শিরোনাম :
বাংলাদেশের লিড ১০৬, হ্যাটট্রিক করলেন হাসান রিয়াদে হামলার জেরে জেদ্দা বিমানবন্দরে আটকা ঢাকাগামী বিমানের যাত্রীরা তবে কি ঢাকা কাঠমান্ডুর পথে দিল্লি, কি হবে মোদির উত্তাল দিল্লিতে যে শর্তে মুক্তি পেলেন ককরোচের তিন নেতা সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দরে হুথি হামলায় দুই বাংলাদেশি সহ নিহত ১২ জনতা ব্যাংকে বেক্সিমকোর ঋণের ৯৫ শতাংশই জামানতহীন নোবেল শান্তি পুরস্কার না পেয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ ট্রাম্পের সাত মাসে রিজার্ভ ১১ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে: স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী সরকারের সমন্বিত পদক্ষেপে ডেঙ্গু প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে :স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী নভেম্বর থেকে রিকশাচালক ও মুচিসহ সবার থাকবে বাংলা কিউআর

তবে কি ঢাকা কাঠমান্ডুর পথে দিল্লি, কি হবে মোদির

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) এবং নিট পরীক্ষার অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে ১০ অক্টোবর উত্তাল ছিল ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের তরুণদের একটি আন্দোলন এবং বিরোধী দলগুলো প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ চেয়ে বিক্ষোভের ডাক দেয়। প্রতিবাদ ঠেকাতে রাজধানীতে নিরাপত্তা কড়া করা হয়, আটক করা হয় বহু মানুষকে।

বিক্ষোভের কেন্দ্রে ভোটার তালিকা

আন্দোলনকারীদের মূল অভিযোগ এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে। তাঁদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়েছে এবং তাতে বহু বৈধ ভোটারের ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেশজুড়ে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার কথা এসেছে।

নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন বিজেপি এই অভিযোগ মানছে না। তাদের বক্তব্য, তালিকা সংশোধন নিয়মিত যাচাইপ্রক্রিয়ারই অংশ। মৃত, স্থানান্তরিত কিংবা একাধিকবার তালিকাভুক্ত ব্যক্তির নাম বাদ দেওয়ার প্রয়োজনও থাকতে পারে। আবার যাচাইয়ের ত্রুটি, পর্যাপ্ত নোটিশের অভাব বা পরিচয়সংক্রান্ত জটিলতায় প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ পড়লে সেটিও গুরুতর সমস্যা। কতজনের নাম বাদ গেছে, তাঁদের মধ্যে কতজন মৃত, কতজন স্থানান্তরিত আর কতজন জীবিত ও যোগ্য ভোটার, সেই হিসাব আলাদা করে প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বিতর্কের নিষ্পত্তি কঠিন।

নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞা ও আটক

বিক্ষোভের আগেই দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। যন্তর-মন্তরের দিকের পথগুলোতে বসানো হয় ব্যারিকেড। মোতায়েন করা হয় বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক সদস্য। কয়েকটি মেট্রো স্টেশনের কার্যক্রম সীমিত বা বন্ধ রাখা হয়। মোবাইল ইন্টারনেট স্থগিত করার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আগেই আন্দোলনের সংগঠক, ছাত্রনেতা, রাজনৈতিক কর্মী ও বিরোধী দলের কয়েকজন নেতাকে আটক করা হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে দুই হাজারের বেশি বিক্ষোভকারী আটক হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্য সংবাদমাধ্যমে আটকের সংখ্যা ও পরিধি নিয়ে ভিন্ন তথ্য এসেছে।

সমাবেশের অনুমতি নিয়েও প্রশাসন ও আয়োজকদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়সীমা ও আগের কর্মসূচির শর্তের কারণে প্রস্তাবিত সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, এসব বিধিনিষেধের উদ্দেশ্য ছিল তাঁদের কণ্ঠ রোধ করা। কোন পক্ষের যুক্তি কতটা ঠিক, তা বুঝতে প্রশাসনিক নথি, প্রযোজ্য আইন ও ঘটনাপ্রবাহের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন দরকার।

