ঢাকা ০৯:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দোতারার জীবন

  • মামুন সরকার
  • আপডেট সময় ১০:৩৩:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • 71
আকাশে রঙিন ভোরের আভা মেখে যখন গ্রাম জেগে ওঠে, তখনই মেঠোপথে দেখা মেলে বাউল জয়নালের । কাঁধে ঝোলা, হাতে একতারা, চোখে যেন অন্য দুনিয়ার আলো। তার হাঁটা যেন গানের তালে বাঁধা, তার নিঃশ্বাসে লুকিয়ে থাকে শত শোক-সুখের সুর।
“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি রে,
এই দেহের মাঝে লুকানো ধন।
সংসার ভেঙে, বিরহ বুকে নিয়ে,
ভালোবাসাই আসল জীবন।”
গান ধরলেই মনে হয়, বাতাসও যেন থমকে শোনে।
লোকজন জয়নালকে ডাকে ‘ছন্নছাড়া’, কেউ বলে ‘পাগল’, কিন্তু তার গান শোনার পর বোঝা যায়—সে একজন বিরহের প্রেমিক, আবার মুক্তিরও ফেরিওয়ালা।
জয়নালের জীবনটা এমন ছিল না। একসময় তারও ছিল সংসার, ছিল প্রিয়তমা আসমা জান। আসমা জানের চোখে ভরপুর ছিল স্বপ্ন। ছিল ধানের একচিলতে উঠোন। সন্ধ্যায় আসমার হাতের রান্নার সুস্বাদু মৌ মৌ ঘ্রাণে ঘর ভরে যেত। কিন্তু জয়নালের বুকে হঠাৎই জন্ম নিল অদ্ভুত তৃষ্ণা। গানের সুরে মানুষের মন খোঁজা, আত্মার দর্শন মিলা। সংসারের চার দেওয়ালে বন্দি তার ভাল লাগল না। এমন কি আসমার ভালোবাসার আঁচলও তাকে বেঁধে রাখতে পারল না।
এক রাতে বৃষ্টি ঝরছিল। আসমা জান নাইয়র এসেছিল বাপের বাড়ি। সাথে স্বামী জয়নালও। গভীর রাত। বাইরে ঝিঁঝি পোকা ডাকছে। আসমা জান ঘুমিয়ে ছিল। আর জয়নাল নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে গেল দোতারা হাতে। ঝড়ো হাওয়ার মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে সে বলল,
“হে অদৃশ্য সৃষ্টির মালিক , আমি কি তোমার কাছে পৌঁছাতে পারব?”
বাতাসে যেন প্রতিধ্বনি ভেসে এলো,
“পথে নামলেই পথ খুলে যায়।”
দিন যায়, বছর যায়। জয়নালের গান ভেসে ওঠে নদীর ঘাটে, গঞ্জের হাটে, মেলার মাঠে আর লঞ্চ স্টিমারে। তার সুরে প্রেম আর বিরহ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
একবার মেলার আখড়ায় গাইছিল সে। ভিড়ের মাঝে এক তরুণ এসে জিজ্ঞেস করল, বাউল ভাই, এত ঘুরে বেড়ান কেন? ঘর-সংসার ছেড়ে মানুষকে ভালোবাসা যায় না ? সংসার করতে ইচ্ছে হয় না৷ না কি সংসার নাই? ঘোলে কী আর দুধের স্বাদ মিটে?
