শিরোনাম :
হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে নতুন জল্পনা,আকস্মিক দিল্লি সফরে বাংলাদেশের গোয়েন্দাপ্রধান আদর্শবান সাংবাদিকরাই স্বৈরাচার পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন: রিজভী বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের ওপর গুরুত্বারোপ প্রধানমন্ত্রীর ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে ছিটকে গেলেন মেসি-এমবাপ্পে, জানাল এআই কাঁটাতারে আটকা ১৩০ হাতি, কূটনীতির টেবিলেও মিলছে না সমাধান সরকার অনুমতি দিলে ক্রসফায়ারেও পিছপা হবে না পুলিশ: আইজিপি ক্যাঙারু কোর্ট’ মন্তব্যে ট্রাইব্যুনালে হাজির আওয়ামীপন্থি দুই আইনজীবী, চাইলেন নিঃশর্ত ক্ষমা কে পাঠালেন উড়োজাহাজে করে পরীমনিকে শিউলি ফুল? ফেব্রুয়ারি ছেড়ে জানুয়ারিতে বইমেলা, প্রশ্ন উঠছে একুশের চেতনা নিয়ে পাঠ্যবইয়ে ‘দাঁড়িপাল্লা’ বিতর্কের রেশ না কাটতেই এবার ‘নৌকা’ নিয়ে তোলপাড়

মাদ্রাসায় শিশুদের যৌন নির্যাতন: মুখ খুলছেন ভুক্তভোগীরা, প্রশ্নের মুখে নজরদারি

ঢাকার যাত্রাবাড়ির বাসিন্দা আক্কাস আলী পেশায় ফল বিক্রেতা। নিরাপত্তার কারণে এটি তাঁর ছদ্মনাম। চার বছর বয়সী একমাত্র ছেলেকে বছরখানেক পর স্থানীয় একটি কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর পরিকল্পনা ছিল তাঁর। ইচ্ছা ছিল, ছেলে হাফেজ হবে।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনের একের পর এক অভিযোগ সামনে আসায় সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন তিনি। বলেন, প্রতিদিন যা দেখছেন আর শুনছেন, তাতে ছেলেকে মাদ্রাসায় পাঠানোর ইচ্ছাই আর নেই। সন্তানের জীবনে এমন কিছু ঘটুক, তা তিনি চান না।

আলোচনায় নতুন মাত্রা

কওমি ধারার মাদ্রাসা নিয়ে এত দিন শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তির অভিযোগই বেশি শোনা যেত। গত কয়েক মাসে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ।

স্থানীয় গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে দেশের নানা এলাকায় মাদ্রাসাকেন্দ্রিক প্রায় দেড় ডজন যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে ছেলেশিশুর সংখ্যাই বেশি। গত এক সপ্তাহে গাজীপুর, পাবনা ও লক্ষ্মীপুরের তিনটি মাদ্রাসার ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। পুলিশ জানিয়েছে, এর মধ্যে দুটি ঘটনায় ভুক্তভোগী ছেলেশিশু।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) হিসাবে, শুধু গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরেই অন্তত ১৩ জন ছেলেশিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, এদের প্রায় সবাই কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, যা গভীর উদ্বেগের বিষয়।

সরকারি হিসাবে দেশে এখন প্রায় ২৫ হাজার কওমি মাদ্রাসা আছে। এগুলোতে পড়াশোনা করে প্রায় ৭০ লাখ শিক্ষার্থী। সাইদুর রহমানের মতে, প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে চলছে এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার কতটা সুরক্ষিত হচ্ছে, সে বিষয়ে সরকারের পর্যাপ্ত নজরদারি নেই। ফলে সমস্যাটি থেকেই যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, কিছু ঘটনায় অভিযুক্তরা গ্রেপ্তার হলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উদাহরণ নেই। এ কারণে ঘটনা থামছে না। তাঁদের মতে, অনেক মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ অভিযোগ তদন্ত না করেই তা অস্বীকার করে। এটিও পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

‘আগেও ছিল’

সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো সামনে এলেও সমস্যা যে নতুন নয়, তা বলছেন মাদ্রাসার সাবেক শিক্ষার্থীরা। সাজেদুল ইসলাম নামের একজন সাবেক শিক্ষার্থী বলেন, বিষয়টি আগেও ছিল। তবে পরিস্থিতি এমন ছিল যে এ নিয়ে কথা বলার সুযোগ মিলত না।