‘ককরোচ’ নামের পেছনের গল্প

আন্দোলনের নামটিও আলোচনার বিষয়। তরুণদের প্রতি অবমাননাকর ভাষা ব্যবহারের প্রতিবাদ থেকেই এসেছে ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকা শব্দটি। জাতীয় মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট নিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে এর বিস্তার ঘটে। ব্যঙ্গাত্মক এই রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রথমে উঠে আসে পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্দোলনের চাপের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন। তবে একজন মন্ত্রীর পদত্যাগে সমস্যার সমাধান হয় না। প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা, তদন্তের স্বচ্ছতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের ন্যায্যতা নিশ্চিত করার প্রশ্ন থেকেই যায়।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ

আন্দোলনকে ঘিরে ২০২৪ সালের বাংলাদেশের ঘটনার তুলনাও উঠছে। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন ক্রমে বৃহত্তর রাজনৈতিক অসন্তোষে রূপ নেয়। ওই বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। তবে দুই দেশের রাজনৈতিক কাঠামো, নির্বাচনব্যবস্থা, সামাজিক বাস্তবতা ও বিরোধী দলের অবস্থান আলাদা। তাই এই তুলনা থেকে ভারতের পরিণতি সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

এখন প্রশ্ন কোথায়

বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জননিরাপত্তা ও প্রতিবাদের অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি। ভোটার তালিকার মতো বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা এবং আপিলের কার্যকর সুযোগ থাকার কথাও তাঁরা বলছেন। সরকারের সামনে আছে আইনশৃঙ্খলা সামলানোর পাশাপাশি অভিযোগগুলোর স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে জনআস্থা ফেরানোর চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে আন্দোলনের নেতাদের সামনে প্রশ্ন, শান্তিপূর্ণ থাকা এবং তথ্যের নির্ভুলতা বজায় রাখা।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে রবিবার দিল্লিতে তরুণদের দ্বিতীয় দিনের বিক্ষোভের প্রস্তুতি চলছে। এর আগে আদালতের নির্দেশে মুক্তি পেয়েছেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে ও আরও দুই শীর্ষ নেতা। শনিবার বিমান থেকে নামার পরপরই তাঁদের আটক করা হয়েছিল।

১০ অক্টোবর, শনিবার, রাজধানীর কেন্দ্রীয় অংশ কার্যত অবরুদ্ধ ছিল। পুলিশ বলছে, ১৬৩ ধারা জারি থাকায় সেখানে যেকোনো জমায়েত নিষিদ্ধ ছিল। ফলে যন্তর মন্তরে বড় কোনো সমাবেশ হয়নি। তার বদলে শহরজুড়ে দেখা গেছে ব্যারিকেড, তল্লাশি আর একের পর এক আটকের ঘটনা।

দুর্গের মতো দিল্লি

এক প্রত্যক্ষদর্শী সংবাদ প্রতিবেদনের বর্ণনা অনুযায়ী, শনিবার সকালেই দিল্লির প্রবেশমুখে গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি শুরু হয়। নয়ডা থেকে আসা সড়কের টোল বুথের সামনে যে গাড়িগুলো আটকানো হচ্ছিল, তার বেশির ভাগেই চালক বা সামনের আসনের যাত্রী ছিলেন তরুণ। শহরের ভেতরে মান্ডি হাউস সার্কেলসহ বিভিন্ন মোড়ে ব্যারিকেড বসিয়ে সাধারণ মানুষের প্রবেশ আটকানো হয়। সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা অবশ্য তুলনামূলক কম বাধায় কনট প্লেস পর্যন্ত যেতে পেরেছেন।

যন্তর মন্তর থেকে কনট প্লেসের দূরত্ব মাত্র ৪০০ মিটার। তাই ওই এলাকাতেই সবচেয়ে বেশি পুলিশ ও সশস্ত্র সদস্য মোতায়েন ছিল। সেখানে রাখা হয়েছিল দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের যান, জলকামান, প্রিজন ভ্যান এবং ত্রিশটিরও বেশি বাস। বিক্ষোভকারীদের আটক করে নিয়ে যেতে পুলিশ এসব বাস ব্যবহার করেছে বলে ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