গান বাজনা মনের খোরাক। আর সংসার হলো বেঁচে থাকার খুঁটি। সেই খুঁটি ভেঙ্গে গেলে জীবন পানসে হয়ে যায়।
তরুণের তাত্ত্বিক কথা শুনে জয়নাল হাসল। মনের কোণে একটা ব্যথা চিন চিন করতে থাকে। বছর পাঁচ হয় স্ত্রী আসমা জানকে ঘুমে রেখে ঘর ছেড়েছে। এর মাঝে আর কোন খোঁজ নেয়া হয়নি। জয়নাল দোতারা বাজিয়ে বলল, ভাই, সংসারের বাঁধন ভালোবাসাকে শেকল দেয়। আর পথের ধুলোয় মানুষকে পেলে, তার চোখে-চোখ রাখলে বোঝা যায়, সব প্রেম আসলে একই প্রেম। ঘরের প্রেমও, দুনিয়ার প্রেমও, ঈশ্বরের প্রেমও।
তরুণ আর কথা না বাড়িয়ে চুপ হয়ে গেল।
জয়নালের অন্তরে এক গভীর শূন্যতা ছায়া ফেলে। রাতে নদীর পাড়ে বসে সে আকাশ দেখে। চোখের পর্দায় আসমা জানের মুখ ভেসে উঠে।
সে ফিসফিস করে বলে, আসমা জান, আমি তোমায় ছেড়ে এসেছি, কিন্তু গানে গানে আমি তোমারই প্রতিচ্ছবি খুঁজে ফিরি।
এক বৃদ্ধ সাধক, যিনি পাশেই ধ্যানে বসেছিলেন, চোখ মেলে বললেন, বাবা, প্রেম আর বিরহকে আলাদা ভেবো না। প্রেমের ভেতরেই বিরহ লুকানো, বিরহের ভেতরেই প্রেম। দোতারায় যখন টান দাও, দুটি তারে ভিন্ন সুর বাজে, কিন্তু শেষে মিলেমিশে এক হয়। জীবনও তাই। তবে দুতারার একটা তার ছিঁড়ে গেলে যেমন সুর উঠে না, সংসার জীবনও ঠিক তাই। মন ভেঙ্গে গেলে কাঁচ ভাঙ্গার মত আর জোড়া লাগে না।
বৃদ্ধ সাধকের কথায় বুকের ভেতর চিন চিন ব্যথাটা একটু বেড়ে গেল। জয়নাল একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাথা নোয়াল। জীবনের অংক বড় জটিল।
পরের দিন সে ফিরল নিজের গ্রামে। কাশফুলে ভরে গেছে মাঠ, আকাশ নীলে সাদাকালো মেঘের মেলা বসেছে।
জয়নাল এসে দাঁড়াল শ্বশুর বাড়ির পুরোনো উঠোনে। দরজায় নক করতেই আসমা জান বেরিয়ে এলো। জয়নালের চোখে এক অদ্ভুত নীরবতা। কি বলে নিজের দোষ ভাঙ্গাবে ঠিক করতে পারে না। জয়নালকে দেখে আসমা জানও অবাক। পাঁচ বছর যার কোন খোঁজ ছিল না, সে হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হলো? জয়নাল মাথা নিচু করে জানতে চায়, আসমা জান কেমন আছো?
আসমা বলল, আপনি কি আপনার মনের মানুষ খুঁজে পেয়েছেন?
জয়নালের বুক কেঁপে উঠল। জয়নাল এক মুহূর্তে বুঝে গেল, তার গান, তার প্রেম, তার ভ্রমণ, সবকিছু ছিল মনের ঘোর। তরুণ আর বৃদ্ধ সাধকের তাত্ত্বিক কথায় জয়নারের বাউল জীবনের ঘোর কাটলেও আসমা জানের প্রশ্নের উত্তর জানা নেই।
সে পথে পথে ঘুরেফিরে অনেক মানুষ দেখেছে। অনেক গান গেয়েছে। কিন্তু স্ত্রী আসমা জানের মত দরদী মানুষ পায়নি। একটা অচেনা কষ্টে চোখ ভিজে আসে। দোতারা বুকে চেপে ধরে সে গেয়ে ওঠে, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি রে…”
আসমা জান সত্যি বলতে তোমার মত কাউকে খুঁজে পাইনি। তুমি যে আমার অন্তরে গানের সুরে মিশে আছ।
জয়নালের কথা শুনে আসমা জান একটুখানি হেসে শাড়ির আঁচলে চোখ মুছল। তারপরও চোখে জল চিকচিক করছে, কিন্তু আসমা জান কিছু না বলে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, তোমার আসমা জান আর তোমার নেই। সে এখন দূর আকাশের চাঁদ তারা।
জয়নাল কিছু বুঝে উঠার আগেই ঘরের ভেতর থেকে অপরিচিত পুরুষ কন্ঠ ভেসে আসে, বাহিরে কে এলো?
