শিরোনাম :
আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছেন ৩ জেলার ৭০ চরমপন্থি চার মাসে রপ্তানি আয় ১৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল, প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ ১০ মিনিটে হামলার হুমকি ট্রাম্পের, পাল্টা আক্রমণের জবাবের নির্দেশ খামেনির সিসিটিভিতে তাহসিফের সাথে দেখা যাওয়া নারীকে গ্রেফতার মজুরির দাবিতে উত্তাল সাভার-গাজীপুর, মিরপুরে সংঘর্ষ, ৮০ কারখানায় ছুটি বিনিয়োগকারীদের টাকা ফেরত দিতে চান ডেসটিনির রফিকুল আমীন শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজের শিরোপা পাকিস্তানের সোমবার থেকে নিবন্ধন ছাড়া সড়কে নামতে পারবে না ই-রিকশা পোশাকশ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের বোর্ড ঘোষণা ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়েছে : এএফইডি

ইইউ-আমেরিকার বাজার ধরে রাখতে ট্রেসেবিলিটির ৬৬ ঘাটতি

পণ্য কোথায়, কীভাবে এবং কাদের হাতে তৈরি হয়েছে, সেই তথ্য সংরক্ষণ করতে না পারলে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বড় বাধার মুখে পড়তে পারে। দেশের প্রধান রপ্তানি খাতগুলোর সরবরাহ চেইনে পণ্যের ট্রেসেবিলিটি নির্ধারণে ৬৬টি তথ্যগত ঘাটতি চিহ্নিত করেছে সরকার। এই সংকট মোকাবিলায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি সমন্বিত ‘জাতীয় ট্রেসেবিলিটি প্ল্যাটফর্ম’ ও কৌশলপত্র তৈরিসহ ছয় দফা সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সম্প্রতি সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি অনুবিভাগ আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের জাতীয় সভায় সরকারি-বেসরকারি খাত ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের উপস্থিতিতে সর্বসম্মতিক্রমে এসব সিদ্ধান্ত হয়।

কেন জরুরি হয়ে উঠছে ট্রেসেবিলিটি

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২০২৭ সালের তৃতীয় বা চতুর্থ প্রান্তিকে ‘ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট’ (ডিপিপি) কার্যকর হবে। একই বছরের ডিসেম্বরে কার্যকর হবে ‘ফোর্সড লেবার রেগুলেশন’। সমুদ্রে অবৈধ বা অনিয়মিত মৎস্য শিকার রোধে ব্যবহৃত ইইউর ‘ক্যাচ’ ডিজিটাল সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা চালু হয়েছে ২০২৬ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে। ইইউর বনায়ন নীতি বাধ্যতামূলক হচ্ছে ২০২৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে। এ ছাড়া লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) আওতায় ২০২৮ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে কসাইখানা পর্যায় পর্যন্ত ট্রেসেবিলিটি চালুর সময়সীমা নির্ধারিত আছে।

এসব নীতিমালার আওতায় পণ্য রপ্তানিতে ডিজিটাল তথ্য থাকতে হয়, আর সেই তথ্যের জন্য ট্রেসেবিলিটি অপরিহার্য। কিন্তু প্রয়োজনীয় তথ্যই এখন হাতে নেই। এ কারণেই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সরবরাহ চেইনে ট্রেসেবিলিটি বাস্তবায়নে সরকারের অঙ্গীকার অবিচল। তাঁর ভাষ্য, ট্রেসেবিলিটির প্রয়োজন কেবল রপ্তানিতে সীমাবদ্ধ নয়। অভ্যন্তরীণ বাজারে খাদ্যের বিশুদ্ধতা রক্ষা এবং পণ্যের হঠাৎ অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ খুঁজে বের করার ক্ষেত্রেও এটি প্রয়োগ করা হবে।

সমীক্ষায় যা উঠে এসেছে

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বিজনেস ইনিশিয়েটিভ ফর লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড) এবং জার্মান উন্নয়ন সংস্থা জিআইজেডের যৌথ প্রকল্প ‘সাসটেইনেবল ইন দ্য টেক্সটাইল সেক্টর’ (এসটিআইএলই-II)-এর আওতায় একটি গ্যাপ অ্যানালিসিস বা তথ্যগত ঘাটতি মূল্যায়ন সমীক্ষা হয়। সমীক্ষায় তৈরি পোশাক, চামড়া ও জুতা, কৃষি-খাদ্য এবং মৎস্য ও চিংড়ি খাতের সরবরাহ চেইন খতিয়ে দেখা হয়। এতে ৬৬টি ঘাটতি চিহ্নিত হয়।

