নোবেল শান্তি পুরস্কারের ঘোষণা আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) বা আইসিসির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবারের এই সিদ্ধান্তে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক দূরত্ব আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সময়টা লক্ষ করার মতো। একই দিনে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজ্ঞ নাভি পিল্লাই। আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের পথে দীর্ঘ পথচলার স্বীকৃতি হিসেবেই তাঁকে এই সম্মান দেওয়া হয়েছে। আর সেই দিনই আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার একটি প্রধান প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিল মার্কিন প্রশাসন।
রুবিওর বক্তব্য
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো অবস্থাতেই আইসিসিকে মার্কিন নাগরিকদের বিচার করতে দেবেন না। সে কারণেই আদালতটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে। রুবিওর ভাষ্য, এর ফলে আদালতের সঙ্গে লেনদেন বন্ধ হবে এবং তার সম্পদ ও কার্যক্রম চালানোর সক্ষমতা সংকুচিত হবে। আদালতকে তিনি ‘দুর্বৃত্ত আদালত’ বলে আখ্যা দেন।
নিষেধাজ্ঞা আরোপে কেন দেরি হয়েছিল, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ মেটানোর সুযোগ আইসিসি ও তার সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে দিতেই সময় নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। আদালতকে নিয়ন্ত্রণে আনতে যুক্তরাষ্ট্র মিত্রদেরও পদক্ষেপ নিতে বলেছে। রুবিওর কথায়, হয় আইসিসিকে ‘হুমকি’ বন্ধ করতে হবে, নয়তো যুক্তরাষ্ট্র আদালতের কার্যক্রম বন্ধ করে দেবে।
আগের পদক্ষেপ ও নতুন সম্ভাবনা
এটি আইসিসির বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের প্রথম পদক্ষেপ নয়। এর আগে আদালতের কৌঁসুলি ও বিচারকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে এবার নিষেধাজ্ঞা সরাসরি প্রতিষ্ঠানটির ওপরই। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর আওতায় আদালতকে সেবা দেওয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় কিছু লাইসেন্স দেবে। এর ফলে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কিছু কার্যক্রমে সাময়িক ছাড় মিলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের নিষেধাজ্ঞায় সাধারণত দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলো সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে কাজ করতে পারে না। ফলে ব্যাংক হিসাব বন্ধ হয়ে যাওয়া, বীমাসেবা প্রত্যাহার এবং সফটওয়্যার-সংক্রান্ত সহযোগিতা থেমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
কেন ক্ষুব্ধ ওয়াশিংটন
ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই আইসিসির বিরোধিতা করে আসছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ দেশটির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অনেক দিন ধরেই ক্ষুব্ধ। আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের ভূমিকা নিয়ে আদালতের একটি তদন্ত নিয়েও ওয়াশিংটনের আপত্তি ছিল। পরে সেই তদন্ত বন্ধ করে দেয় আইসিসি।
আদালত যেভাবে প্রস্তুতি নিয়েছে
নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা আগে থেকেই ছিল। গত কয়েক মাস ধরে আইসিসি সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়েছে। মাইক্রোসফটের সফটওয়্যারের পরিবর্তে উন্মুক্ত সফটওয়্যার ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকিং ও স্বাস্থ্যবীমার জন্যও বিকল্প ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আদালতের রেজিস্ট্রার ওসভালদো জাভালা গিলার ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, সদস্য দেশগুলোকে নিষেধাজ্ঞার বহির্দেশীয় প্রভাব থেকে রক্ষা করতে ‘ব্লকিং ব্যবস্থা’ চালুর প্রস্তুতি নিতে।
মিত্রদের সঙ্গে টানাপোড়েন
নিষেধাজ্ঞার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপরও পড়ার কথা। ২০০২ সালে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচারের লক্ষ্যে আদালতটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সদস্যরাষ্ট্র এখন ১২৫টি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক ছাড়া ন্যাটোর সব সদস্য এই আদালতের সদস্য। যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের অনেকেই আইসিসির প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে। আদালতের সদর দপ্তর নেদারল্যান্ডসে, যে দেশ ইইউ ও ন্যাটো দুটিরই সদস্য। এসব কারণে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে নতুন করে কূটনৈতিক বিরোধ তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নোবেল কমিটির বার্তা
