লন্ডনের বিশ্বখ্যাত রয়্যাল অ্যালবার্ট হলের মঞ্চ। দর্শকসারিতে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ। যুক্তরাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে উঠে আসা কিশোর-তরুণ সংগীতশিল্পীরা একে একে নিজেদের সুর মেলে ধরছেন। কেউ জ্যাজ, কেউ পপ, কেউ গ্রাইম, আবার কেউ বেছে নিয়েছেন ধ্রুপদি সংগীত। সেই সন্ধ্যায় পিয়ানোর সামনে বসেন ১৬ বছর বয়সী ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কিশোর নাভহান উজায়ের রঈস চৌধুরী। নিজের রচিত সুরে বিচারকদের মুগ্ধ করে সে জিতে নেয় রয়্যাল অ্যালবার্ট হলের ‘ফিউচার মেকার্স ২০২৬’ সংগীত প্রতিযোগিতার চ্যাম্পিয়নের সম্মাননা।
গতকাল বুধবার ঐতিহাসিক এই মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় কিশোর-তরুণ সংগীতশিল্পীদের জাতীয় প্রতিযোগিতা ‘ফিউচার মেকার্স’-এর চূড়ান্ত পর্ব। এবার আবেদন জমা পড়ে হাজারো। প্রাথমিক বাছাই ও সরাসরি অডিশনের ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্ত পর্বে পৌঁছান ৯ প্রতিযোগী। অংশগ্রহণকারীদের বয়স ১৪ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে। অভিজ্ঞ বিচারকদের মূল্যায়নে চ্যাম্পিয়ন হয় নাভহান। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকেরাও উপস্থিত ছিলেন।
যুদ্ধের বিপরীতে ভালোবাসার গল্প
প্রতিযোগিতায় নাভহান বাজায় নিজের রচিত পিয়ানো কম্পোজিশন ‘লা দ্যুল্যর এক্সকিজ’। ফরাসি এই শব্দগুচ্ছের অর্থ তীব্র বেদনা। এফ-শার্প মাইনর স্কেলে রচিত সুরটির বিষয় যুদ্ধ ও ভালোবাসা।
যুদ্ধের দুই বিপরীত পক্ষের এক প্রেমিক-প্রেমিকার গল্প সে বলেছে সুরের ভাষায়। পিয়ানোর ডান ও বাঁ হাতের ভিন্নধর্মী সুরে ফুটিয়ে তুলেছে দুই পক্ষের সংঘাত, ভালোবাসা, বেদনা ও আবেগ। তার সংগীতের মূল বার্তা, ঘৃণা, সংঘাত ও ঈর্ষার বিপরীতে ভালোবাসার জয়।
ধ্রুপদি সংগীতের রোমান্টিক যুগের প্রতি নাভহানের বিশেষ টান। ফ্রেদেরিক শোপাঁ, সের্গেই রাখমানিনভ ও ফ্রানৎস লিস্ট তার সংগীতচর্চার অনুপ্রেরণা। তবে আগ্রহ কেবল ধ্রুপদিতে আটকে নেই। জ্যাজ, পপ, রকসহ নানা ঘরানার সংগীত তার ভালো লাগে। ভাষা বা ধরন যা-ই হোক, সব সুরই তার কাছে উপভোগ্য।
একটি বিজ্ঞাপন থেকে শুরু
এই অর্জনের শুরুটা ইনস্টাগ্রামে। সেখানে ‘ফিউচার মেকার্স’ প্রতিযোগিতার একটি বিজ্ঞাপন নাভহানের চোখে পড়ে। নিজের প্রতিভা যাচাইয়ের সুযোগ ভেবে সে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
নিয়ম অনুযায়ী আবেদনকারীকে জমা দিতে হয় নিজের রচিত মৌলিক সংগীত। সেটি কণ্ঠসংগীত, যন্ত্রসংগীত বা দুটির সমন্বয়ে হতে পারে। নাভহান জমা দেয় নিজের পিয়ানো কম্পোজিশন।
নাভহানের মা রুবেনা চৌধুরী জানান, হাজারো আবেদনের মধ্য থেকে প্রাথমিক বাছাইয়ে টিকে গত মে মাসে অডিশনের জন্য নির্বাচিত হয় তাঁর ছেলে। জুনে অনুষ্ঠিত সরাসরি অডিশনে অংশ নেন ২৫ জন, সেখানেও জায়গা করে নেয় নাভহান। সেই ধাপ পেরিয়ে ৯ জনের একজন হয়ে সে পৌঁছায় চূড়ান্ত পর্বে।
চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় আগামী এক বছর সংগীতশিল্পের পেশাদারদের কাছ থেকে বিশেষ সহায়তা পাবে সে। এর মধ্যে আছে সংগীত প্রযোজনা, রেকর্ডিং, প্রচারণা ও পেশাগত সংগীতজীবন গড়ার নানা সুযোগ। ইতিমধ্যে অভিজ্ঞদের কাছ থেকে পরামর্শ ও প্রশিক্ষণও পেয়েছে সে।
সংগীতবৃত্তি নিয়ে হ্যারো স্কুলে
নাভহানের জন্ম ২০০৯ সালে, যুক্তরাজ্যে। এখন সে ঐতিহ্যবাহী আবাসিক প্রতিষ্ঠান হ্যারো স্কুলের শিক্ষার্থী। ১৩ বছর বয়সীদের ভর্তিপ্রক্রিয়ায় সংগীতবৃত্তি পেয়ে সেখানে পড়ার সুযোগ হয় তার।