ফিরোজ করিম (ছদ্মনাম) এমনই একজন ভুক্তভোগী। প্রায় দুই দশক আগে, মাত্র সাত বছর বয়সে তাঁকে কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি করানো হয়। মায়ের মানত ছিল, ছেলেকে কোরআনের হাফেজ বানাবেন। ভর্তির অল্প কিছুদিন পরই তিনি যৌন নির্যাতনের শিকার হন। এর পর পরিবার তাঁকে আরেকটি কওমি মাদ্রাসায় দেয়। সেখানে এক শিক্ষকের হাতেও তিনি নির্যাতনের শিকার হন বলে জানান।

পরপর দুটি প্রতিষ্ঠানে এমন অভিজ্ঞতার ট্রমা তিনি এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন। লজ্জা ও ভয়ে পরিবারের কাছেও কখনো কিছু বলতে পারেননি। তাঁর ভাষ্য, মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর থেকেই তাঁরা জানতেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন ঘটনা ঘটে। বড়রা ছোটদের সঙ্গে এবং কখনো কখনো শিক্ষকেরাও এসব করেন। কিন্তু লজ্জা, ভয় ও সামাজিক চাপে বিষয়টি বাইরে আসে না।

সমস্যা কতটা গভীর

লজ্জা ও পারিবারিক সম্মানের ভয়ে বহু ভুক্তভোগী এত দিন মুখ খোলেননি। তাই সমস্যাটি আসলে কত বড়, তার স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি।

সম্প্রতি কিছু ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর কওমি মাদ্রাসার দুই সাবেক শিক্ষার্থী ‘আওয়াজডটবিডি’ নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করেছেন। সেখানে পরিচয় গোপন রেখে নির্যাতনের অভিজ্ঞতা জানানো যায়। ওয়েবসাইটটির তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক সপ্তাহে অন্তত ২২৭ জন নিজেদের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা বলেছেন প্রায় ৯৩ জন। তাঁদের প্রায় ৪৭ শতাংশ কওমি মাদ্রাসার ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। ওয়েবসাইটের এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।

প্ল্যাটফর্মটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সালাউদ্দীন জাহাঙ্গীর নিজেও কওমি মাদ্রাসার সাবেক শিক্ষার্থী। তাঁর মতে, মাদ্রাসাগুলোর কাঠামো ও আবাসনব্যবস্থা প্রায় একই ধরনের। তাই সমস্যাটি প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই থাকার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর অভিজ্ঞতায়, নিচু শ্রেণিতে, বিশেষ করে হিফজখানায়, ছোট শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তিনি আরও বলেন, একসময় যারা নির্যাতনের শিকার হয়, পরে তাদের কেউ কেউ নিজেই নির্যাতক হয়ে ওঠে। তাঁর দাবি, ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বহু বছর ধরেই চলছে।

কেন থামছে না

সাবেক শিক্ষার্থী ও মানবাধিকারকর্মীরা একাধিক কারণের কথা বলছেন। সাইদুর রহমানের মতে, প্রথম কারণ হলো যথাযথ তদন্ত ও বিচারের অভাব। আর তদন্ত না হওয়ার বড় কারণ, ঘটনা প্রকাশ্যে না আসা। সাবেক শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট হবে বা অনুদান বন্ধ হয়ে যাবে, এমন যুক্তিতে কর্তৃপক্ষ প্রায়ই অভিযোগ এড়িয়ে যায়। সালাউদ্দীন জাহাঙ্গীরের ভাষ্য, ঘটনা হয় চাপা দেওয়া হয়, নয়তো সংশ্লিষ্ট শিক্ষক বা শিক্ষার্থীকে শুধু বের করে দেওয়া হয়। পুলিশের কাছে সোপর্দ করার চর্চা থাকলে এ ধরনের ঘটনা কমতে পারত বলে তিনি মনে করেন।

অভিভাবকদের সচেতনতার ঘাটতিকেও কেউ কেউ কারণ হিসেবে দেখছেন। সাইদুর রহমান বলেন, কওমি মাদ্রাসায় সন্তান পাঠানো অভিভাবকদের বেশির ভাগই দরিদ্র এবং তাঁদের শিক্ষার সুযোগ কম। ফলে বিষয়টি নিয়ে তাঁরা তুলনামূলক কম সচেতন। যাঁরা কিছুটা সচেতন ও সাহসী, তাঁরাই মূলত কথা বলছেন।

