বাংলা সংগীতের এক অবিস্মরণীয় নাম সাবিনা ইয়াসমিন। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি নিজের কণ্ঠের জাদুতে মুগ্ধ করে চলেছেন কোটি শ্রোতাকে। আজ ৪ সেপ্টেম্বর, এই কিংবদন্তি শিল্পীর জন্মদিন। ১৯৫৪ সালের এই দিনে সাতক্ষীরা জেলায় জন্ম নেন তিনি। জন্মের সময় তাঁর নাম রাখা হয়েছিল দিলশাদ ইয়াসমিন। পরবর্তীতে এক কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনার মধ্য দিয়ে তাঁর নাম বদলে হয় সাবিনা।
এই নাম বদলের পেছনের গল্পটি বেশ চমকপ্রদ। ষাটের দশকের প্রথমার্ধে, সম্ভবত ১৯৬২ বা ১৯৬৪ সালের কোনো এক সময়ে, উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী তালাত মাহমুদ ঢাকা সফরে আসেন। তিনি তাঁর জনপ্রিয় গান পরিবেশন করেছিলেন সে সময়ের একটি অনুষ্ঠানে। ঘটনাক্রমে সেই একই অনুষ্ঠানে গান গেয়েছিলেন সাবিনা ইয়াসমিনের বড় বোন ফরিদা ইয়াসমিন। অনুষ্ঠান চলাকালে গল্পগুজবের এক ফাঁকে তিনি জানতে পারেন, তালাত মাহমুদের কন্যার নাম সাবিনা তালাত।
নামটি ফরিদা ইয়াসমিনের এতটাই মনে ধরে যে বাড়ি ফিরে তিনি মায়ের কাছে অনুরোধ জানান, তাঁর ছোট বোনের নাম যেন বদলে সাবিনা রাখা হয়। শুরুতে মা রাজি না হলেও মেয়ের বারবার অনুরোধে শেষ পর্যন্ত রাজি হন। এভাবেই দিলশাদের পরিবর্তে নাম হয় সাবিনা। পরিবারের রীতি অনুযায়ী বোনদের সকলের নামের শেষে যুক্ত থাকে ইয়াসমিন, তাই তাঁর নামও দাঁড়ায় সাবিনা ইয়াসমিন।
শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল সাবিনা ইয়াসমিনের। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি মঞ্চে গান পরিবেশন শুরু করেন। সংগীতের প্রতি এই ভালোবাসা থেকেই তিনি দীর্ঘ ১৩ বছর তালিম নেন ওস্তাদ পি সি গোমেজের কাছে। এই দীর্ঘ সাধনার মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে তাঁর স্বতন্ত্র কণ্ঠশৈলী, যা পরবর্তীতে তাঁকে নিয়ে যায় খ্যাতির শিখরে।
শিশুশিল্পী হিসেবে ‘নতুন সুর’ চলচ্চিত্রে প্রথম প্লেব্যাক করেন তিনি। এরপর ১৯৬৭ সালে ‘আগুন নিয়ে খেলা’ ও ‘মধুর জোছনা দীপালি’ গানের মধ্য দিয়ে পূর্ণাঙ্গ প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। এরপর থেকেই একে একে উপহার দিতে থাকেন অসংখ্য কালজয়ী গান, যা আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে।
তাঁর কণ্ঠে জনপ্রিয়তা পেয়েছে দেশাত্মবোধক থেকে শুরু করে রোমান্টিক, আধুনিক নানা ধারার গান। ‘সব ক’টা জানালা খুলে দাও না’ গানটি আজও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতীক হয়ে আছে। এছাড়া ‘মাঝি নাও ছাড়িয়া দে’, ‘সুন্দর সুবর্ণ’সহ অসংখ্য গান তাঁকে এনে দিয়েছে অমরত্বের স্বীকৃতি।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে অসাধারণ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন সাবিনা ইয়াসমিন। শ্রেষ্ঠ নারী প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছেন মোট ১৩ বার, যা আজও একটি অক্ষুণ্ণ রেকর্ড। শুধু চলচ্চিত্রের জন্যই তিনি গেয়েছেন দেড় হাজারেরও বেশি গান। সব মিলিয়ে তাঁর সামগ্রিক সংগীত জীবনে রেকর্ড করা গানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ হাজারেরও বেশি, যা এক বিরল কীর্তি।
নিজের অনন্য কণ্ঠমাধুর্য ও গায়কী দিয়ে বাংলা গানের জগতে এক স্বতন্ত্র আসন তৈরি করে নিয়েছেন সাবিনা ইয়াসমিন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর গান শুনে বেড়ে উঠেছে, খুঁজে পেয়েছে আনন্দ-বেদনার সঙ্গী। জন্মদিনের এই বিশেষ দিনে বাংলা সংগীতের এই কিংবদন্তি শিল্পীর প্রতি রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।
শিরোনাম :
ভারতের বিখ্যাত শিল্পীর জন্য নাম বদলে গিয়েছিল সাবিনা ইয়াসমিনের
-
চলমান বার্তা ডেস্ক : - আপডেট সময় ০২:৪৩:১৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- 9
জনপ্রিয় সংবাদ

