নিরাপত্তার আরেকটি স্তর চোখে দেখা না গেলেও তার প্রভাব ছিল পদে পদে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যন্তর মন্তরের পাঁচ কিলোমিটার ব্যাসার্ধে ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছিল। এতে ওই এলাকায় থাকা সাংবাদিকদের পক্ষে সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এলাকার বাইরে কী ঘটছে, তাও জানা যাচ্ছিল না। কয়েকটি মেট্রো স্টেশনের কার্যক্রম সীমিত বা বন্ধ রাখার খবরও পাওয়া গেছে। সাধারণত সপ্তাহান্তের আড্ডায় জমজমাট থাকা কনট প্লেসে সেদিন কোনো রেস্তোরাঁ বা পানশালা খোলেনি।

যন্তর মন্তরে যা দেখা গেল

ওই প্রতিবেদনের বর্ণনায়, যন্তর মন্তরের আশপাশে বিক্ষোভকারীর চেয়ে সংবাদকর্মীর সংখ্যাই বেশি চোখে পড়েছে। কেউ প্ল্যাকার্ড হাতে এলেই পুলিশ তাঁকে সরিয়ে দিচ্ছিল। কাউকে বাসে তোলা হয়েছে কোলে তুলে, কাউকে টেনে নিয়ে। আন্দোলনকারীদের অনেকের হাতে ছিল মিম-সংবলিত কৌতুকপূর্ণ প্ল্যাকার্ড। পুলিশ সেগুলোও দেখামাত্র আটক করেছে।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে একটি ঘটনার কথাও ওই প্রতিবেদনে আছে। রাস্তার একদিকে কয়েকজন তরুণ জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছিলেন। অন্যদিকে গলায় গেরুয়া গামছা আর কপালে তিলক পরা আরেকটি দল ‘দিল্লি পুলিশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান তোলে। দুই দল সংঘর্ষে জড়ালে প্রথম দলের সদস্যদের পুলিশ চ্যাংদোলা করে সরিয়ে নেয়। দ্বিতীয় দলকে অনুরোধ করে সরিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিবেদক এই পার্থক্য আলাদাভাবে উল্লেখ করেছেন।

ওই প্রতিবেদক কথা বলেছেন কয়েকজন বিক্ষোভকারীর সঙ্গে। একজন আইনজীবী জানান, এসআইআর প্রক্রিয়ার পর তাঁর পরিবারের সবার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। কীভাবে আবার নাম তোলা যাবে, তা নিয়ে তিনি কিছুই জানেন না। ৮২ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ বলেন, “আমার বয়স ৮২, এমন অবস্থা আমি আগে দেখিনি।” তাঁর মতে, সরকার ও বিক্ষোভকারী, এই দুই পক্ষই তো আছে। তাদের মধ্যে কথা বললেই সমাধান সম্ভব। এক তরুণ বলেন, একদিন দিল্লিকে স্তব্ধ করে রাখা যায়, কিন্তু তরুণদের কণ্ঠ কতদিন দমিয়ে রাখা সম্ভব।

নেতাদের আটক

শনিবার সকাল থেকেই আন্দোলনের পরিচিত মুখদের একের পর এক আটকের খবর আসতে থাকে। সিজেপির শীর্ষ নেতা অভিজিৎ দিপকে, আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে বিমান থেকেই আটক করে পুলিশ। ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে আটক করা হয় তাঁর বাড়ি থেকে। বামপন্থী ছাত্রনেত্রী নেহা বোরাকেও আটক করা হয়েছিল। ছাড়া পাওয়ার পর তিনি যন্তর মন্তর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে দিল্লি হাট এলাকায় অবস্থান নেন।

