ঢাকা ০১:৫০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬, ১৬ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা ও সমালোচকদের পরিণতি

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবাগণের মর্যাদা ও ফযীলত কুরআন ও হাদীসের মাঝে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। কুরআন বা হাদীসে কোথাও সাহাবাগণের মাঝে ভাল মন্দের কোন পার্থক্য করা হয়নি। বরং সকলকেই হক ও হক্কানিয়্যাতের প্রতিচ্ছবি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এখানে সংক্ষিপ্তাকারে সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা ও ফযীলত সম্পর্কে উল্লেখ করা হচ্ছেঃ
১. আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা আমার সাহাবীগণের সমালোচনা করো না। তোমরা আমার সাহাবীগণের সমালোচনা করবে না। সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার জীবন, যদি তোমাদের মধ্যে কেউ উহুদ পাহাড় বরাবর স্বর্ণ ব্যয় করে তাহলেও তাঁদের কারোর এক মুদ অথবা অর্ধ মুদ্দের সমান হবে না। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৫৪০] এ হাদীস পরিস্কার প্রমাণ করে, সাহাবাগণ আল্লাহর কাছে কত মর্যাদাবান। কত শ্রেষ্ঠ।
২. হযরত সাওবান রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যখন আমার সাহাবীদের আলোচনা আসে, তখন [তাদের ব্যাপারে সমালোচনা করা থেকে] নিজেকে বিরত রাখো। [আলমু’জামুল কাবীর লিততাবরানী, হাদীস নং-১৪২৭]
জালালুদ্দীন সুয়ুতী রহঃ এ হাদীসকে হাসান বলেছেন। [আলজামেউস সাগীর, বর্ণনা নং-৬১৩ ]
৩. ইবনে উমর রাঃ বলেন, তোমরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাগণের সমালোচনা করো না, তাদের এক মুহুর্তের সৎকাজ তোমাদের সারা জীবনের সৎকাজের চেয়ে উত্তম। [সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-১৪৬, মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং-৩৩০৮২]
৪. হযরত আয়শা রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাগণের ব্যাপারে ক্ষমা প্রার্থনার আদেশ করা করা হয়েছে, অথচ লোকেরা তাদের সমালোচনা করছে। [মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং-৩৩০৮৫, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৩০২২, মুস্তাদরাক আলাস সহীহাইন, হাদীস নং-৩৭১৯]
উপরোক্ত হাদীস দ্বারা একথা পরিস্কার প্রমাণিত যে, সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে সমালোচনা বা খারাপ মন্তব্য নয়, বরং তাদের জন্য ইস্তিগফার এবং প্রশংসনীয় মন্তব্য করাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তামান্না ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা অনেকেই তা লঙ্ঘণ করছি। আল্লাহ হিফাযত করুন।
৫. হযরত আত্বা রহঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আমার সাহাবীর সমালোচনা করে, তার উপর আল্লাহর লানত। [মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং-৩৩০৮৬]
৬. সাহাবা সমালোচনা এবং তাদের প্রতি কু-ধারণা পোষণকারীর হুকুম :
মাইমুনী রহঃ বলেন, আমাকে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহঃ বলেছেন, হে আবুল হাসান! যখন তুমি দেখবে কোন ব্যক্তি সাহাবাগণের মাঝে কোন সাহাবীর ব্যাপারে সমালোচনা করছে, তাহলে তুমি বুঝে নিও তার ঈমান ও ইসলামে খাদ আছে। [আলবিদায়া ওয়াননিহায়া-৮/১৪৮, ১৪৯, ইফাবা-৮/২৬৫]
৭. ফজল বিন যিয়াদ হযরত ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল রহঃ থেকে শুনেছেন। তাকে একজন প্রশ্ন করল এমন ব্যক্তির ব্যাপারে, যে হযরত মুয়াবিয়া রাঃ এবং হযরত আমর বিন আস রাঃ এর ব্যাপারে মন্দ বলে। লোকটিকে কি রাফেজী বলা হবে?
