শিরোনাম :

দত্তকের নামে শিশু পাচার, ফেসবুকে কেনাবেচার হাট 

‘ইমার্জেন্সি একটা ছেলে বাচ্চা দেওয়া হবে, বয়স ৬ মাস, ডিমান্ড ২ লাখ টাকা, লোকেশন চট্টগ্রাম।’ ফেসবুকের একটি গ্রুপে এভাবেই শিশু হস্তান্তরের প্রস্তাব দিয়েছেন একজন। গ্রুপটির নাম ‘সন্তান দত্তক দেওয়া-নেওয়া হয়’। পোস্টদাতা ভবিষ্যৎ ক্রেতাদের সতর্ক করে লিখেছেন, ৫০ হাজার বা এক লাখ টাকা যাঁরা চাইছেন, তাঁরা আসলে শিশু দেবেন না। গত ১৩ সেপ্টেম্বর তিনি আরও লিখেছেন, ‘এটা ১০০% রিয়েল পোস্ট, সবকিছু বুঝেশুনে তারপর নক দিবেন।’

এমন পোস্ট একটি দুটি নয়। ফেসবুকে দত্তকের নামে খোলা বহু গ্রুপে শিশুর দরদাম চলছে প্রকাশ্যেই। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশু জন্মের আগে, মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থাতেই কেনাবেচার আলাপ শুরু হয়ে যায়। এসব কার্যক্রম আইন ও সরকারি নজরদারির বাইরে চলছে। ফলে কত শিশু এভাবে হাতবদল হচ্ছে, তার হিসাব পাওয়া কঠিন।

৩৯টি গ্রুপে অনুসন্ধান

গত ১২ আগস্ট থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত একজন ফ্যাক্টচেকারের সহায়তায় ফেসবুকের ৩৯টি পাবলিক গ্রুপ খতিয়ে দেখা হয়। বেশির ভাগ গ্রুপের সদস্য কয়েক শ। তবে প্রায় ২০ হাজার সদস্যের গ্রুপও আছে। পাঁচ হাজারের বেশি সদস্যের একটি গ্রুপে গত বছর এক অজ্ঞাতপরিচয় সদস্য ফোন নম্বরসহ লিখেছিলেন, ‘একটি বাচ্চা মেয়ে বিক্রি করা হবে।’ গত জুনে আরেকটি গ্রুপে ‘বিশেষ অফারে’ একটি ছেলেশিশু দত্তক দেওয়ার কথা লেখা হয়েছে।

অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তিনটি গ্রুপে যোগ দেওয়া হয়। দুটি গ্রুপ নিয়মিত অনুসরণ করা হয়। কখনো পরিচয় জানিয়ে, কখনো গোপন রেখে ইনবক্স ও মুঠোফোনে দরদাম করা হয়েছে। এর মধ্যে এক ডজন গ্রুপের ২৮৮টি পোস্ট বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর ৩৪টিতে দত্তকের জন্য শিশু চাওয়া হয়েছে, আর ৬৩টিতে শিশু দেওয়ার প্রস্তাব ছিল। এসব পোস্টে ছেলে বা মেয়ে ছাড়াও ‘বেবি’, ‘নিউবর্ন’, ‘যমজ বাচ্চা’ ধরনের শব্দ ব্যবহার করে চাহিদা ও জোগানের কথা লেখা হয়েছে।

পোস্টের ভাষা অনেকটা বাজারের হাঁকডাকের মতো। কেউ লিখেছেন, ‘আমার একটা ছেলে বাবু চাই, খুব ইমার্জেন্সি দরকার।’ কেউ চেয়েছেন অক্টোবর বা নভেম্বরে শিশু। একজন ৫০ হাজার টাকা বাজেটে ১০ দিন বা এক মাস বয়সী ছেলেশিশু খুঁজেছেন। এক নারী জানিয়েছেন, পাঁচ-ছয় মাসের গর্ভবতী কারও সঙ্গে চুক্তি করে সিজারিয়ানের খরচ দেবেন এবং শিশুটিকে ইতালি নিয়ে যাবেন। আরেকজন অস্ট্রেলিয়ায় নেওয়ার জন্য তিন-চার মাস বয়সী ‘সুন্দর, ফরসা, কিউট মেয়ে বাবু’ চেয়েছেন।

এক বিক্রেতা লিখেছেন, ‘একটা মেয়ে বাচ্চা দত্তক দেওয়া হবে… কোনো অগ্রিম দিতে হবে না, আসবেন, দেখবেন, কথা বলবেন, কাগজ করবেন, নিয়ে চলে যাবেন।’ আগ্রহী কেউ ইনবক্সে লিখলেই যোগাযোগের ফোন নম্বর মেলে। শিশু দিতে আগ্রহী এমন আটজনের সঙ্গে মুঠোফোন, হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারে কথা হয়েছে।