পুরস্কার ঘোষণার সময় নোবেল কমিটি বলেছিল, আন্তর্জাতিক আইনের বিচারক ও প্রতিষ্ঠানগুলো যখন রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে, তখন এই পুরস্কার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। কমিটির মতে, যুদ্ধাপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং নির্যাতনের শিকার মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা শান্তিপূর্ণ বিশ্বের পূর্বশর্ত।
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়োর্গেন ওয়াটনে ফ্রাইডনেস বলেছেন, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করায় পিল্লাইয়ের কাজ অপরিহার্য ভূমিকা রেখেছে। তাঁর মতে, বিশ্বে দীর্ঘকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যুদ্ধ ও সংঘাতের এই সময়ে আন্তর্জাতিক আইন কেবল শান্তি ও নিরাপত্তার পরিপূরক নয়, এটি অপরিহার্য প্রয়োজন।
কে এই নাভি পিল্লাই
পিল্লাইয়ের বয়স ৮৫ বছর। বর্ণবৈষম্যের যুগে ডারবানের একটি দরিদ্র ভারতীয়-অধ্যুষিত এলাকায় এক বাসচালকের মেয়ে হিসেবে তিনি বড় হয়েছেন। ১৯৬৭ সালে নাটাল প্রদেশে প্রথম নারী হিসেবে আইন পেশা শুরু করেন। পরে দেশের উচ্চ আদালতে নিয়োগ পাওয়া প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী হন। শুরুর দিকে বর্ণবাদবিরোধী কর্মীদের পক্ষে আদালতে লড়েছেন। শুক্রবারের পুরস্কারের মধ্য দিয়ে নেলসন ম্যান্ডেলা ও আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটুর পথ ধরে দক্ষিণ আফ্রিকার পঞ্চম শান্তি পুরস্কারজয়ী হলেন তিনি।
রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক ছিলেন পিল্লাই। ১৯৯৪ সালের গণহত্যার বিচারের জন্য জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত ওই ট্রাইব্যুনালে তিনি চার বছর সভাপতির দায়িত্বও সামলেছেন। রুয়ান্ডার ওই গণহত্যায় আট লাখ মানুষ নিহত হয়েছিলেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি আইসিসির আপিল বিভাগেও বিচারক ছিলেন।
২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিনি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড বিষয়ে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতি ছিলেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের গঠিত এই কমিশন আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করে। কমিশন সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালিয়েছে এবং নেতানিয়াহু ও তাঁর সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট বক্তৃতা ও বিবৃতির মাধ্যমে গণহত্যায় উসকানি দিয়েছেন। তিন সদস্যের এই বিশেষজ্ঞ প্যানেল আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের পক্ষে কথা বলেনি এবং তাদের কোনো আইনি কর্তৃত্ব ছিল না। ইসরায়েল তাদের অনুসন্ধান প্রত্যাখ্যান করে কমিশনের সদস্যদের ‘হামাসের দালাল’ বলে অভিযুক্ত করেছে।
পিল্লাই বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) বিচারক। গাম্বিয়ার দায়ের করা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগের মামলাটি সেখানেই চলছে। মিয়ানমার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। জানুয়ারিতে একজন সরকারি প্রতিনিধি আদালতে অভিযোগটিকে ‘ভিত্তিহীন’ বলেছেন।
প্রতিক্রিয়া
পুরস্কারের খবর শুনে পিল্লাইয়ের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘এটা নিশ্চয়ই একটা রসিকতা’। অভিনন্দন জানাতে জড়ো হওয়া মানুষদের ধন্যবাদ দিয়ে তিনি হাসতে হাসতে বলেন, আরেকটু বেশি হাততালি পেলে হয়তো পুরস্কারটি তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নেবেন। উল্লেখ্য, গত বছরের বিজয়ী ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো জানুয়ারিতে নিজের পদক ট্রাম্পকে উপহার দিয়েছিলেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক বলেছেন, এই স্বীকৃতি আবারও প্রমাণ করল যে মানবাধিকার, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি শান্তি, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির ভিত্তি। দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি সিরিল রামাফোসা তাঁকে বর্ণবাদবিরোধী কর্মীদের একজন অগ্রণী প্রতিরক্ষা আইনজীবী বলে উল্লেখ করেছেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেন, আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচার যখন আক্রমণের মুখে, তখন এই পুরস্কার এর চেয়ে সময়োপযোগী আর হতে পারত না।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুরস্কারটিকে ‘ইসরায়েল-বিরোধী ঘৃণা ও বিদ্বেষকে বৈধতা দেওয়ার জন্য একটি পুরস্কারের জঘন্য অস্ত্রায়ন’ বলে মন্তব্য করেছে।
ফ্রাইডনেস স্পষ্ট করেছেন, গাজায় ইসরায়েলি হামলা গণহত্যার শামিল কি না, সে বিষয়ে নোবেল সংস্থা কোনো পক্ষ নিচ্ছে না।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 





