তখন ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহঃ বললেন, অন্তর কলুষিত এবং খারাপ উদ্দেশ্য ছাড়া সে দু’জনের প্রতি এ দুঃসাহস দেখায়নি। আর অসৎ উদ্দেশ্য ছাড়া কেউ কোন সাহাবীর সমালোচনা করেনি। [আলবিদায়া ওয়াননিহায়া-৮/১৪৮, ১৪৯, ইফাবা-৮/২৬৫]
৮. ইবনুল মুবারক বলেন, মুহাম্মদ বিন মুসলিম থেকে, তিনি ইবরাহীম বিন মায়সারা থেকে তিনি বলেন, হযরত মুয়াবিয়ার সমালোচনাকারী এক ব্যক্তি ব্যতীত আমি উমর বিন আব্দুল আজীজকে কোন মানুষের গায়ে হাত উঠাতে দেখিনি। ঐ ব্যক্তিকে তিনি কয়েক ঘা চাবুক লাগিয়ে ছিলেন। [আলবিদায়া ওয়াননিহায়া-৮/১৪৮, ১৪৯ ইফাবা-৮/২৬৫, আলইস্তিআব-৩/৩৮৩]
৯. সালাফে সালেহীনদের একজন বলেন, যখন আমি শামের এক পাহাড়ে অবস্থান করছিলাম তখন এক (অদৃশ্য) ঘোষককে বলতে শুনলাম-সিদ্দীকের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী হল যিনদীক, ধর্মদ্রোহী। উমরের প্রতি বিদ্বেষীর ঠাঁই হল জাহান্নাম। উসমান বিদ্বেষীর প্রতিপক্ষ হলেন আল্লাহ। আলী বিদ্বেষীর প্রতিপক্ষ হলেন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আর যে মুয়াবিয়ার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে (জাহান্নামের) ফেরেশতারা তাকে হেঁচড়ে নিয়ে যাবে। উত্তপ্ত জাহান্নামের দিকে এবং সে নিক্ষিপ্ত হবে উত্তপ্ত অগ্নি গহ্ববরে। [আলবিদায়া ওয়াননিহায়া-৮/১৪৮-১৪৯, ১৪৯-১৫০, ইফাবা-৮/২৬৫-২৬৬]
আব্দুল আজীজ বিন আহমাদ বিন হামেদ কুরাইশী রহঃ লিখেছেনঃ
فحُسن الظن والتأدب لجميعهم واجب على كل مسلم. فهذا مذهب السلف الصالح وأهل الحديث والأصول. ونسأل الله الثبات عليه.
সমস্ত সাহাবাগণের প্রতি সুধারণা রাখা এবং আদব রাখা সকল মুসলমানের উপর ওয়াজিব। সালাফে সালেহীন, আহলে হাদীস এবং আহলে উসূল (আহলে ফিক্বহ) এর এটাই মতাদর্শ। আর আমরা আল্লাহ কাছে এর উপরই অটল থাকার আর্জি জানাই। [আননাহিয়াহ আন তা’নি আমীরিল মু’মিমীনা মুয়াবিয়াহ-৬৭]
১০. শামসুল আইয়িম্মাহ সারাখসী রহঃ লিখেন, কুরআনে কারীমের একাধিক স্থানে আল্লাহ তাআলা সাহাবায়ে কেরাম রাঃ এর প্রশংসা করেছেন। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন {مُحَمَّد رَسُول الله وَالَّذين مَعَه} الْآيَة এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় ইরশাদে সাহাবাগণকে খাইরুন্নাস তথা সর্বোৎকৃষ্ট মানুষ হবার স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। আর এ লোকেরা সেই জমানার শ্রেষ্ঠ মানুষ যে জমানায় আমি নবী রয়েছি। শরীয়তে ইসলামিয়া সাহাবাগণের মাধ্যমেই বর্ণিত হয়ে আমাদের পর্যন্ত এসেছে। [অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরাম ইসলামী শরীয়তের বিস্তারকারী] সুতরাং যে ব্যক্তি সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে সমালোচনা করবে সে মুলহিদ এবং বে-দ্বীন। ইসলামের দিকে পৃষ্ঠপ্রদর্শনকারী। যদি সে ব্যক্তি তওবা না করে তাহলে তার একমাত্র সমাধান তলোয়ার। [উসূলে সারাখসী-২/১৩৪]