নজরদারির ফাঁক

এসব কারণের গোড়ায় সবচেয়ে বড় হয়ে উঠছে সরকারি নজরদারির অভাব। অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় কওমি মাদ্রাসার ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ অনেক কম। শিক্ষকেরা জানিয়েছেন, মাদ্রাসা কীভাবে পরিচালিত হবে এবং যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে কী ব্যবস্থা নিতে হবে, সে বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো নীতিমালা নেই।

জনপ্রিয় ইসলামি বক্তা মিজানুর রহমান আজহারি ফেসবুকে লিখেছেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হওয়ার অর্থ জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকা নয়। বরং দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা আরও বেশি দৃশ্যমান হওয়া উচিত। আবাসিক মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য আরও কার্যকর নীতিমালার প্রয়োজনের কথাও তিনি বলেছেন।

কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামও গত শনিবারের এক বিবৃতিতে নৈতিক স্খলনের ঘটনায় তদন্ত এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব সাজেদুর রহমান বিবৃতিতে বলেছেন, এ বিষয়ে কোনো শিথিলতা বা আপস চলবে না।

বোর্ড ও সরকার কী বলছে

কওমি মাদ্রাসার বৃহত্তম শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের (বেফাক) সহসভাপতি মুসলেহ উদ্দীন রাজু জানান, তাঁদের অধীন কোনো মাদ্রাসার বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। শিশুদের সুরক্ষায় মাদ্রাসাগুলোকে ছাত্র সুরক্ষা কমিটি গঠনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

তবে বাস্তবতা হলো, কওমি মাদ্রাসার জন্য একক কোনো বোর্ড নেই। অন্তত ছয়টি বোর্ডের অধীনে এগুলো চলে এবং কারও একক কর্তৃত্ব নেই। বোর্ডগুলো মূলত পাঠ্যক্রম, সিলেবাস ও পরীক্ষা দেখে। অনিয়ম বা যৌন নির্যাতনের মতো বিষয়ে নজরদারির মতো জনবলও তাদের নেই।

বোর্ডগুলোর কাজের সমন্বয়ের জন্য সরকার ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’ নামে একটি কর্তৃপক্ষ গঠন করেছে। এটি মূলত দেশের কওমি মাদ্রাসার পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ ও সনদ দেওয়ার কাজ করে। সম্প্রতি শিশুদের ওপর শারীরিক ও যৌন নির্যাতন নিয়ে সমালোচনা বাড়লে সংস্থাটি শিক্ষার্থীদের মারধর করে শাস্তি দেওয়া পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেছে। সব মাদ্রাসায় সুরক্ষা কমিটি গঠন বা পুনর্গঠন করে তা সক্রিয় রাখার পরামর্শও দিয়েছে। কিন্তু নির্দেশনা মানা হচ্ছে কি না তা কীভাবে নিশ্চিত হবে, আর কেউ না মানলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। নির্দেশনায় শুধু বলা হয়েছে, সীমা লঙ্ঘনকারী শিক্ষক শরিয়ত ও বিধি, উভয় দৃষ্টিতে জবাবদিহির আওতায় থাকবেন।

বিশেষ কোনো নীতিমালা না থাকায় সারা দেশে ইচ্ছামতো মাদ্রাসা গড়ে উঠছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকার মাদরাসাতুল আতহার আল ইসলামিয়ার অধ্যক্ষ আজিজুল হক ইসলামাবাদী। তাঁর ভাষ্য, এ ধরনের অনেক প্রতিষ্ঠান কোনো বোর্ডের আওতায় নেই এবং অনিয়মের অভিযোগ মূলত সেগুলোর বিরুদ্ধেই বেশি। বোর্ডের বাইরে থাকা এসব মাদ্রাসা নিয়ে গত শনিবার আল-হাইআতুল উলয়া জরুরি বৈঠক করেছে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সারা দেশের আঞ্চলিক কমিটিগুলো এসব প্রতিষ্ঠানের খোঁজ নেবে এবং যোগ্যদের সদস্য করবে। ইসলামাবাদীর বিশ্বাস, এটি করা গেলে সমস্যা অনেকটা কমবে।

