নদীমাতৃক এই জলাভূমির খালবিল হাওড়ের দেশে দূর্গম জনপদে আমরা বাঙ্গালী’রা অতি সাধারণ কাঙ্গালি জীবনযাপন করতাম। হালচাষ গৃহস্থালি সাদামাটা জীবন ছিল আমাদের! শতকরা পঁচানব্বই জন মানুষের ছিল কৃষিভিত্তিক জীবনাচার! শিক্ষাব্যবস্থা নেই বললেই বলা যেত! আমার দাদাদের কালেও গ্রামে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না,এমনকি প্রাইমারী স্কুলটি পর্যন্ত দাদা চেরাগ আলী মাষ্টার করে ছিলেন একটা ছনের ঘরে। সেই স্কুলের প্রথম ছাত্র ছিল আমার বাবা ও তাঁর সমবয়সী পনেরোজন ছাত্র। অথচ, সেই গ্রামে আজ ছয়টি মসজিদ আছে,মাদ্রাসা,বহুতল ভবনের একটা প্রাইমারী স্কুল, সনামধন্য হাইস্কুল, বাজার, পাকা রাস্তাঘাট, পাকা ঈদগাঁ, কবরস্থান সবমিলিয়ে আমাদের গ্রামটি এখন একটি আদর্শ গ্রাম গড়ে উঠেছে। এখন আর ঐ গ্রাম’কে গ্রাম বলা যাবে না। সেমি উপশহর, হাতের কাছে সবকিছু সহজেই পাওয়া যায়, দৈনিক পত্রিকা থেকে শুরু করে ডিস ইন্টারনেট সকল নাগরিক সুযোগ সুবিধা গুলো বর্তমানে গ্রামে বসে এনজয় করা যায়।
যাহোক,যেকথা বলছিলাম মাত্র আশি থেকে পঁচাশি বছর আগে এই বাংলার নব্বুই ভাগ জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষাদীক্ষা সামাজি জীবনযাত্রার মান সবকিছুতেই একটা আদিমতম দূর্গম বসতি ছিল। যেখানে কেউ স্থায়ীভাবে শাসন ও শাসক গোষ্ঠী গড়ে তুলেন নি। আমাদের এই বঙ্গদেশের ভিটামাটি পশুপাখি গাছপালা ফলফলাদি ভরপুর সোনার বাংলার পললভূমির রূপসৌন্দর্য্যকে উপভোগ করতে’ই দেশি-বিদেশি উপনিবেশিক প্রভুদের দ্বারা শাসিত হতো। ওরা আমাদের জনগণের উপর একধরণের লাঠিয়াল বাহিনী ও জমিদার পরিবারের সৃষ্টি করতেন এবং তাদের অত্যাচার জুলুম নির্যাতন শোষণ নিপীড়ন লুটপাট দাদন পত্তনি সুদের ব্যাবসার প্রচলন ও প্রসার ঘটিয়ে এই সোনার বাংলার মানুষকে দমিয়ে রাখতেন। নিরীহ কৃষক কৃষাণীর সাধারণ জীবনযাপন ছিল প্রভুভক্তি তোষামোদি ও চাটুকারীতে ভরপুর! সমাজব্যবস্থা সৃষ্টি হয়ে ছিল একধরনের নতজানু শরীর আর মননে ও শক্তিমত্তায় নির্জীব অসহায়ত্ব দূর্বলভাবে! বাঙালী জনগোষ্ঠী বিশ্বের ক্রমবর্ধমান এগিয়ে যাওয়া সভ্যতার সাথে প্রতিযোগিতায় হাজার বছরের পিছিয়ে পড়া এক অবহিত জনপদ!