উপর্যুক্ত কোরআন-হাদীসের আলোকে একথা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, সাহাবিদের সমালোচনাকারি বা কারিগণ নিঃসন্দেহে কাফের-মোশরেকদের মতো চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামের অগ্নির আগুনে জ্বলতে থাকবে–সে বা তাদের যতো নেক আমলই থাকনা কেনো তা কোনো কাজে আসবেনা। তাছাড়া ওই সমস্ত বদবখত যারা সাহাবায়ে কেরাম আজমাইনদের সমালোচনা করে এবং জায়েজ মনে করে তাদের প্রতি সমাজে বসবাস রতো অন্যান্য মুসলমানদের করণীয় আচরণ কি হবে তা আমাদের প্রিয় নবী স. স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন।
হযরত আনাস রাদ্বিআল্লাহু তা’লা আনহু থেকে বর্ণিতৃ.তিনি বলেন আল্লাহ্’র প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু তা’লা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’লা আঁমাকে নির্বাচন করেছেন এবং আঁমার সাহাবীগণকে নির্বাচন করেছেন। অতঃপর তাদের মধ্যে থেকে আঁমার শ্বশুড় ও জামাতা বানিয়েছেন এবং তাদেরকে আঁমার আনসার তথা সাহায্যকারী বানিয়েছেন। নিশ্চয়ই অচিরেই শেষ যামানায় এমন সম্প্রদায়ের আগমন ঘটবে। যারা আঁমার সাহাবীদের সমালোচনা করবে। সাবধান! এমন লোকদের সাথে বিবাহের সম্পর্ক করবেনা এবং তাদের নারীদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবেনা। সাবধান!! তাদের সাথে নামায পড়বেনা। সাবধান! তাদেরকে সালাম দিবেনা, তাদের উপড় লানত অভিশাপ অবতীর্ণ হয়েছে। [হাকীম সৈয়দ আহমাদুল্লাহ্ নদভী, -তারীখে হাদীস ওয়া মুহাদ্দিসীন, উর্দু খন্ড ১ম-পৃষ্ঠা-১৯৬]
বর্তমানে আবুল আলা মওদুদির অনুসারির দল “জামাতে ইসলাম “ নামক পথভ্রষ্ট দলটি উপরিউক্ত নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে অর্থাৎ এই দলের নেতা ভণ্ড মওদুদি ও তার বদবখত অনুসারীরা সাহাবিদের সমালোচনা করে এবং এই সমারোচনাকে জায়েজ মনে করে। শুধু তাই না মওদুদির তার বিভিন্ন কিতাবে সাহাবাদের তো সমালোচনা করছেই উপরন্তু বিভিন্ন নবীগণের সমালোচনা করতে ও সে পিছু পা হয় নাই এমনকি আমাদের প্রিয় নবী স.কে সমালোচনা করতে ছাড়ে নাই। তার কুখ্যাত তাফসির গ্রন্থ তাহফিমুল কোরআনে সূরা নসরের ব্যাখ্যায় নবীজী স. এঁর সমালোচনা করেছে। নাউজুবিল্লাহ। কতো বড় ধৃষ্টতা সে দেখিয়েছে। তার অন্যান্য পুস্তকেও সে বিভিন্ন বিষয়ের অবতারনা করে সমালোচনা করেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পুস্তক হলো “ইসলামি রেনেসা আন্দোলন ”।
তাছাড়া আমরা জানি যে, মাওলানা শামসুল হোক ফরিদ পুরি র. যিনি বিখ্যাত মাশলা-মাসায়েল কিতাব” বেহেশতি জেওরের” রচয়িতা তিনি সুদীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর যাবত মওদুদির সংস্পর্শে ছিলেন। মওদুদি ফেতনা বুঝতে তার দীর্ঘ সময় লেগেছে। তিনি মওদুদিকে তার পুস্তকগুলো ভুল ধরিয়ে দিয়ে বলেন যে, এইগুলি বাদ দিতে হবে কিন্তু পথভ্রষ্ট শয়তানের শিষ্য মওদুদি তাতে কোনো কর্ণপাত করে নাই। ফলে শামসুল হক ফরিদপুরি র. বৃদ্ধ বয়সে ইমানি দায়িত্ব হিসাবে “ভুল সংশোধন” নামক কিতাবটি আমাদের সাবধানের জন্য লিখে যান যাতে করে আমাদের মতো সরলপ্রাণ মুসলমানরা জামাতে ইসলামির খপ্পরে না পরি। তাছাড়া ৪৫২ জন প্রখ্যাতে আলেমদের দস্তখসহ হাফেজ্জি হুজুরের লিখিত “সতর্ক বাণী” উল্লেখ্যযোগ্য। এছাড়াও পাকিস্তানের মাওলানা তাকি ওসমান এবং ভারতের বিভিন্ন হক পন্থি আলেমগণের বহু লিখিত কিতাবাদী আছে যা মউদুদি ও তার অনুসারি “জামাতে ইসলাম যে