সমাজ গঠনের একক পরিবার। ফলমূল সংগ্রহ আর পশু শিকারভিত্তিক আদিম গুহাবাসী মানুষজন পরিবার গঠন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল না থাকলেও সামাজিক বিবর্তনের মাধ্যমে কৃষি এবং শিল্পবিপ্লবের আবির্ভাবে গড়ে তোলে পরিবার এবং সমাজ। সমাজ গঠনের একক পরিবার হলেও পরিবার গঠনের অন্যতম মাধ্যমে হচ্ছে বিবাহ। পরিবার এমন একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান যেখানে প্রাপ্ত বয়স্ক একটি ছেলে এবং মেয়ের মধ্যে বিবাহ সম্পাদনের দ্বারা বৈধ উপায়ে জৈবিক সম্পর্কের মাধ্যমে সন্তান উৎপাদন ও লালন পালন করা হয়। হিন্দু আইনে বিবাহ শুধুমাত্র ধর্মীয় রীতি হলেও মুসলিম আইনে বিবাহ শুধু সামাজিক বা ধর্মীয় কোন রীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং মুসলিম আইনে বিবাহকে দেওয়ানী চুক্তি হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। যদিও বিবাহকে পূর্ণাঙ্গভাবে দেওয়ানী চুক্তি বলা যায় না আবার বিবাহ দেওয়ানী প্রকৃতির চুক্তিও। আব্দুল কাদির বনাম সলিমা মামলায় বিবাহকে পুরোপুরিভাবে দেওয়ানী প্রকৃতির চুক্তি বললেও খুরশিদ বিবি মামলায় বিচারপতি এস এ রহমান বিবাহকে সরাসরি দেওয়ানী চুক্তি না বলে দেওয়ানী প্রকৃতির চুক্তি বলেছে। বিবাহ সরাসরি দেওয়ানী চুক্তি না দেওয়ানী প্রকৃতির চুক্তি এই বিতর্ক ছাপিয়ে একটি বিষয় পরিস্কারভাবে প্রকাশ করে যে বিবাহ ধর্মীয় এবং নৈতিকভিত্তির পাশাপাশি পারস্পারিক সম্মতির ভিত্তিতে একটি চুক্তির বিষয়ও নির্দেশ করে। কেননা, বিবাহের মাধ্যমে স্বামী এবং স্ত্রীর মধ্যে কিছু দায়িত্ববোধ এবং দায়বদ্ধতাও সৃষ্টি হয়। আর স্বামী এবং স্ত্রীর মধ্যে দায়িত্ববোধ এবং দায়বদ্ধতার প্রশ্নের মাঝেই ঘটে বিপত্তি। মুসলিম শরীয়াহ আইন ও বাংলাদেশে বিদ্যমান বিবাহ বিচ্ছেদ আইনে বিবাহ বিচ্ছেদ বৈধ হলেও বিবাহ বিচ্ছেদকে পরোক্ষভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। আবু দাউদ শরীফের হাদিসে বলা হয়েছে আল্লাহর কাছে হালাল বিষয়গুলোর মধ্যে তালাকের চেয়ে অধিক ঘৃণিত আর কিছু নেই।”
বর্তমানে বাংলাদেশে বিবাহ বিচ্ছেদের হার নব্বইয়ের দশকের তুলনায় অনেক বেশি। বাংলাদেশের বিবাহ বিচ্ছেদের হার তুলনামূলকভাবে বেড়ে যাওয়ার পেছনের রয়েছে পরিবর্তিত সমাজ কাঠামো, সহনশীলতার অভাব, আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা, উন্নত জীবনযাপনের আড়ালে মানবিক সত্তাকে ভুলে যাওয়া, শহরের আধুনিক জীবন, আকাশসংস্কৃতির প্রভাবসহ আরো বেশকিছু কারণ। বাংলাদেশে গ্রামের তুলনায় শহরে বিবাহ বিচ্ছেদের পরিমাণ অনেক বেশি। ২০২৩ সালে ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৭ হাজার ৩০৬টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৬ হাজার ৩৯৯টি বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে। সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের জরীপে দেখা গিয়েছে ঢাকা শহরে গড়ে প্রতিদিন ৫০ টি করে বিবাহ বিচ্ছেদ হচ্ছে। বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিক্স’ অনুযায়ী ২০১১ সালে দেশে তালাকের স্থুলহার ছিল প্রতি হাজারে ০.৭ যা ২০২১ সালে বেড়ে হয়েছে প্রতি হাজারে ১.৪। ২০২৩ সালের সর্বশেষ বিবিএস তথ্য অনুযায়ী সারা বাংলাদেশে প্রতি দশ হাজারে গড়ে ১১ টি বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। আর সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী বেশিরভাগ বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে খুবই তুচ্ছ ঘটনার কারণে যা পারস্পারিক মধ্যস্থতার মাধ্যমে সহজেই সমাধান করা যায়। আর তা সমাধানের অন্যতম উপায় হচ্ছে বিবাহ বা নিকাহনামায় শর্তাবলি যুক্ত করা৷
বিবাহ বা নিকাহনামার শর্ত কী (Stipulations in Marriage)?
