শিরোনাম :
‘উই ওয়্যার হিয়ার’: এআইয়ের বিরুদ্ধে মাইক্রোওয়েভ ইরানের পারমাণবিক তথ্যে ২ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের ১২ সফটওয়্যার তৈরিতে খরচ ৮০ কোটি টাকা, কাজে লাগছে কতটা? ৭ নভেম্বরের কুচকাওয়াজে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সিপাহী-জনতার বিপ্লবকে স্মরণ ইরান যুদ্ধের অবসানে কূটনীতির চেষ্টা, কাতারের আমিরকে ট্রাম্পের ফোন ওপেনিংয়ে ওলটপালট, শেষ বিকেলে হৃদয়-মুশফিকের প্রতিরোধ সংবিধানে আল্লাহর প্রতি আস্থা ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আগামী গ্রীষ্মের আগেই সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য: বিদ্যুৎমন্ত্রী ষড়যন্ত্রকারীদের ২০২৪ সালের মতোই জনগণ উচিত জবাব দেবে : প্রধানমন্ত্রী এআই যেন বেকারত্ব আরও জটিল না করে, সতর্ক করলেন রাষ্ট্রপতি

১২ সফটওয়্যার তৈরিতে খরচ ৮০ কোটি টাকা, কাজে লাগছে কতটা?

তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার সহজ করার লক্ষ্য নিয়ে এক দশক আগে একটি প্রকল্প শুরু হয়েছিল। এত দিনে এর পেছনে প্রায় ৮০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। অথচ প্রকল্পের অনেক সেবা এখনো সাধারণ মানুষের হাতের কাছে নেই। যেগুলো আছে, তার ব্যবহারও সীমিত। এ অবস্থার মধ্যেই প্রকল্পের মেয়াদ তৃতীয় দফায় বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।

একটি উদ্বোধন, একটি প্রশ্ন

গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব ‘কাগজডটএআই’ নামে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্ল্যাটফর্ম উদ্বোধন করেন। এর অন্যতম সেবা ওসিআর। এর মাধ্যমে ছবি বা নথির লেখা ওয়ার্ড ফাইলে রূপান্তর করা যায়।

অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ভাষাকে উন্মুক্ত করতে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার কাজে লাগাতে চান তাঁরা।

কিন্তু সেবাটির ব্যবহার এখন পর্যন্ত সামান্য। তথ্য অনুযায়ী, কাগজডটএআইয়ের ওসিআর সেবায় দিনে গড়ে ৫০টি অনুরোধ আসে। অন্যদিকে স্মার্টফোনে থাকা গুগল লেন্স দিয়েই সহজে একই কাজ করা যায়। বিনা মূল্যে এমন সেবা দেয় আরও অনেক অ্যাপ, যেগুলো সরকারি প্ল্যাটফর্ম চালুর অনেক আগে থেকেই বাজারে আছে।

প্রকল্পের হিসাব

‘গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি নেওয়া হয় ২০১৬ সালে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে। বাস্তবায়ন করছে আইসিটি বিভাগের অধীন সংস্থা বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল। এর বরাদ্দ ১৫৮ কোটি টাকা, পুরোটাই সরকারি অর্থায়নে। মেয়াদ বেড়েছে তিনবার। সর্বশেষ গত আগস্টে সেটি ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।

পরিকল্পনা ছিল ১৬টি সফটওয়্যার, টুল ও প্রযুক্তি উপকরণ তৈরির। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, ১০ বছরে ১২টির কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে আছে অডিও থেকে লেখা তৈরি, বানান ও ব্যাকরণ সংশোধন এবং বাংলা থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদের মতো সেবা। তবে সবগুলো সাধারণ মানুষের জন্য পুরোপুরি চালু বা সহজলভ্য নয়।

প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। এর ৬০ কোটি টাকা গেছে সফটওয়্যার উন্নয়ন, হোস্টিং ও সংরক্ষণে। বাকি অর্থ খরচ হয়েছে অফিস সাজসজ্জা, সভা-সেমিনার, প্রচারণা ও পরিচালন কাজে।