কোনো ইসলামি দল না তারা প্রমাণে আর অপেক্ষা রাখেনা। তাই ইমান ও আমলের হেফাজত করুন মউদুদি ফ্যাতনা প্রতিহত করুন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা বহুবিধ ধারণা থেকে দূরে থাকো। কারণ কোনো কোনো ধারণা পাপ; এবং তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয়ের সন্ধান করো না এবং একে অপরের পেছনে নিন্দা (গিবত) করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের মাংস খেতে খেতে চাইবে? তোমরা তো এটাকে ঘৃন্যই মনে করো। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহ তাওবা গ্রহণকারী পরম দয়ালু।’ (সুরা হুজরাত : আয়াত ১২)৷ অর্থাৎ যেখানে সাধারণ মোসলমানদের দোষ চর্চা নিষেধ, সেখানে রসূলে পাক স. এর সাহচর্য লাভকারি সকল সম্মানিত সাহাবাদের দোষচর্চা করলে যে ধর্ম থেকে খারিজ বা বিচ্যুত হয়ে যাবে তাতে কোনোই সন্দেহ নাই। সুতরাং সাবধান! সাবধান! সাবধান। আমিন। আল্লাহ আমাদেরকে এদের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করুন। সুম্মা আমিন।

ট্যাগস

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিরোধী দলীয় নেতার সাক্ষাৎ

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা ও সমালোচকদের পরিণতি

আপডেট সময় ০৮:১৬:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবাগণের মর্যাদা ও ফযীলত কুরআন ও হাদীসের মাঝে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। কুরআন বা হাদীসে কোথাও সাহাবাগণের মাঝে ভাল মন্দের কোন পার্থক্য করা হয়নি। বরং সকলকেই হক ও হক্কানিয়্যাতের প্রতিচ্ছবি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এখানে সংক্ষিপ্তাকারে সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা ও ফযীলত সম্পর্কে উল্লেখ করা হচ্ছেঃ
১. আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা আমার সাহাবীগণের সমালোচনা করো না। তোমরা আমার সাহাবীগণের সমালোচনা করবে না। সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার জীবন, যদি তোমাদের মধ্যে কেউ উহুদ পাহাড় বরাবর স্বর্ণ ব্যয় করে তাহলেও তাঁদের কারোর এক মুদ অথবা অর্ধ মুদ্দের সমান হবে না। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৫৪০] এ হাদীস পরিস্কার প্রমাণ করে, সাহাবাগণ আল্লাহর কাছে কত মর্যাদাবান। কত শ্রেষ্ঠ।
২. হযরত সাওবান রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যখন আমার সাহাবীদের আলোচনা আসে, তখন [তাদের ব্যাপারে সমালোচনা করা থেকে] নিজেকে বিরত রাখো। [আলমু’জামুল কাবীর লিততাবরানী, হাদীস নং-১৪২৭]
জালালুদ্দীন সুয়ুতী রহঃ এ হাদীসকে হাসান বলেছেন। [আলজামেউস সাগীর, বর্ণনা নং-৬১৩ ]
৩. ইবনে উমর রাঃ বলেন, তোমরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাগণের সমালোচনা করো না, তাদের এক মুহুর্তের সৎকাজ তোমাদের সারা জীবনের সৎকাজের চেয়ে উত্তম। [সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-১৪৬, মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং-৩৩০৮২]