আসমা জান কোন জবাব না দিয়ে ঘরের দরজা বিকট শব্দে এঁটে দেয়।
বাতাসে শিউলি ফুল ঝরে পড়ে, আর সেই মুহূর্তে জয়নাল বুঝে যায়, তার জীবনটা তার ছেঁড়া বেসুরা এক দোতারা। অন্তহীন গান, যার দুখের শেষ নেই।
জয়নালের চোখে কালো মেঘের বিজলি চমকাতে থাকে। বুকের ভেতর কেমন হাহাকার করে ওঠে। এক মুহূর্তে সে বুঝে যায়,পথই তার ঘর, খোলা আকাশই তার মাথার ছাদ, আর গানই তার মুক্তি।
আসমা জানের চোখে যে অশ্রুর ঝিলিক দেখেছিল, তা তার শেষ আশীর্বাদ, আবার শেষ বিদায়ও।
দোতারা বুকে জড়িয়ে সে হাঁটতে থাকে মেঠোপথ ধরে। বাতাসে শিউলি ফুল ঝরে পড়ছে, যেন প্রতিটি ফুল তার ছিন্ন জীবনের সাদা অশ্রুবিন্দু। চারপাশে নিস্তব্ধতা, কেবল দূরের নদীর স্রোতের সঙ্গে মিলেমিশে যায় জয়নালের কণ্ঠ।
“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি রে…”
গানের সুর ভেসে ওঠে দূরের নদীতে, কাশবনে, হয়তো আসমা জানের জানালার কাঁচেও ঠেকে যায় জয়নালের সুর।
আসমা জান হয়তো শুনবে, হয়তো শুনবে না। কিন্তু সেই সুরে তার ভালোবাসা আর অভিমান মিলেমিশে চিরকাল বেঁচে থাকবে।
আর জয়নাল?
সে চলে যায় অদৃশ্য পথের দিকে, এক ছিন্ন দোতারার সুরে, যা থামবে না কোনোদিন, যেমন থামে না প্রেমের অশ্রু, যেমন থামে না বিরহের গান। হয়তো আসমা জানের বুকেও একদিন প্রতিধ্বনিত হয়ে বাজবে জয়নালের গান।
ট্যাগস

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

দোতারার জীবন

আপডেট সময় ১০:৩৩:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫
আকাশে রঙিন ভোরের আভা মেখে যখন গ্রাম জেগে ওঠে, তখনই মেঠোপথে দেখা মেলে বাউল জয়নালের । কাঁধে ঝোলা, হাতে একতারা, চোখে যেন অন্য দুনিয়ার আলো। তার হাঁটা যেন গানের তালে বাঁধা, তার নিঃশ্বাসে লুকিয়ে থাকে শত শোক-সুখের সুর।
“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি রে,
এই দেহের মাঝে লুকানো ধন।
সংসার ভেঙে, বিরহ বুকে নিয়ে,
ভালোবাসাই আসল জীবন।”
গান ধরলেই মনে হয়, বাতাসও যেন থমকে শোনে।
লোকজন জয়নালকে ডাকে ‘ছন্নছাড়া’, কেউ বলে ‘পাগল’, কিন্তু তার গান শোনার পর বোঝা যায়—সে একজন বিরহের প্রেমিক, আবার মুক্তিরও ফেরিওয়ালা।
জয়নালের জীবনটা এমন ছিল না। একসময় তারও ছিল সংসার, ছিল প্রিয়তমা আসমা জান। আসমা জানের চোখে ভরপুর ছিল স্বপ্ন। ছিল ধানের একচিলতে উঠোন। সন্ধ্যায় আসমার হাতের রান্নার সুস্বাদু মৌ মৌ ঘ্রাণে ঘর ভরে যেত। কিন্তু জয়নালের বুকে হঠাৎই জন্ম নিল অদ্ভুত তৃষ্ণা। গানের সুরে মানুষের মন খোঁজা, আত্মার দর্শন মিলা। সংসারের চার দেওয়ালে বন্দি তার ভাল লাগল না। এমন কি আসমার ভালোবাসার আঁচলও তাকে বেঁধে রাখতে পারল না।
এক রাতে বৃষ্টি ঝরছিল। আসমা জান নাইয়র এসেছিল বাপের বাড়ি। সাথে স্বামী জয়নালও। গভীর রাত। বাইরে ঝিঁঝি পোকা ডাকছে। আসমা জান ঘুমিয়ে ছিল। আর জয়নাল নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে গেল দোতারা হাতে। ঝড়ো হাওয়ার মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে সে বলল,
“হে অদৃশ্য সৃষ্টির মালিক , আমি কি তোমার কাছে পৌঁছাতে পারব?”