বিশ্লেষকেরা অবশ্য বলছেন, সারা দেশে নজরদারি চালানোর সক্ষমতা ও লোকবল আল-হাইআতুল উলয়ার নেই। তাই সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে।

শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ গত শনিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে ঘটনাগুলোকে ‘অত্যন্ত দুঃখজনক ও লজ্জাকর’ বলেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঘটবে না। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে নতুন জল্পনা,আকস্মিক দিল্লি সফরে বাংলাদেশের গোয়েন্দাপ্রধান

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

পাঠ্যবইয়ে ‘দাঁড়িপাল্লা’ বিতর্কের রেশ না কাটতেই এবার ‘নৌকা’ নিয়ে তোলপাড়

২৬ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

মাদ্রাসায় শিশুদের যৌন নির্যাতন: মুখ খুলছেন ভুক্তভোগীরা, প্রশ্নের মুখে নজরদারি

আপডেট সময় ০৪:৫২:১৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

ঢাকার যাত্রাবাড়ির বাসিন্দা আক্কাস আলী পেশায় ফল বিক্রেতা। নিরাপত্তার কারণে এটি তাঁর ছদ্মনাম। চার বছর বয়সী একমাত্র ছেলেকে বছরখানেক পর স্থানীয় একটি কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর পরিকল্পনা ছিল তাঁর। ইচ্ছা ছিল, ছেলে হাফেজ হবে।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনের একের পর এক অভিযোগ সামনে আসায় সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন তিনি। বলেন, প্রতিদিন যা দেখছেন আর শুনছেন, তাতে ছেলেকে মাদ্রাসায় পাঠানোর ইচ্ছাই আর নেই। সন্তানের জীবনে এমন কিছু ঘটুক, তা তিনি চান না।

আলোচনায় নতুন মাত্রা

কওমি ধারার মাদ্রাসা নিয়ে এত দিন শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তির অভিযোগই বেশি শোনা যেত। গত কয়েক মাসে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ।

স্থানীয় গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে দেশের নানা এলাকায় মাদ্রাসাকেন্দ্রিক প্রায় দেড় ডজন যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে ছেলেশিশুর সংখ্যাই বেশি। গত এক সপ্তাহে গাজীপুর, পাবনা ও লক্ষ্মীপুরের তিনটি মাদ্রাসার ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। পুলিশ জানিয়েছে, এর মধ্যে দুটি ঘটনায় ভুক্তভোগী ছেলেশিশু।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) হিসাবে, শুধু গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরেই অন্তত ১৩ জন ছেলেশিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, এদের প্রায় সবাই কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, যা গভীর উদ্বেগের বিষয়।

সরকারি হিসাবে দেশে এখন প্রায় ২৫ হাজার কওমি মাদ্রাসা আছে। এগুলোতে পড়াশোনা করে প্রায় ৭০ লাখ শিক্ষার্থী। সাইদুর রহমানের মতে, প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে চলছে এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার কতটা সুরক্ষিত হচ্ছে, সে বিষয়ে সরকারের পর্যাপ্ত নজরদারি নেই। ফলে সমস্যাটি থেকেই যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, কিছু ঘটনায় অভিযুক্তরা গ্রেপ্তার হলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উদাহরণ নেই। এ কারণে ঘটনা থামছে না। তাঁদের মতে, অনেক মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ অভিযোগ তদন্ত না করেই তা অস্বীকার করে। এটিও পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

‘আগেও ছিল’

সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো সামনে এলেও সমস্যা যে নতুন নয়, তা বলছেন মাদ্রাসার সাবেক শিক্ষার্থীরা। সাজেদুল ইসলাম নামের একজন সাবেক শিক্ষার্থী বলেন, বিষয়টি আগেও ছিল। তবে পরিস্থিতি এমন ছিল যে এ নিয়ে কথা বলার সুযোগ মিলত না।

ফিরোজ করিম (ছদ্মনাম) এমনই একজন ভুক্তভোগী। প্রায় দুই দশক আগে, মাত্র সাত বছর বয়সে তাঁকে কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি করানো হয়। মায়ের মানত ছিল, ছেলেকে কোরআনের হাফেজ বানাবেন। ভর্তির অল্প কিছুদিন পরই তিনি যৌন নির্যাতনের শিকার হন। এর পর পরিবার তাঁকে আরেকটি কওমি মাদ্রাসায় দেয়। সেখানে এক শিক্ষকের হাতেও তিনি নির্যাতনের শিকার হন বলে জানান।