৪. হযরত আয়শা রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাগণের ব্যাপারে ক্ষমা প্রার্থনার আদেশ করা করা হয়েছে, অথচ লোকেরা তাদের সমালোচনা করছে। [মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং-৩৩০৮৫, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-৩০২২, মুস্তাদরাক আলাস সহীহাইন, হাদীস নং-৩৭১৯]
উপরোক্ত হাদীস দ্বারা একথা পরিস্কার প্রমাণিত যে, সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে সমালোচনা বা খারাপ মন্তব্য নয়, বরং তাদের জন্য ইস্তিগফার এবং প্রশংসনীয় মন্তব্য করাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তামান্না ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা অনেকেই তা লঙ্ঘণ করছি। আল্লাহ হিফাযত করুন।
৫. হযরত আত্বা রহঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আমার সাহাবীর সমালোচনা করে, তার উপর আল্লাহর লানত। [মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং-৩৩০৮৬]
৬. সাহাবা সমালোচনা এবং তাদের প্রতি কু-ধারণা পোষণকারীর হুকুম :
মাইমুনী রহঃ বলেন, আমাকে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহঃ বলেছেন, হে আবুল হাসান! যখন তুমি দেখবে কোন ব্যক্তি সাহাবাগণের মাঝে কোন সাহাবীর ব্যাপারে সমালোচনা করছে, তাহলে তুমি বুঝে নিও তার ঈমান ও ইসলামে খাদ আছে। [আলবিদায়া ওয়াননিহায়া-৮/১৪৮, ১৪৯, ইফাবা-৮/২৬৫]
৭. ফজল বিন যিয়াদ হযরত ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল রহঃ থেকে শুনেছেন। তাকে একজন প্রশ্ন করল এমন ব্যক্তির ব্যাপারে, যে হযরত মুয়াবিয়া রাঃ এবং হযরত আমর বিন আস রাঃ এর ব্যাপারে মন্দ বলে। লোকটিকে কি রাফেজী বলা হবে?
তখন ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহঃ বললেন, অন্তর কলুষিত এবং খারাপ উদ্দেশ্য ছাড়া সে দু’জনের প্রতি এ দুঃসাহস দেখায়নি। আর অসৎ উদ্দেশ্য ছাড়া কেউ কোন সাহাবীর সমালোচনা করেনি। [আলবিদায়া ওয়াননিহায়া-৮/১৪৮, ১৪৯, ইফাবা-৮/২৬৫]
৮. ইবনুল মুবারক বলেন, মুহাম্মদ বিন মুসলিম থেকে, তিনি ইবরাহীম বিন মায়সারা থেকে তিনি বলেন, হযরত মুয়াবিয়ার সমালোচনাকারী এক ব্যক্তি ব্যতীত আমি উমর বিন আব্দুল আজীজকে কোন মানুষের গায়ে হাত উঠাতে দেখিনি। ঐ ব্যক্তিকে তিনি কয়েক ঘা চাবুক লাগিয়ে ছিলেন। [আলবিদায়া ওয়াননিহায়া-৮/১৪৮, ১৪৯ ইফাবা-৮/২৬৫, আলইস্তিআব-৩/৩৮৩]
৯. সালাফে সালেহীনদের একজন বলেন, যখন আমি শামের এক পাহাড়ে অবস্থান করছিলাম তখন এক (অদৃশ্য) ঘোষককে বলতে শুনলাম-সিদ্দীকের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী হল যিনদীক, ধর্মদ্রোহী। উমরের প্রতি বিদ্বেষীর ঠাঁই হল জাহান্নাম। উসমান বিদ্বেষীর প্রতিপক্ষ হলেন আল্লাহ। আলী বিদ্বেষীর প্রতিপক্ষ হলেন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আর যে মুয়াবিয়ার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে (জাহান্নামের) ফেরেশতারা তাকে হেঁচড়ে নিয়ে যাবে। উত্তপ্ত জাহান্নামের দিকে এবং সে নিক্ষিপ্ত হবে উত্তপ্ত অগ্নি গহ্ববরে। [আলবিদায়া ওয়াননিহায়া-৮/১৪৮-১৪৯, ১৪৯-১৫০, ইফাবা-৮/২৬৫-২৬৬]
আব্দুল আজীজ বিন আহমাদ বিন হামেদ কুরাইশী রহঃ লিখেছেনঃ
فحُسن الظن والتأدب لجميعهم واجب على كل مسلم. فهذا مذهب السلف الصالح وأهل الحديث والأصول. ونسأل الله الثبات عليه.