প্রকল্পের ওয়েবসাইটে রাখা সেবার মধ্যে আছে সরকারি সেবার তথ্য দেওয়ার জন্য ‘জিজ্ঞাসা’ নামের এআই সহকারী। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য স্ক্রিন রিডার, ইশারাভাষা শনাক্তকরণ, ব্রেইল কনভার্টার, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষার তথ্যভান্ডার এবং বাংলা ফন্ট ও কিবোর্ডও তৈরি হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এসব প্রযুক্তি প্রাথমিক পর্যায়ের। কোনটির জন্য কত টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে আর বাস্তবে কত খরচ হয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা দরকার বলেও তাঁরা মনে করেন।

কোন সেবা কতটা চলছে

ব্যবহারের চিত্র একেক সেবায় একেক রকম:

বানান যাচাইয়ের সেবায় দিনে গড়ে পাঁচ লাখের মতো অনুরোধ আসে।
‘জিজ্ঞাসা’ চ্যাটবটে পরীক্ষামূলক ব্যবহারে গড়ে দিনে ১১০টি অনুরোধ আসছে।
লেখার ফন্ট রূপান্তরের সেবায় ৩৫ দিনে রূপান্তর হয়েছে ২৭৫টি ফাইল।

গত এক মাসে বিভিন্ন সময়ে কয়েকটি টুল ব্যবহার করে যাচাই করা হয়েছে। দেখা গেছে, বানান যাচাইয়ের সেবা বেশ ভালো ফল দেয়। অডিও থেকে লেখা তৈরির সেবায় বড় আকারের ফাইলে সমস্যা হয়েছে। ‘জিজ্ঞাসা’ সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেও জটিল প্রশ্নে কখনো কখনো বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছে।

অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা

প্রকল্পের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান জিপিইউ সক্ষমতায় একসঙ্গে সীমিতসংখ্যক ব্যবহারকারীকে সেবা দেওয়া যায়। জিপিইউ হলো কম্পিউটারের একধরনের বিশেষ প্রসেসর, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল চালাতে ও বিপুল তথ্য দ্রুত প্রক্রিয়া করতে কাজে লাগে। কর্মকর্তাদের দাবি, একসঙ্গে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার ব্যবহারকারীকে সেবা দেওয়া সম্ভব। চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষা করতে হয়। সেবাগুলো ব্যাপকভাবে খুলে দিতে হলে তাই বাড়তি জিপিইউ ও অবকাঠামো লাগবে।

এখান থেকেই উঠছে বড় প্রশ্ন। এত টাকায় তৈরি প্রযুক্তি যদি অবকাঠামোর অভাবে সাধারণ মানুষের কাজে না লাগে, তাহলে প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সেগুলো সচল রাখবে কে?

প্রকল্প পরিচালক মাহবুব করিম বলেন, সব কাজ শেষ হলে প্রযুক্তি ও তথ্যভান্ডার বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা আছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী জিপিইউ কেনা বা সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগও থাকবে।

তথ্যভান্ডারের যুক্তি

প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের দাবি, শুধু সফটওয়্যার দিয়ে এর সাফল্য মাপা ঠিক হবে না। তাঁদের মতে, বাংলা ভাষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভাষাপ্রযুক্তির উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যভান্ডার গড়াও এর বড় লক্ষ্য। এ পর্যন্ত যা হয়েছে:

প্রায় ৮ হাজার কপিরাইটমুক্ত বই ডিজিটাল করা হয়েছে।
বাংলা কথাকে লেখায় রূপান্তরের জন্য ১০ হাজার ঘণ্টার অডিও উপাত্ত তৈরি হয়েছে।
লেখা থেকে কণ্ঠ তৈরির জন্য এক হাজার ঘণ্টার অডিও উপাত্ত তৈরি হয়েছে।
৪৪টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষার ১২ হাজার মিনিটের বেশি অডিও সংগ্রহ হয়েছে।
ইশারাভাষার ৪২ হাজার ৮০০টি ভিডিও সংগ্রহ হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, সফটওয়্যার তৈরি বা উপাত্ত সংগ্রহের হিসাব দিয়ে প্রকল্পের সফলতা বিচার করা যাবে না। এসব প্রযুক্তি কতটা ব্যবহার হচ্ছে, কতটা কার্যকর এবং প্রকল্প শেষের পর কত দিন সচল থাকবে, সেটিই বড় বিবেচ্য।

আইসিটি সচিবের বক্তব্য

আইসিটি সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা বলেন, এই প্রকল্পের আওতায় বেশ কিছু টুল তৈরি হয়েছে। তবে সব কাজ যে খুব অর্থবহ হয়েছে, তা তিনি বলবেন না। তাঁর ভাষ্য, টুলগুলো মানুষের কাছে যেভাবে পৌঁছানোর কথা ছিল, সেভাবে পৌঁছায়নি। এখন সেগুলোকে একটি প্ল্যাটফর্মে এনে ব্যবহারবান্ধব করার কাজ চলছে।

