শিরোনাম :
মজুরি বোর্ড গঠনের পরও উত্তাল শিল্পাঞ্চল, কারখানা বন্ধ কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে নার্সের বিরুদ্ধে রোগীর স্বজনকে লাঞ্ছিতের অভিযোগ এমবাপ্পের মন্তব্যের জেরে রিয়ালের ম্যাচ দেখায়নি চীন বিকাশ-নগদ-রকেটের বাড়তি চার্জ কেন অবৈধ নয়, হাইকোর্টের রুল ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্তের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর সাজেকে ফের অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ ডলারের অস্ত্রকে ভোঁতা করতে রেনমিনবির পথে এগোচ্ছে চীন, কীভাবে জুলাই হত্যাকাণ্ড: আওয়ামী লীগের সাত শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল সকল মাদরাসায় সরকারের নতুন নির্দেশনা মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে ফের উত্তাল গাজীপুর, আশুলিয়া ও মিরপুর

ইউনূসের আমলে ৩৬ বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন বাতিল, ঝুলে গেল ৩২৮৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ

দেশে বাতিল হলো ৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন, ঝুলে গেল প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট

জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত এক আইনের সূত্র ধরে অনুমোদন পাওয়া মোট ৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি বা লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) বাতিল হয়ে গেছে। জীবাশ্ম জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর এসব প্রকল্পের সম্মিলিত উৎপাদনক্ষমতা ছিল তিন হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট। ২০১৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের মে মাস পর্যন্ত সময়ে ধাপে ধাপে এসব প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে অন্তত ১৫টি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে জমি কিনেছিল, সরকারি কর-ফি পরিশোধ করেছিল এবং প্রস্তুতিমূলক কাজে অর্থও ব্যয় করেছিল।

তথ্য অনুযায়ী, বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে এনআরবি কোম্পানির ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ফেঞ্চুগঞ্জ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, যা ২০১৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ক্রয় কমিটির অনুমোদন পেয়েছিল এবং ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে চালু হওয়ার কথা ছিল। এ ছাড়া মালয়েশিয়ার এডরা পাওয়ার হোল্ডিংস ও দেশীয় ইউনিভিশন পাওয়ার লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে ৬৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার গজারিয়া এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, কনফিডেন্স গ্রুপের একই ক্ষমতার মিরসরাই এলএনজিভিত্তিক কেন্দ্র এবং আনলিমা পাওয়ারের ৪৫০ মেগাওয়াট মেঘনাঘাট গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রও তালিকায় রয়েছে। এসব প্রকল্পের সম্ভাব্য উৎপাদন শুরুর সময় নির্ধারিত ছিল যথাক্রমে ২০২৮, ২০২৯ ও ২০৩০ সালের মধ্যে।

তবে বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর সিংহভাগই সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যৌথ বা এককভাবে গড়ে তোলার কথা ছিল পঞ্চগড়, মৌলভীবাজার, ফেনী, খুলনা, চুয়াডাঙ্গা, জামালপুর, পাবনা, ময়মনসিংহ, নীলফামারী, কক্সবাজার, বান্দরবান, সাতক্ষীরা, নিলফামারী, সিরাজগঞ্জসংলগ্ন এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ২০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত ক্ষমতার একাধিক সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র। এসবের মধ্যে সিঙ্গাপুর, চীন, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, যুক্তরাজ্য, পানামা ও সৌদি আরবভিত্তিক একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও যুক্ত ছিল। এসব কেন্দ্রের উৎপাদনে আসার কথা ছিল ধাপে ধাপে—কিছু গত জুন মাসে, কিছু আগামী ডিসেম্বরে এবং কিছু ২০২৭ সালের মধ্যে।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি সংকটের জেরে দেশে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি চরম রূপ নেয়। বিভিন্ন সময় দুই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হয়েছে। অথচ ওই সংকটকালীন সময়ে জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সর্বোচ্চ যে পরিমাণ বিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছিল, তা ছিল মাত্র ৬৫০ মেগাওয়াট। এ কারণে সংশ্লিষ্টদের অনেকেই মনে করেন, বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর একটি অংশও যদি নির্ধারিত সময়ে উৎপাদনে যেত, তাহলে দিনের বেলার বিদ্যুৎ সংকট অনেকটাই সহনীয় হতো।