পোস্টগুলোতে আরও কিছু বিষয় চোখে পড়েছে। মেয়েশিশুর চেয়ে ছেলেশিশুর দর বেশি। হাতে গোনা কয়েকটি পোস্টে শিশু পাওয়ার কথা আছে। বেশ কিছু পোস্টে প্রতারণার ঝুঁকি ও তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা এসেছে, কাউকে কাউকে ‘বাটপার’ও বলা হয়েছে। একই ব্যক্তি একাধিক গ্রুপে সক্রিয়। কিছু পোস্টে গর্ভকালীন বিভিন্ন পর্যায়ের ডাক্তারি রিপোর্ট কিনতে চাওয়া হয়েছে। কয়েকটি গ্রুপে মূল আলোচনা শুক্রাণু দান বা সারোগেসি নিয়ে, যেখানে যৌনসেবার প্রস্তাবও দেখা গেছে।

‘ইমার্জেন্সি’ পোস্টের পেছনে

দুই লাখ টাকার সেই পোস্টদাতাও একাধিক গ্রুপে সক্রিয়। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে মেসেঞ্জারে ও পরে মুঠোফোনে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, শিশুর মায়ের অনুরোধেই তিনি পোস্টটি দিয়েছেন এবং এই বিক্রির সঙ্গে তিনি জড়িত নন। তিনি একটি নম্বর দেন।

১৩ সেপ্টেম্বর সেই নম্বরে ফোন করলে এক নারী জানান, তিনি থাকেন নরসিংদীতে, যদিও পোস্টে ‘লোকেশন’ লেখা ছিল চট্টগ্রাম। শিশুটি নিতে চাইলে তিনি এক লাখ টাকা দাবি করেন। তাঁর ভাষায়, ‘বাচ্চা হইতে, বাচ্চারে ৬ মাস পালতে, প্যাম্পার্স কিনতেই তো ৫০ হাজার টাকা খরচ হইয়া গেছে।’ বিক্রির কারণ জানতে চাইলে বলেন, ‘স্বামী চইল্যা গেছে। আরেক বাচ্চা আছে। ফ্যামেলিগত সমস্যা আছে।’

নারী নিজের নাম-ঠিকানা জানাননি, প্রতিবেদকের পরিচয়ও জানতে চাননি। বলেছেন, নরসিংদী গিয়ে ফোন করলে ঠিকানা দেবেন, অথবা প্রতিবেদক ঠিকানা দিলে শিশুটিকে সেখানে পৌঁছে দেবেন। শিশুটিকে দেখতে চাইলে তিনি হোয়াটসঅ্যাপে একটি ছবি ও টিকার কার্ড পাঠান। কার্ডে বাবার নাম আছে এবং ঠিকানা গাজীপুরের কাপাসিয়ার। ওই নারীর হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টও সেই বাবার নামেই।

পোস্টদাতাকে আবার ফোন করলে তিনি জানান, ফেনী থেকে একজন এক লাখ ৭০ হাজার টাকা দিতে চাইছেন, কিন্তু দুই লাখই লাগবে। পরে তিনি বলেন, মাকে সাহায্য করাই তাঁর উদ্দেশ্য, এখান থেকে কোনো টাকার ভাগ তিনি পাবেন না।

আরেকটি গ্রুপে এক ব্যক্তি দেড়-দুই বছর বয়সী এক শিশুর সঙ্গে নিজের ছবি দিয়ে লিখেছেন, শিশুটি তাঁরই সন্তান। স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে যাবেন, তাই স্ত্রীর মোহরানা পরিশোধ করতে সাড়ে তিন লাখ টাকার বিনিময়ে ছেলেকে দত্তক দেবেন। পরিচয় গোপন রেখে ফোন করলে তিনি বলেন, নিজের সন্তানকে নিজে দত্তক দিলে সমস্যার কিছু নেই।

দালালচক্রের কথা, প্রতারণার অভিজ্ঞতা

একটি গ্রুপের সূত্র ধরে এক নারী দালালের সন্ধান মেলে। নাম গোপন রাখার শর্তে তিনি মুঠোফোনে বলেন, বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে সন্তান রাখতে অনিচ্ছুক গর্ভবতী নারীদের খোঁজ পান তাঁরা। নারীরা শিশু দিতে রাজি হলে একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রসব পর্যন্ত তাঁদের দেখভাল করে। তাঁর দাবি, নবজাতক ছেলের দাম তিন লাখ এবং মেয়ের দুই লাখ টাকা। দালালেরা কমিশন পান।