পরপর দুটি প্রতিষ্ঠানে এমন অভিজ্ঞতার ট্রমা তিনি এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন। লজ্জা ও ভয়ে পরিবারের কাছেও কখনো কিছু বলতে পারেননি। তাঁর ভাষ্য, মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর থেকেই তাঁরা জানতেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন ঘটনা ঘটে। বড়রা ছোটদের সঙ্গে এবং কখনো কখনো শিক্ষকেরাও এসব করেন। কিন্তু লজ্জা, ভয় ও সামাজিক চাপে বিষয়টি বাইরে আসে না।

সমস্যা কতটা গভীর

লজ্জা ও পারিবারিক সম্মানের ভয়ে বহু ভুক্তভোগী এত দিন মুখ খোলেননি। তাই সমস্যাটি আসলে কত বড়, তার স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি।

সম্প্রতি কিছু ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর কওমি মাদ্রাসার দুই সাবেক শিক্ষার্থী ‘আওয়াজডটবিডি’ নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করেছেন। সেখানে পরিচয় গোপন রেখে নির্যাতনের অভিজ্ঞতা জানানো যায়। ওয়েবসাইটটির তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক সপ্তাহে অন্তত ২২৭ জন নিজেদের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা বলেছেন প্রায় ৯৩ জন। তাঁদের প্রায় ৪৭ শতাংশ কওমি মাদ্রাসার ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। ওয়েবসাইটের এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।

প্ল্যাটফর্মটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সালাউদ্দীন জাহাঙ্গীর নিজেও কওমি মাদ্রাসার সাবেক শিক্ষার্থী। তাঁর মতে, মাদ্রাসাগুলোর কাঠামো ও আবাসনব্যবস্থা প্রায় একই ধরনের। তাই সমস্যাটি প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই থাকার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর অভিজ্ঞতায়, নিচু শ্রেণিতে, বিশেষ করে হিফজখানায়, ছোট শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তিনি আরও বলেন, একসময় যারা নির্যাতনের শিকার হয়, পরে তাদের কেউ কেউ নিজেই নির্যাতক হয়ে ওঠে। তাঁর দাবি, ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বহু বছর ধরেই চলছে।

কেন থামছে না

সাবেক শিক্ষার্থী ও মানবাধিকারকর্মীরা একাধিক কারণের কথা বলছেন। সাইদুর রহমানের মতে, প্রথম কারণ হলো যথাযথ তদন্ত ও বিচারের অভাব। আর তদন্ত না হওয়ার বড় কারণ, ঘটনা প্রকাশ্যে না আসা। সাবেক শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট হবে বা অনুদান বন্ধ হয়ে যাবে, এমন যুক্তিতে কর্তৃপক্ষ প্রায়ই অভিযোগ এড়িয়ে যায়। সালাউদ্দীন জাহাঙ্গীরের ভাষ্য, ঘটনা হয় চাপা দেওয়া হয়, নয়তো সংশ্লিষ্ট শিক্ষক বা শিক্ষার্থীকে শুধু বের করে দেওয়া হয়। পুলিশের কাছে সোপর্দ করার চর্চা থাকলে এ ধরনের ঘটনা কমতে পারত বলে তিনি মনে করেন।

অভিভাবকদের সচেতনতার ঘাটতিকেও কেউ কেউ কারণ হিসেবে দেখছেন। সাইদুর রহমান বলেন, কওমি মাদ্রাসায় সন্তান পাঠানো অভিভাবকদের বেশির ভাগই দরিদ্র এবং তাঁদের শিক্ষার সুযোগ কম। ফলে বিষয়টি নিয়ে তাঁরা তুলনামূলক কম সচেতন। যাঁরা কিছুটা সচেতন ও সাহসী, তাঁরাই মূলত কথা বলছেন।

নজরদারির ফাঁক

এসব কারণের গোড়ায় সবচেয়ে বড় হয়ে উঠছে সরকারি নজরদারির অভাব। অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় কওমি মাদ্রাসার ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ অনেক কম। শিক্ষকেরা জানিয়েছেন, মাদ্রাসা কীভাবে পরিচালিত হবে এবং যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে কী ব্যবস্থা নিতে হবে, সে বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো নীতিমালা নেই।

