এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচির অপব্যবহারের অভিযোগে মাইক্রোসফটসহ আটটি প্রযুক্তি কোম্পানিকে দক্ষ বিদেশি কর্মীদের স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া থেকে বিরত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস। বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই ঘোষণা দেন।
ভ্যান্সের অভিযোগ, এইচ-১বি ভিসা এবং বিদেশি কর্মীদের স্থায়ী মার্কিন বাসিন্দা হওয়ার সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি করেছে এই কোম্পানিগুলো। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মূল্যবান প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট কার্যত আমেরিকান কর্মীদের বদলে “বিদেশি চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক” নিয়োগ দিচ্ছে। তিনি বলেন, “আমেরিকার অন্য কোনো কোম্পানি মাইক্রোসফটের চেয়ে বেশি এই ব্যবস্থার অপব্যবহার করেনি।”
মাইক্রোসফট ছাড়া যে সাতটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেগুলো হলো অ্যাডোবি, কগনিজেন্ট, ইনফোসিস, টাটা, উইপ্রো, এইচসিএল ও ক্যাপজেমিনি।
যে সিদ্ধান্ত জানানো হলো
একই সংবাদ সম্মেলনে শ্রমমন্ত্রী কিথ সন্ডারলিং জানান, মাইক্রোসফট ও বাকি সাতটি কোম্পানির কোনো নতুন কিংবা বিচারাধীন পার্মানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন, অর্থাৎ পার্ম আবেদন অনুমোদন করবে না মার্কিন সরকার।
সন্ডারলিংয়ের ভাষ্য, মাইক্রোসফটের মতো কোম্পানি এবং মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো “ভিসা তৈরির কারখানায়” পরিণত হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মী দিয়ে আমেরিকাকে “ভাসিয়ে” দিচ্ছে।
ভ্যান্সের যুক্তি
ভ্যান্স বলেন, একই সময়ে মাইক্রোসফট প্রায় ছয় হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে এবং ছয় হাজার ৮০০টি এইচ-১বি ভিসার আবেদন করেছে। তাঁর মতে, এটিই প্রমাণ করে যে কোম্পানিটি দেশীয় কর্মীদের বদলে বিদেশিদের নিয়োগ দিচ্ছে এবং এতে মজুরি কমছে।
মাইক্রোসফটকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, “আপনারা একটি মহান আমেরিকান কোম্পানি, আপনাদেরকে অবশ্যই আমেরিকান কর্মী নিয়োগ করতে হবে। আপনারা আমেরিকান কর্মীদের ছাঁটাই করে তাদেরকে বিদেশি চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে পারেন না।”
বিদেশি কর্মীদের “চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক” বলার কারণও ব্যাখ্যা করেন ভ্যান্স। তাঁর কথায়, যে প্রতিষ্ঠান ভিসা স্পনসর করেছে, সেখান থেকে চাকরি হারালে এই কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্র “ছেড়ে যেতে হয়”। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে কর্মীরা ৬০ দিনের গ্রেস পিরিয়ড পান। গত মাসে মার্কিন সরকার সেই সুবিধাও পুরোপুরি বাতিলের প্রস্তাব দিয়েছিল।
মাইক্রোসফটের বক্তব্য
অভিযোগের জবাবে মাইক্রোসফটের একজন মুখপাত্র জানান, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠানটির অধিকাংশ কর্মীই আমেরিকান। বিশ্বজুড়ে কোম্পানিটির কর্মীর সংখ্যা দুই লাখেরও বেশি।
মুখপাত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে দাখিল করা এইচ-১বি আবেদনের ৮০ শতাংশ ইতোমধ্যে কর্মরত কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্কিত, নতুন নিয়োগের জন্য নয়। তিনি আরও বলেন, এই কর্মসূচিতে নেওয়া আন্তর্জাতিক কর্মীদের একজন আমেরিকান কর্মীর সমান ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। মুখপাত্র জানান, প্রশাসনকে অতিরিক্ত তথ্য দিতে প্রতিষ্ঠানটি প্রস্তুত।
বিদেশ থেকে দক্ষ কর্মী নিয়োগে অনেক প্রযুক্তি কোম্পানিকে সহায়তা করে এমন প্রতিষ্ঠান এলিসের তথ্য অনুযায়ী, মাইক্রোসফটে একজন এইচ-১বি কর্মীর গড় বেতন এক লাখ ৫৫ হাজার মার্কিন ডলার।
একই দিনে হোয়াইট হাউসে সম্মাননা
ঘটনাটি আলোচনায় এসেছে আরেকটি কারণে। একই বৃহস্পতিবার মাইক্রোসফটের দীর্ঘদিনের প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেলা হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত থেকে প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য একটি পদক নেন। নাদেলাকে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, তাঁকে পদক দিতে পেরে হোয়াইট হাউস “সম্মানিত” এবং এটি “তাঁর যোগ্যতারই প্রতিফলন”।
পদকপ্রাপ্ত অন্য প্রযুক্তি ব্যক্তিত্বদের মধ্যে ছিলেন ইলন মাস্ক, জেনসেন হুয়াং, লিসা সু, সের্গেই ব্রিন ও মাইকেল ডেল। নাদেলাসহ পদকপ্রাপ্তদের বেশিরভাগই সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক এক মধ্যাহ্নভোজ এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্মানে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় নৈশভোজেও উপস্থিত ছিলেন। তবু সেদিনই ভ্যান্সের সমালোচনার কেন্দ্রে ছিল মাইক্রোসফট।
প্রেক্ষাপট
যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানই বহু বছর ধরে এইচ-১বি কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক কর্মী নিয়োগ দিয়ে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যামাজন, গুগল, মেটা, অ্যাপল ও এনভিডিয়া। অথচ ভ্যান্সের বৃহস্পতিবারের মন্তব্যে এদের কোনোটির নাম আসেনি।
কয়েক দশক ধরে এই কর্মসূচি এমন উচ্চ দক্ষ ও বিশেষায়িত কর্মীদের জন্য তৈরি, যাদের কোম্পানিগুলোর প্রয়োজন, কিন্তু দেশের ভেতরে খুঁজে পাওয়া বা নিয়োগ দেওয়া কঠিন। পার্ম কর্মসূচি এই কর্মীদের স্থায়ী মার্কিন বাসিন্দা হওয়ার একটি পথ, যা প্রায়ই গ্রিন কার্ডের দিকে নিয়ে যায় এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ও কাজ করার সুযোগ দেয়। গত অর্থবছরে মার্কিন শ্রম দপ্তর দশটি ব্যবসায়িক বিভাগে এক লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি পার্ম আবেদন অনুমোদন করেছে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : 



