ক্রেতারাও সব সময় নিরাপদ নন। কুষ্টিয়ার আবদুল আলিম একটি গ্রুপে লিখেছেন, তিনি তিনবার প্রতারিত হয়েছেন। তাঁর বর্ণনায়, সর্বশেষবার একটি নবজাতকের দাম ঠিক হয়। এক নারী হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কলে শিশুটিকে দেখান, তারপর পথখরচ হিসেবে অগ্রিম ১০ হাজার টাকা চান। বিকাশে টাকা পাঠানোর পরই গ্রুপটি উধাও হয়ে যায় এবং হোয়াটসঅ্যাপসহ সব নম্বর বন্ধ হয়ে যায়। তাঁর আক্ষেপ, প্রতারক চক্রকে থামানোর বা দেখার কেউ নেই।

ঢাকা মেডিকেলের দেয়ালে নোটিশ

ফেসবুকের বাইরেও এই বাণিজ্যের একটি প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা মিলেছে। গত ১১ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিচতলার বারান্দার দেয়ালে একটি নোটিশ চোখে পড়ে: ‘বাচ্চা দত্তক দিবেন? আমরা নিবো।’ নিচে দুটি ফোন নম্বর ও একটি ঠিকানা। সেই ঠিকানা ধরে ৩০ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে আল-বোখারি কেয়ারগিভিং সার্ভিসেস লিমিটেডের অফিসে যাওয়া হয়।

প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পাতায় আইইউআই, আইভিএফ ও সারোগেসিসহ বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা সহায়তার কথা আছে। ‘শিশুর আইনগত অভিভাবকত্ব’ শিরোনামে নবজাতক ও এতিম শিশু দত্তকে সহযোগিতার কথাও লেখা। প্রতিবেদকেরা প্রথমে দত্তক নিতে আগ্রহী পরিচয়ে আলাপ করেন, পরে নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দেন। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল আহাদ দীর্ঘ সময় কথা বলেন। তিনি জানান, তাঁরা ভারতেও সারোগেসি সেবা দেন।

প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্যাডে শিশু দেওয়া ও নেওয়ার আবেদনের ফরম আছে। ফরমে বলা আছে, প্রতিষ্ঠানটি সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করবে এবং শিশু নিতে ইচ্ছুক পক্ষ ৩৫ হাজার টাকা সম্মানী দেবে। আবদুল আহাদ মুখে চেয়েছিলেন ৫০ হাজার টাকা। এই ফি ব্যবস্থাপনা খরচ হিসেবে নেওয়া হয়। এর বাইরে শিশুদাতা পরিবারকে চাহিদামতো টাকা দিতে হয়, সিজারিয়ান হলে তার খরচও বহন করতে হয়। সব মিলিয়ে খরচ দুই লাখ টাকার কাছাকাছি দাঁড়ায়।

প্রতিষ্ঠানটি একটি সম্মতিনামা ও সমঝোতা দলিল দেয়। দুই পক্ষ সই করার সময় প্রতিষ্ঠানের দুজন সাক্ষী হিসেবে সই করেন। আবদুল আহাদ জানান, দলিলটি কম্পিউটারের দোকান থেকে অ্যাফিডেভিট করানো হয়। সই-সাবুদের পর শিশুকে হস্তান্তর করা হয়, এরপর প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শেষ। আদালতে আইনি অভিভাবকত্বের বিষয়ে তাঁরা কিছু করেন না। তাঁর ভাষ্য, স্থানীয় থানা ও সমাজসেবা অধিদপ্তরে করণীয় জানতে চেয়েও তিনি স্পষ্ট দিকনির্দেশ পাননি। এখন নিজেদের মতো করে কাগজপত্র রাখছেন।

তাঁর জানামতে, অনেক প্রতিষ্ঠান টাকার বিনিময়ে শিশু দত্তক দেওয়ার কাজ করে, কিছু ভুয়া প্রতিষ্ঠানও আছে। চাহিদা অনেক বড় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর মুঠোফোন থেকে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা হয়, যিনি কয়েক দিন আগে ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি ছেলেশিশু নিয়েছেন। তাঁর খরচ হয়েছে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা। তিনি এখন নিজেদের সন্তান পরিচয়ে শিশুটির জন্মনিবন্ধন ও অন্যান্য কাগজ তৈরি করবেন। কথাবার্তার একপর্যায়ে এক আসন্নপ্রসবা নারী আবদুল আহাদকে ফোন করেন। লাউডস্পিকারে শোনা যায়, আরেকটি সন্তান পালনের সামর্থ্য তাঁর নেই। এক লাখ টাকা ও অস্ত্রোপচারের খরচ পেলে তিনি গর্ভের ছেলেশিশুটিকে দত্তক দেবেন।

