অনলাইন জুয়া, ডিজিটাল প্রতারণা, বিদেশে অর্থ পাচার ও অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আলোচনায় এসেছেন হবিগঞ্জের রুবেল মিয়া (৩৭)। অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে এলাকায় তিনি ‘ক্যাসিনো সম্রাট রুবেল’ নামে পরিচিত। ক্যাসিনো সম্রাট রুবেল টং দোকান থেকে শত শত কোটি টাকার মালিক। ঢাকার পল্টন মডেল থানায় দায়ের হওয়া একটি প্রতারণা মামলায় তিনি গ্রেফতার হয়েছেন। মামলাটির তদন্তভার এখন ডিএমপির ডিবি দক্ষিণ বিভাগের হাতে।
মামলার বিবরণ
গত ২৯ সেপ্টেম্বর পল্টন থানায় মামলাটি করেন মো. আকবর হোসেন। এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৩ সালের ২২ জুন থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে আসামিরা তাঁকে নানাভাবে প্রলোভন দেখান। harrywinstongold.vip নামে একটি ভুয়া অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নিজেদের আমেরিকান কোম্পানির প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে তাঁর কাছ থেকে ৭০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। মামলায় মোট ৭৬ লাখ ৩৬ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার আসামিদের মধ্যে আছেন ঢাকার উত্তর বাড্ডার মো. ইকবাল আশরাফ ওরফে ক্যাসিনো ইকবাল, গাজীপুরের তাসনুভা নওরিন সানজানা ওরফে শারমিন জাহান তিশা, হবিগঞ্জ সদরের শরীফপুর গ্রামের রুবেল মিয়া, কুমিল্লার দেবিদ্বারের জুয়েল রানা, চুয়াডাঙ্গার মো. সুজন এবং হবিগঞ্জের সুলতানশী গ্রামের ময়নুল হাসান। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও পাঁচ-ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে রুবেলকে বিভিন্ন অ্যাপভিত্তিক অনলাইন জুয়া ও প্রতারণাচক্রের ‘এশিয়া অঞ্চলের কান্ট্রি ডিরেক্টর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্রেফতারের ঘটনা
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মামলার পর দুবাই যাওয়ার চেষ্টাকালে ২ অক্টোবর সন্ধ্যায় সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রুবেলকে গ্রেফতার করা হয়। পরে হবিগঞ্জে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের একটি হত্যা মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকার কারণে সেই মামলাতেও তাঁকে গ্রেফতার দেখানো হয়। সবশেষ হবিগঞ্জ পুলিশ তাঁকে পল্টন থানার প্রতারণা মামলায় হস্তান্তর করে।
ডিবি দক্ষিণ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, মামলায় উল্লিখিত অ্যাপটিই একমাত্র নয়। কিছুদিন পরপর নতুন নতুন অ্যাপের মাধ্যমে এই জুয়া চালানো হচ্ছে এবং সবগুলো অ্যাপ রুবেলের নিয়ন্ত্রণে বলে তাঁদের ধারণা। বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান চলছে বলে জানান তিনি।
আগের মামলা
এর আগে ২০২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি অনলাইন জুয়ার মূল হোতা হিসেবে রুবেলকে গ্রেফতার করেছিল ডিএমপির সিটি সাইবার ক্রাইম ইউনিট। ওই মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রও দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, পরে জামিনে বেরিয়ে তিনি আবারও একই কায়দায় সারা দেশে অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণ করছিলেন।
গ্রামের মানুষ যা বলছেন
রুবেলের গ্রেফতারের পর সিলেট অঞ্চলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। হবিগঞ্জ সদরের শরীফপুর গ্রামে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১২ সালেও রুবেলের বাবা আব্দুল লতিফ দিনমজুর ছিলেন।
