ঢাকা ০৪:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিভিন্ন দেশে ইরানের ১০০ বিলিয়ন ডলার জব্দ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে দ্বিতীয় দফা আলোচনার প্রস্তুতি চলছে। তবে তেহরানের ‘ফ্রিজ’ বা জব্দ হয়ে থাকা বৈদেশিক সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়টি এখন প্রধান বিবাদমান ইস্যু। বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে পড়ে থাকা ইরানের এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়েছে। খবর আলজাজিরার।

বিভিন্ন সূত্র ও বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বিদেশের মাটিতে ইরানের জব্দ থাকা সম্পদের পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষক ফ্রেডেরিক স্নাইডার আল জাজিরাকে জানান, এই অর্থের পরিমাণ ইরানের বার্ষিক তেল ও গ্যাস রপ্তানি আয়ের প্রায় তিন গুণ। দশকের পর দশক ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা ইরানি অর্থনীতির জন্য এই বিশাল অংকের অর্থ অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে দেশটির অবকাঠামো উন্নয়ন, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের জন্য তেহরান এই অর্থের ওপর নির্ভর করছে।

এর আগে গত ১০ এপ্রিল ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, যেকোনো আলোচনার আগে ইরানের এই ‘ফ্রোজেন অ্যাসেট‘ অবমুক্ত করতে হবে। ইসলামাবাদের আলোচনায় ওয়াশিংটন কিছু সম্পদ ছেড়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে বলে গুঞ্জন উঠলেও মার্কিন সরকার দ্রুত তা অস্বীকার করে। ইরান বর্তমানে ‘বিশ্বাস ফেরানোর পদক্ষেপ’ হিসেবে অন্তত ৬ বিলিয়ন ডলার অবমুক্ত করার দাবি জানাচ্ছে।

কেন এই সম্পদ আটকে আছে?
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব ও পরবর্তী তেহরান দূতাবাস জিম্মি সংকট থেকেই ইরানের সম্পদ জব্দ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরবর্তীতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রকল্পের কারণে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও তাদের মিত্ররা কয়েক ধাপে এই নিষেধাজ্ঞা কঠোর করে। ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের সময় জেসিপিওএ চুক্তির অধীনে ইরান কিছু অর্থ ফিরে পেলেও, ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে চুক্তি থেকে সরে এসে পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। ফলে সম্পদগুলো আবারও স্থগিত বা জব্দ হয়ে যায়।

কোন দেশে কত অর্থ আটকে আছে?
ইরানি সংবাদমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই বিপুল অর্থ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে। এর মধ্যে চীনে অন্তত ২০ বিলিয়ন ডলার, ভারতে ৭ বিলিয়ন ডলার, ইরাকে ৬ বিলিয়ন ডলার, কাতারে ৬ বিলিয়ন ডলার (যা দক্ষিণ কোরিয়া থেকে পাঠানো হয়েছিল কিন্তু পরে পুনরায় ব্লক করা হয়), যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকে ২ বিলিয়ন ও লুক্সেমবার্গসহ ইউরোপীয় দেশগুলোতে আরও প্রায় ১ দাশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার রয়েছে।

অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্য
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ রোকসানে ফরমানফারমাইয়ান মনে করেন, এই অর্থ ফিরে পেলে ইরান তার বিদ্যুৎ গ্রিড, পানি ব্যবস্থা ও তেল খনির আধুনিকায়ন করতে পারবে। অন্যদিকে, পলিটিক্যাল সায়েন্টিস্ট ক্রিস ফেদারস্টোন মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এই সম্পদ অবমুক্ত করে, তবে তা আন্তর্জাতিকভাবে ইরানের ওপর চাপ কমানোর একটি বড় কূটনৈতিক বার্তা হবে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের অনিশ্চিত পররাষ্ট্রনীতির কারণে এই সম্পদ অবমুক্ত হবে কি না, তা নিয়ে এখনও সংশয় কাটছে না।

উল্লেখ্য, আগামী ২২ এপ্রিল বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এই ইস্যুতে একটি রফাদফা করতে চাইছে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো। তবে তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, নিজেদের ন্যায্য পাওনা বুঝে না পাওয়া পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হওয়া কঠিন।