ফলে এই দেশের মানুষের মাঝে সুনিয়ন্ত্রিত নেতৃত্ব গড়ে উঠে নাই। একটি সুশৃঙ্খল রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তুলতে জনগণের আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি হলেও সঙ্ঘবদ্ধ শক্তিশালী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন আন্দোলন লড়াই সংগ্রাম ও সামষ্টিক ঐক্য গড়ে উঠে নাই। বিচ্ছিন্ন ভাবে বারবার প্রবল দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বহু দুঃসাহসিক লড়াই সংগ্রাম করে কেউ কেউ সাময়িক ভাবে বঙ্গভূমির স্বাধীনতা, নিজেদের শাসন ব্যবস্থা চালু করলেও তারা স্থায়ী ভাবে সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখতে পারেন নাই। বারবার এই বঙ্গ রাষ্ট্রের স্বাধীনতা বিদেশী অপশক্তির দ্বারা হরণ হয়েছে। এইভাবে আর্য মৌর্য সিংহলী সেন পাল খিলজি তুঘলক সুলতান মোগল পাঠান মারাঠি গুজরাটি তুর্কী ফিরিঙ্গী ইংরেজ সর্বশেষ পাকিস্তানের হাত থেকে স্থায়ী ভাবে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করেন। আমাদের বাঙালীর মুক্তির ও স্বাধীনতার জন্যে বহু নেতা-নেত্রী নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। কিন্তু,কেউ বঙ্গভূমি পরিপূর্ণ স্বাধীন করতে পারেননি। সর্বশেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চৌকস সেনানায়কত্ব ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে রাজনৈতিক দুরদর্শিতার কঠিন লড়াই সংগ্রাম এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙ্গালী একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র পেয়েছেন। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চের এই দিনে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে জাতির সর্বস্তরের জনগণ বর্বর পাক-হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তি যুদ্ধে যার যা আছে তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করেছেন। একটি বিশ্বখ্যাতি সম্পন্ন উঁচু মানের সু-প্রশিক্ষিত সশস্ত্র বাহিনীর সাথে নিরস্ত্র বাঙ্গালী দীর্ঘ নয় মাস ভারতের সাহায্যে নামমাত্র ট্রেনিং নিয়ে সাধারণ অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়ে গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে যুদ্ধে জয়লাভ করেন। বিশ্বের দরবারে বাঙ্গালী বীরের জাতি হিসেবে পরিচয় নিয়ে স্বাধীনতার সুফল ভোগ করে গৌরবোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। পাকিস্তান থেকে আমরা চিরতরে স্বাধীন হলাম। শোষণ পীড়ন ও জাতিগত বৈষম্যের হাত থেকে বাঙালী মুক্তি পেলো।
বলাবাহুল্য যে, আমাদের স্বাধীনতার জন্যে আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী একই ভাষাভাষী বন্ধু রাষ্ট্র ভারত আমাদের কে আশ্রয় প্রশ্রয় অন্নবস্ত্র চিকিৎসা অস্র সৈন্যবল সবকিছু দিয়ে সাহায্য করেছেন। ভারত আমাদের চিরদিনের বন্ধু,কখনো শত্রু হয়ে থাকতে চাই না। ভারতের জনগণ আমাদের স্বাধীনতা নিয়ে গর্ব করেন এবং দিনটি’কে আনন্দ ও গর্বের সাথে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে উদযাপন করেন। কারণ, আমাদের স্বাধীনতার মুক্তিযুদ্ধে ভারতের হাজার- হাজার সৈন্য শহীদ হয়েছেন। আজকের এই স্বাধীনতা
দিবস ১৯৭১ সাল থেকে সশস্ত্রবাহিনীর সামরিক বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ ও সামরিক সরঞ্জাম প্রদর্শনী মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ভাবে পালন করি, দেশবিদেশের বিশিষ্ট গুণিজন রাষ্ট্রীয় মেহমান হিসেবে আপ্যায়ন করি, জেলখানা থেকে দুস্ত সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে উন্নত খাবার পরিবেশন করে থাকি। স্বাধীনতা পুরস্কার ও পদক প্রদান করে সম্মানীয় ও দেশের বরেণ্য খ্যাতিমান মানুষকে পুরস্কৃত করি। দিনটিতে রাষ্ট্রের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সর্বসাধারণের জন্যে আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি করে স্বরণীয় করে তুলি। শহীদ ও বীরাঙ্গনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি এবং দিনের শুরুতে দোয়া প্রার্থনা করি।
কিন্তু, আজ আমাদের কি দূর্ভাগা! স্বাধীনতার চুয়ান্ন বছরের পরে-ও জাতির এক কলঙ্কময় অধ্যায় শুরু হলো! দ্বিজাতিতত্ত্বের বৈষম্যের মতো কেমন যেন আমাদের দেশের মানুষের মাঝে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ছে! কেন যেন আমরা জাতীয় দিবসটি সার্বজনিন ভাবে আনন্দঘন পরিবেশে সকলে স্বতঃস্ফূর্ত মিলেমিশে উদযাপন করতে পারলাম না! বিশ্বের দরবারে জাতি হিসেবে আমরা অনেক হেয় হীনমন্যতার পরিচয় বহন করে চলেছি। আমি একজন দেশের সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে স্বাধীনতার বেহাল দশা দেখে মনের মাঝে ভীষণ কষ্ট পেলাম।