‘ক্রিটিক্যাল প্রেফারেন্স স্কোরিং’ (সিপিএস) পদ্ধতিতে এর মধ্যে ৩৯টিকে অতি গুরুত্বপূর্ণ বা কাঠামোগত সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে:

  • ১৮টি ক্রিটিক্যাল বা আশু সংকট, যা আগামী ১৮ মাসের মধ্যে সমাধান করতে হবে;
  • ১৩টি কাঠামোগত সংকট, যা ১৮ থেকে ৩৬ মাসের মধ্যে সমাধানযোগ্য;
  • ৮টি কৌশলগত সংকট, যা ৩৬ থেকে ৬০ মাসের মধ্যে সমাধান করতে হবে।

খাতওয়ারি বিশ্লেষণে সবচেয়ে বেশি ১৪টি ঘাটতি পাওয়া গেছে কারিগরি ও ডেটা-সংক্রান্ত ক্ষেত্রে, যার পাঁচটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। নীতি ও প্রবিধানের ক্ষেত্রেও ১৪টি ঘাটতি আছে, যার চারটি ক্রিটিক্যাল। প্রাতিষ্ঠানিক ও সুশাসন-সংক্রান্ত ঘাটতি ১২টি, যার তিনটি ক্রিটিক্যাল। এ ছাড়া খাতভিত্তিক কাঠামোয় ৯টি, শিল্পের সক্ষমতায় ৮টি এবং অর্থসংস্থানে ৭টি ঘাটতি পাওয়া গেছে।

সমীক্ষা বলছে, মূল দুর্বলতা ডেটার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি নয়। সমস্যা হলো বিভিন্ন সংস্থা ও কাস্টমস ব্যবস্থার মধ্যে তথ্যের বিচ্ছিন্নতা এবং ইন্টারঅপারেবিলিটির অভাব। আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনে রপ্তানিকারকের উৎস-ডেটার সঙ্গে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের রিয়েল-টাইম কোনো সংযোগ নেই। পোশাকে ব্যবহৃত তুলার উৎস নিয়ে স্পষ্ট তথ্য না থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘উইঘুর ফোর্সড লেবার প্রিভেনশন অ্যাক্ট’ (ইউএফএলপিএ) মানতে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। দেশে পর্যাপ্ত ফরেনসিক পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপরও নির্ভর করতে হচ্ছে।

কর্মশালা ও প্রতিবেদন

তথ্যগত ঘাটতি কাটাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২৭ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে ‘সরবরাহ চেইন ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ: কার্যকারিতা টুল হিসেবে ট্রেসেবিলিটি’ শীর্ষক জাতীয় কর্মশালার আয়োজন করে। সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান। প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, ফ্লেক্সা, ফোয়াব ও বিল্ডের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, ইউএনডিপি ও আইএলওর শীর্ষ প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন এবং সমাধানের সুপারিশ করেন। কর্মশালার আলোচনার ভিত্তিতে ১২ অক্টোবর একটি প্রতিবেদন তৈরি হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, উরমি গ্রুপ, এপিলিয়ন ও ফতুল্লা অ্যাপারেলসের মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট চালু করেছে। চামড়া ও চিংড়ি খাতেও বিচ্ছিন্ন কিছু পাইলট প্রকল্প আছে। তবে জাতীয় পর্যায়ে কোনো সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম নেই। তাই এসব বিচ্ছিন্ন উদ্যোগকে এক ছাতার নিচে এনে একটি আন্তঃকার্যক্ষম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা হবে।

সভায় বিজিএমইএর সহসভাপতি ভিদিয়া অমৃত খান বলেন, পোশাক খাত ইইউর ডিপিপি, সিএসডিডিডি ও ইএসপিআরের মতো কঠোর নীতিমালার মুখোমুখি। জিআইজেডের সহায়তায় ৩০০টির বেশি কারখানায় ইএসজি ও ডিপিপির পাইলটিং চলছে। তিনি মনে করেন, বিচ্ছিন্ন ক্রেতা-চাহিদার বদলে বিজিএমইএকে ফোকাল পয়েন্ট ধরে পুরো খাতের জন্য একটি একক, মানসম্মত কাঠামো তৈরি করা উচিত। তিনি আরও জানান, চামড়া ও জুতা খাতে আইএলওর সহায়তায় ২০টি কারখানায় পাইলটিং চলছে। এ খাতের জন্য একটি ‘জাতীয় আরবিসি সেল’ ও জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন।

