উচ্চশিক্ষায় বড় রদবদল

বাংলা-ইতিহাসসহ ৬ বিষয়ের অনার্স কোর্স বাতিল করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়

দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় এক বড় ধরনের সংস্কার ও কাঠামোগত পরিবর্তনের আভাস দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। যুগোপযোগী কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলা, ইতিহাস এবং দর্শনসহ প্রায় ছয়টি মৌলিক বিষয়ের ঐতিহ্যবাহী চার বছরের পূর্ণাঙ্গ অনার্স কোর্স বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, এই বিষয়গুলোকে পুরোপুরি বিলুপ্ত না করে, আধুনিক কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ অন্যান্য বিষয়ের সাথে সমন্বয় (ইন্টিগ্রেট) করা হবে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ যাবৎকালের অন্যতম সাহসী এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হতে যাচ্ছে এটি।

কেন এই পরিবর্তন?

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের মতে, বর্তমান বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির যুগে প্রথাগত কিছু বিষয়ের একক ডিগ্রি শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারছে না। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের এসব মৌলিক বিষয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করলেও, চাকরির বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে।

মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা শিক্ষাকে শুধু সনদমুখী না করে কর্মমুখী করতে চাই। বাংলা বা দর্শনের মতো বিষয়গুলোর গুরুত্ব অপরিসীম, তবে সেগুলোকে যদি তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগ বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ের সাথে সমন্বয় করে একটি আধুনিক কারিকুলাম তৈরি করা যায়, তবে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনে বেশি উপকৃত হবে।”

সমন্বয় প্রক্রিয়া যেভাবে কাজ করবে

প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই ছয়টি বিষয়ের জন্য আলাদা কোনো পূর্ণাঙ্গ অনার্স বিভাগ থাকবে না। এর পরিবর্তে ইন্টারডিসিপ্লিনারি বা বহুমাত্রিক শিক্ষা পদ্ধতি চালু করা হবে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলার একজন শিক্ষার্থীকে ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি ডিজিটাল কনটেন্ট রাইটিং বা অনুবাদ শিল্পের ওপর জোর দেওয়া হতে পারে। একইভাবে ইতিহাসের সাথে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বা পর্যটন ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় যুক্ত করার কথা ভাবা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া শিক্ষা গবেষকদের একটি বড় অংশ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, যুগের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষার আধুনিকায়ন অপরিহার্য। তবে একাংশের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগও রয়েছে। কিছু শিক্ষাবিদ মনে করেন, মৌলিক বিষয়গুলোর নিজস্ব সত্ত্বা হারিয়ে গেলে তা দীর্ঘমেয়াদে গবেষণার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

চাকরির বাজারে প্রভাব ও ভবিষ্যৎ

শিল্প ও করপোরেট খাতের উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার কারিকুলাম নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছিলেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে তাত্ত্বিক শিক্ষার চেয়ে ব্যবহারিক শিক্ষার পরিধি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। ফলে স্নাতক শেষ করেই শিক্ষার্থীরা সরাসরি কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করতে পারবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হঠাৎ করেই কোনো পরিবর্তন চাপিয়ে দেওয়া হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে ধাপে ধাপে এই রূপরেখা বাস্তবায়ন করা হবে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই এর আংশিক প্রতিফলন দেখা যেতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

ট্যাগস

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

উচ্চশিক্ষায় বড় রদবদল

বাংলা-ইতিহাসসহ ৬ বিষয়ের অনার্স কোর্স বাতিল করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়

আপডেট সময় ০৬:৪৫:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬

দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় এক বড় ধরনের সংস্কার ও কাঠামোগত পরিবর্তনের আভাস দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। যুগোপযোগী কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলা, ইতিহাস এবং দর্শনসহ প্রায় ছয়টি মৌলিক বিষয়ের ঐতিহ্যবাহী চার বছরের পূর্ণাঙ্গ অনার্স কোর্স বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, এই বিষয়গুলোকে পুরোপুরি বিলুপ্ত না করে, আধুনিক কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ অন্যান্য বিষয়ের সাথে সমন্বয় (ইন্টিগ্রেট) করা হবে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ যাবৎকালের অন্যতম সাহসী এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হতে যাচ্ছে এটি।

কেন এই পরিবর্তন?

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের মতে, বর্তমান বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির যুগে প্রথাগত কিছু বিষয়ের একক ডিগ্রি শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারছে না। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের এসব মৌলিক বিষয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করলেও, চাকরির বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে।

মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা শিক্ষাকে শুধু সনদমুখী না করে কর্মমুখী করতে চাই। বাংলা বা দর্শনের মতো বিষয়গুলোর গুরুত্ব অপরিসীম, তবে সেগুলোকে যদি তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগ বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ের সাথে সমন্বয় করে একটি আধুনিক কারিকুলাম তৈরি করা যায়, তবে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনে বেশি উপকৃত হবে।”

সমন্বয় প্রক্রিয়া যেভাবে কাজ করবে

প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই ছয়টি বিষয়ের জন্য আলাদা কোনো পূর্ণাঙ্গ অনার্স বিভাগ থাকবে না। এর পরিবর্তে ইন্টারডিসিপ্লিনারি বা বহুমাত্রিক শিক্ষা পদ্ধতি চালু করা হবে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলার একজন শিক্ষার্থীকে ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি ডিজিটাল কনটেন্ট রাইটিং বা অনুবাদ শিল্পের ওপর জোর দেওয়া হতে পারে। একইভাবে ইতিহাসের সাথে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বা পর্যটন ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় যুক্ত করার কথা ভাবা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া শিক্ষা গবেষকদের একটি বড় অংশ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, যুগের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষার আধুনিকায়ন অপরিহার্য। তবে একাংশের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগও রয়েছে। কিছু শিক্ষাবিদ মনে করেন, মৌলিক বিষয়গুলোর নিজস্ব সত্ত্বা হারিয়ে গেলে তা দীর্ঘমেয়াদে গবেষণার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

চাকরির বাজারে প্রভাব ও ভবিষ্যৎ

শিল্প ও করপোরেট খাতের উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার কারিকুলাম নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছিলেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে তাত্ত্বিক শিক্ষার চেয়ে ব্যবহারিক শিক্ষার পরিধি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। ফলে স্নাতক শেষ করেই শিক্ষার্থীরা সরাসরি কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করতে পারবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হঠাৎ করেই কোনো পরিবর্তন চাপিয়ে দেওয়া হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে ধাপে ধাপে এই রূপরেখা বাস্তবায়ন করা হবে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই এর আংশিক প্রতিফলন দেখা যেতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।