আইন কী বলে

বাংলাদেশে সবার জন্য প্রযোজ্য কোনো সাধারণ দত্তক আইন নেই। পারিবারিক আইনগুলো ধর্মভিত্তিক, আর মুসলিম পারিবারিক আইনে দত্তকের বিধান নেই। আইনজীবীরা বলছেন, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানেরা ধর্মীয়ভাবে দত্তক নিতে পারেন। ধর্মনির্বিশেষে পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে শিশুর আইনি অভিভাবকত্ব নেওয়া যায়। এ ছাড়া ২০১৩ সালের শিশু আইন অনুযায়ী শিশুকল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুর বিকল্প পরিচর্যার দায়িত্ব হস্তান্তর করা যায়। কেবল এই দুই ক্ষেত্রেই নজরদারির বিধান আছে।

সরকারিভাবে শুধু সমাজসেবা অধিদপ্তরের ছয়টি ছোটমণি নিবাসের শিশুদের আদালতের মাধ্যমে অভিভাবকত্ব দেওয়া হচ্ছে। কয়েকটি বেসরকারি সংস্থাও সুবিধাবঞ্চিত শিশুর আইনি অভিভাবকত্ব হস্তান্তরের কাজ করে, আবার আইনবহির্ভূতভাবে দত্তক দেওয়া প্রতিষ্ঠানও আছে। ঢাকার আজিমপুর ছোটমণি নিবাসের সাবেক উপতত্ত্বাবধায়ক জুবলি বেগম বলেন, নিঃসন্তান দম্পতিরা যেকোনো উপায়ে সন্তান চান। এ কারণেই ফেসবুকসহ বিভিন্ন জায়গায় শিশু কেনাবেচার চক্র সক্রিয় হচ্ছে।

আইনি শাস্তির বিধানও আছে। বেআইনি ও অনৈতিক কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে শিশু বেচা, কেনা বা হস্তান্তর করলে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩৭২ ও ৩৭৩ ধারায় কঠোর শাস্তি রয়েছে। ২০২৬ সালের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে ‘অসৎ উদ্দেশ্যে’ দত্তক গ্রহণকে শোষণ হিসেবে ধরা হয়েছে।

অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ফউজুল আজিম আইন কমিশনের মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁর মতে, ‘শিশু দত্তক’, ‘নবজাতক প্রয়োজন’ বা ‘বিনিময়ে এত টাকা’ ধরনের পোস্টকে সম্ভাব্য শিশু পাচার বা শোষণের ঝুঁকি হিসেবে দেখা উচিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার উচিত প্রাথমিকভাবে বিষয়টি যাচাই করা। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন বা দরদাম যদি বাস্তবে শিশুর হস্তান্তরের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে টাকা কারা নিচ্ছে, কোনো মধ্যস্থতাকারী বা চক্র আছে কি না এবং শিশুকে ভবিষ্যতে কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে, তদন্তে তা দেখতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ হুদা মনে করেন, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো কেনাবেচার পর শিশুরা কোথায় যাচ্ছে বা কী কাজে জড়াচ্ছে, তার কোনো নজরদারি না থাকা। তাঁর ভাষ্য, ‘অনেকে হয়তো এ ধরনের ব্যবসা করার জন্যই সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। বিষয়টিতে সরকারের নজরদারি জরুরি হয়ে পড়েছে।’ তিনি আরও বলেন, এতিম ও অসহায় শিশুদের দত্তক বা পরিবারের কাছে হস্তান্তরের জন্য একটি সর্বজনীন আইন দরকার। আইনি কাঠামো থাকলে শিশু বিক্রি ঠেকানো সহজ হবে।

পুলিশ যা জানাল

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারে নিযুক্ত আছেন। তিনি জানান, দত্তকের নামে ফেসবুকে প্রতারণার বিষয়টি তাঁরা জানেন, তবে এভাবে শিশু বিক্রির সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পাননি। তাঁর মতে, উদ্দেশ্য যা-ই হোক, ফেসবুকে এ ধরনের কার্যক্রম চালানো অপরাধ। যদিও তাঁদের সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং টিম দত্তকের নামে গ্রুপ খুলে শিশু বিক্রির তৎপরতার দায়ে এখন পর্যন্ত কাউকে আইনের আওতায় আনেনি।

একদিকে নিঃসন্তান দম্পতিদের সন্তান পাওয়ার তীব্র চাহিদা, অন্যদিকে শিশু দিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন বা জোগান। মাঝখানে নেই পর্যাপ্ত আইন, নেই কার্যকর নজরদারি। সেই ফাঁকেই বাজারটি জমে উঠছে। ফউজুল আজিম বলেন, এখনই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার নজরদারি বাড়াতে হবে, আর সরকারের তত্ত্বাবধানে দত্তকের এমন একটি কাঠামো গড়তে হবে, যেখানে শিশুর সুরক্ষার সব বিষয় থাকবে।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় আরও আটজনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৮৬০ জন