বাতাসে যেন প্রতিধ্বনি ভেসে এলো,
“পথে নামলেই পথ খুলে যায়।”
দিন যায়, বছর যায়। জয়নালের গান ভেসে ওঠে নদীর ঘাটে, গঞ্জের হাটে, মেলার মাঠে আর লঞ্চ স্টিমারে। তার সুরে প্রেম আর বিরহ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
একবার মেলার আখড়ায় গাইছিল সে। ভিড়ের মাঝে এক তরুণ এসে জিজ্ঞেস করল, বাউল ভাই, এত ঘুরে বেড়ান কেন? ঘর-সংসার ছেড়ে মানুষকে ভালোবাসা যায় না ? সংসার করতে ইচ্ছে হয় না৷ না কি সংসার নাই? ঘোলে কী আর দুধের স্বাদ মিটে?
গান বাজনা মনের খোরাক। আর সংসার হলো বেঁচে থাকার খুঁটি। সেই খুঁটি ভেঙ্গে গেলে জীবন পানসে হয়ে যায়।
তরুণের তাত্ত্বিক কথা শুনে জয়নাল হাসল। মনের কোণে একটা ব্যথা চিন চিন করতে থাকে। বছর পাঁচ হয় স্ত্রী আসমা জানকে ঘুমে রেখে ঘর ছেড়েছে। এর মাঝে আর কোন খোঁজ নেয়া হয়নি। জয়নাল দোতারা বাজিয়ে বলল, ভাই, সংসারের বাঁধন ভালোবাসাকে শেকল দেয়। আর পথের ধুলোয় মানুষকে পেলে, তার চোখে-চোখ রাখলে বোঝা যায়, সব প্রেম আসলে একই প্রেম। ঘরের প্রেমও, দুনিয়ার প্রেমও, ঈশ্বরের প্রেমও।
তরুণ আর কথা না বাড়িয়ে চুপ হয়ে গেল।
জয়নালের অন্তরে এক গভীর শূন্যতা ছায়া ফেলে। রাতে নদীর পাড়ে বসে সে আকাশ দেখে। চোখের পর্দায় আসমা জানের মুখ ভেসে উঠে।
সে ফিসফিস করে বলে, আসমা জান, আমি তোমায় ছেড়ে এসেছি, কিন্তু গানে গানে আমি তোমারই প্রতিচ্ছবি খুঁজে ফিরি।
এক বৃদ্ধ সাধক, যিনি পাশেই ধ্যানে বসেছিলেন, চোখ মেলে বললেন, বাবা, প্রেম আর বিরহকে আলাদা ভেবো না। প্রেমের ভেতরেই বিরহ লুকানো, বিরহের ভেতরেই প্রেম। দোতারায় যখন টান দাও, দুটি তারে ভিন্ন সুর বাজে, কিন্তু শেষে মিলেমিশে এক হয়। জীবনও তাই। তবে দুতারার একটা তার ছিঁড়ে গেলে যেমন সুর উঠে না, সংসার জীবনও ঠিক তাই। মন ভেঙ্গে গেলে কাঁচ ভাঙ্গার মত আর জোড়া লাগে না।
বৃদ্ধ সাধকের কথায় বুকের ভেতর চিন চিন ব্যথাটা একটু বেড়ে গেল। জয়নাল একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাথা নোয়াল। জীবনের অংক বড় জটিল।
পরের দিন সে ফিরল নিজের গ্রামে। কাশফুলে ভরে গেছে মাঠ, আকাশ নীলে সাদাকালো মেঘের মেলা বসেছে।
জয়নাল এসে দাঁড়াল শ্বশুর বাড়ির পুরোনো উঠোনে। দরজায় নক করতেই আসমা জান বেরিয়ে এলো। জয়নালের চোখে এক অদ্ভুত নীরবতা। কি বলে নিজের দোষ ভাঙ্গাবে ঠিক করতে পারে না। জয়নালকে দেখে আসমা জানও অবাক। পাঁচ বছর যার কোন খোঁজ ছিল না, সে হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হলো? জয়নাল মাথা নিচু করে জানতে চায়, আসমা জান কেমন আছো?