লস্করপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. উজ্জ্বল বলেন, “রুবেলের বর্তমান জীবনযাপন আলাদিনের চেরাগের গল্পকেও হার মানায়। যে ছেলে কয়েক বছর আগে গ্রামে চায়ের দোকান চালাত, যার বাবা ভ্যান চালাতেন, সে অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে বিপুল টাকার মালিক হয়েছে।” তাঁর দাবি, রুবেলের এই উত্থান দেখে এলাকার অনেক তরুণ জুয়ায় ঝুঁকেছে, যা এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। চেয়ারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকায় যে সম্পদ দৃশ্যমান, তার মূল্যই প্রায় শতকোটি টাকা। রুবেল বেশির ভাগ সম্পদ দুবাইয়ে পাচার করেছেন এবং সেখানে বসেই দীর্ঘদিন জুয়া নিয়ন্ত্রণ করেছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
সম্পদের খোঁজে
স্থানীয় সাবরেজিস্ট্রি অফিসের নথি অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় রুবেল ও তাঁর পরিবারের নামে যেসব সম্পত্তি কেনা হয়েছে, তার বাজারমূল্য শতকোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে সুলতানশী মৌজায় ২০১৯ সাল থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে একাধিক দলিলে জমি রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। সেখানে শুধু রুবেলের নামে ১৫ বিঘা এবং ভাই সোহাগসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে আরও ১৭ বিঘা জমি রয়েছে। যমুনাবাদ মৌজায় ২০২২ সালে ১৫ শতক, দারিয়া মৌজায় ১ একর ৭৬ শতক এবং আনন্দপুর পৌরসভা এলাকায় ২০২৪ সালে ১১.৭২ শতক জমিসহ একটি বাড়ি কেনার তথ্যও মিলেছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, কটিয়াদী বাজারে একটি বিলাসবহুল মার্কেট, শ্রীমঙ্গলে চারতলা ও তিনতলা দুটি ভবন, হবিগঞ্জের ইনাতাবাদ ও পুরাতন মুন্সীতে জমি এবং দুটি নির্মিত বাড়ি আছে। এ ছাড়া ঢাকার মতিঝিল ও উত্তরায় একাধিক ফ্ল্যাট, নিজ গ্রামে বিশাল বাড়ি, শ্রীমঙ্গলে শত বিঘার বেশি জমিতে রিসোর্ট এবং দুবাইয়ে বাংলো, সুপার শপ, হোটেল ও ক্যাসিনো ব্যবসার অভিযোগও উঠেছে।
সাবরেজিস্ট্রি অফিসের একাধিক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করে জানান, দলিল, রেজিস্ট্রি মূল্য ও মালিকানার তথ্য চাওয়া হলে তাঁরা তা লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দেবেন। তাঁদের মতে, এসব সম্পত্তির বাজারমূল্য শতকোটি টাকার ওপরে হবে।
সহযোগী ও রাজনৈতিক যোগসূত্র
স্থানীয়দের ভাষ্য, ময়নুল হাসান ওরফে দুলাল রুবেলের স্থানীয় সহযোগী হিসেবে পরিচিত। তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং হবিগঞ্জের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটরের পদও পেয়েছিলেন। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আইন মন্ত্রণালয় সম্প্রতি তাঁর নিয়োগ বাতিল করেছে। পুলিশের খাতায় তিনি এখনো পলাতক।
রুবেলের ভাই সোহাগ মিয়া এলাকায় ‘ক্যাসিনো সোহাগ’ নামে পরিচিত। এলাকাবাসীর অভিযোগ, তিনি এখন দুবাইয়ে থেকে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার এবং অনলাইন জুয়া ও মাদক চোরাচালান পরিচালনা করছেন। তাঁকে রুবেলের প্রধান সহযোগী বলা হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রুবেল তৎকালীন সংসদ সদস্য আবু জাহিরের অর্থ জোগানদাতা ছিলেন এবং নিজেকে যুবলীগ নেতা হিসেবে পরিচয় দিতেন। জুলাই আন্দোলনের একটি হত্যা মামলায়ও তিনি আসামি।
সংসদ সদস্যের বক্তব্য
বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে হবিগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য ও হুইপ জিকে গউছ বলেন, রুবেল আওয়ামী লীগের একজন সংসদ সদস্যের আশ্রয়েই এসব অপরাধ করে আসছিলেন। এটি হবিগঞ্জের মানুষ জানে। তাঁর ভাষ্য, বর্তমান সরকারের সময় এসব অপরাধী কোনোভাবেই পার পাবেন না এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ইতোমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অনলাইন জুয়ার মতো অপরাধ যাঁরা নিয়ন্ত্রণ করছেন, তাঁরা যে দলেরই হোন, তাঁদের গ্রেফতার করতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। ময়নুল হাসানের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কারও অপরাধের দায় দল নেবে না এবং তাঁর বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 



















