কোন দেশের বাদশা বা শাসক যদি ন্যায়পরায়ণ হন, তবে সেই রাষ্ট্রে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও কল্যাণ বিরাজ করে। ন্যায়পরায়ণ শাসকের অধীনে প্রজারা নিরাপদে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে এবং অপরাধ প্রবণতা কমে, যা একটি আবাদি ও উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া, ন্যায়পরায়ণ শাসক আখেরাতে মহান আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদা ও পুরস্কার লাভ করবেন।
আলহামদুলিল্লাহ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। ৭৭টি আসন পেয়ে বিরোধী দলের নেতা হলেন ডাঃ শফিকুর রহমান। আজ মিরপুরে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন ফজরের নামাজের পর উনি নিজেই নেমে পড়লেন শহর পরিছন্নতার জন্য। ঝাড়ু হাতে রচনা করলেন এক অনন্য দৃষ্টান্ত এক শাসকের জনতার প্রতি দায়বদ্ধতার এক অনন্য ইতিহাসের শুরু করলেন এবং আমরাও চাই শুরু হোক। এর ধারাবাহিকতা থাকলেই আমাদের অভ্যাসে পরিণত হবে। লোক দেখানোর জন্য হলে তখন আসবে তিরস্কার।
ঢাকার বায়ুদূষণ পৃথিবীতে জঘন্যতম স্থানগুলোর মধ্যে একটি এর কারণ বহুবিধ । সিটি কর্পোরেশন ট্যাক্স নিবে সেবা দিবে না আর দিলেও সেটা কোন ভাবেই উল্লেখযোগ্য নয়। যানবাহনের অব্যবস্থাপনা, জনগণের সচেতনতার অভাব, ঢাকার প্রতিটা রাস্তাকেই ময়লার ভাগাড় বলা যায়। আর এই রাস্তাঘাটের ময়লাগুলোই বৃষ্টি হলে পানির সাথে আমাদের যে সুয়ারেজ ব্যবস্থা আছে সেটার ৮০% ধ্বংস করে দেয় অর্থাৎ মাটি জমাট হয়ে সুয়ারেজ ব্যবস্থাকে অচল করে দিচ্ছে। সুয়ারেজ ব্যবস্থাকে পরিষ্কার করা খুবই জটিল ও দুঃসাধ্য ব্যাপার, কোন কোন ক্ষেত্রে এগুলো অসম্ভব। রাস্তা পরিষ্কার রাখা এতটা জটিল নয় যদি আমরা দায়িত্বশীল হই। আর এর ফলেই সামান্য বৃষ্টিতেই ঢাকা শহরের অনেক জায়গায় বন্যার সৃষ্টি হয় সাময়িকভাবে। আমরা যদি রাস্তাঘাট আবর্জনা মুক্ত রাখতে পারতাম তাহলে সুয়ারেজ ব্যবস্থার এই ক্ষতি হতো না এবং আমরা সাময়িক বন্যায় পড়তাম না। আর এই বায়ু দূষণ শ্বাসনালীর মাধ্যমে আমাদের প্রভূত ক্ষতিসাধন করছে। আমরা বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছি, আমাদের জীবনী শক্তি হারিয়ে যাচ্ছে, দেশের উৎপাদনশীলতা এবং কর্মযজ্ঞ ব্যাহত হচ্ছে এবং তার পেছনে হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক এবং ওষুধের পিছনে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। আর যাদের সামর্থ্য নাই তারা ধুঁকেধুকে মারা যাচ্ছে এইটাই হলো এর গভীর পরিণাম। বিরোধী দলীয় নেতা ডাক্তার শফিকুর রহমান সাহেবকে সাধুবাদ জানাই। আসলে সংস্কার ভেতর থেকে আসে মননের মানসিকতার এবং পরিশীলন ও পরিমার্জন ভেতর থেকে না আসলে হয় না।