প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দিতে গিয়ে আটক হয়েছেন চার সাবেক মুখ্যমন্ত্রীও। তাঁরা হলেন পশ্চিমবঙ্গের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির অরবিন্দ কেজরিওয়াল, কেরালার পিনারাই বিজয়ন ও ত্রিপুরার মানিক সরকার। বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে কেজরিওয়াল আটক হন। বিকেল চারটা নাগাদ জানা যায়, মমতা ও তাঁর দলীয় সতীর্থদের উত্তর দ্বারকা থানায় নেওয়া হয়েছে। আগের রাত থেকে বাংলা সাহিব গুরুদোয়ারায় আশ্রয় নেওয়া কয়েকশ বিক্ষোভকারী যন্তর মন্তরের দিকে এগোতে চাইলে তাঁদের ওপর লাঠিচার্জ হয়েছে বলে জানা গেছে।

রবিবারের চিত্র

রবিবার ভোরে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার পর আদালত অভিজিৎ দিপকে ও দুই নেতাকে মুক্তির নির্দেশ দেন। সিজেপির আইনবিষয়ক প্রধান রত্না সিং এক্স-এ জানান, মুক্তির শর্ত হলো এক বছর শান্তিভঙ্গ করা যাবে না। ধ্রুব রাঠি মধ্যরাতের পর ছাড়া পান। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আর কোনো বিক্ষোভে অংশ না নেওয়ার শর্তে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, প্রথম দিনে আটক হওয়া বেশির ভাগ মানুষকে শনিবার গভীর রাতেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। রবিবারও শহরজুড়ে হাজার হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক সদস্য মোতায়েন আছে। তবে মেট্রো স্টেশনগুলো আবার খুলেছে এবং মোবাইল ইন্টারনেটও ফিরেছে।

বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর বলপ্রয়োগের নিন্দা করেছে বিরোধী দলগুলো ও সরকারের সমালোচকেরা। শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের একটি সংস্থা। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রবিবার বলেছে, এই অবস্থান ‘বেছে বেছে’ নেওয়া এবং এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ।

আন্দোলনের মূল প্রশ্ন

বিক্ষোভকারীদের দাবি, জ্ঞানেশ কুমারকে পদ ছাড়তে হবে। তাঁদের আপত্তি ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে। সমালোচকদের মতে, এই সংশোধনে ১২ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা বিজেপি বাড়তি সুবিধা পায়। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, নাম বাদ পড়ার ঘটনায় মুসলিম ও অন্য সংখ্যালঘু ভোটাররা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। হিন্দুত্ববাদী ক্ষমতাসীন দলকে এই ভোটারদের ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম বলেই তাদের বক্তব্য।

বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশন কারসাজির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বিজেপির বক্তব্য, বিরোধীরা একটি বৈধ নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে ভুল প্রশ্ন তুলে গণতন্ত্রকে দুর্বল করতে চাইছে। দলটি কমিশনের তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, যাচাই কার্যক্রমে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ গেছে। এর মধ্যে ৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষ অন্যত্র চলে গেছেন এবং ৩ কোটি মানুষকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, কুমারের দুই সহকর্মী কমিশনার ভোটার তালিকা সংশোধন, নিবন্ধন পদ্ধতি ও ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে একাধিক উদ্বেগ তুলেছিলেন। এরপর থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট বিক্ষোভ চলছে। কমিশন বলছে, ভেতরের আলোচনায় ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক। কোনো দলের পক্ষ নেওয়ার অভিযোগও তারা অস্বীকার করেছে।

ককরোচ জনতা পার্টির পথচলা

সিজেপির যাত্রা শুরু হয়েছিল অনলাইনে ব্যঙ্গ-রসিকতার মাধ্যম হিসেবে। পরে দ্রুতই এটি একটি চাপসৃষ্টিকারী সংগঠনে রূপ নেয়। নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের বিরুদ্ধে তাদের রাস্তার আন্দোলনের পর শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। জুলাই মাসে সংগঠনটির বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশের আচরণ এবার অনেকটাই ভিন্ন ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।

নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে চলমান বিক্ষোভকে সিজেপি সামাজিক মাধ্যমে ‘সিজন ২’ বলছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থামবে না। প্রস্তাবিত সমাবেশের অনুমতি না দেওয়ার কারণ হিসেবে দিল্লি পুলিশ নির্ধারিত সময়সীমা ও আগের কর্মসূচির শর্তের কথা বলেছে। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, এসব বিধিনিষেধের উদ্দেশ্য ছিল তাঁদের কণ্ঠ রোধ করা।

লেখক : সাংবাদিক,কলামিষ্ট

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

নভেম্বর থেকে রিকশাচালক ও মুচিসহ সবার থাকবে বাংলা কিউআর

১০ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

তবে কি ঢাকা কাঠমান্ডুর পথে দিল্লি, কি হবে মোদির

আপডেট সময় ০১:০১:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) এবং নিট পরীক্ষার অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে ১০ অক্টোবর উত্তাল ছিল ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের তরুণদের একটি আন্দোলন এবং বিরোধী দলগুলো প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ চেয়ে বিক্ষোভের ডাক দেয়। প্রতিবাদ ঠেকাতে রাজধানীতে নিরাপত্তা কড়া করা হয়, আটক করা হয় বহু মানুষকে।

বিক্ষোভের কেন্দ্রে ভোটার তালিকা

আন্দোলনকারীদের মূল অভিযোগ এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে। তাঁদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়েছে এবং তাতে বহু বৈধ ভোটারের ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেশজুড়ে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার কথা এসেছে।

নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন বিজেপি এই অভিযোগ মানছে না। তাদের বক্তব্য, তালিকা সংশোধন নিয়মিত যাচাইপ্রক্রিয়ারই অংশ। মৃত, স্থানান্তরিত কিংবা একাধিকবার তালিকাভুক্ত ব্যক্তির নাম বাদ দেওয়ার প্রয়োজনও থাকতে পারে। আবার যাচাইয়ের ত্রুটি, পর্যাপ্ত নোটিশের অভাব বা পরিচয়সংক্রান্ত জটিলতায় প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ পড়লে সেটিও গুরুতর সমস্যা। কতজনের নাম বাদ গেছে, তাঁদের মধ্যে কতজন মৃত, কতজন স্থানান্তরিত আর কতজন জীবিত ও যোগ্য ভোটার, সেই হিসাব আলাদা করে প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বিতর্কের নিষ্পত্তি কঠিন।

নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞা ও আটক

বিক্ষোভের আগেই দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। যন্তর-মন্তরের দিকের পথগুলোতে বসানো হয় ব্যারিকেড। মোতায়েন করা হয় বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক সদস্য। কয়েকটি মেট্রো স্টেশনের কার্যক্রম সীমিত বা বন্ধ রাখা হয়। মোবাইল ইন্টারনেট স্থগিত করার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আগেই আন্দোলনের সংগঠক, ছাত্রনেতা, রাজনৈতিক কর্মী ও বিরোধী দলের কয়েকজন নেতাকে আটক করা হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে দুই হাজারের বেশি বিক্ষোভকারী আটক হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্য সংবাদমাধ্যমে আটকের সংখ্যা ও পরিধি নিয়ে ভিন্ন তথ্য এসেছে।

সমাবেশের অনুমতি নিয়েও প্রশাসন ও আয়োজকদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়সীমা ও আগের কর্মসূচির শর্তের কারণে প্রস্তাবিত সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, এসব বিধিনিষেধের উদ্দেশ্য ছিল তাঁদের কণ্ঠ রোধ করা। কোন পক্ষের যুক্তি কতটা ঠিক, তা বুঝতে প্রশাসনিক নথি, প্রযোজ্য আইন ও ঘটনাপ্রবাহের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন দরকার।

‘ককরোচ’ নামের পেছনের গল্প

আন্দোলনের নামটিও আলোচনার বিষয়। তরুণদের প্রতি অবমাননাকর ভাষা ব্যবহারের প্রতিবাদ থেকেই এসেছে ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকা শব্দটি। জাতীয় মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট নিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে এর বিস্তার ঘটে। ব্যঙ্গাত্মক এই রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রথমে উঠে আসে পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্দোলনের চাপের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন। তবে একজন মন্ত্রীর পদত্যাগে সমস্যার সমাধান হয় না। প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা, তদন্তের স্বচ্ছতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের ন্যায্যতা নিশ্চিত করার প্রশ্ন থেকেই যায়।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ