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

মেসির গোল-অ্যাসিস্টে মহাকাব্যের সমাপ্তি

০৭ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

দত্তকের নামে শিশু পাচার, ফেসবুকে কেনাবেচার হাট 

আপডেট সময় ০২:০৬:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

‘ইমার্জেন্সি একটা ছেলে বাচ্চা দেওয়া হবে, বয়স ৬ মাস, ডিমান্ড ২ লাখ টাকা, লোকেশন চট্টগ্রাম।’ ফেসবুকের একটি গ্রুপে এভাবেই শিশু হস্তান্তরের প্রস্তাব দিয়েছেন একজন। গ্রুপটির নাম ‘সন্তান দত্তক দেওয়া-নেওয়া হয়’। পোস্টদাতা ভবিষ্যৎ ক্রেতাদের সতর্ক করে লিখেছেন, ৫০ হাজার বা এক লাখ টাকা যাঁরা চাইছেন, তাঁরা আসলে শিশু দেবেন না। গত ১৩ সেপ্টেম্বর তিনি আরও লিখেছেন, ‘এটা ১০০% রিয়েল পোস্ট, সবকিছু বুঝেশুনে তারপর নক দিবেন।’

এমন পোস্ট একটি দুটি নয়। ফেসবুকে দত্তকের নামে খোলা বহু গ্রুপে শিশুর দরদাম চলছে প্রকাশ্যেই। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশু জন্মের আগে, মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থাতেই কেনাবেচার আলাপ শুরু হয়ে যায়। এসব কার্যক্রম আইন ও সরকারি নজরদারির বাইরে চলছে। ফলে কত শিশু এভাবে হাতবদল হচ্ছে, তার হিসাব পাওয়া কঠিন।

৩৯টি গ্রুপে অনুসন্ধান

গত ১২ আগস্ট থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত একজন ফ্যাক্টচেকারের সহায়তায় ফেসবুকের ৩৯টি পাবলিক গ্রুপ খতিয়ে দেখা হয়। বেশির ভাগ গ্রুপের সদস্য কয়েক শ। তবে প্রায় ২০ হাজার সদস্যের গ্রুপও আছে। পাঁচ হাজারের বেশি সদস্যের একটি গ্রুপে গত বছর এক অজ্ঞাতপরিচয় সদস্য ফোন নম্বরসহ লিখেছিলেন, ‘একটি বাচ্চা মেয়ে বিক্রি করা হবে।’ গত জুনে আরেকটি গ্রুপে ‘বিশেষ অফারে’ একটি ছেলেশিশু দত্তক দেওয়ার কথা লেখা হয়েছে।

অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তিনটি গ্রুপে যোগ দেওয়া হয়। দুটি গ্রুপ নিয়মিত অনুসরণ করা হয়। কখনো পরিচয় জানিয়ে, কখনো গোপন রেখে ইনবক্স ও মুঠোফোনে দরদাম করা হয়েছে। এর মধ্যে এক ডজন গ্রুপের ২৮৮টি পোস্ট বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর ৩৪টিতে দত্তকের জন্য শিশু চাওয়া হয়েছে, আর ৬৩টিতে শিশু দেওয়ার প্রস্তাব ছিল। এসব পোস্টে ছেলে বা মেয়ে ছাড়াও ‘বেবি’, ‘নিউবর্ন’, ‘যমজ বাচ্চা’ ধরনের শব্দ ব্যবহার করে চাহিদা ও জোগানের কথা লেখা হয়েছে।

পোস্টের ভাষা অনেকটা বাজারের হাঁকডাকের মতো। কেউ লিখেছেন, ‘আমার একটা ছেলে বাবু চাই, খুব ইমার্জেন্সি দরকার।’ কেউ চেয়েছেন অক্টোবর বা নভেম্বরে শিশু। একজন ৫০ হাজার টাকা বাজেটে ১০ দিন বা এক মাস বয়সী ছেলেশিশু খুঁজেছেন। এক নারী জানিয়েছেন, পাঁচ-ছয় মাসের গর্ভবতী কারও সঙ্গে চুক্তি করে সিজারিয়ানের খরচ দেবেন এবং শিশুটিকে ইতালি নিয়ে যাবেন। আরেকজন অস্ট্রেলিয়ায় নেওয়ার জন্য তিন-চার মাস বয়সী ‘সুন্দর, ফরসা, কিউট মেয়ে বাবু’ চেয়েছেন।

এক বিক্রেতা লিখেছেন, ‘একটা মেয়ে বাচ্চা দত্তক দেওয়া হবে… কোনো অগ্রিম দিতে হবে না, আসবেন, দেখবেন, কথা বলবেন, কাগজ করবেন, নিয়ে চলে যাবেন।’ আগ্রহী কেউ ইনবক্সে লিখলেই যোগাযোগের ফোন নম্বর মেলে। শিশু দিতে আগ্রহী এমন আটজনের সঙ্গে মুঠোফোন, হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারে কথা হয়েছে।

