দেশের বিদ্যুৎ আইনে সাধারণ গ্রাহকের জন্য ‘এক নাম, এক মিটার’ নীতি কঠোরভাবে কার্যকর থাকলেও, মোবাইল নেটওয়ার্ক টাওয়ার কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। একই স্থাপনায়, একই গ্রাহকের নামে একের অধিক বিদ্যুৎ মিটার ব্যবহারের মাধ্যমে বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি এবং কারিগরি অনিয়মের মহোৎসব চলছে। অভিযোগ উঠেছে, বিগত সরকারের আমলের প্রভাবশালী মহলের আর্শীবাদপুষ্ট একটি চক্র এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তৎকালীন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এই অনৈতিক সুবিধা ভোগ করছে মোবাইল অপারেটর ও টাওয়ার শেয়ারিং কোম্পানিগুলো।
আইনের বৈষম্য: সাধারণ গ্রাহক বনাম মোবাইল অপারেটর
বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর (যেমন- ডিপিডিসি, ডেসকো, আরইবি বা পবিস) বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী, একই সীমানায় বা একই স্থাপনায় একই গ্রাহকের নামে একাধিক মিটার নেওয়ার কোনো অনুমতি নেই। যদি বাড়তি বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, তবে বিদ্যমান মিটারের লোড বৃদ্ধি (Load Sanction) করার নিয়ম। কিন্তু সরেজমিনে এবং অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কীর্তনখোলা টাওয়ার্স, সামিট টাওয়ার্স এবং ফ্রন্টিয়ার টাওয়ার্স , ইডটকো বাংলাদেশ লিমিটেডের মতো টাওয়ার কোম্পানিগুলো একই স্থানে একাধিক মিটার ব্যবহার করছে। এমনকি গ্রামীণফোন, বাংলালিংক ও রবির মতো শীর্ষ অপারেটরগুলোও এই অনিয়মের বাইরে নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি সরাসরি বিদ্যুৎ আইনের লঙ্ঘন। সাধারণ গ্রাহক একটি বাড়তি মিটারের জন্য আবেদন করলে যেখানে হাজারো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়, সেখানে মোবাইল অপারেটরদের ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। এটি কেবল বৈষম্য নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার।
পেছনের কারিগর: সেই বিতর্কিত ‘প্রত্যয়ন পত্র’
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিগত সরকারের আমলে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি) বা সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিভাগের একজন তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তা একটি বিতর্কিত ‘নোট’ বা প্রত্যয়ন পত্রে স্বাক্ষর করেন। মূলত সেই কাগজটিকেই ‘লাইসেন্স’ হিসেবে ব্যবহার করছে মোবাইল অপারেটররা। অভিযোগ আছে, একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট বিদ্যুৎ অফিসগুলোকে কার্যত ‘কন্ট্রোল’ করছে।
এই চক্রটি টেকনিক্যালি লোড বৃদ্ধির ঝামেলা এড়াতে এবং কমার্শিয়াল ট্যারিফ ফাঁকি দিতে ৭ কিলোওয়াটের সিঙ্গেল ফেজ মিটার বেছে নেয়। নিয়ম অনুযায়ী, লোড বেশি হলে থ্রি-ফেজ মিটার বা ট্রান্সফর্মার স্থাপনের বাধ্যবাধকতা থাকে, যা কোম্পানিগুলোর জন্য ব্যয়বহুল। কিন্তু এই ‘বিশেষ চক্রের’ মাধ্যমে তারা একই স্থাপনায় ৩ থেকে ৪টি সিঙ্গেল ফেজ মিটার নিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে, যা বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি একটি গুরুতর ‘টেকনিক্যাল ক্রাইম’। একই জায়গায় একাধিক সিঙ্গেল ফেজ মিটার ব্যবহারের ফলে ফেজ আনব্যালেন্সিংয়ের ঝুঁকি বাড়ে, যা স্থানীয় ট্রান্সফর্মার বিকল হওয়া বা অগ্নিকাণ্ডের কারণ হতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রকৌশলী জানান, “একটি টাওয়ারের জন্য যদি ১৫ বা ২০ কিলোওয়াট লোড লাগে, তবে নিয়ম অনুযায়ী তাদের নিজস্ব ট্রান্সফর্মার বা প্রপার থ্রি-ফেজ কানেকশন নেওয়ার কথা। কিন্তু তারা নিয়মবহির্ভূতভাবে একাধিক ৭ কিলোওয়াটের লাইন নিয়ে বিদ্যুৎ চুরি ও সিস্টেম লস বৃদ্ধি করছে।”
রাজস্ব হারানোর শঙ্কা
একই নামে একাধিক মিটার নেওয়ার ফলে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো বড় অঙ্কের ফিক্সড চার্জ এবং ডিমান্ড চার্জ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। লোড বৃদ্ধি করলে গ্রাহককে যে পরিমাণ জামানত ও চার্জ দিতে হতো, একাধিক ছোট মিটারের আড়ালে তা আড়াল করা হচ্ছে। মোবাইল কোম্পানিগুলো তাদের বিশাল মুনাফার একটি অংশ বিদ্যুৎ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করতে ব্যয় করলেও সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।
অপারেটরদের লুকোচুরি
এ বিষয়ে ইডটকো বা সামিট টাওয়ার্সের মতো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তারা সদুত্তর দেয়নি। তবে মাঠ পর্যায়ের বিদ্যুৎ কর্মীরা জানান, উপর মহলের প্রত্যয়ন পত্র’ বা ‘বিশেষ নির্দেশনা’ থাকায় তারা চাইলেও এসব মিটারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন না।
চলমানবার্তা’র পর্যবেক্ষণ
বিদ্যুৎ খাতকে আধুনিক ও দুর্নীতিমুক্ত করার ঘোষণা থাকলেও মোবাইল টাওয়ারগুলোর এই ‘মিটার বাণিজ্য’ জনমনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। সাধারণ মানুষ যেখানে সামান্য লোড বাড়লে জরিমানার মুখে পড়ে, সেখানে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো কীভাবে এই গর্হিত কাজ করছে, তার তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ বিভাগের বর্তমান প্রশাসনের উচিত বিগত আমলের সেই বিতর্কিত প্রত্যয়ন বাতিল করা এবং প্রতিটি মোবাইল টাওয়ারের বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় নিরীক্ষা (Audit) করা। আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত—এটাই এখন সাধারণ গ্রাহকদের দাবি।
এস কে চন্দন 