আন্দোলনকে ঘিরে ২০২৪ সালের বাংলাদেশের ঘটনার তুলনাও উঠছে। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন ক্রমে বৃহত্তর রাজনৈতিক অসন্তোষে রূপ নেয়। ওই বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। তবে দুই দেশের রাজনৈতিক কাঠামো, নির্বাচনব্যবস্থা, সামাজিক বাস্তবতা ও বিরোধী দলের অবস্থান আলাদা। তাই এই তুলনা থেকে ভারতের পরিণতি সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

এখন প্রশ্ন কোথায়

বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জননিরাপত্তা ও প্রতিবাদের অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি। ভোটার তালিকার মতো বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা এবং আপিলের কার্যকর সুযোগ থাকার কথাও তাঁরা বলছেন। সরকারের সামনে আছে আইনশৃঙ্খলা সামলানোর পাশাপাশি অভিযোগগুলোর স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে জনআস্থা ফেরানোর চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে আন্দোলনের নেতাদের সামনে প্রশ্ন, শান্তিপূর্ণ থাকা এবং তথ্যের নির্ভুলতা বজায় রাখা।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে রবিবার দিল্লিতে তরুণদের দ্বিতীয় দিনের বিক্ষোভের প্রস্তুতি চলছে। এর আগে আদালতের নির্দেশে মুক্তি পেয়েছেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে ও আরও দুই শীর্ষ নেতা। শনিবার বিমান থেকে নামার পরপরই তাঁদের আটক করা হয়েছিল।

১০ অক্টোবর, শনিবার, রাজধানীর কেন্দ্রীয় অংশ কার্যত অবরুদ্ধ ছিল। পুলিশ বলছে, ১৬৩ ধারা জারি থাকায় সেখানে যেকোনো জমায়েত নিষিদ্ধ ছিল। ফলে যন্তর মন্তরে বড় কোনো সমাবেশ হয়নি। তার বদলে শহরজুড়ে দেখা গেছে ব্যারিকেড, তল্লাশি আর একের পর এক আটকের ঘটনা।

দুর্গের মতো দিল্লি

এক প্রত্যক্ষদর্শী সংবাদ প্রতিবেদনের বর্ণনা অনুযায়ী, শনিবার সকালেই দিল্লির প্রবেশমুখে গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি শুরু হয়। নয়ডা থেকে আসা সড়কের টোল বুথের সামনে যে গাড়িগুলো আটকানো হচ্ছিল, তার বেশির ভাগেই চালক বা সামনের আসনের যাত্রী ছিলেন তরুণ। শহরের ভেতরে মান্ডি হাউস সার্কেলসহ বিভিন্ন মোড়ে ব্যারিকেড বসিয়ে সাধারণ মানুষের প্রবেশ আটকানো হয়। সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা অবশ্য তুলনামূলক কম বাধায় কনট প্লেস পর্যন্ত যেতে পেরেছেন।

যন্তর মন্তর থেকে কনট প্লেসের দূরত্ব মাত্র ৪০০ মিটার। তাই ওই এলাকাতেই সবচেয়ে বেশি পুলিশ ও সশস্ত্র সদস্য মোতায়েন ছিল। সেখানে রাখা হয়েছিল দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের যান, জলকামান, প্রিজন ভ্যান এবং ত্রিশটিরও বেশি বাস। বিক্ষোভকারীদের আটক করে নিয়ে যেতে পুলিশ এসব বাস ব্যবহার করেছে বলে ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