হ্যারো স্কুলে সে পিয়ানো ও চেলো, দুটি যন্ত্রেই উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। খ্যাতিমান শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে দুটি যন্ত্রেই ডিপ্লোমা পর্যায়ের যোগ্যতা অর্জনের প্রস্তুতি চলছে। অল্প বয়সেই সংগীতের সব গ্রেড পরীক্ষায় সে ‘ডিস্টিংশন’ পেয়েছে।
পিয়ানো ও চেলোর পাশাপাশি নাভহান গিটার বাজায়, আধুনিক গানও গায়। সে হ্যারো স্কুলের বায়রন কনসোর্ট চেম্বার কয়ারের সদস্য। এই দলের জন্য তার রচিত গান যুক্তরাজ্যসহ বিদেশেও পরিবেশিত হয়েছে। স্কুলের সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা ও স্ট্রিং অর্কেস্ট্রারও সদস্য সে। বিগ ব্যান্ডের সঙ্গেও কণ্ঠসংগীত পরিবেশন করেছে। তার রয়েছে ‘পারফেক্ট পিচ’, অর্থাৎ কোনো সুরের স্বর নির্ভুলভাবে শনাক্ত করার বিশেষ দক্ষতা।
হ্যারো স্কুলে ভর্তির আগে সে ব্রেন্টউড স্কুলের সংগীতবৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী ছিল। একই সঙ্গে লন্ডনের গিল্ডহল স্কুল অব মিউজিক অ্যান্ড ড্রামার জুনিয়র বিভাগে পিয়ানো, চেলো ও সংগীত রচনার প্রশিক্ষণ নিয়েছে।
ছোটবেলা থেকেই সুরের টান
মায়ের ভাষ্য, ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি নাভহানের আগ্রহ। তিনি ঘুমপাড়ানি গান গাইলে সেই সুর অনুকরণের চেষ্টা করত শিশু নাভহান। আট বছর বয়সের দিকে শুরু হয় তার প্রাতিষ্ঠানিক সংগীতশিক্ষা।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে লন্ডনের ঐতিহাসিক ড্রেপার্স হলে নিজের রচিত একটি সংগীত পরিবেশন করে সে। সিটি অব লন্ডন করপোরেশনের বিনিয়োগ কমিটির বার্ষিক নৈশভোজে সেই পরিবেশনা শেষে অতিথিরা দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানান।
সংগীতের পারিবারিক ঐতিহ্য
নাভহানের বাবা মোহাম্মদ চৌধুরী, ভুলন চৌধুরী নামেও পরিচিত। তাঁর বাড়ি বাংলাদেশের দিনাজপুরে। ১৯৯৪ সাল থেকে তিনি যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। মা রুবেনা চৌধুরীর আদি বাড়ি সিলেটে, যুক্তরাজ্যে আছেন ১৯৭৯ সাল থেকে। দুই সন্তানের মধ্যে নাভহান ছোট।
রুবেনা চৌধুরী নিজেও সংগীতচর্চা করতেন। সাত বছর বয়স থেকে বাংলা, উর্দু ও হিন্দি গান গেয়েছেন। লন্ডনের ভারতীয় বিদ্যা ভবনে ভারতীয় শাস্ত্রীয় কণ্ঠসংগীতে প্রশিক্ষণ নিয়ে দুই বছরের পরীক্ষাতেই ‘ডিস্টিংশন’ পান। নাভহানের জন্মের কারণে তৃতীয় বছরের প্রশিক্ষণ শেষ করতে পারেননি।
বড় বোনের সংগীতচর্চাও শৈশব থেকে নাভহানকে অনুপ্রাণিত করেছে। বোন বেহালা ও পিয়ানো বাজাতেন, গানও গাইতেন। এখন তিনি বিজ্ঞানভিত্তিক পেশায় কর্মরত।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী মাহমুদুন্নবী এবং খ্যাতনামা গীতিকার কাওসার আহমেদ চৌধুরী, দুজনই নাভহানের বাবার ফুফা ছিলেন।
ভবিষ্যতের শিল্পীর খোঁজে
রয়্যাল অ্যালবার্ট হলের ‘ফিউচার মেকার্স’ শুরু হয় ২০২২ সালে। যুক্তরাজ্যের ১৪ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-তরুণ সংগীতশিল্পীদের জন্য এই আয়োজন। প্রতিভাবান শিল্পী খুঁজে বের করা এবং তাঁদের পেশাগত সংগীতজীবন গড়তে সহায়তা করাই এর উদ্দেশ্য।
শিল্পীকে প্রথমে মৌলিক সংগীত জমা দিতে হয়। এরপর প্রাথমিক বাছাই, তারপর সরাসরি অডিশন। এভাবেই নির্বাচিত হন চূড়ান্ত পর্বের শিল্পীরা। প্রতিযোগিতার বিশেষত্ব হলো, বিজয়ী শুধু সম্মাননা পান না, এক বছরের বিশেষ সহায়তাও পান। এতে আছে অভিজ্ঞ প্রযোজকদের সঙ্গে কাজ, রেকর্ডিং স্টুডিও ব্যবহারের সুযোগ, প্রচারণা এবং রয়্যাল অ্যালবার্ট হলের এলগার রুমে নিজস্ব সংগীত পরিবেশনার সুযোগ।
বিনোদন ডেস্ক : 



















