অভিনেত্রী ও জনপ্রিয় মডেল তানজিন নাহার তিশার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও হুমকির মামলায় অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পায়নি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সম্প্রতি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এ সংক্রান্ত চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. জাহাঙ্গীর আলম।
মামলার বাদী পক্ষের ফ্যাশন ডিজাইনার আয়েশাহ আনুম ফারযাহ সানায়া চৌধুরী নিজেই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গত বছরের ২৭ নভেম্বর ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে তানজিন তিশার বিরুদ্ধে প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও হুমকির অভিযোগ এনে মামলা করেন তিনি। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তদন্তের দায়িত্ব দেয় পিবিআইকে। সানায়ার ভাষ্য, নির্দেশের পর তিনি পুলিশকে সাক্ষী, হুমকির অডিও রেকর্ডিংসহ সব প্রমাণ হস্তান্তর করেন। কিন্তু তারপরও কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ ছাড়াই পুলিশ অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে প্রতিবেদন দাখিল করে, যা তাকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করেছে বলে মনে করেন তিনি। এই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করে নারাজি আবেদন করার কথাও জানিয়েছেন সানায়া।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, এর আগে তানজিন তিশার বিরুদ্ধে করা শাড়ি সংক্রান্ত আরেকটি মামলার তদন্তে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ অভিযোগের সত্যতা পেয়েছিল। তার দাবি, সব প্রমাণ থাকার পরও একজন সাধারণ মানুষ হওয়ার কারণেই তাকে মিথ্যা প্রতিবেদনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতউল্লাহর আদালতে এই তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর শুনানির দিন ধার্য রয়েছে। নথিপত্র অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৫ মে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তদন্ত প্রতিবেদনটি জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা।
তদন্ত প্রতিবেদনে যা উঠে এসেছে
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলার বাদী আয়েশাহ আনুম ফারযাহ সানায়া চৌধুরী পেশায় একজন ফ্যাশন ডিজাইনার, আর বিবাদী তানজিন নাহার তিশা একজন মডেল ও অভিনেত্রী। বাদী বিভিন্ন মডেল ও তারকার জন্য পোশাক তৈরি করেন, আর দেশের নামী তারকাদের পাশাপাশি তানজিন তিশাও তার ফ্যাশন হাউজের কাপড় পরিধান করতেন। বিভিন্ন ফ্যাশন ও অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে একসঙ্গে অংশগ্রহণ এবং একসঙ্গে ভ্রমণের সুবাদে দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।
তদন্তে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর একটি অনুষ্ঠানের জন্য তানজিন তিশা বাদীর কাছ থেকে তার সাবেক গাড়িচালকের মাধ্যমে একটি শাড়ি সংগ্রহ করেন। পরে সেই শাড়ি ফেরত চেয়ে ফেসবুক মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠান বাদী। তবে ব্যস্ততার কারণে মেসেঞ্জার ঠিকমতো ব্যবহার না করায় বার্তাগুলো তানজিন তিশার নজরে আসেনি বলে উভয়ের মেসেঞ্জারের স্ক্রিনশট পর্যালোচনায় উঠে আসে তদন্তে। এর মধ্যেই ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের শুভেচ্ছা বিনিময় হয় তাদের মধ্যে, আবার ১৮ মে এক অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে দেখা হলে কুশল বিনিময়ও হয়। এরপর বাদীর শোরুমের ট্রায়াল রুম নিয়ে কিছু নেতিবাচক মন্তব্য এবং ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে দুজনের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনার সূত্রপাত ঘটে।