সচিব আরও বলেন, আইসিটি খাতের চলমান প্রকল্প বন্ধ করা হয়নি। বরং কোনটি চালু রাখা দরকার আর কোনটির কতটা যৌক্তিকতা আছে, তা যাচাই করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী ১০ থেকে ১২টি প্রকল্পের পরিধি পুনর্মূল্যায়ন করে অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে এই প্রকল্পের ব্যয় বর্তমান সরকারের সময়ে কমানো হয়নি।

বৃহত্তর প্রেক্ষাপট

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার নামে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ২১টি প্রকল্প নেওয়া হয়। আইসিটি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এগুলোর অনুমোদিত ব্যয় প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা।

এসব প্রকল্প মূল্যায়নে ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন হয়। কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, কিছু প্রকল্পের কার্যক্রমের সঙ্গে মূল উদ্দেশ্যের মিল নেই। কোনো কোনো প্রকল্পে আইসিটি বিভাগের আওতার বাইরের কাজও রাখা হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় খাত বাদ দিলে ৬ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা সাশ্রয় হতো বলে কমিটি জানায়।

অ্যাপ তৈরি, ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো, আইটি পার্ক ও ইনকিউবেশন সেন্টারের নামে নেওয়া এসব প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির বেশি অভিযোগ তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহ্‌মেদ পলকের বিরুদ্ধে। তিনি এখন কারাগারে। প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই এখনো জবাবদিহির বাইরে আছেন।

আগের সরকারের আমলে মোবাইল গেম ও অ্যাপ্লিকেশন তৈরিতে ৩৩০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পও নেওয়া হয়েছিল। এর আওতায় তৈরি বেশির ভাগ গেম ও অ্যাপ কোনো কাজে আসেনি বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান। তাঁদের অভিযোগ, নিজেদের লোকজনকে কাজ দিতেই এসব প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল।

জবাবদিহির দাবি

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নতুন সরকারের উচিত ছিল আগের সরকারের নেওয়া প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে বেশির ভাগ বাদ দেওয়া এবং জড়িতদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। তার বদলে মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, আইসিটি খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ আছে। অতীতের কর্মপদ্ধতি ও ফলাফল যাচাই না করে শুধু মেয়াদ বাড়িয়ে যাওয়া মানে পুরোনো কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেওয়া।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

‘উই ওয়্যার হিয়ার’: এআইয়ের বিরুদ্ধে মাইক্রোওয়েভ

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

এআই যেন বেকারত্ব আরও জটিল না করে, সতর্ক করলেন রাষ্ট্রপতি

০৫ নভেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

১২ সফটওয়্যার তৈরিতে খরচ ৮০ কোটি টাকা, কাজে লাগছে কতটা?

আপডেট সময় ০১:১৪:৩৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার সহজ করার লক্ষ্য নিয়ে এক দশক আগে একটি প্রকল্প শুরু হয়েছিল। এত দিনে এর পেছনে প্রায় ৮০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। অথচ প্রকল্পের অনেক সেবা এখনো সাধারণ মানুষের হাতের কাছে নেই। যেগুলো আছে, তার ব্যবহারও সীমিত। এ অবস্থার মধ্যেই প্রকল্পের মেয়াদ তৃতীয় দফায় বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।

একটি উদ্বোধন, একটি প্রশ্ন

গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব ‘কাগজডটএআই’ নামে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্ল্যাটফর্ম উদ্বোধন করেন। এর অন্যতম সেবা ওসিআর। এর মাধ্যমে ছবি বা নথির লেখা ওয়ার্ড ফাইলে রূপান্তর করা যায়।

অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ভাষাকে উন্মুক্ত করতে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার কাজে লাগাতে চান তাঁরা।

কিন্তু সেবাটির ব্যবহার এখন পর্যন্ত সামান্য। তথ্য অনুযায়ী, কাগজডটএআইয়ের ওসিআর সেবায় দিনে গড়ে ৫০টি অনুরোধ আসে। অন্যদিকে স্মার্টফোনে থাকা গুগল লেন্স দিয়েই সহজে একই কাজ করা যায়। বিনা মূল্যে এমন সেবা দেয় আরও অনেক অ্যাপ, যেগুলো সরকারি প্ল্যাটফর্ম চালুর অনেক আগে থেকেই বাজারে আছে।