নিরাপত্তার আরেকটি স্তর চোখে দেখা না গেলেও তার প্রভাব ছিল পদে পদে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যন্তর মন্তরের পাঁচ কিলোমিটার ব্যাসার্ধে ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছিল। এতে ওই এলাকায় থাকা সাংবাদিকদের পক্ষে সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এলাকার বাইরে কী ঘটছে, তাও জানা যাচ্ছিল না। কয়েকটি মেট্রো স্টেশনের কার্যক্রম সীমিত বা বন্ধ রাখার খবরও পাওয়া গেছে। সাধারণত সপ্তাহান্তের আড্ডায় জমজমাট থাকা কনট প্লেসে সেদিন কোনো রেস্তোরাঁ বা পানশালা খোলেনি।

যন্তর মন্তরে যা দেখা গেল

ওই প্রতিবেদনের বর্ণনায়, যন্তর মন্তরের আশপাশে বিক্ষোভকারীর চেয়ে সংবাদকর্মীর সংখ্যাই বেশি চোখে পড়েছে। কেউ প্ল্যাকার্ড হাতে এলেই পুলিশ তাঁকে সরিয়ে দিচ্ছিল। কাউকে বাসে তোলা হয়েছে কোলে তুলে, কাউকে টেনে নিয়ে। আন্দোলনকারীদের অনেকের হাতে ছিল মিম-সংবলিত কৌতুকপূর্ণ প্ল্যাকার্ড। পুলিশ সেগুলোও দেখামাত্র আটক করেছে।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে একটি ঘটনার কথাও ওই প্রতিবেদনে আছে। রাস্তার একদিকে কয়েকজন তরুণ জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছিলেন। অন্যদিকে গলায় গেরুয়া গামছা আর কপালে তিলক পরা আরেকটি দল ‘দিল্লি পুলিশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান তোলে। দুই দল সংঘর্ষে জড়ালে প্রথম দলের সদস্যদের পুলিশ চ্যাংদোলা করে সরিয়ে নেয়। দ্বিতীয় দলকে অনুরোধ করে সরিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিবেদক এই পার্থক্য আলাদাভাবে উল্লেখ করেছেন।

ওই প্রতিবেদক কথা বলেছেন কয়েকজন বিক্ষোভকারীর সঙ্গে। একজন আইনজীবী জানান, এসআইআর প্রক্রিয়ার পর তাঁর পরিবারের সবার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। কীভাবে আবার নাম তোলা যাবে, তা নিয়ে তিনি কিছুই জানেন না। ৮২ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ বলেন, “আমার বয়স ৮২, এমন অবস্থা আমি আগে দেখিনি।” তাঁর মতে, সরকার ও বিক্ষোভকারী, এই দুই পক্ষই তো আছে। তাদের মধ্যে কথা বললেই সমাধান সম্ভব। এক তরুণ বলেন, একদিন দিল্লিকে স্তব্ধ করে রাখা যায়, কিন্তু তরুণদের কণ্ঠ কতদিন দমিয়ে রাখা সম্ভব।

নেতাদের আটক

শনিবার সকাল থেকেই আন্দোলনের পরিচিত মুখদের একের পর এক আটকের খবর আসতে থাকে। সিজেপির শীর্ষ নেতা অভিজিৎ দিপকে, আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে বিমান থেকেই আটক করে পুলিশ। ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে আটক করা হয় তাঁর বাড়ি থেকে। বামপন্থী ছাত্রনেত্রী নেহা বোরাকেও আটক করা হয়েছিল। ছাড়া পাওয়ার পর তিনি যন্তর মন্তর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে দিল্লি হাট এলাকায় অবস্থান নেন।

প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দিতে গিয়ে আটক হয়েছেন চার সাবেক মুখ্যমন্ত্রীও। তাঁরা হলেন পশ্চিমবঙ্গের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির অরবিন্দ কেজরিওয়াল, কেরালার পিনারাই বিজয়ন ও ত্রিপুরার মানিক সরকার। বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে কেজরিওয়াল আটক হন। বিকেল চারটা নাগাদ জানা যায়, মমতা ও তাঁর দলীয় সতীর্থদের উত্তর দ্বারকা থানায় নেওয়া হয়েছে। আগের রাত থেকে বাংলা সাহিব গুরুদোয়ারায় আশ্রয় নেওয়া কয়েকশ বিক্ষোভকারী যন্তর মন্তরের দিকে এগোতে চাইলে তাঁদের ওপর লাঠিচার্জ হয়েছে বলে জানা গেছে।