মুসলিম বিবাহ চুক্তি প্রকৃতির বিশেষ করে কাবিননামা বা নিকাহনামায় বেশ কিছু শর্ত তথা সম্মতির ভিত্তিতে একটি বিবাহের কাজ সম্পন্ন হয়৷
কাবিননামার ১৭ নং ঘর অনুযায়ী স্ত্রীকে যে শর্ত প্রদানের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সেটিই বিবাহনামার শর্ত বা Stipulations in Marriage।
বিবাহনামার প্রকৃতি ও প্রকার:
১। বিবাহের স্বাভাবিক অধিকার ও দায়িত্বকে শক্তিশালী করে এমন শর্তাবলি যেখানে বিদ্যমান কোন কিছুর পুনর্ব্যক্ত করা হয়। যেমন: মোহরানা আদায়ের সময় নির্ধারণ করে দেওয়া৷ অর্থাৎ বিবাহে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে মোহরানা দেওয়া একটি স্বাভাবিক এবং বিদ্যমান বিষয়। আর এই স্বাভাবিক এবং বিদ্যমান বিষয়কে শুধু সময়ে আবদ্ধ করাই হচ্ছে বিবাহে স্বাভাবিক অধিকার ও দায়িত্বে কোন কিছুর পুনর্ব্যক্ততা।
২।বিবাহের স্বাভাবিক অধিকার ও দায়িত্বকে পরিবর্তন করে এমন শর্তাবলি যেখানে নতুন কোন কিছু যুক্ত করা হয়। যেমন: বিবাহের পর স্ত্রী স্বামীর বাড়িতে থাকবে এটা বিদ্যমান স্বাভাবিক বিষয় কিন্তু যদি বলা হয় স্বামী স্ত্রীর বাসায় থাকবে এই মর্মে স্ত্রী যদি শর্ত জুড়ে দেয় তখন এটি বিবাহে স্বাভাবিক অধিকার ও দায়িত্বকে পরিবর্তন করে এমন শর্তাবলি হিসেবে বিবেচ্য হবে।
আইনী বৈধতার উপর ভিত্তি করে বিবাহনামায় শর্ত ৩ ভাগে বিভক্ত:
১। বৈধ বিবাহনামা শর্ত (Valid Stipulations in Marriage ): বিবাহের স্বাভাবিক অধিকার ও দায়িত্বকে শক্তিশালী করে এমন শর্তাবলি যেখানে বিদ্যমান কোন কিছুর পুনর্ব্যক্ত করা হয়। যেমন: মোহরানা আদায়ের সময় নির্ধারণ করে দেওয়া৷ অর্থাৎ বিবাহে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে মোহরানা দেওয়া একটি স্বাভাবিক এবং বিদ্যমান বিষয়। আর এই স্বাভাবিক এবং বিদ্যমান বিষয়কে শুধু সময়ে আবদ্ধ করাই হচ্ছে বিবাহে স্বাভাবিক অধিকার ও দায়িত্বে কোন কিছুর পুনর্ব্যক্ততা।
২। অবৈধ বিবাহনামা শর্ত (Void Stipulations in Marriage ): যেখানে আইন এই শর্তকে নিষিদ্ধ করেছে। যেমন: মোহরানা আদায় বিবাহে একটি বৈধ এবং বাধ্যতামূলক বিষয় কিন্তু বিবাহনামায় যদি এরূপ শর্ত দেওয়া হয় স্বামী স্ত্রীকে মোহরানা দিবে না সেটি অবৈধ বিবাহনামা শর্ত বলে বিবেচিত হবে।
