মানবাধিকার হলো মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং সমতার মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশে, অন্যান্য অনেক দেশের মতো, এই অধিকারগুলোর স্বীকৃতি, সুরক্ষা এবং প্রচার একটি দীর্ঘকালীন সংগ্রাম ছিল। কিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও, সব নাগরিকের জন্য পূর্ণ মানবাধিকার নিশ্চিত করার পথ এখনও চ্যালেঞ্জপূর্ণ, যেখানে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা এবং অধিকার লঙ্ঘন অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশের মানবাধিকার ইতিহাস
বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। এই ঐতিহাসিক সংগ্রাম দেশের জাতীয় পরিচয় গঠনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, এবং একটি গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা উত্থিত হয়। তবে, এর সম্ভাবনার পরও, দেশটি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, কর্তৃত্ববাদী শাসন, দারিদ্র্য এবং সামাজিক অসমতার মুখোমুখি হয়, যা মানবাধিকার রক্ষার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
স্বাধীনতার পরবর্তী দশকগুলোতে, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং বিশ্বের বিভিন্ন মানবাধিকার চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, যার মধ্যে ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটস (টউঐজ) অন্তর্ভুক্ত। তবে, এই প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও, দেশের বিভিন্ন অংশে মানবাধিকার লঙ্ঘন অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশে মানবাধিকার সম্পর্কিত প্রধান ইস্যু
বাংলাদেশে মুক্ত বক্তব্য ও সাংবাদিকতার অধিকার একটি গুরুতর সমস্যা। সাংবাদিক, ব্লগার এবং অধিকারকর্মীরা যারা সরকারের সমালোচনা করেন বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেন, তারা প্রায়ই হয় হয়রানির শিকার হন, গ্রেপ্তার হন অথবা হুমকির মুখে পড়েন। ২০১৮ সালে প্রবর্তিত ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট বিশেষভাবে বিতর্কিত, কারণ এটি সমালোচনা ও প্রতিবাদের বাক স্বাধীনতা হরণে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অনেকের দাবি। এই আইনের আওতায় অনেক গণমাধ্যম এবং সাংবাদিক নিজেদের মত প্রকাশে সংযত থাকেন, যা সাংবাদিকতার স্বাধীনতার জন্য একটি বড় হুমকি।
বাংলাদেশে শিশুদের শিক্ষা ও শ্রমের অধিকার উন্নতির দিকে গেলেও, এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ইউনিসেফের মতে, ৫ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রায় ৩.৩ মিলিয়ন শিশু শ্রমের সাথে যুক্ত, অনেকেই বিপজ্জনক কাজের মধ্যে জড়িত। শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে এখনও বেশ কিছু সমস্যা বিদ্যমান, যেমন অধিক ছাত্রসংখ্যা, শিক্ষকের অভাব এবং উপকরণের ঘাটতি, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকাগুলিতে।
অগ্রগতি এবং ইতিবাচক পরিবর্তন
যদিও বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এখনো বেশ চ্যালেঞ্জিং, তবে কিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। দেশের দারিদ্র্য হ্রাস, স্বাস্থ্য খাতের উন্নতি এবং শিশু পুষ্টির ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী একটি নেতৃত্বের ভূমিকায় রয়েছে, যেখানে নারীরা রাজনীতি, ব্যবসা এবং সিভিল সোসাইটিতে আরও বেশি অংশগ্রহণ করছে।
সিভিল সোসাইটি এবং আন্তর্জাতিক চাপ
বাংলাদেশে সিভিল সোসাইটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এবং অধিকারকর্মীরা নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছেন মানবাধিকার সুরক্ষিত রাখতে। আন্তর্জাতিক সমাজ, বিশেষ করে জাতিসংঘ এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলি, বাংলাদেশ সরকারকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আন্তর্জাতিক চাপের ফলস্বরূপ কিছু ক্ষেত্রে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
বাংলাদেশে মানবাধিকার ক্ষেত্রেও কিছু অগ্রগতি হলেও, এখনও অনেক কাজ বাকি। দেশের সব নাগরিকের জন্য পূর্ণ মানবাধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের, সিভিল সোসাইটি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। বৈষম্য, সহিংসতা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার বাধাগুলি কাটিয়ে উঠতে হলে বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য একটি ন্যায় ও সমতার ভিত্তিতে সমাজ গঠন করতে হবে।
লেখিকা : নারী ও শিশু বিষয়ক সম্পাদক, চট্টগ্রাম মহানগর, মানবাধিকার তথ্য পর্যবেক্ষণ সোসাইটি।