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

বিভিন্ন দেশে ইরানের ১০০ বিলিয়ন ডলার জব্দ

আপডেট সময় ০৩:৫২:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে দ্বিতীয় দফা আলোচনার প্রস্তুতি চলছে। তবে তেহরানের ‘ফ্রিজ’ বা জব্দ হয়ে থাকা বৈদেশিক সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়টি এখন প্রধান বিবাদমান ইস্যু। বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে পড়ে থাকা ইরানের এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়েছে। খবর আলজাজিরার।

বিভিন্ন সূত্র ও বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বিদেশের মাটিতে ইরানের জব্দ থাকা সম্পদের পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষক ফ্রেডেরিক স্নাইডার আল জাজিরাকে জানান, এই অর্থের পরিমাণ ইরানের বার্ষিক তেল ও গ্যাস রপ্তানি আয়ের প্রায় তিন গুণ। দশকের পর দশক ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা ইরানি অর্থনীতির জন্য এই বিশাল অংকের অর্থ অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে দেশটির অবকাঠামো উন্নয়ন, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের জন্য তেহরান এই অর্থের ওপর নির্ভর করছে।

এর আগে গত ১০ এপ্রিল ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, যেকোনো আলোচনার আগে ইরানের এই ‘ফ্রোজেন অ্যাসেট‘ অবমুক্ত করতে হবে। ইসলামাবাদের আলোচনায় ওয়াশিংটন কিছু সম্পদ ছেড়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে বলে গুঞ্জন উঠলেও মার্কিন সরকার দ্রুত তা অস্বীকার করে। ইরান বর্তমানে ‘বিশ্বাস ফেরানোর পদক্ষেপ’ হিসেবে অন্তত ৬ বিলিয়ন ডলার অবমুক্ত করার দাবি জানাচ্ছে।

কেন এই সম্পদ আটকে আছে?
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব ও পরবর্তী তেহরান দূতাবাস জিম্মি সংকট থেকেই ইরানের সম্পদ জব্দ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরবর্তীতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রকল্পের কারণে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও তাদের মিত্ররা কয়েক ধাপে এই নিষেধাজ্ঞা কঠোর করে। ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের সময় জেসিপিওএ চুক্তির অধীনে ইরান কিছু অর্থ ফিরে পেলেও, ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে চুক্তি থেকে সরে এসে পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। ফলে সম্পদগুলো আবারও স্থগিত বা জব্দ হয়ে যায়।

কোন দেশে কত অর্থ আটকে আছে?
ইরানি সংবাদমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই বিপুল অর্থ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে। এর মধ্যে চীনে অন্তত ২০ বিলিয়ন ডলার, ভারতে ৭ বিলিয়ন ডলার, ইরাকে ৬ বিলিয়ন ডলার, কাতারে ৬ বিলিয়ন ডলার (যা দক্ষিণ কোরিয়া থেকে পাঠানো হয়েছিল কিন্তু পরে পুনরায় ব্লক করা হয়), যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকে ২ বিলিয়ন ও লুক্সেমবার্গসহ ইউরোপীয় দেশগুলোতে আরও প্রায় ১ দাশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার রয়েছে।

অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্য
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ রোকসানে ফরমানফারমাইয়ান মনে করেন, এই অর্থ ফিরে পেলে ইরান তার বিদ্যুৎ গ্রিড, পানি ব্যবস্থা ও তেল খনির আধুনিকায়ন করতে পারবে। অন্যদিকে, পলিটিক্যাল সায়েন্টিস্ট ক্রিস ফেদারস্টোন মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এই সম্পদ অবমুক্ত করে, তবে তা আন্তর্জাতিকভাবে ইরানের ওপর চাপ কমানোর একটি বড় কূটনৈতিক বার্তা হবে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের অনিশ্চিত পররাষ্ট্রনীতির কারণে এই সম্পদ অবমুক্ত হবে কি না, তা নিয়ে এখনও সংশয় কাটছে না।

উল্লেখ্য, আগামী ২২ এপ্রিল বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এই ইস্যুতে একটি রফাদফা করতে চাইছে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো। তবে তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, নিজেদের ন্যায্য পাওনা বুঝে না পাওয়া পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হওয়া কঠিন।