পোস্টগুলোতে আরও কিছু বিষয় চোখে পড়েছে। মেয়েশিশুর চেয়ে ছেলেশিশুর দর বেশি। হাতে গোনা কয়েকটি পোস্টে শিশু পাওয়ার কথা আছে। বেশ কিছু পোস্টে প্রতারণার ঝুঁকি ও তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা এসেছে, কাউকে কাউকে ‘বাটপার’ও বলা হয়েছে। একই ব্যক্তি একাধিক গ্রুপে সক্রিয়। কিছু পোস্টে গর্ভকালীন বিভিন্ন পর্যায়ের ডাক্তারি রিপোর্ট কিনতে চাওয়া হয়েছে। কয়েকটি গ্রুপে মূল আলোচনা শুক্রাণু দান বা সারোগেসি নিয়ে, যেখানে যৌনসেবার প্রস্তাবও দেখা গেছে।

‘ইমার্জেন্সি’ পোস্টের পেছনে

দুই লাখ টাকার সেই পোস্টদাতাও একাধিক গ্রুপে সক্রিয়। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে মেসেঞ্জারে ও পরে মুঠোফোনে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, শিশুর মায়ের অনুরোধেই তিনি পোস্টটি দিয়েছেন এবং এই বিক্রির সঙ্গে তিনি জড়িত নন। তিনি একটি নম্বর দেন।

১৩ সেপ্টেম্বর সেই নম্বরে ফোন করলে এক নারী জানান, তিনি থাকেন নরসিংদীতে, যদিও পোস্টে ‘লোকেশন’ লেখা ছিল চট্টগ্রাম। শিশুটি নিতে চাইলে তিনি এক লাখ টাকা দাবি করেন। তাঁর ভাষায়, ‘বাচ্চা হইতে, বাচ্চারে ৬ মাস পালতে, প্যাম্পার্স কিনতেই তো ৫০ হাজার টাকা খরচ হইয়া গেছে।’ বিক্রির কারণ জানতে চাইলে বলেন, ‘স্বামী চইল্যা গেছে। আরেক বাচ্চা আছে। ফ্যামেলিগত সমস্যা আছে।’

নারী নিজের নাম-ঠিকানা জানাননি, প্রতিবেদকের পরিচয়ও জানতে চাননি। বলেছেন, নরসিংদী গিয়ে ফোন করলে ঠিকানা দেবেন, অথবা প্রতিবেদক ঠিকানা দিলে শিশুটিকে সেখানে পৌঁছে দেবেন। শিশুটিকে দেখতে চাইলে তিনি হোয়াটসঅ্যাপে একটি ছবি ও টিকার কার্ড পাঠান। কার্ডে বাবার নাম আছে এবং ঠিকানা গাজীপুরের কাপাসিয়ার। ওই নারীর হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টও সেই বাবার নামেই।

পোস্টদাতাকে আবার ফোন করলে তিনি জানান, ফেনী থেকে একজন এক লাখ ৭০ হাজার টাকা দিতে চাইছেন, কিন্তু দুই লাখই লাগবে। পরে তিনি বলেন, মাকে সাহায্য করাই তাঁর উদ্দেশ্য, এখান থেকে কোনো টাকার ভাগ তিনি পাবেন না।

আরেকটি গ্রুপে এক ব্যক্তি দেড়-দুই বছর বয়সী এক শিশুর সঙ্গে নিজের ছবি দিয়ে লিখেছেন, শিশুটি তাঁরই সন্তান। স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে যাবেন, তাই স্ত্রীর মোহরানা পরিশোধ করতে সাড়ে তিন লাখ টাকার বিনিময়ে ছেলেকে দত্তক দেবেন। পরিচয় গোপন রেখে ফোন করলে তিনি বলেন, নিজের সন্তানকে নিজে দত্তক দিলে সমস্যার কিছু নেই।

দালালচক্রের কথা, প্রতারণার অভিজ্ঞতা

একটি গ্রুপের সূত্র ধরে এক নারী দালালের সন্ধান মেলে। নাম গোপন রাখার শর্তে তিনি মুঠোফোনে বলেন, বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে সন্তান রাখতে অনিচ্ছুক গর্ভবতী নারীদের খোঁজ পান তাঁরা। নারীরা শিশু দিতে রাজি হলে একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রসব পর্যন্ত তাঁদের দেখভাল করে। তাঁর দাবি, নবজাতক ছেলের দাম তিন লাখ এবং মেয়ের দুই লাখ টাকা। দালালেরা কমিশন পান।