প্রকল্পগুলো বাতিলের পেছনে রয়েছে ‘দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’, যা সাধারণভাবে দায়মুক্তি আইন নামে পরিচিত। ২০০৯-১০ সালের তীব্র বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় তৎকালীন সরকার এই আইন প্রণয়ন করেছিল, যার মাধ্যমে প্রচলিত সরকারি ক্রয় আইন ও উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়া এড়িয়ে সরাসরি আলোচনার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রকল্প অনুমোদনের সুযোগ তৈরি হয়। আইনের একটি ধারায় এসব সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগও সীমিত করে দেওয়া হয়েছিল, যে কারণে এটি দায়মুক্তি আইন নামে পরিচিতি পায়। এই আইনের অধীনে পরবর্তী সময়ে কুইক রেন্টাল, রেন্টাল ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি আমদানি এবং অন্যান্য জ্বালানি অবকাঠামো প্রকল্পও অনুমোদন করা হয়। তৎকালীন সরকারের দাবি ছিল, এর মাধ্যমে অল্প সময়ে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদি লোডশেডিং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

তবে শুরু থেকেই আইনটি ঘিরে বিতর্ক অব্যাহত ছিল। সমালোচকদের অভিযোগ, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া প্রকল্প অনুমোদনের কারণে অনেক ক্ষেত্রে ব্যয় বেড়েছে এবং জবাবদিহি কমেছে। অলস কিংবা আংশিক অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বিপুল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ নিয়েও দীর্ঘদিন প্রশ্ন উঠেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর হাইকোর্ট আইনটির ৬(২) ও ৯ নম্বর ধারা অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার একই মাসের ২৮ তারিখে অধ্যাদেশ জারি করে আইনটি বাতিল করে, যদিও আইন বাতিলের আগে সম্পাদিত বিদ্যমান চুক্তিগুলো কার্যকর থাকবে বলে অধ্যাদেশে স্পষ্ট করা হয়।

আইন বাতিলের পর অন্তর্বর্তী সরকার এই আইনের অধীনে অনুমোদিত বিভিন্ন প্রকল্প পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেয়। দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসের মধ্যেই তৎকালীন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে পাইপলাইনে থাকা এই ৩৬টি প্রকল্পের এলওআই বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর পরিবর্তে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন করে ৫৫টি গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দরপত্র আহ্বান করে, যার লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় পাঁচ হাজার ২৩৮ মেগাওয়াট। তবে এই দরপত্রে আশানুরূপ সাড়া মেলেনি। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, মাত্র ১১টি প্রকল্পের জন্য দরপত্র জমা পড়েছে, যার সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট। খাত-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, নতুন প্রকল্পে সভরেন গ্যারান্টি না থাকাই বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহের প্রধান কারণ, কারণ আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিত করতে এ ধরনের গ্যারান্টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সরকার এই গ্যারান্টি না দেওয়ায় বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা নতুন দরপত্র নিয়ে সতর্ক অবস্থানে ছিলেন।

এদিকে বাতিল হওয়া নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়নের সুপারিশ করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, এসব প্রকল্পে প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। সিপিডি সরকারের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের তাগিদ দিয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়মুক্তি আইন বাতিল করলেও প্রকৃতপক্ষে এই আইনের মাধ্যমেই কেন্দ্রগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল। তাঁর মতে, চুক্তিগুলোতে অযৌক্তিক ও লুণ্ঠনমূলক মূল্যহার নির্ধারণ করা হয়েছিল ঠিকই, তবে কেন্দ্রের মালিকদের সঙ্গে আলোচনায় বসে ব্যয় কমানোর সুযোগ দেওয়া যেতে পারত। প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়ায় এখন তা আর সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, যেহেতু অনেক প্রতিষ্ঠান জমি অধিগ্রহণসহ নানা খাতে অর্থ ব্যয় করেছিল, তারা এখন সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে।

বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) আইপিপি সেলের প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল হক বলেন, যেসব কেন্দ্রের সঙ্গে বিপিডিবির চুক্তি সম্পন্ন হয়নি, সেগুলো স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদনে আসতে পারবে না। তবে চুক্তির বাইরে থেকেও যেসব কেন্দ্র ইতিমধ্যে অবকাঠামোগত কাজ শুরু করেছিল, সেসবের জন্য উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং কিছু দরপত্র জমাও পড়েছে। তাঁর ভাষ্যে, এ ক্ষেত্রে দায়মুক্তি আইন কোনো বাধা তৈরি করবে না।