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে চাটুকারের সংখ্যাই বেশি এবং তারা জ্ঞানে বা অজ্ঞানে চাটুকারিতাই করে যায়। দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য কিংবা রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার জন্য কেহই দলীয় প্রধানের বাহিরে যেতে পারেন না। সকল কর্মযজ্ঞ একজনের হাতেই রক্ষিত থাকে, প্রধানমন্ত্রী বা দলীয় প্রধানই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে একনায়কতন্ত্রের দিকে ধাবিত হন। এটাই আমাদের দুর্ভাগ্যের ঘনঘটা ত্বরান্বিত করেছে। যা বাংলাদেশের জন্য গভীর বেদনার কারণ। দেশের অগ্রযাত্রা এখানেই থামিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ জামাতে ইসলাম সেই ভুলটাই করেছিল। তারা চেয়েছিলেন এই দেশ পাকিস্তান থাকুক, পাকিস্তান থেকে পৃথক হলে ভারতের গর্ভে চলে যাবে! তাই তারা বাংলার স্বাধীনতার প্রয়োজন অনুভব করেননি। কিন্তু তাদের মধ্যে কি দেশ প্রেম ছিল না? সবাই কি পাকিস্তানপন্থী ছিলেন? অবশ্যই না। কিন্তু স্বকীয়তা কেহই প্রকাশ করতে পারেননি, দলীয় প্রধানের মতের বাহিরে যাইতে পারেন নাই এবং আদর্শিকভাবে তারা সবাই পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন করায় আজ ও রাজাকারের তকমা থেকে বের হতে পারেননি।
ফলশ্রুতিতে আদর্শিকভাবে তারা সবাই রাজাকার।
বাংলাদেশ জামাতে ইসলামী বাংলাদেশের যত রাজনৈতিক দল আছে তাদের থেকে অনেক বেশি সুসংঘটিত, সুকৌশলী এবং কুটকৌশলী হিসাবে আমার কাছে পরিগণিত। তাদের সাংগঠনিক তৎপরতা, তাদের দলীয় ভ্রাতৃত্ববোধ সুসংহত, তাদের মিডিয়া সেল, তাদের ক্যাডার বাহিনী, তাদের কর্মী ভিত্তিক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক, অন্য সকলের চেয়ে শক্তিশালী অপ্রতিরোধ্য ভূমিকা পালন করে, তাদের একগোয়ামী ও অন্যদের চেয়ে আলাদা। আমি বিএল কলেজে পড়ার সময় তাদেরকে খুব কাছ থেকে দেখেছি তাদের আমল, আখলাক, চরিত্র ও ধর্মীয় আচার, কুটকৌশল বাদে অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। আজও তারা ৭১ সালের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চায়নি। এই কলঙ্কের তিলক পরেই তারা অবিচল দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে যাচ্ছে, এত ঝড়- ঝঞ্জা তাদের উপর বয়ে গেছে, দলের সর্বোচ্চ নেতাদের ফাঁসি, তারপরও ফলাফল ২৬ শের নির্বাচন, অভাবনীয় সাফল্য। ভবিষ্যতে সরকার গঠন করলেও আমি আশ্চর্য হব না।
চাটুকারে আবৃত থেকে শাসক শ্রেণী ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা তারা বুঝতেই পারে না, সবকিছু ঘটে যায় অগোচরে, যেমনটি ঘটেছে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের ক্ষেত্রে। এমনভাবে চাটুকারে আবৃত ছিলেন প্রকৃত অবস্থা বোঝার মত অবস্থায় ছিলেন না। মানুষের অধিকারের জন্য সোচ্চার আওয়ামী লীগ, অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথেই যাদের জন্ম, সেই রাজপথের থেকে প্রাসাদে সোচ্চার হয়ে উঠলেন। জনতার পালস বুঝতে হলে জনতার মাঝেই থাকতে হয়, প্রভু হয়ে নয়, তারা প্রভু হয়ে উঠলেন। দূরত্ব কখনো জনতার পালস বোঝার সক্ষমতা দেয় না। যারা জনতার জন্য রাজনীতি করতো তারাই জনতার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে জনতাকে অবিশ্বাস করতে শুরু করলেন। ১৪ এর নির্বাচন, ১৮ এর রাতের নির্বাচন, ২৪ এর ডামি নির্বাচন, সেই জনগণকে অবিশ্বাসের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। জনগণ তাদেরকে আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিবে বুঝতে পেরে নির্বাচনী ষড়যন্ত্র বা জনতার সাথে সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করলেন। আর এর ফলাফল হলো সর্বনাশা বিপর্যয়।