৩। অকার্যকর বিবাহনামার শর্ত (Invalidating stipulations in Marriage ): অকার্যকর শর্ত এমন একটি শর্ত যা নিজেই বাতিল বা অকার্যকর, এবং সেই শর্তের কারণে সম্পূর্ণ চুক্তিটিও বাতিল হয়ে যায়।
যেমন : যদি কোনো বিবাহ এমন শর্তের ভিত্তিতে সম্পাদিত হয় যে সেই বিবাহের মেয়াদ ২ বা ৩ মাসের জন্য নির্ধারিত, তবে সেই শর্তটি অকার্যকর হবে এবং এর ফলে পুরো বিবাহটিই বাতিল বলে গণ্য হবে।
বিবাহনামার শর্ত সম্পর্কিত আধুনিক মুসলিম বিশ্বে চর্চা:
বিবাহনামার শর্ত বিষয়ে বাংলাদেশে বিদ্যমান আইন স্বতন্ত্র কোন আইন না থাকলেও বিবাহ রেজিষ্ট্রেশন বইয়ে(খাতা) বেশিকিছু শর্তাবলি যুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশে স্বতন্ত্র আইন না থাকলেও মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রে এ সংক্রান্ত আইন আছে এবং তার চর্চাও হচ্ছে। বিবাহনামার শর্ত সংক্রান্ত প্রথম বিধিবদ্ধ আইন তৈরি করা হয়েছে তুরস্কে ১৯১৭ সালে। অটোমান(উসমানীয়) পারিবারিক অধিকার আইনের ৩৮ ধারায় বলা হয়েছে একজন স্ত্রী তার স্বামীকে দ্বিতীয় বিবান না করার শর্ত দিতে পারে যদি তার স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করে তবে সে অথবা তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে তাৎক্ষণিক তালাক দিতে হবে। মরক্কো ফ্যামিলি কোড,২০০৪ (মওদায়ানা) এর অনুচ্ছেদ ৪০ এ বহুগামীতার বিষয়ে বিবাহনামায় শর্তের কথা বলা হয়েছে। বাহরাইনে স্ত্রী বিবাহের পরে বাইরে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে এরূপ শর্ত বিবাহনামায় স্ত্রী দিতে পারবে মর্মে আইন করা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতেও বিবাহের পরে স্ত্রী বাইরে স্বাধীনভাবে কাজ ও পড়াশোনা করতে পারবে এরূপ শর্ত বিবাহনামায় স্ত্রী দিতে পারবে মর্মে আইন করা হয়েছে। এছাড়াও আধুনিক মুসলিম বিশ্বে এবং মুসলিম আইনের জুরিসপ্রুডেন্সে বিবাহনামায় শর্ত খুবই স্বাভাবিকীকরণ করা হয়েছে।
কেন বাংলাদেশে বিবাহনামার শর্ত দরকার?