সব মিলিয়ে জ্বালানি খাতের এই অস্থিরতা স্পষ্ট করে দেয়, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাব কতটা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে বিদ্যমান সংকট মোকাবিলায় নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন, অন্যদিকে সভরেন গ্যারান্টির অনুপস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

মজুরি বোর্ড গঠনের পরও উত্তাল শিল্পাঞ্চল, কারখানা বন্ধ

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে ফের উত্তাল গাজীপুর, আশুলিয়া ও মিরপুর

০২ নভেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

ইউনূসের আমলে ৩৬ বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন বাতিল, ঝুলে গেল ৩২৮৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ

আপডেট সময় ০১:২৫:০৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দেশে বাতিল হলো ৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন, ঝুলে গেল প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট

জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত এক আইনের সূত্র ধরে অনুমোদন পাওয়া মোট ৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি বা লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) বাতিল হয়ে গেছে। জীবাশ্ম জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর এসব প্রকল্পের সম্মিলিত উৎপাদনক্ষমতা ছিল তিন হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট। ২০১৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের মে মাস পর্যন্ত সময়ে ধাপে ধাপে এসব প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে অন্তত ১৫টি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে জমি কিনেছিল, সরকারি কর-ফি পরিশোধ করেছিল এবং প্রস্তুতিমূলক কাজে অর্থও ব্যয় করেছিল।

তথ্য অনুযায়ী, বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে এনআরবি কোম্পানির ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ফেঞ্চুগঞ্জ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, যা ২০১৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ক্রয় কমিটির অনুমোদন পেয়েছিল এবং ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে চালু হওয়ার কথা ছিল। এ ছাড়া মালয়েশিয়ার এডরা পাওয়ার হোল্ডিংস ও দেশীয় ইউনিভিশন পাওয়ার লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে ৬৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার গজারিয়া এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, কনফিডেন্স গ্রুপের একই ক্ষমতার মিরসরাই এলএনজিভিত্তিক কেন্দ্র এবং আনলিমা পাওয়ারের ৪৫০ মেগাওয়াট মেঘনাঘাট গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রও তালিকায় রয়েছে। এসব প্রকল্পের সম্ভাব্য উৎপাদন শুরুর সময় নির্ধারিত ছিল যথাক্রমে ২০২৮, ২০২৯ ও ২০৩০ সালের মধ্যে।

তবে বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর সিংহভাগই সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যৌথ বা এককভাবে গড়ে তোলার কথা ছিল পঞ্চগড়, মৌলভীবাজার, ফেনী, খুলনা, চুয়াডাঙ্গা, জামালপুর, পাবনা, ময়মনসিংহ, নীলফামারী, কক্সবাজার, বান্দরবান, সাতক্ষীরা, নিলফামারী, সিরাজগঞ্জসংলগ্ন এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ২০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত ক্ষমতার একাধিক সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র। এসবের মধ্যে সিঙ্গাপুর, চীন, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, যুক্তরাজ্য, পানামা ও সৌদি আরবভিত্তিক একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও যুক্ত ছিল। এসব কেন্দ্রের উৎপাদনে আসার কথা ছিল ধাপে ধাপে—কিছু গত জুন মাসে, কিছু আগামী ডিসেম্বরে এবং কিছু ২০২৭ সালের মধ্যে।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি সংকটের জেরে দেশে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি চরম রূপ নেয়। বিভিন্ন সময় দুই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হয়েছে। অথচ ওই সংকটকালীন সময়ে জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সর্বোচ্চ যে পরিমাণ বিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছিল, তা ছিল মাত্র ৬৫০ মেগাওয়াট। এ কারণে সংশ্লিষ্টদের অনেকেই মনে করেন, বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর একটি অংশও যদি নির্ধারিত সময়ে উৎপাদনে যেত, তাহলে দিনের বেলার বিদ্যুৎ সংকট অনেকটাই সহনীয় হতো।