ক্রেতারাও সব সময় নিরাপদ নন। কুষ্টিয়ার আবদুল আলিম একটি গ্রুপে লিখেছেন, তিনি তিনবার প্রতারিত হয়েছেন। তাঁর বর্ণনায়, সর্বশেষবার একটি নবজাতকের দাম ঠিক হয়। এক নারী হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কলে শিশুটিকে দেখান, তারপর পথখরচ হিসেবে অগ্রিম ১০ হাজার টাকা চান। বিকাশে টাকা পাঠানোর পরই গ্রুপটি উধাও হয়ে যায় এবং হোয়াটসঅ্যাপসহ সব নম্বর বন্ধ হয়ে যায়। তাঁর আক্ষেপ, প্রতারক চক্রকে থামানোর বা দেখার কেউ নেই।

ঢাকা মেডিকেলের দেয়ালে নোটিশ

ফেসবুকের বাইরেও এই বাণিজ্যের একটি প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা মিলেছে। গত ১১ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিচতলার বারান্দার দেয়ালে একটি নোটিশ চোখে পড়ে: ‘বাচ্চা দত্তক দিবেন? আমরা নিবো।’ নিচে দুটি ফোন নম্বর ও একটি ঠিকানা। সেই ঠিকানা ধরে ৩০ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে আল-বোখারি কেয়ারগিভিং সার্ভিসেস লিমিটেডের অফিসে যাওয়া হয়।

প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পাতায় আইইউআই, আইভিএফ ও সারোগেসিসহ বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা সহায়তার কথা আছে। ‘শিশুর আইনগত অভিভাবকত্ব’ শিরোনামে নবজাতক ও এতিম শিশু দত্তকে সহযোগিতার কথাও লেখা। প্রতিবেদকেরা প্রথমে দত্তক নিতে আগ্রহী পরিচয়ে আলাপ করেন, পরে নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দেন। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল আহাদ দীর্ঘ সময় কথা বলেন। তিনি জানান, তাঁরা ভারতেও সারোগেসি সেবা দেন।

প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্যাডে শিশু দেওয়া ও নেওয়ার আবেদনের ফরম আছে। ফরমে বলা আছে, প্রতিষ্ঠানটি সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করবে এবং শিশু নিতে ইচ্ছুক পক্ষ ৩৫ হাজার টাকা সম্মানী দেবে। আবদুল আহাদ মুখে চেয়েছিলেন ৫০ হাজার টাকা। এই ফি ব্যবস্থাপনা খরচ হিসেবে নেওয়া হয়। এর বাইরে শিশুদাতা পরিবারকে চাহিদামতো টাকা দিতে হয়, সিজারিয়ান হলে তার খরচও বহন করতে হয়। সব মিলিয়ে খরচ দুই লাখ টাকার কাছাকাছি দাঁড়ায়।

প্রতিষ্ঠানটি একটি সম্মতিনামা ও সমঝোতা দলিল দেয়। দুই পক্ষ সই করার সময় প্রতিষ্ঠানের দুজন সাক্ষী হিসেবে সই করেন। আবদুল আহাদ জানান, দলিলটি কম্পিউটারের দোকান থেকে অ্যাফিডেভিট করানো হয়। সই-সাবুদের পর শিশুকে হস্তান্তর করা হয়, এরপর প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শেষ। আদালতে আইনি অভিভাবকত্বের বিষয়ে তাঁরা কিছু করেন না। তাঁর ভাষ্য, স্থানীয় থানা ও সমাজসেবা অধিদপ্তরে করণীয় জানতে চেয়েও তিনি স্পষ্ট দিকনির্দেশ পাননি। এখন নিজেদের মতো করে কাগজপত্র রাখছেন।

তাঁর জানামতে, অনেক প্রতিষ্ঠান টাকার বিনিময়ে শিশু দত্তক দেওয়ার কাজ করে, কিছু ভুয়া প্রতিষ্ঠানও আছে। চাহিদা অনেক বড় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর মুঠোফোন থেকে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা হয়, যিনি কয়েক দিন আগে ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি ছেলেশিশু নিয়েছেন। তাঁর খরচ হয়েছে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা। তিনি এখন নিজেদের সন্তান পরিচয়ে শিশুটির জন্মনিবন্ধন ও অন্যান্য কাগজ তৈরি করবেন। কথাবার্তার একপর্যায়ে এক আসন্নপ্রসবা নারী আবদুল আহাদকে ফোন করেন। লাউডস্পিকারে শোনা যায়, আরেকটি সন্তান পালনের সামর্থ্য তাঁর নেই। এক লাখ টাকা ও অস্ত্রোপচারের খরচ পেলে তিনি গর্ভের ছেলেশিশুটিকে দত্তক দেবেন।

