জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জাতীয় সংসদে ফ্যাসিবাদের কালো ছায়া ফিরে এসেছে। জুলাইয়ের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বর্তমান সরকার পার পাবে না।
আজ সোমবার (১৩ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনে ‘গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার : সংকটের মুখোমুখি দেশ’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন দাবিতে সপ্তাহব্যাপী ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১১ দলীয় ঐক্য এই সেমিনারের আয়োজন করে।
সংসদের বর্তমান অবস্থাকে ‘জুলাই প্রোডাক্ট’ হিসেবে অভিহিত করে জামায়াত আমির বলেন, আমি সংসদেও বলেছি- জুলাই নাই আমরাও নাই। জুলাই আছে আমরা আছি, জুলাই আছে সরকার আছে, জুলাই আছে বিরোধী দল আছে, জুলাই নাই কিছুই নাই। এই জুলাইয়ের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে সরকার পার পাবে না, ইনশাল্লাহ। গণভোটের গণরায়ের মাধ্যমে এই জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ইনশাল্লাহ বাস্তবায়ন হবে। এর জন্য আবার জীবন দিতে হলে দেব।
জামায়াতের আমির বলেন, দেশে আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে, এই সেমিনার আন্দোলনেরই একটি অংশ। এই আন্দোলনকে তিলে তিলে সফলতার দিকে নিয়ে যেতে হবে। সফল হওয়ার আগে এই আন্দোলন থামবে না। আমিও কথা দিচ্ছি-আগামীর আন্দোলনে আমাকে সামনে পাবেন ইনশাল্লাহ। তিনি আরও বলেন, যতদিন জাতির অধিকারের পক্ষে লড়াই করা প্রয়োজন, ততদিন তারা সংসদে থাকবেন, তার বাইরে এক সেকেন্ডও নয়।
জামায়াত আমির বলেন, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্তের পেছনে অদৃশ্য শক্তি কাজ করছে। আমাদের দেশে, বিশেষ করে পার্লামেন্টে যাদের নাড়া দেখেন, প্রশ্ন আসে কে দড়ি টানে? সেই দড়িটা কোথা থেকে টান দেওয়া হয়? জাতি বুঝে।
ডা. শফিকুর রহমান সরকারের দ্বৈত নীতির সমালোচনা করে বলেন, একসময় গণভোট হারাম, আরেক সময় না এটা অর্ধেক হালাল। একসময় একই অর্ডারের গোস্ত হালাল, কিন্তু শুরুটা জুলটা তার হারাম। আমরা এটা পার্লামেন্টে বলেছি, আমাদের কণ্ঠ দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, আমরাও সমানতালে চালিয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ- সুযোগ পাই না পাই আমরা কণ্ঠ বন্ধ করিনি, কারণ জনগণ আমাদেরকে তো তাদের অধিকারের পক্ষে কথা বলতে সেখানে পাঠিয়েছে। মুখ বন্ধ করে বসে থাকার জন্য পাঠায়নি।
সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে তার ভূমিকা প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, আমরা সংসদে যাওয়ার আগেই বলেছি, এই সংসদের বিভিন্ন ধরনের সুবিধা নেওয়ার জন্য আমরা এখানে যাচ্ছি না। অনেক সুবিধা আছে, স্বেচ্ছায় ছেড়ে দেব, নিবই না, যেটা না নিয়ে পারবো না সেইটা নেব। অবৈধ কোনো দিকে আমাদের চোখ ও হাত যাবে না। আমরা এখনো এই নীতিতে অটল আছি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান কেবল শিক্ষিত ছাত্র বা রাজনীতিবিদদের আন্দোলন নয়। এই আন্দোলনের শহীদদের ৬২ শতাংশই শ্রমিক। তিনি বলেন, তারা কি কৌটার বৈষম্যের বিরুদ্ধে নেমেছিল? কৌটার বৈষম্যের বিরুদ্ধে নেমেছিল আমাদের যুবসমাজ, ছাত্র সমাজ। তারা নেমেছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। তারা নেমেছিল একটা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে।
জামায়াত আমির বলেন, আন্দোলন শুরু করতে হবে এটা কি? এটাও আন্দোলনের অংশ। যেদিন আমরা নোটিশ মুভ করেছিলাম যে, সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান করতে হবে, আলোচনার পর যখন তাদের মেজরিটির গায়ের জোরে এটাকে নাকচ করে দেওয়া হলো, আমরা সেদিন সংসদ থেকে বের হয়ে এসেছিলাম। এসে বলেছিলাম, জনগণের রায় নিয়ে রায় বাস্তবায়নের জন্য এখানে এসেছিলাম। অন্যায়ভাবে এই রায়কে পদদলিত করা হয়েছে। এখন জনগণের রায় নিয়ে আবার জনগণের পার্লামেন্টে আমরা চলে যাচ্ছি।