প্রকল্পগুলো বাতিলের পেছনে রয়েছে ‘দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’, যা সাধারণভাবে দায়মুক্তি আইন নামে পরিচিত। ২০০৯-১০ সালের তীব্র বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় তৎকালীন সরকার এই আইন প্রণয়ন করেছিল, যার মাধ্যমে প্রচলিত সরকারি ক্রয় আইন ও উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়া এড়িয়ে সরাসরি আলোচনার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রকল্প অনুমোদনের সুযোগ তৈরি হয়। আইনের একটি ধারায় এসব সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগও সীমিত করে দেওয়া হয়েছিল, যে কারণে এটি দায়মুক্তি আইন নামে পরিচিতি পায়। এই আইনের অধীনে পরবর্তী সময়ে কুইক রেন্টাল, রেন্টাল ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি আমদানি এবং অন্যান্য জ্বালানি অবকাঠামো প্রকল্পও অনুমোদন করা হয়। তৎকালীন সরকারের দাবি ছিল, এর মাধ্যমে অল্প সময়ে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদি লোডশেডিং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

তবে শুরু থেকেই আইনটি ঘিরে বিতর্ক অব্যাহত ছিল। সমালোচকদের অভিযোগ, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া প্রকল্প অনুমোদনের কারণে অনেক ক্ষেত্রে ব্যয় বেড়েছে এবং জবাবদিহি কমেছে। অলস কিংবা আংশিক অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বিপুল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ নিয়েও দীর্ঘদিন প্রশ্ন উঠেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর হাইকোর্ট আইনটির ৬(২) ও ৯ নম্বর ধারা অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার একই মাসের ২৮ তারিখে অধ্যাদেশ জারি করে আইনটি বাতিল করে, যদিও আইন বাতিলের আগে সম্পাদিত বিদ্যমান চুক্তিগুলো কার্যকর থাকবে বলে অধ্যাদেশে স্পষ্ট করা হয়।

আইন বাতিলের পর অন্তর্বর্তী সরকার এই আইনের অধীনে অনুমোদিত বিভিন্ন প্রকল্প পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেয়। দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসের মধ্যেই তৎকালীন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে পাইপলাইনে থাকা এই ৩৬টি প্রকল্পের এলওআই বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর পরিবর্তে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন করে ৫৫টি গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দরপত্র আহ্বান করে, যার লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় পাঁচ হাজার ২৩৮ মেগাওয়াট। তবে এই দরপত্রে আশানুরূপ সাড়া মেলেনি। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, মাত্র ১১টি প্রকল্পের জন্য দরপত্র জমা পড়েছে, যার সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট। খাত-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, নতুন প্রকল্পে সভরেন গ্যারান্টি না থাকাই বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহের প্রধান কারণ, কারণ আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিত করতে এ ধরনের গ্যারান্টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সরকার এই গ্যারান্টি না দেওয়ায় বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা নতুন দরপত্র নিয়ে সতর্ক অবস্থানে ছিলেন।

এদিকে বাতিল হওয়া নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়নের সুপারিশ করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, এসব প্রকল্পে প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। সিপিডি সরকারের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের তাগিদ দিয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়মুক্তি আইন বাতিল করলেও প্রকৃতপক্ষে এই আইনের মাধ্যমেই কেন্দ্রগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল। তাঁর মতে, চুক্তিগুলোতে অযৌক্তিক ও লুণ্ঠনমূলক মূল্যহার নির্ধারণ করা হয়েছিল ঠিকই, তবে কেন্দ্রের মালিকদের সঙ্গে আলোচনায় বসে ব্যয় কমানোর সুযোগ দেওয়া যেতে পারত। প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়ায় এখন তা আর সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, যেহেতু অনেক প্রতিষ্ঠান জমি অধিগ্রহণসহ নানা খাতে অর্থ ব্যয় করেছিল, তারা এখন সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে।

বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) আইপিপি সেলের প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল হক বলেন, যেসব কেন্দ্রের সঙ্গে বিপিডিবির চুক্তি সম্পন্ন হয়নি, সেগুলো স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদনে আসতে পারবে না। তবে চুক্তির বাইরে থেকেও যেসব কেন্দ্র ইতিমধ্যে অবকাঠামোগত কাজ শুরু করেছিল, সেসবের জন্য উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং কিছু দরপত্র জমাও পড়েছে। তাঁর ভাষ্যে, এ ক্ষেত্রে দায়মুক্তি আইন কোনো বাধা তৈরি করবে না।

সব মিলিয়ে জ্বালানি খাতের এই অস্থিরতা স্পষ্ট করে দেয়, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাব কতটা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে বিদ্যমান সংকট মোকাবিলায় নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন, অন্যদিকে সভরেন গ্যারান্টির অনুপস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Share this news as a Photo Card