প্রকল্পের হিসাব

‘গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি নেওয়া হয় ২০১৬ সালে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে। বাস্তবায়ন করছে আইসিটি বিভাগের অধীন সংস্থা বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল। এর বরাদ্দ ১৫৮ কোটি টাকা, পুরোটাই সরকারি অর্থায়নে। মেয়াদ বেড়েছে তিনবার। সর্বশেষ গত আগস্টে সেটি ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।

পরিকল্পনা ছিল ১৬টি সফটওয়্যার, টুল ও প্রযুক্তি উপকরণ তৈরির। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, ১০ বছরে ১২টির কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে আছে অডিও থেকে লেখা তৈরি, বানান ও ব্যাকরণ সংশোধন এবং বাংলা থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদের মতো সেবা। তবে সবগুলো সাধারণ মানুষের জন্য পুরোপুরি চালু বা সহজলভ্য নয়।

প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। এর ৬০ কোটি টাকা গেছে সফটওয়্যার উন্নয়ন, হোস্টিং ও সংরক্ষণে। বাকি অর্থ খরচ হয়েছে অফিস সাজসজ্জা, সভা-সেমিনার, প্রচারণা ও পরিচালন কাজে।

প্রকল্পের ওয়েবসাইটে রাখা সেবার মধ্যে আছে সরকারি সেবার তথ্য দেওয়ার জন্য ‘জিজ্ঞাসা’ নামের এআই সহকারী। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য স্ক্রিন রিডার, ইশারাভাষা শনাক্তকরণ, ব্রেইল কনভার্টার, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষার তথ্যভান্ডার এবং বাংলা ফন্ট ও কিবোর্ডও তৈরি হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এসব প্রযুক্তি প্রাথমিক পর্যায়ের। কোনটির জন্য কত টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে আর বাস্তবে কত খরচ হয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা দরকার বলেও তাঁরা মনে করেন।

কোন সেবা কতটা চলছে

ব্যবহারের চিত্র একেক সেবায় একেক রকম:

বানান যাচাইয়ের সেবায় দিনে গড়ে পাঁচ লাখের মতো অনুরোধ আসে।
‘জিজ্ঞাসা’ চ্যাটবটে পরীক্ষামূলক ব্যবহারে গড়ে দিনে ১১০টি অনুরোধ আসছে।
লেখার ফন্ট রূপান্তরের সেবায় ৩৫ দিনে রূপান্তর হয়েছে ২৭৫টি ফাইল।

গত এক মাসে বিভিন্ন সময়ে কয়েকটি টুল ব্যবহার করে যাচাই করা হয়েছে। দেখা গেছে, বানান যাচাইয়ের সেবা বেশ ভালো ফল দেয়। অডিও থেকে লেখা তৈরির সেবায় বড় আকারের ফাইলে সমস্যা হয়েছে। ‘জিজ্ঞাসা’ সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেও জটিল প্রশ্নে কখনো কখনো বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছে।

অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা

প্রকল্পের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান জিপিইউ সক্ষমতায় একসঙ্গে সীমিতসংখ্যক ব্যবহারকারীকে সেবা দেওয়া যায়। জিপিইউ হলো কম্পিউটারের একধরনের বিশেষ প্রসেসর, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল চালাতে ও বিপুল তথ্য দ্রুত প্রক্রিয়া করতে কাজে লাগে। কর্মকর্তাদের দাবি, একসঙ্গে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার ব্যবহারকারীকে সেবা দেওয়া সম্ভব। চাহিদা বেশি হলে অপেক্ষা করতে হয়। সেবাগুলো ব্যাপকভাবে খুলে দিতে হলে তাই বাড়তি জিপিইউ ও অবকাঠামো লাগবে।

এখান থেকেই উঠছে বড় প্রশ্ন। এত টাকায় তৈরি প্রযুক্তি যদি অবকাঠামোর অভাবে সাধারণ মানুষের কাজে না লাগে, তাহলে প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সেগুলো সচল রাখবে কে?