সমস্ত সাহাবাগণের প্রতি সুধারণা রাখা এবং আদব রাখা সকল মুসলমানের উপর ওয়াজিব। সালাফে সালেহীন, আহলে হাদীস এবং আহলে উসূল (আহলে ফিক্বহ) এর এটাই মতাদর্শ। আর আমরা আল্লাহ কাছে এর উপরই অটল থাকার আর্জি জানাই। [আননাহিয়াহ আন তা’নি আমীরিল মু’মিমীনা মুয়াবিয়াহ-৬৭]
১০. শামসুল আইয়িম্মাহ সারাখসী রহঃ লিখেন, কুরআনে কারীমের একাধিক স্থানে আল্লাহ তাআলা সাহাবায়ে কেরাম রাঃ এর প্রশংসা করেছেন। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন {مُحَمَّد رَسُول الله وَالَّذين مَعَه} الْآيَة এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় ইরশাদে সাহাবাগণকে খাইরুন্নাস তথা সর্বোৎকৃষ্ট মানুষ হবার স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। আর এ লোকেরা সেই জমানার শ্রেষ্ঠ মানুষ যে জমানায় আমি নবী রয়েছি। শরীয়তে ইসলামিয়া সাহাবাগণের মাধ্যমেই বর্ণিত হয়ে আমাদের পর্যন্ত এসেছে। [অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরাম ইসলামী শরীয়তের বিস্তারকারী] সুতরাং যে ব্যক্তি সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে সমালোচনা করবে সে মুলহিদ এবং বে-দ্বীন। ইসলামের দিকে পৃষ্ঠপ্রদর্শনকারী। যদি সে ব্যক্তি তওবা না করে তাহলে তার একমাত্র সমাধান তলোয়ার। [উসূলে সারাখসী-২/১৩৪]
উপর্যুক্ত কোরআন-হাদীসের আলোকে একথা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, সাহাবিদের সমালোচনাকারি বা কারিগণ নিঃসন্দেহে কাফের-মোশরেকদের মতো চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামের অগ্নির আগুনে জ্বলতে থাকবে–সে বা তাদের যতো নেক আমলই থাকনা কেনো তা কোনো কাজে আসবেনা। তাছাড়া ওই সমস্ত বদবখত যারা সাহাবায়ে কেরাম আজমাইনদের সমালোচনা করে এবং জায়েজ মনে করে তাদের প্রতি সমাজে বসবাস রতো অন্যান্য মুসলমানদের করণীয় আচরণ কি হবে তা আমাদের প্রিয় নবী স. স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন।
হযরত আনাস রাদ্বিআল্লাহু তা’লা আনহু থেকে বর্ণিতৃ.তিনি বলেন আল্লাহ্’র প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু তা’লা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’লা আঁমাকে নির্বাচন করেছেন এবং আঁমার সাহাবীগণকে নির্বাচন করেছেন। অতঃপর তাদের মধ্যে থেকে আঁমার শ্বশুড় ও জামাতা বানিয়েছেন এবং তাদেরকে আঁমার আনসার তথা সাহায্যকারী বানিয়েছেন। নিশ্চয়ই অচিরেই শেষ যামানায় এমন সম্প্রদায়ের আগমন ঘটবে। যারা আঁমার সাহাবীদের সমালোচনা করবে। সাবধান! এমন লোকদের সাথে বিবাহের সম্পর্ক করবেনা এবং তাদের নারীদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবেনা। সাবধান!! তাদের সাথে নামায পড়বেনা। সাবধান! তাদেরকে সালাম দিবেনা, তাদের উপড় লানত অভিশাপ অবতীর্ণ হয়েছে। [হাকীম সৈয়দ আহমাদুল্লাহ্ নদভী, -তারীখে হাদীস ওয়া মুহাদ্দিসীন, উর্দু খন্ড ১ম-পৃষ্ঠা-১৯৬]