গৃহীত ছয় সিদ্ধান্ত

কর্মশালায় সর্বসম্মতিক্রমে ছয়টি মূল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাস্তবায়নের জন্য ফোকাল পারসনও ঠিক করা হয়েছে। সিদ্ধান্তগুলো হলো:

১. স্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব ও ডেটা মানদণ্ড নির্ধারণ করে অতি দ্রুত ‘জাতীয় ট্রেসেবিলিটি কৌশলপত্র’ চূড়ান্ত করা হবে। এ ক্ষেত্রে ফোকাল পয়েন্ট থাকবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জিআইজেড ও বিল্ড।

২. সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের নিয়ে কার্যক্রম তদারকির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি ‘জাতীয় ট্রেসেবিলিটি স্টিয়ারিং কমিটি’ গঠন করা হবে।

৩. ডেটা ভেরিফিকেশন, ইউনিক আইডেন্টিফায়ার ও সব খাতকে একসঙ্গে আনতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ইপিবি, জিআইজেড ও বিল্ডের যৌথ উদ্যোগে একটি ইন্টারঅপারেবল জাতীয় ট্রেসেবিলিটি প্ল্যাটফর্ম (এনটিপি) তৈরি করা হবে।

৪. ট্রেসেবিলিটির ধারণা ছড়িয়ে দিতে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রস্তুত করতে ব্যাপক সংলাপ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেওয়া হবে।

৫. বিভিন্ন সমিতি ও প্রতিষ্ঠানের পৃথক ট্রেসেবিলিটি উদ্যোগ ও সমীক্ষা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে সমন্বিত করা হবে।

৬. দায়িত্বশীল ব্যবসা পরিচালনা ও ট্রেসেবিলিটির জন্য গঠিত ‘পলিসি কো-অর্ডিনেশন ইউনিট’ (পিসিইউ) মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুবিভাগ থেকে রপ্তানি অনুবিভাগে স্থানান্তর করা হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য সুরক্ষিত হবে। পাশাপাশি দেশের বাজারেও নিত্যপণ্যের সরবরাহে স্বচ্ছতা ও গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বিল্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা বেগম বলেন, ২০২৫ সাল থেকেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জিআইজেডের সঙ্গে ট্রেসেবিলিটি নিয়ে কাজ করছে বিল্ড। দেশীয় ট্রেসেবিলিটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রথম ধাপে রপ্তানি ট্রেসেবিলিটিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে হবে। তাঁর মতে, ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট চালু এবং জাতীয় ট্রেসেবিলিটি প্ল্যাটফর্ম গঠন জরুরি।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছেন ৩ জেলার ৭০ চরমপন্থি

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়েছে : এএফইডি

০১ নভেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

ইইউ-আমেরিকার বাজার ধরে রাখতে ট্রেসেবিলিটির ৬৬ ঘাটতি

আপডেট সময় ০৪:৩২:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

পণ্য কোথায়, কীভাবে এবং কাদের হাতে তৈরি হয়েছে, সেই তথ্য সংরক্ষণ করতে না পারলে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বড় বাধার মুখে পড়তে পারে। দেশের প্রধান রপ্তানি খাতগুলোর সরবরাহ চেইনে পণ্যের ট্রেসেবিলিটি নির্ধারণে ৬৬টি তথ্যগত ঘাটতি চিহ্নিত করেছে সরকার। এই সংকট মোকাবিলায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি সমন্বিত ‘জাতীয় ট্রেসেবিলিটি প্ল্যাটফর্ম’ ও কৌশলপত্র তৈরিসহ ছয় দফা সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সম্প্রতি সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি অনুবিভাগ আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের জাতীয় সভায় সরকারি-বেসরকারি খাত ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের উপস্থিতিতে সর্বসম্মতিক্রমে এসব সিদ্ধান্ত হয়।

কেন জরুরি হয়ে উঠছে ট্রেসেবিলিটি

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২০২৭ সালের তৃতীয় বা চতুর্থ প্রান্তিকে ‘ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট’ (ডিপিপি) কার্যকর হবে। একই বছরের ডিসেম্বরে কার্যকর হবে ‘ফোর্সড লেবার রেগুলেশন’। সমুদ্রে অবৈধ বা অনিয়মিত মৎস্য শিকার রোধে ব্যবহৃত ইইউর ‘ক্যাচ’ ডিজিটাল সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা চালু হয়েছে ২০২৬ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে। ইইউর বনায়ন নীতি বাধ্যতামূলক হচ্ছে ২০২৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে। এ ছাড়া লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) আওতায় ২০২৮ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে কসাইখানা পর্যায় পর্যন্ত ট্রেসেবিলিটি চালুর সময়সীমা নির্ধারিত আছে।