আসমা বলল, আপনি কি আপনার মনের মানুষ খুঁজে পেয়েছেন?
জয়নালের বুক কেঁপে উঠল। জয়নাল এক মুহূর্তে বুঝে গেল, তার গান, তার প্রেম, তার ভ্রমণ, সবকিছু ছিল মনের ঘোর। তরুণ আর বৃদ্ধ সাধকের তাত্ত্বিক কথায় জয়নারের বাউল জীবনের ঘোর কাটলেও আসমা জানের প্রশ্নের উত্তর জানা নেই।
সে পথে পথে ঘুরেফিরে অনেক মানুষ দেখেছে। অনেক গান গেয়েছে। কিন্তু স্ত্রী আসমা জানের মত দরদী মানুষ পায়নি। একটা অচেনা কষ্টে চোখ ভিজে আসে। দোতারা বুকে চেপে ধরে সে গেয়ে ওঠে, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি রে…”
আসমা জান সত্যি বলতে তোমার মত কাউকে খুঁজে পাইনি। তুমি যে আমার অন্তরে গানের সুরে মিশে আছ।
জয়নালের কথা শুনে আসমা জান একটুখানি হেসে শাড়ির আঁচলে চোখ মুছল। তারপরও চোখে জল চিকচিক করছে, কিন্তু আসমা জান কিছু না বলে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, তোমার আসমা জান আর তোমার নেই। সে এখন দূর আকাশের চাঁদ তারা।
জয়নাল কিছু বুঝে উঠার আগেই ঘরের ভেতর থেকে অপরিচিত পুরুষ কন্ঠ ভেসে আসে, বাহিরে কে এলো?
আসমা জান কোন জবাব না দিয়ে ঘরের দরজা বিকট শব্দে এঁটে দেয়।
বাতাসে শিউলি ফুল ঝরে পড়ে, আর সেই মুহূর্তে জয়নাল বুঝে যায়, তার জীবনটা তার ছেঁড়া বেসুরা এক দোতারা। অন্তহীন গান, যার দুখের শেষ নেই।
জয়নালের চোখে কালো মেঘের বিজলি চমকাতে থাকে। বুকের ভেতর কেমন হাহাকার করে ওঠে। এক মুহূর্তে সে বুঝে যায়,পথই তার ঘর, খোলা আকাশই তার মাথার ছাদ, আর গানই তার মুক্তি।
আসমা জানের চোখে যে অশ্রুর ঝিলিক দেখেছিল, তা তার শেষ আশীর্বাদ, আবার শেষ বিদায়ও।
দোতারা বুকে জড়িয়ে সে হাঁটতে থাকে মেঠোপথ ধরে। বাতাসে শিউলি ফুল ঝরে পড়ছে, যেন প্রতিটি ফুল তার ছিন্ন জীবনের সাদা অশ্রুবিন্দু। চারপাশে নিস্তব্ধতা, কেবল দূরের নদীর স্রোতের সঙ্গে মিলেমিশে যায় জয়নালের কণ্ঠ।
“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি রে…”
গানের সুর ভেসে ওঠে দূরের নদীতে, কাশবনে, হয়তো আসমা জানের জানালার কাঁচেও ঠেকে যায় জয়নালের সুর।
আসমা জান হয়তো শুনবে, হয়তো শুনবে না। কিন্তু সেই সুরে তার ভালোবাসা আর অভিমান মিলেমিশে চিরকাল বেঁচে থাকবে।
আর জয়নাল?
সে চলে যায় অদৃশ্য পথের দিকে, এক ছিন্ন দোতারার সুরে, যা থামবে না কোনোদিন, যেমন থামে না প্রেমের অশ্রু, যেমন থামে না বিরহের গান। হয়তো আসমা জানের বুকেও একদিন প্রতিধ্বনিত হয়ে বাজবে জয়নালের গান।