মহান আল্লাহ পাক দুই সম্প্রদায়ের মানুষকে বেশি পছন্দ করেন। এক- নবী-রাসূল অলি আল্লাহ ও আধ্যাত্মিক সাধকদের যারা মানবজাতিকে কল্যাণের দিকে আহবান করেন। আর দুই শাসকগণকে, যাদের উপর জনগণের ভালো-মন্দ, কল্যাণ, রাষ্ট্রীয় কল্যাণ, ন্যায় বিচার সুরক্ষিত থাকে।
মহান আল্লাহ পাক যাকে ইচ্ছা তাকেই বাদশাহী দান করেন এবং কেড়েও নেন। আমাদের দেশে বাদশাহী নেই, তাই প্রধানমন্ত্রী সেই স্থানে উপনীত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আল্লাহ সেই স্থানে অধিষ্ঠিত করেছেন। ১৮ কোটি জনগণ এখন তারেক রহমানের দিকেই চেয়ে আছে। তার মেধা, প্রজ্ঞা এই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে আবার তার অবিবেচক শাসন দেশকে তলিয়ে দিতে পারে। ন্যায়পরায়ণ প্রধানমন্ত্রী হলেন সেই ব্যক্তি যে সৃষ্ট জীবের জন্য কল্যাণের সুব্যবস্থা করেন। জ্ঞানীদের ভাষায় প্রত্যেক দেশে ধর্ম নির্ভরশীল বাদশাহের উপর, বাদশাহ নির্ভরশীল সেনাবাহিনীর উপর, সেনাবাহিনী নির্ভরশীল দেশের ধনসম্পদের উপর আর ধনসম্পত্তি নির্ভরশীল সুশাসনের উপর, ন্যায় বিচারের উপর। সুতরাং তারেক রহমান যদি উনার দলীয় নেতা কর্মী ও চাটুকার্যের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন, যদি চাঁদাবাজি, পেশি শক্তির উদ্ভব, দখলবাজি ও দুর্নীতি থামাতে না পারেন তবে বাংলাদেশের জনগণের দুর্ভাগ্যের পরিধি আরো ব্যাপক হবে। এবং তিনি অধিষ্ঠিত আসন হারাতে পারেন। তিনি যদি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেন তাহলে বাংলাদেশ আত্মমর্যাদায় সুপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং জনগণের মধ্যে আস্থা, মনোবল ও সৌহার্দ্যে সহনশীল এক মহান জাতি গড়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারাটা শিখর থেকে শিকড়ে ধাবিত হয়। তারেক রহমান যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখাতে সামর্থ্য হন তাহলে দুর্নীতিমুক্ত হবে বাংলাদেশ। কারণ শাসক যদি ন্যায়পরায়ন হন পুরো দেশে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি যদি সৎকর্মশীল হন বাংলাদেশও হাসবে সৎকর্মশীলতায়। তিনি যদি ঝাড়ু হাতে নেন তার দলীয় কর্মীরা, নেতারা, মন্ত্রীরা, ঝাড়ু হাতে পুরো বাংলাদেশ পরিষ্কার করবে, বাংলাদেশকে মেরামত শুরু করবে, এটাই এদেশের এবং ঐতিহাসিক সত্যতা। তিনি কতটুকু সফল হন সেটাই দেখার ব্যাপার। কারণ তার মন্ত্রী পরিষদের অনেকের অহমিকা ও দম্ভ এত উচ্চ পর্যায়ের যে সেখানে কোন শালীনতা নেই। তাদের নেতাকর্মীরাও উচ্চকিত দম্ভের ধারক। আসুন আমরা এই শাসকদের জন্য দোয়া করি। যেন তারা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে ১৮ কোটি জনতার কল্যাণ প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করেন, আমিন।
লেখক: কবি, সংগঠক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক।
মুহাম্মদ আমির হোসেন 


