আইন কী বলে

বাংলাদেশে সবার জন্য প্রযোজ্য কোনো সাধারণ দত্তক আইন নেই। পারিবারিক আইনগুলো ধর্মভিত্তিক, আর মুসলিম পারিবারিক আইনে দত্তকের বিধান নেই। আইনজীবীরা বলছেন, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানেরা ধর্মীয়ভাবে দত্তক নিতে পারেন। ধর্মনির্বিশেষে পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে শিশুর আইনি অভিভাবকত্ব নেওয়া যায়। এ ছাড়া ২০১৩ সালের শিশু আইন অনুযায়ী শিশুকল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুর বিকল্প পরিচর্যার দায়িত্ব হস্তান্তর করা যায়। কেবল এই দুই ক্ষেত্রেই নজরদারির বিধান আছে।

সরকারিভাবে শুধু সমাজসেবা অধিদপ্তরের ছয়টি ছোটমণি নিবাসের শিশুদের আদালতের মাধ্যমে অভিভাবকত্ব দেওয়া হচ্ছে। কয়েকটি বেসরকারি সংস্থাও সুবিধাবঞ্চিত শিশুর আইনি অভিভাবকত্ব হস্তান্তরের কাজ করে, আবার আইনবহির্ভূতভাবে দত্তক দেওয়া প্রতিষ্ঠানও আছে। ঢাকার আজিমপুর ছোটমণি নিবাসের সাবেক উপতত্ত্বাবধায়ক জুবলি বেগম বলেন, নিঃসন্তান দম্পতিরা যেকোনো উপায়ে সন্তান চান। এ কারণেই ফেসবুকসহ বিভিন্ন জায়গায় শিশু কেনাবেচার চক্র সক্রিয় হচ্ছে।

আইনি শাস্তির বিধানও আছে। বেআইনি ও অনৈতিক কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে শিশু বেচা, কেনা বা হস্তান্তর করলে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩৭২ ও ৩৭৩ ধারায় কঠোর শাস্তি রয়েছে। ২০২৬ সালের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে ‘অসৎ উদ্দেশ্যে’ দত্তক গ্রহণকে শোষণ হিসেবে ধরা হয়েছে।

অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ফউজুল আজিম আইন কমিশনের মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁর মতে, ‘শিশু দত্তক’, ‘নবজাতক প্রয়োজন’ বা ‘বিনিময়ে এত টাকা’ ধরনের পোস্টকে সম্ভাব্য শিশু পাচার বা শোষণের ঝুঁকি হিসেবে দেখা উচিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার উচিত প্রাথমিকভাবে বিষয়টি যাচাই করা। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন বা দরদাম যদি বাস্তবে শিশুর হস্তান্তরের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে টাকা কারা নিচ্ছে, কোনো মধ্যস্থতাকারী বা চক্র আছে কি না এবং শিশুকে ভবিষ্যতে কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে, তদন্তে তা দেখতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ হুদা মনে করেন, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো কেনাবেচার পর শিশুরা কোথায় যাচ্ছে বা কী কাজে জড়াচ্ছে, তার কোনো নজরদারি না থাকা। তাঁর ভাষ্য, ‘অনেকে হয়তো এ ধরনের ব্যবসা করার জন্যই সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। বিষয়টিতে সরকারের নজরদারি জরুরি হয়ে পড়েছে।’ তিনি আরও বলেন, এতিম ও অসহায় শিশুদের দত্তক বা পরিবারের কাছে হস্তান্তরের জন্য একটি সর্বজনীন আইন দরকার। আইনি কাঠামো থাকলে শিশু বিক্রি ঠেকানো সহজ হবে।

পুলিশ যা জানাল

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারে নিযুক্ত আছেন। তিনি জানান, দত্তকের নামে ফেসবুকে প্রতারণার বিষয়টি তাঁরা জানেন, তবে এভাবে শিশু বিক্রির সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পাননি। তাঁর মতে, উদ্দেশ্য যা-ই হোক, ফেসবুকে এ ধরনের কার্যক্রম চালানো অপরাধ। যদিও তাঁদের সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং টিম দত্তকের নামে গ্রুপ খুলে শিশু বিক্রির তৎপরতার দায়ে এখন পর্যন্ত কাউকে আইনের আওতায় আনেনি।

একদিকে নিঃসন্তান দম্পতিদের সন্তান পাওয়ার তীব্র চাহিদা, অন্যদিকে শিশু দিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন বা জোগান। মাঝখানে নেই পর্যাপ্ত আইন, নেই কার্যকর নজরদারি। সেই ফাঁকেই বাজারটি জমে উঠছে। ফউজুল আজিম বলেন, এখনই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার নজরদারি বাড়াতে হবে, আর সরকারের তত্ত্বাবধানে দত্তকের এমন একটি কাঠামো গড়তে হবে, যেখানে শিশুর সুরক্ষার সব বিষয় থাকবে।

Share this news as a Photo Card