এসব নীতিমালার আওতায় পণ্য রপ্তানিতে ডিজিটাল তথ্য থাকতে হয়, আর সেই তথ্যের জন্য ট্রেসেবিলিটি অপরিহার্য। কিন্তু প্রয়োজনীয় তথ্যই এখন হাতে নেই। এ কারণেই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সরবরাহ চেইনে ট্রেসেবিলিটি বাস্তবায়নে সরকারের অঙ্গীকার অবিচল। তাঁর ভাষ্য, ট্রেসেবিলিটির প্রয়োজন কেবল রপ্তানিতে সীমাবদ্ধ নয়। অভ্যন্তরীণ বাজারে খাদ্যের বিশুদ্ধতা রক্ষা এবং পণ্যের হঠাৎ অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ খুঁজে বের করার ক্ষেত্রেও এটি প্রয়োগ করা হবে।

সমীক্ষায় যা উঠে এসেছে

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বিজনেস ইনিশিয়েটিভ ফর লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড) এবং জার্মান উন্নয়ন সংস্থা জিআইজেডের যৌথ প্রকল্প ‘সাসটেইনেবল ইন দ্য টেক্সটাইল সেক্টর’ (এসটিআইএলই-II)-এর আওতায় একটি গ্যাপ অ্যানালিসিস বা তথ্যগত ঘাটতি মূল্যায়ন সমীক্ষা হয়। সমীক্ষায় তৈরি পোশাক, চামড়া ও জুতা, কৃষি-খাদ্য এবং মৎস্য ও চিংড়ি খাতের সরবরাহ চেইন খতিয়ে দেখা হয়। এতে ৬৬টি ঘাটতি চিহ্নিত হয়।

‘ক্রিটিক্যাল প্রেফারেন্স স্কোরিং’ (সিপিএস) পদ্ধতিতে এর মধ্যে ৩৯টিকে অতি গুরুত্বপূর্ণ বা কাঠামোগত সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে:

  • ১৮টি ক্রিটিক্যাল বা আশু সংকট, যা আগামী ১৮ মাসের মধ্যে সমাধান করতে হবে;
  • ১৩টি কাঠামোগত সংকট, যা ১৮ থেকে ৩৬ মাসের মধ্যে সমাধানযোগ্য;
  • ৮টি কৌশলগত সংকট, যা ৩৬ থেকে ৬০ মাসের মধ্যে সমাধান করতে হবে।

খাতওয়ারি বিশ্লেষণে সবচেয়ে বেশি ১৪টি ঘাটতি পাওয়া গেছে কারিগরি ও ডেটা-সংক্রান্ত ক্ষেত্রে, যার পাঁচটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। নীতি ও প্রবিধানের ক্ষেত্রেও ১৪টি ঘাটতি আছে, যার চারটি ক্রিটিক্যাল। প্রাতিষ্ঠানিক ও সুশাসন-সংক্রান্ত ঘাটতি ১২টি, যার তিনটি ক্রিটিক্যাল। এ ছাড়া খাতভিত্তিক কাঠামোয় ৯টি, শিল্পের সক্ষমতায় ৮টি এবং অর্থসংস্থানে ৭টি ঘাটতি পাওয়া গেছে।

সমীক্ষা বলছে, মূল দুর্বলতা ডেটার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি নয়। সমস্যা হলো বিভিন্ন সংস্থা ও কাস্টমস ব্যবস্থার মধ্যে তথ্যের বিচ্ছিন্নতা এবং ইন্টারঅপারেবিলিটির অভাব। আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনে রপ্তানিকারকের উৎস-ডেটার সঙ্গে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের রিয়েল-টাইম কোনো সংযোগ নেই। পোশাকে ব্যবহৃত তুলার উৎস নিয়ে স্পষ্ট তথ্য না থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘উইঘুর ফোর্সড লেবার প্রিভেনশন অ্যাক্ট’ (ইউএফএলপিএ) মানতে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। দেশে পর্যাপ্ত ফরেনসিক পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপরও নির্ভর করতে হচ্ছে।