জামায়াত আমির স্পষ্ট করে বলেন, এই আন্দোলন কোনো সুবিধাবাদী আন্দোলন নয়, ক্ষমতার হালুয়া রুটির ভাগ বাটোয়ারা নয়। এই আন্দোলন ৭০ ভাগ মানুষের রায়ের প্রতি সম্মান দেখিয়ে, শহীদদের রক্তের সঙ্গে তাদের ওয়াদা বাস্তবায়ন করার জন্য ও জুলাই যোদ্ধাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করার জন্য। তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান, আপনারা শুধু পাশে থাকবেন। এই আন্দোলন আমার জন্য, আপনাদের জন্য, সবার জন্য। আমরা আমাদের সন্তানদেরকে কারো গোলাম বানাতে চাই না, কারো পারিবারিক রাজতন্ত্র বাংলাদেশে চলবে জাতির ওপর ফ্যাসিজম হিসেবে তা আমরা বরদাস্ত করব না।
ডা. শফিকুর রহমান রাজনীতির এই দুষ্টচক্র ভেঙে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সংসদের এক-তৃতীয়াংশ সময় একজনের বদলে আরেকজনের প্রশংসায় ব্যয় হোক, এটা তারা আর দেখতে বা শুনতে চান না। তিনি বলেন, প্রশংসা হবে জনগণের, সংসদের ভিতরে কথা হবে জনগণের সমস্যা নিয়ে, সেখানে বসে খোলামেলা সমাধান বের হয়ে আসতে হবে। এইটাকে বাদ দিয়ে সংসদের ভিতরে অন্য কোনো কিছুর চর্চা হোক-আমরা এটা চাই না।
জামায়াত আমির সরকারের সমালোচনা করে বলেন, আমরা ফ্যাসিবাদের কালো ছায়া এখন সংসদে দেখতে পাচ্ছি। ওই সংসদে দাঁড়িয়ে আজকে যারা সরকারি দলের গ্যালারিতে বসেছেন, তাদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে যেভাবে কথা বলা হতো, আজকে দুই একজন আমাদেরকে লক্ষ্য করে সেই রকম কথা বলা শুরু করেছেন। আমরা তাদেরকে বলি, জিহ্বা সংযত করুন। এই মনোভাব এবং আচরণ দেখাবেন না। জুলাই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যেই প্রজন্ম, যেই দেশ গড়ে উঠেছে, এই দেশ কারো চোখ রাঙ্গানির পরোয়া করে না। অতীতে যারা এরকম আচরণ করেছে তাদের পরিণতি চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছেন। মনে রাখবেন, অপকর্ম করলে আগের চেয়ে পরিণতি আরও ভয়ানক হবে। সে পথেইতো হাঁটছেন। বাইরেতো পদচারণা দেখছি না। সবকিছু কুক্ষিগত করছেন।
ব্যাংক দখল প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকে অভ্যুত্থানের পর এখন সবচেয়ে বড় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকে নতুন করে অভ্যুত্থান শুরু হয়েছে। যে ব্যাংক দেশের রেমিট্যান্সের ৩২ ভাগ একাই আহরণ করে, এই ব্যাংকের অস্তিত্ব বিপন্ন হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি বঙ্গোপসাগরে চলে যাবে। এটাকে দলীয়করণ করবেন না। যদি একটার পর একটা ব্যাংক দলীয়করণ করেন, জনগণ আপনাদের ছেড়ে কথা বলবে না। ব্যাংকের মূল মালিক জনগণকে জেগে উঠে, আওয়াজ তুলে তাদের চেহারা উন্মোচন ও থামিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, শুধু রাজনৈতিক পটপবিরর্তনের জন্য জন্য সবখানে সংস্কৃতির আমুল পরিবর্তনের জন্য আমাদের এ লড়াই। অপসংস্কৃতি যে সেক্টরেই হোক, আমরা বসে বসে আঙুল চুষব না। জনগণের সঙ্গে থাকবো, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তা মোকাবিলা করবো, ইনশাল্লাহ।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন- সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এমপি, এলডিপির চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, মানারাত ইউনিভার্সিটির ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. আব্দুর রবসহ ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতা ও নাগরিক সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অ্যাডভোকেট শিশির মনির।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