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের ৫ নভেম্বর বাদী মেসেঞ্জারে শাড়ি ফেরতের অনুরোধ জানিয়ে লেখেন, প্রায় এক বছর হয়ে গেছে শাড়িটি এখনো ফেরত পাননি, লোক পাঠিয়ে সেটি সংগ্রহের কথাও জানান তিনি। জবাবে তানজিন তিশা বিষয়টি ঠিক মনে করতে পারছিলেন না বলে জানান এবং খুঁজে দেখার আশ্বাস দেন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে মনোমালিন্য ও বাক-বিতণ্ডা হয়। পরবর্তীতে ৭ নভেম্বর বাদী আরেকটি বার্তা পাঠালে ১০ নভেম্বর পাল্টা বার্তা দেন তানজিন তিশা। এর জেরে ১২ নভেম্বর গুলশান থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন বাদী। জিডির বিষয় জানার পর থানা পুলিশের মাধ্যমে শাড়িটি ফেরত দিতে চাইলেও বাদী তা গ্রহণ না করে মামলা দায়ের করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
জিজ্ঞাসাবাদে তানজিন তিশা জানান, বাদীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ। এই শাড়ির পরও তিনি বাদীর কাছ থেকে আরও কয়েকটি শাড়ি নিয়েছেন ও যথাসময়ে ফেরত দিয়েছেন, বিনিময়ে কোনো অর্থও নেননি বাদী। দীর্ঘদিন এ নিয়ে কোনো যোগাযোগ না থাকায় শাড়ির বিষয়টি তিনি ভুলে গিয়েছিলেন বলে জানান। এদিকে যে গাড়িচালকের মাধ্যমে শাড়িটি নেওয়া হয়েছিল, তিনি চাকরি ছেড়ে চলে যাওয়ায় শাড়ি ফেরত দেওয়া সম্ভব হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি। মামলার বিষয়টি জানার পর আরজিতে উল্লিখিত ঠিকানায় ডাকযোগে শাড়িটি ফেরত পাঠান তানজিন তিশা।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নোটিশ, সশরীরে তদন্ত ও মোবাইল ফোনে একাধিকবার দালিলিক সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া হলেও বাদী কোনো দালিলিক প্রমাণ হাজির করতে পারেননি। অন্যদিকে চলতি বছরের ৩১ মার্চ ডাকযোগে শাড়ি ফেরত পাঠানোয় প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে জানায় তদন্ত সংস্থা। এ ছাড়া গত বছরের ১০ নভেম্বর রাত ৮টায় পাঠানো সর্বশেষ বার্তার শেষাংশে তানজিন তিশা শাড়ি ফেরতের ঠিকানা জানতে চেয়ে বাদীর সুন্দর জীবন কামনা করেছিলেন বলে উল্লেখ থাকায় হুমকির অভিযোগও প্রমাণিত হয়নি। সার্বিক তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা শেষে মামলার ঘটনায় কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয়নি বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসেন তদন্ত কর্মকর্তা।
মামলার এজাহারে কী বলা হয়েছিল
মামলার এজাহারে বাদী উল্লেখ করেছিলেন, গুলশান থানাধীন এলাকায় তার নিজস্ব ফ্যাশন হাউজ ও স্টুডিও রয়েছে, যেখানকার পোশাক দেশের নামী তারকারা পরিধান করে থাকেন। এজাহার অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর একটি অনুষ্ঠানে পরার জন্য ৭৫ হাজার টাকা মূল্যের একটি শাড়ি নিয়ে যান তানজিন তিশা, পরদিন ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেননি। শাড়ির জন্য ১৫ ডিসেম্বর মেসেজ পাঠালে ১৭ ডিসেম্বর অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন বাদী। এরপর মার্চ মাসে দুটি অনুষ্ঠানে বিনয়ের সঙ্গে শাড়ি ফেরত চাইলেও তা প্রত্যাখ্যান করা হয় বলে দাবি এজাহারে। নভেম্বরে বাদীর স্টুডিওর একজন ফটোগ্রাফারকে দিয়ে শাড়ি সংগ্রহের চেষ্টা করা হলে তাকেও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয় এবং বাদীর মানহানির হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ছিল, যার প্রেক্ষিতে গুলশান থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন বাদী।
তদন্তের এই ফলাফলের পর মামলার পরবর্তী গতিপথ নির্ধারিত হবে আগামী ৯ সেপ্টেম্বরের শুনানিতে।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 



