বর্তমানে আবুল আলা মওদুদির অনুসারির দল “জামাতে ইসলাম “ নামক পথভ্রষ্ট দলটি উপরিউক্ত নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে অর্থাৎ এই দলের নেতা ভণ্ড মওদুদি ও তার বদবখত অনুসারীরা সাহাবিদের সমালোচনা করে এবং এই সমারোচনাকে জায়েজ মনে করে। শুধু তাই না মওদুদির তার বিভিন্ন কিতাবে সাহাবাদের তো সমালোচনা করছেই উপরন্তু বিভিন্ন নবীগণের সমালোচনা করতে ও সে পিছু পা হয় নাই এমনকি আমাদের প্রিয় নবী স.কে সমালোচনা করতে ছাড়ে নাই। তার কুখ্যাত তাফসির গ্রন্থ তাহফিমুল কোরআনে সূরা নসরের ব্যাখ্যায় নবীজী স. এঁর সমালোচনা করেছে। নাউজুবিল্লাহ। কতো বড় ধৃষ্টতা সে দেখিয়েছে। তার অন্যান্য পুস্তকেও সে বিভিন্ন বিষয়ের অবতারনা করে সমালোচনা করেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পুস্তক হলো “ইসলামি রেনেসা আন্দোলন ”।
তাছাড়া আমরা জানি যে, মাওলানা শামসুল হোক ফরিদ পুরি র. যিনি বিখ্যাত মাশলা-মাসায়েল কিতাব” বেহেশতি জেওরের” রচয়িতা তিনি সুদীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর যাবত মওদুদির সংস্পর্শে ছিলেন। মওদুদি ফেতনা বুঝতে তার দীর্ঘ সময় লেগেছে। তিনি মওদুদিকে তার পুস্তকগুলো ভুল ধরিয়ে দিয়ে বলেন যে, এইগুলি বাদ দিতে হবে কিন্তু পথভ্রষ্ট শয়তানের শিষ্য মওদুদি তাতে কোনো কর্ণপাত করে নাই। ফলে শামসুল হক ফরিদপুরি র. বৃদ্ধ বয়সে ইমানি দায়িত্ব হিসাবে “ভুল সংশোধন” নামক কিতাবটি আমাদের সাবধানের জন্য লিখে যান যাতে করে আমাদের মতো সরলপ্রাণ মুসলমানরা জামাতে ইসলামির খপ্পরে না পরি। তাছাড়া ৪৫২ জন প্রখ্যাতে আলেমদের দস্তখসহ হাফেজ্জি হুজুরের লিখিত “সতর্ক বাণী” উল্লেখ্যযোগ্য। এছাড়াও পাকিস্তানের মাওলানা তাকি ওসমান এবং ভারতের বিভিন্ন হক পন্থি আলেমগণের বহু লিখিত কিতাবাদী আছে যা মউদুদি ও তার অনুসারি “জামাতে ইসলাম যে কোনো ইসলামি দল না তারা প্রমাণে আর অপেক্ষা রাখেনা। তাই ইমান ও আমলের হেফাজত করুন মউদুদি ফ্যাতনা প্রতিহত করুন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা বহুবিধ ধারণা থেকে দূরে থাকো। কারণ কোনো কোনো ধারণা পাপ; এবং তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয়ের সন্ধান করো না এবং একে অপরের পেছনে নিন্দা (গিবত) করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের মাংস খেতে খেতে চাইবে? তোমরা তো এটাকে ঘৃন্যই মনে করো। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহ তাওবা গ্রহণকারী পরম দয়ালু।’ (সুরা হুজরাত : আয়াত ১২)৷ অর্থাৎ যেখানে সাধারণ মোসলমানদের দোষ চর্চা নিষেধ, সেখানে রসূলে পাক স. এর সাহচর্য লাভকারি সকল সম্মানিত সাহাবাদের দোষচর্চা করলে যে ধর্ম থেকে খারিজ বা বিচ্যুত হয়ে যাবে তাতে কোনোই সন্দেহ নাই। সুতরাং সাবধান! সাবধান! সাবধান। আমিন। আল্লাহ আমাদেরকে এদের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করুন। সুম্মা আমিন।