নোবেল শান্তি পুরস্কার না পেয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ বছরের পুরস্কারজয়ী নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাইকে তিনি ‘রহস্যময় ব্যক্তি’ বলে উল্লেখ করেছেন। ট্রাম্পের ভাষায়, তাঁকে পুরস্কার না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নরওয়ের জন্য ‘মুছে ফেলা যায় না এমন কলঙ্ক’ হয়ে থাকবে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের সিরাকিউজে এক সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। পিল্লাই ঠিক কী করেছেন, তা তাঁর জানা নেই বলেও জানান ট্রাম্প। নরওয়েকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘আপনারা যে আমাকে এই পুরস্কার দেননি, তা আমরা ভুলব না।’ প্রায় ১০ মিনিটের ওই বক্তব্যে সিদ্ধান্তটিকে নরওয়ে ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের জন্য ‘কলঙ্কজনক ও বিব্রতকর’ বলেও বর্ণনা করেন তিনি।
ট্রুথ সোশ্যালের পোস্টেও হতাশা
এর আগে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালের এক পোস্টেও একই হতাশা প্রকাশ করেছিলেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি নিজের কৃতিত্বের একটি ফিরিস্তি তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, তিনি আটটি যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছেন, আরও দুটি যুদ্ধ থামানোর কাছাকাছি রয়েছেন, ইসরাইলি জিম্মিদের সবাইকে ফিরিয়ে এনেছেন এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনে বাধা দিয়েছেন। এসব কারণে তাঁর কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের পুরস্কার পাওয়া উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাম্পের ভাষ্য, ‘আমি আটটি যুদ্ধের নিষ্পত্তি করেছি, আরও দুটি যুদ্ধের অবসান ঘটানো বা মীমাংসা করার কাছাকাছি রয়েছি। ইসরাইলের সব জিম্মিকে ফিরিয়ে এনেছি, যার মধ্যে শেষ ২৮ জনও রয়েছেন—জীবিত ও মৃত উভয়ই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শত শত জিম্মিকে মুক্ত করে তাদের দেশে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভেনেজুয়েলায় একটি যুদ্ধে জয়ী হয়েছি এবং দেশটিকে নির্মমভাবে শাসন করা সহিংস স্বৈরশাসককে আটক করেছি। এ ছাড়া সন্ত্রাসবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রেখেছি। আরও অনেক কিছু করেছি। তারপরও আমি কিংবা যুক্তরাষ্ট্র নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলাম না। বাহ!’
তবে আটটি সংঘাতের অবসান ঘটানোর এই দাবির সবটুকু বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মেলে না। এর মধ্যে কয়েকটি সংঘাত এখনো চলছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে সংঘাত থামাতে অন্য পক্ষগুলোর ভূমিকাও ছিল উল্লেখযোগ্য।
পুরস্কারের জন্য দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষা
নোবেল শান্তি পুরস্কারের প্রতি ট্রাম্পের আগ্রহ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে তিনি দাবি করেছেন, এই সম্মানের জন্য তিনিই যোগ্য। একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরস্কার নিয়ে নরওয়ের নেতাদের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টাও করেছেন তিনি। দেশটির অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে বার্তা পাঠানোর ঘটনাও সামনে এসেছে।
নোবেল কমিটি যা বলছে
নরওয়েজীয় নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়োরগেন ওয়াটনে ফ্রাইডনেস শনিবার বলেন, কমিটি নরওয়ে সরকারের কাছ থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করে। আলফ্রেড নোবেলের উইলে নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী পুরস্কারপ্রাপকদের সম্মানিত করাই তাদের একমাত্র দায়িত্ব। ট্রাম্পের বক্তব্য নিয়ে সরাসরি কিছু না বললেও তিনি বলেন, ‘এই পুরস্কারের উদ্দেশ্য হলো এমন একজন ব্যক্তিকে সম্মান জানানো, যিনি সাহস ও সততার সঙ্গে আরও বিস্তৃত বৈশ্বিক আইনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ দেখিয়েছেন। শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়তে চাইলে আমাদের সমাজ ও বিশ্বকে সেই দিকেই এগোতে হবে।’
নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি সরকারের অংশ নয়। তবে কমিটির সদস্যদের নিয়োগ দেয় দেশটির সংসদ, আর সংসদের রাজনৈতিক গঠন অনুযায়ীই কমিটিতে প্রতিনিধিত্ব থাকে।
কে এই নাভি পিল্লাই
বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান নাভি পিল্লাই এ বছর শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন। আন্তর্জাতিক আইন ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
তাঁর কর্মজীবনে রয়েছে রুয়ান্ডায় ১৯৯৪ সালের গণহত্যার তদন্তে গঠিত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের নেতৃত্ব, দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের কর্মীদের আইনি সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারকের দায়িত্ব। গত বছর তিনি জাতিসংঘের যে কমিশনের নেতৃত্ব দেন, সেটি গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। ইসরাইল এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগের মামলায় বিচারক হিসেবে আছেন।
পুরস্কারের খবর প্রকাশের পর শুক্রবার করতালির মধ্যে রসিকতা করে পিল্লাই বলেন, ‘আপনারা যদি আরেকটু বেশি করতালি দেন, তাহলে হয়তো পুরস্কারটি ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি।’ পরে তিনি যুদ্ধাপরাধের শিকার ব্যক্তিদের উদ্দেশে পুরস্কারটি উৎসর্গ করেন। কমিটি তাঁর সাহসের প্রশংসা করায় বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘সত্য কথা বলতে সাহসের প্রয়োজন হবে কেন?’ আইসিসির বিরুদ্ধে হুমকির সমালোচনাও করেন তিনি। তাঁর মতে, এসব পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক অপরাধবিচার ব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা।
একই দিনে আইসিসির ওপর নিষেধাজ্ঞা
পিল্লাইয়ের পুরস্কার পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য ‘বেপরোয়া আদালতটি’ যে হুমকি তৈরি করেছে, তা বন্ধ করতেই এই পদক্ষেপ।
অসলোভিত্তিক স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট অসলোর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হাকন গেরলোর মতে, একই দিনে নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা পুরস্কারের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করেছে। তিনি বলেন, ‘নোবেল কমিটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে আন্তর্জাতিক আইন এবং তা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো শান্তিপূর্ণ বিশ্বের অপরিহার্য ভিত্তি। কমিটির সিদ্ধান্তটি সাহসী এবং এর জবাবে যে প্রতিক্রিয়া এসেছে, তা উদ্বেগজনকভাবে দাদাগিরিমূলক।’
মাচাদোর পদক ও কমিটির অবস্থান
ট্রাম্পের পক্ষে আরও কয়েকটি দেশ ও ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে প্রচার চালিয়েছেন বা তাঁকে মনোনয়ন দিয়েছেন। গত বছরের শান্তি পুরস্কারজয়ী ভেনেজুয়েলার বিরোধী রাজনীতিক মারিয়া কোরিনা মাচাদো জানুয়ারিতে নিজের পদক ট্রাম্পকে দিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার কয়েক সপ্তাহ আগে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের নেতা নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন। তবে নোবেল কমিটি স্পষ্ট করেছে, পুরস্কার একবার দেওয়া হলে তা বাতিল, ভাগ কিংবা অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করা যায় না।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 




















