বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সত্যনিষ্ঠ ও আদর্শবান সাংবাদিকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। একই দিনে তিনি জানিয়েছেন, জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আগামী ৭ নভেম্বর ঢাকাসহ সারাদেশে র্যালি করবে দলটি।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) আলাদা দুটি অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন রিজভী। সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে বাংলাদেশ জাতীয় সাংবাদিক সমিতি আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। একই দিন নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিএনপির যৌথসভা শেষে তিনি সাংবাদিকদের কাছে কর্মসূচির বিবরণ তুলে ধরেন।
সাংবাদিকদের সাহসের স্মৃতি
আলোচনা সভায় রিজভী বলেন, গিয়াস কামাল চৌধুরী, আতাউস সামাদ ও ফয়েজ আহমেদের মতো সাংবাদিকেরা সত্য ও ন্যায়ের প্রশ্নে কখনো আপস করেননি। তাঁদের সাহসিকতা, নীতিবোধ ও দৃঢ় অবস্থান স্বৈরাচারের পতনের আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এরশাদের শাসনামলের কথা স্মরণ করে বিএনপির এই নেতা বলেন, তখন দেশের প্রকৃত পরিস্থিতি জানতে মানুষ বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকার ওপর নির্ভর করতেন। ভয়েস অব আমেরিকার সাংবাদিক গিয়াস কামাল চৌধুরী এবং বিবিসির সাংবাদিক আতাউস সামাদের সংবাদ পরিবেশন ছিল মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের কণ্ঠেই সাধারণ মানুষ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্দোলন-সংগ্রামের খবর জানতে পারতেন।
রিজভীর ভাষ্য, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় সাংবাদিকদের ওপর নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হতো। গ্রেপ্তার ও হয়রানির মধ্যেও গিয়াস কামাল চৌধুরী সাহসের সঙ্গে সংবাদ পরিবেশন চালিয়ে গেছেন। নিরাপত্তার কারণে কখনো কখনো তাঁকে সংবাদ পাঠানোর স্থানও গোপন রাখতে হতো। পেশাগত দায়িত্বের প্রতি এই নিষ্ঠা ও সাহসই তাঁকে মানুষের কাছে বিশেষ মর্যাদার আসনে বসিয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ওই সময়ের অনেক সাংবাদিক ছিলেন নীতিবান, দৃঢ়চেতা ও আপসহীন। নানা প্রলোভন ও চাপের মুখেও তাঁরা আদর্শ থেকে সরে আসেননি। সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার যে দৃষ্টান্ত তাঁরা রেখে গেছেন, তা বর্তমান প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্যও অনুসরণীয়।
গিয়াস কামাল চৌধুরীর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা স্মরণ করে রিজভী জানান, ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর থেকেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর অসাধারণ বক্তব্য দেওয়ার দক্ষতা এবং তরুণদের প্রতি আন্তরিক ও স্নেহশীল আচরণ তাঁকে মুগ্ধ করত। তিনি বলেন, গিয়াস কামাল চৌধুরী শুধু সাহসী সাংবাদিকই ছিলেন না, ছিলেন অভিভাবকসুলভ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। সভায় তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন রিজভী।
৭ নভেম্বরের কর্মসূচি
নয়াপল্টনে যৌথসভা শেষে রিজভী জানান, বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাদের মতামতের ভিত্তিতে কর্মসূচির খসড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। ৭ নভেম্বর সকাল ছয়টায় ঢাকাসহ সারাদেশে দলীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন করা হবে। এরপর ঢাকায় কেন্দ্রীয়ভাবে বর্ণাঢ্য র্যালি বের হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও র্যালি আয়োজনের নির্দেশনা দেওয়া হবে।
একই দিন বেলা ১১টায় সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ করবেন দলের নেতারা। বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন পোস্টার প্রকাশ ও আলোচনা সভার আয়োজন করবে। ছাত্রদল আয়োজন করবে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও চিত্র প্রদর্শনীর। আলোচনা সভার সম্ভাব্য তারিখ ঠিক করা হয়েছে ৬ নভেম্বর।
দিবসের প্রেক্ষাপট নিয়ে রিজভীর বক্তব্য
দিবসটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ৭ নভেম্বর দেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এ দিনের চেতনা স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার চেতনা। তাঁর ভাষ্য, ১৯৭৫ সালের আগে রাজনৈতিক সংঘাত ও নানা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, আর সেই প্রেক্ষাপটেই ৭ নভেম্বরের বিপ্লব সংঘটিত হয়। ওই দিনের পর দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরে আসে বলে দাবি করেন তিনি।
রিজভী বলেন, ৭ নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমান জাতীয় রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন। ১৯৭১ সালে কালুরঘাট থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সংকটময় সময়ে জিয়াউর রহমান জাতিকে দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন।
সংবাদপত্রের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর চারটি সংবাদপত্র রেখে অন্যগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এতে বহু সাংবাদিক বেকার হয়ে পড়েন। পরে সংবাদপত্র ও রাজনৈতিক দলগুলো আবার কার্যক্রম চালানোর সুযোগ পায়।
জুলাই আন্দোলনের কথা তুলে রিজভী বলেন, ৭ নভেম্বরের বৈপ্লবিক চেতনা এই আন্দোলনকে প্রভাবিত করেছে। ছাত্র, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে অংশ নেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এর মধ্য দিয়েই ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদের পতন ঘটে এবং গণতন্ত্রের পথ আবার উন্মুক্ত হয়।
দুই অনুষ্ঠানেই রিজভীর বক্তব্যে স্বৈরশাসনের সময়ে সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে এসেছে। একদিকে এরশাদ আমলে সংবাদ পরিবেশনের ঝুঁকি, অন্যদিকে ১৯৭৫ সালের পর সংবাদপত্র ফিরে পাওয়ার কথা। দুই ক্ষেত্রেই তিনি সাংবাদিকদের ভূমিকাকে সামনে এনেছেন।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 



