জনপ্রিয় ইসলামি বক্তা মিজানুর রহমান আজহারি ফেসবুকে লিখেছেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হওয়ার অর্থ জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকা নয়। বরং দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা আরও বেশি দৃশ্যমান হওয়া উচিত। আবাসিক মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য আরও কার্যকর নীতিমালার প্রয়োজনের কথাও তিনি বলেছেন।

কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামও গত শনিবারের এক বিবৃতিতে নৈতিক স্খলনের ঘটনায় তদন্ত এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব সাজেদুর রহমান বিবৃতিতে বলেছেন, এ বিষয়ে কোনো শিথিলতা বা আপস চলবে না।

বোর্ড ও সরকার কী বলছে

কওমি মাদ্রাসার বৃহত্তম শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের (বেফাক) সহসভাপতি মুসলেহ উদ্দীন রাজু জানান, তাঁদের অধীন কোনো মাদ্রাসার বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। শিশুদের সুরক্ষায় মাদ্রাসাগুলোকে ছাত্র সুরক্ষা কমিটি গঠনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

তবে বাস্তবতা হলো, কওমি মাদ্রাসার জন্য একক কোনো বোর্ড নেই। অন্তত ছয়টি বোর্ডের অধীনে এগুলো চলে এবং কারও একক কর্তৃত্ব নেই। বোর্ডগুলো মূলত পাঠ্যক্রম, সিলেবাস ও পরীক্ষা দেখে। অনিয়ম বা যৌন নির্যাতনের মতো বিষয়ে নজরদারির মতো জনবলও তাদের নেই।

বোর্ডগুলোর কাজের সমন্বয়ের জন্য সরকার ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’ নামে একটি কর্তৃপক্ষ গঠন করেছে। এটি মূলত দেশের কওমি মাদ্রাসার পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ ও সনদ দেওয়ার কাজ করে। সম্প্রতি শিশুদের ওপর শারীরিক ও যৌন নির্যাতন নিয়ে সমালোচনা বাড়লে সংস্থাটি শিক্ষার্থীদের মারধর করে শাস্তি দেওয়া পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেছে। সব মাদ্রাসায় সুরক্ষা কমিটি গঠন বা পুনর্গঠন করে তা সক্রিয় রাখার পরামর্শও দিয়েছে। কিন্তু নির্দেশনা মানা হচ্ছে কি না তা কীভাবে নিশ্চিত হবে, আর কেউ না মানলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। নির্দেশনায় শুধু বলা হয়েছে, সীমা লঙ্ঘনকারী শিক্ষক শরিয়ত ও বিধি, উভয় দৃষ্টিতে জবাবদিহির আওতায় থাকবেন।

বিশেষ কোনো নীতিমালা না থাকায় সারা দেশে ইচ্ছামতো মাদ্রাসা গড়ে উঠছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকার মাদরাসাতুল আতহার আল ইসলামিয়ার অধ্যক্ষ আজিজুল হক ইসলামাবাদী। তাঁর ভাষ্য, এ ধরনের অনেক প্রতিষ্ঠান কোনো বোর্ডের আওতায় নেই এবং অনিয়মের অভিযোগ মূলত সেগুলোর বিরুদ্ধেই বেশি। বোর্ডের বাইরে থাকা এসব মাদ্রাসা নিয়ে গত শনিবার আল-হাইআতুল উলয়া জরুরি বৈঠক করেছে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সারা দেশের আঞ্চলিক কমিটিগুলো এসব প্রতিষ্ঠানের খোঁজ নেবে এবং যোগ্যদের সদস্য করবে। ইসলামাবাদীর বিশ্বাস, এটি করা গেলে সমস্যা অনেকটা কমবে।

বিশ্লেষকেরা অবশ্য বলছেন, সারা দেশে নজরদারি চালানোর সক্ষমতা ও লোকবল আল-হাইআতুল উলয়ার নেই। তাই সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে।

শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ গত শনিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে ঘটনাগুলোকে ‘অত্যন্ত দুঃখজনক ও লজ্জাকর’ বলেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঘটবে না। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Share this news as a Photo Card