বাংলাদেশের বিদ্যমান সমাজ কাঠামোতে বিবাহে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার প্রতিফলন বেশি লক্ষ করা যায়। বিবাহ রেজিষ্ট্রেশন খাতায় বিয়েতে বেশিরভাগ শর্ত বা সম্মতি পুরুষের পক্ষে হয়, সহজ করে বলতে গেলে সম্মতিগুলো পুরুষের ইচ্ছামাফিক হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে কাবিন তথা নিকাহনামার ১৮ নং ঘরে পুরুষকে একক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে স্ত্রীর তালাকপ্রদানের ক্ষমতা দানের বিষয়ে সহজ ভাষায় বললে স্বামী যদি কাবিননামার ১৮ নং ঘরে স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা দেয় তবেই স্ত্রী স্বামীকে তালাক দিতে পারে (বিবাহ বিচ্ছেদ আইন ১৯৩৯, ধারা ২ এর ব্যতিক্রম)। কিন্তু মেয়েদের বিবাহনামার শর্ত বিষয়ে প্রচলিত সমাজব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী আচরণ করে। বিবাহনামার শর্ত সংক্রান্ত কোন স্বতন্ত্র বাংলাদেশে বিদ্যমান না থাকলেও কাবিননামায় শর্ত জুড়ে দেওয়ার বেশ কিছু সুযোগ আছে। স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই সেই শর্ত জুড়ে দেওয়ার অধিকার দেওয়া হলেও বাস্তবিক অর্থে শুধু স্বামীই অধিকার প্রয়োগ করে। কাবিননামার ১৭ নং ঘরে বিশেষ কোন শর্তাদি থাকিলে মর্মে একটি বিষয় থাকলেও আমাদের দেশের কাজিরা সেটি স্পষ্ট করে পক্ষদ্বয়কে বুঝাতে অবজ্ঞা করে, এমনকি পক্ষদ্বয়ও না জানা বা প্রচলিত ধ্যান ধারণার ব্যতয় না ঘটানোর জন্য এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলে না৷ অথচ একটি সম্পর্ক তৈরি হওয়ার আগে যদি কিছু প্রাথমিক বিষয় আগে থেকেই সমাধান করে নেওয়া যায় তাহলে ভবিষ্যতের সম্পর্কের মাঝে কোন অনিশ্চয়তা থাকবে না। বাংলাদেশে বিবাহ বিচ্ছেদের পরিসংখ্যান দিতে গিয়ে লেখার শুরুতেই উল্লেখ করেছি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। আর এই তুচ্ছ ঘটনা রোধ করে সম্পর্ককে স্থায়ী করার সম্ভাব্য অবলম্বন হতে পারে বিবাহনামার শর্ত।
বিবাহনামার শর্তে যেসব বিষয় যুক্ত করলে বাংলাদেশের বাস্তবিক প্রেক্ষাপটে বিবাহ বিচ্ছেদ রোধ করা সম্ভব:
১। মোহরানার পরিমাণ ও আদায় বিষয়ে কাবিননামায় স্পষ্টকরণ।
২। পারস্পারিক সম্মতির উপর ভিত্তি করে বসবাসের স্থান নির্ধারণ।
৩। পারস্পরিক সম্মতিতে বিবাহের পর স্ত্রীর স্বাধীনভাবে কাজ ও পড়াশোনা বিষয়ে কাবিননামায় শর্তারোপ।
৪। পারস্পারিক সম্মতির ভিত্তিতে সম্পদের দেখভাল, অধিকার ও রক্ষণ বিষয়ে কাবিননামায় স্পষ্টকরণ।
৫। পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ বিষয়ে কাবিননামায় শর্তারোপ।
৬। পারস্পারিক সম্মতির উপর ভিত্তি করে তালাক প্রদানের ক্ষমতা উন্মুক্তকরণ।
বিচ্ছেদ শুধু দুটি প্রাণের হয় না বিচ্ছেদ হয় অনেকগুলো আত্মার। বাংলাদেশে যেভাবে বিবাহ বিচ্ছেদ বাড়ছে তাতে এক সময় পারিবারিক কাঠামো ধ্বংসের মুখে পতিত হবে৷ বিবাহনামার শর্ত প্রচলিত ধ্যান ধারণার বাইরে হলেও বিশেষত স্ত্রীর শর্তারোপের অধিকার সংক্রান্ত বিষয়টি আমাদের বিদ্যমান সমাজ কাঠামোর ব্যতিক্রম মনে হলেও বিবাহনামার শর্ত দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে যা পারিবারিক বন্ধনকে আরো দৃঢ় করবে। পরিশেষে একটি কথা দাগ থেকে যদি দারুণ কিছু হয় তাহলে দাগই ভালো। প্রচলিত ধ্যান ধারণার বাইরে গিয়ে যদি ভবিষ্যতে শুভ কিছু হয় তবে আমরা না হয় একটু দাগের অংশীদার হই।
লেখক : আইন বিভাগ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস্।
এম. তাওহিদ হোসেন 


