কর্মশালা ও প্রতিবেদন

তথ্যগত ঘাটতি কাটাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২৭ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে ‘সরবরাহ চেইন ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ: কার্যকারিতা টুল হিসেবে ট্রেসেবিলিটি’ শীর্ষক জাতীয় কর্মশালার আয়োজন করে। সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান। প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, ফ্লেক্সা, ফোয়াব ও বিল্ডের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, ইউএনডিপি ও আইএলওর শীর্ষ প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন এবং সমাধানের সুপারিশ করেন। কর্মশালার আলোচনার ভিত্তিতে ১২ অক্টোবর একটি প্রতিবেদন তৈরি হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, উরমি গ্রুপ, এপিলিয়ন ও ফতুল্লা অ্যাপারেলসের মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট চালু করেছে। চামড়া ও চিংড়ি খাতেও বিচ্ছিন্ন কিছু পাইলট প্রকল্প আছে। তবে জাতীয় পর্যায়ে কোনো সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম নেই। তাই এসব বিচ্ছিন্ন উদ্যোগকে এক ছাতার নিচে এনে একটি আন্তঃকার্যক্ষম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা হবে।

সভায় বিজিএমইএর সহসভাপতি ভিদিয়া অমৃত খান বলেন, পোশাক খাত ইইউর ডিপিপি, সিএসডিডিডি ও ইএসপিআরের মতো কঠোর নীতিমালার মুখোমুখি। জিআইজেডের সহায়তায় ৩০০টির বেশি কারখানায় ইএসজি ও ডিপিপির পাইলটিং চলছে। তিনি মনে করেন, বিচ্ছিন্ন ক্রেতা-চাহিদার বদলে বিজিএমইএকে ফোকাল পয়েন্ট ধরে পুরো খাতের জন্য একটি একক, মানসম্মত কাঠামো তৈরি করা উচিত। তিনি আরও জানান, চামড়া ও জুতা খাতে আইএলওর সহায়তায় ২০টি কারখানায় পাইলটিং চলছে। এ খাতের জন্য একটি ‘জাতীয় আরবিসি সেল’ ও জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন।

গৃহীত ছয় সিদ্ধান্ত

কর্মশালায় সর্বসম্মতিক্রমে ছয়টি মূল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাস্তবায়নের জন্য ফোকাল পারসনও ঠিক করা হয়েছে। সিদ্ধান্তগুলো হলো:

১. স্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব ও ডেটা মানদণ্ড নির্ধারণ করে অতি দ্রুত ‘জাতীয় ট্রেসেবিলিটি কৌশলপত্র’ চূড়ান্ত করা হবে। এ ক্ষেত্রে ফোকাল পয়েন্ট থাকবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জিআইজেড ও বিল্ড।

২. সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের নিয়ে কার্যক্রম তদারকির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি ‘জাতীয় ট্রেসেবিলিটি স্টিয়ারিং কমিটি’ গঠন করা হবে।

৩. ডেটা ভেরিফিকেশন, ইউনিক আইডেন্টিফায়ার ও সব খাতকে একসঙ্গে আনতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ইপিবি, জিআইজেড ও বিল্ডের যৌথ উদ্যোগে একটি ইন্টারঅপারেবল জাতীয় ট্রেসেবিলিটি প্ল্যাটফর্ম (এনটিপি) তৈরি করা হবে।

৪. ট্রেসেবিলিটির ধারণা ছড়িয়ে দিতে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রস্তুত করতে ব্যাপক সংলাপ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেওয়া হবে।

৫. বিভিন্ন সমিতি ও প্রতিষ্ঠানের পৃথক ট্রেসেবিলিটি উদ্যোগ ও সমীক্ষা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে সমন্বিত করা হবে।

৬. দায়িত্বশীল ব্যবসা পরিচালনা ও ট্রেসেবিলিটির জন্য গঠিত ‘পলিসি কো-অর্ডিনেশন ইউনিট’ (পিসিইউ) মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুবিভাগ থেকে রপ্তানি অনুবিভাগে স্থানান্তর করা হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য সুরক্ষিত হবে। পাশাপাশি দেশের বাজারেও নিত্যপণ্যের সরবরাহে স্বচ্ছতা ও গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বিল্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা বেগম বলেন, ২০২৫ সাল থেকেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জিআইজেডের সঙ্গে ট্রেসেবিলিটি নিয়ে কাজ করছে বিল্ড। দেশীয় ট্রেসেবিলিটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রথম ধাপে রপ্তানি ট্রেসেবিলিটিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে হবে। তাঁর মতে, ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট চালু এবং জাতীয় ট্রেসেবিলিটি প্ল্যাটফর্ম গঠন জরুরি।

Share this news as a Photo Card