থেকে গুদামে নেওয়া ও পরিবহনসহ আনুষঙ্গিক খরচে যোগ হয় আরও ১০ থেকে ১৫ টাকা। আমদানিকারকেরা বলছেন, পচনশীল পণ্য হওয়ায় ফল নষ্ট হওয়া এবং কনটেইনার ও বন্দরের খরচ ধরলে তাঁদের প্রকৃত ব্যয় কেজিতে ২৩০ থেকে ২৪০ টাকায় ঠেকে।
করের এই চাপ হঠাৎ আসেনি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে মাল্টাসহ কয়েকটি ফলের মোট করভার ছিল প্রায় ৮৯ শতাংশ। ডলার-সংকটের সময় আমদানি নিরুৎসাহিত করতে ২০২২ সালের মে মাসে ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বসানো হয়। পরে করভার আরও বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একপর্যায়ে ১৩৬ দশমিক ২০ শতাংশে পৌঁছায়। কিছুটা কমানো হলেও এখন তা ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
এর প্রভাব পড়েছে আমদানিতেও। ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে মাল্টা এসেছিল ২ লাখ ৯৪ হাজার টন। এরপর ধাপে ধাপে কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমেছে ১ লাখ ৫৩ হাজার টনে, যা চার বছর আগের প্রায় অর্ধেক। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রায় তিন মাসে এসেছে মাত্র ২১ হাজার টন।
বন্দর থেকে ফল যায় চট্টগ্রাম ও ঢাকার পাইকারি বাজারে, সেখান থেকে হাত বদলে খুচরা দোকানে। চট্টগ্রামের ফলমন্ডির ব্যবসায়ীরা জানান, প্রায় তিন সপ্তাহ আগে পাইকারিতে কেজিপ্রতি মাল্টার দাম ছিল ২২০ থেকে ২৩০ টাকা। পরে দ্রুত বাড়তে বাড়তে ১৫ কেজির এক কার্টন বিক্রি হয়েছে ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকায়, অর্থাৎ কেজিপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। গত বুধবার নগরের বিভিন্ন খুচরা বাজারে প্রতি কেজি বিক্রি হতে দেখা গেছে ৪৮০ থেকে ৫২০ টাকায়।
রেলওয়ে মেন্স সুপার মার্কেটের ফল ব্যবসায়ী মো. বাবুল বলেন, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত অনেক আমদানিকারক লোকসানে পড়েছিলেন, তাই পরে আমদানি কমে যায়। সেপ্টেম্বরে চাহিদার তুলনায় জোগান কম থাকায় দাম বেড়েছে। নতুন চালান আসায় এখন দাম কমতে শুরু করেছে, আগামী সপ্তাহে সরবরাহ বাড়লে আরও কমতে পারে বলে তাঁর ধারণা।
আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এইচআর করপোরেশনের কর্ণধার মোহাম্মদ কুতুব উদ্দিন বলেন, শুল্ক-কর, বন্দর মাশুল ও কনটেইনার পরিবহনসহ সব ধরনের ব্যয় বেড়েছে। তবে আমদানিকারক ও পাইকারি পর্যায়ের দামের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে খুচরা বাজারে কেজিতে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সময়েই মাল্টার দাম চড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি বছরে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৯ হাজার ৬২০ জন, মারা গেছেন ২৪৫ জন। বিশেষ করে সেপ্টেম্বরে রোগী ও মৃত্যু দ্রুত বেড়েছে। ফল ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বর ও ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের পরিবারে মাল্টা ও কমলা কেনার প্রবণতা বেড়েছে, যা জোগান-সংকটের সময় দামকে আরও ঠেলে দিয়েছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ বলেন, বিষয়টি তাঁদের নজরে এসেছে এবং বাজারে অভিযান চালানো হয়েছে। বুধবার ফলমন্ডিতে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে ১৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অভিযান চলবে বলেও জানান তিনি।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 




