প্রকল্প পরিচালক মাহবুব করিম বলেন, সব কাজ শেষ হলে প্রযুক্তি ও তথ্যভান্ডার বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা আছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী জিপিইউ কেনা বা সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগও থাকবে।

তথ্যভান্ডারের যুক্তি

প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের দাবি, শুধু সফটওয়্যার দিয়ে এর সাফল্য মাপা ঠিক হবে না। তাঁদের মতে, বাংলা ভাষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভাষাপ্রযুক্তির উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যভান্ডার গড়াও এর বড় লক্ষ্য। এ পর্যন্ত যা হয়েছে:

প্রায় ৮ হাজার কপিরাইটমুক্ত বই ডিজিটাল করা হয়েছে।
বাংলা কথাকে লেখায় রূপান্তরের জন্য ১০ হাজার ঘণ্টার অডিও উপাত্ত তৈরি হয়েছে।
লেখা থেকে কণ্ঠ তৈরির জন্য এক হাজার ঘণ্টার অডিও উপাত্ত তৈরি হয়েছে।
৪৪টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষার ১২ হাজার মিনিটের বেশি অডিও সংগ্রহ হয়েছে।
ইশারাভাষার ৪২ হাজার ৮০০টি ভিডিও সংগ্রহ হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, সফটওয়্যার তৈরি বা উপাত্ত সংগ্রহের হিসাব দিয়ে প্রকল্পের সফলতা বিচার করা যাবে না। এসব প্রযুক্তি কতটা ব্যবহার হচ্ছে, কতটা কার্যকর এবং প্রকল্প শেষের পর কত দিন সচল থাকবে, সেটিই বড় বিবেচ্য।

আইসিটি সচিবের বক্তব্য

আইসিটি সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা বলেন, এই প্রকল্পের আওতায় বেশ কিছু টুল তৈরি হয়েছে। তবে সব কাজ যে খুব অর্থবহ হয়েছে, তা তিনি বলবেন না। তাঁর ভাষ্য, টুলগুলো মানুষের কাছে যেভাবে পৌঁছানোর কথা ছিল, সেভাবে পৌঁছায়নি। এখন সেগুলোকে একটি প্ল্যাটফর্মে এনে ব্যবহারবান্ধব করার কাজ চলছে।

সচিব আরও বলেন, আইসিটি খাতের চলমান প্রকল্প বন্ধ করা হয়নি। বরং কোনটি চালু রাখা দরকার আর কোনটির কতটা যৌক্তিকতা আছে, তা যাচাই করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী ১০ থেকে ১২টি প্রকল্পের পরিধি পুনর্মূল্যায়ন করে অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে এই প্রকল্পের ব্যয় বর্তমান সরকারের সময়ে কমানো হয়নি।

বৃহত্তর প্রেক্ষাপট

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার নামে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ২১টি প্রকল্প নেওয়া হয়। আইসিটি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এগুলোর অনুমোদিত ব্যয় প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা।

এসব প্রকল্প মূল্যায়নে ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন হয়। কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, কিছু প্রকল্পের কার্যক্রমের সঙ্গে মূল উদ্দেশ্যের মিল নেই। কোনো কোনো প্রকল্পে আইসিটি বিভাগের আওতার বাইরের কাজও রাখা হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় খাত বাদ দিলে ৬ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা সাশ্রয় হতো বলে কমিটি জানায়।

অ্যাপ তৈরি, ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো, আইটি পার্ক ও ইনকিউবেশন সেন্টারের নামে নেওয়া এসব প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির বেশি অভিযোগ তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহ্‌মেদ পলকের বিরুদ্ধে। তিনি এখন কারাগারে। প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই এখনো জবাবদিহির বাইরে আছেন।

আগের সরকারের আমলে মোবাইল গেম ও অ্যাপ্লিকেশন তৈরিতে ৩৩০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পও নেওয়া হয়েছিল। এর আওতায় তৈরি বেশির ভাগ গেম ও অ্যাপ কোনো কাজে আসেনি বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান। তাঁদের অভিযোগ, নিজেদের লোকজনকে কাজ দিতেই এসব প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল।

জবাবদিহির দাবি

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নতুন সরকারের উচিত ছিল আগের সরকারের নেওয়া প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে বেশির ভাগ বাদ দেওয়া এবং জড়িতদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। তার বদলে মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, আইসিটি খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ আছে। অতীতের কর্মপদ্ধতি ও ফলাফল যাচাই না করে শুধু মেয়াদ বাড়িয়ে যাওয়া মানে পুরোনো কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেওয়া।

Share this news as a Photo Card