রবিবারের চিত্র

রবিবার ভোরে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার পর আদালত অভিজিৎ দিপকে ও দুই নেতাকে মুক্তির নির্দেশ দেন। সিজেপির আইনবিষয়ক প্রধান রত্না সিং এক্স-এ জানান, মুক্তির শর্ত হলো এক বছর শান্তিভঙ্গ করা যাবে না। ধ্রুব রাঠি মধ্যরাতের পর ছাড়া পান। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আর কোনো বিক্ষোভে অংশ না নেওয়ার শর্তে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, প্রথম দিনে আটক হওয়া বেশির ভাগ মানুষকে শনিবার গভীর রাতেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। রবিবারও শহরজুড়ে হাজার হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক সদস্য মোতায়েন আছে। তবে মেট্রো স্টেশনগুলো আবার খুলেছে এবং মোবাইল ইন্টারনেটও ফিরেছে।

বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর বলপ্রয়োগের নিন্দা করেছে বিরোধী দলগুলো ও সরকারের সমালোচকেরা। শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের একটি সংস্থা। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রবিবার বলেছে, এই অবস্থান ‘বেছে বেছে’ নেওয়া এবং এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ।

আন্দোলনের মূল প্রশ্ন

বিক্ষোভকারীদের দাবি, জ্ঞানেশ কুমারকে পদ ছাড়তে হবে। তাঁদের আপত্তি ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে। সমালোচকদের মতে, এই সংশোধনে ১২ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা বিজেপি বাড়তি সুবিধা পায়। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, নাম বাদ পড়ার ঘটনায় মুসলিম ও অন্য সংখ্যালঘু ভোটাররা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। হিন্দুত্ববাদী ক্ষমতাসীন দলকে এই ভোটারদের ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম বলেই তাদের বক্তব্য।

বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশন কারসাজির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বিজেপির বক্তব্য, বিরোধীরা একটি বৈধ নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে ভুল প্রশ্ন তুলে গণতন্ত্রকে দুর্বল করতে চাইছে। দলটি কমিশনের তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, যাচাই কার্যক্রমে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ গেছে। এর মধ্যে ৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষ অন্যত্র চলে গেছেন এবং ৩ কোটি মানুষকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, কুমারের দুই সহকর্মী কমিশনার ভোটার তালিকা সংশোধন, নিবন্ধন পদ্ধতি ও ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে একাধিক উদ্বেগ তুলেছিলেন। এরপর থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট বিক্ষোভ চলছে। কমিশন বলছে, ভেতরের আলোচনায় ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক। কোনো দলের পক্ষ নেওয়ার অভিযোগও তারা অস্বীকার করেছে।

ককরোচ জনতা পার্টির পথচলা

সিজেপির যাত্রা শুরু হয়েছিল অনলাইনে ব্যঙ্গ-রসিকতার মাধ্যম হিসেবে। পরে দ্রুতই এটি একটি চাপসৃষ্টিকারী সংগঠনে রূপ নেয়। নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের বিরুদ্ধে তাদের রাস্তার আন্দোলনের পর শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। জুলাই মাসে সংগঠনটির বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশের আচরণ এবার অনেকটাই ভিন্ন ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।

নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে চলমান বিক্ষোভকে সিজেপি সামাজিক মাধ্যমে ‘সিজন ২’ বলছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থামবে না। প্রস্তাবিত সমাবেশের অনুমতি না দেওয়ার কারণ হিসেবে দিল্লি পুলিশ নির্ধারিত সময়সীমা ও আগের কর্মসূচির শর্তের কথা বলেছে। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, এসব বিধিনিষেধের উদ্দেশ্য ছিল তাঁদের কণ্ঠ রোধ করা।

লেখক : সাংবাদিক,কলামিষ্ট

Share this news as a Photo Card