ঢাকা ১২:২৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬, ২৮ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
অনেক পরীক্ষক খাতা না দেখে ‘হেলপার’ দিয়ে মূল্যায়ন করেন : শিক্ষামন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি তেল কিনতে ক্রেতাদের ডাকছেন ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ‘গভীর অবিশ্বাস’ নিয়ে আলোচনায় বসছে ইরান বিদেশি ঋণ জাতিকে কোমর সোজা করে দাঁড়াতে দেবে না : জামায়াতের আমির নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে দল ঘোষণা করল বাংলাদেশ অশুভ শক্তি ইসরায়েল মানবতার জন্য অভিশাপ : খাজা আসিফ জ্বালানির ভর্তুকির বাইরেও লাগবে ৩৬ হাজার কোটি টাকা : অর্থমন্ত্রী গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন বিল পাস যুদ্ধবিরতি থেকে সরে দাঁড়ানোর হুঁমকি ইরানের রায়ে সন্তুষ্ট নয় আবু সাঈদের বাবা

কামিনী রায়; প্রথিতযশা বাঙালি মহিলা কবি

প্রথিতযশা বাঙালি মহিলা কবি
কামিনী রায়
(১২ই অক্টোবর ১৮৬৪-২৭শে সেপ্টেম্বর ১৯৩৩)
মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

কামিনী রায় একজন প্রথিতযশা বাঙালি মহিলা কবি, সমাজকর্মী এবং নারীবাদী লেখিকা। তিনি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম মহিলা স্নাতক ডিগ্রিধারী ব্যক্তিত্ব। তিনি একসময় “জনৈক বঙ্গমহিলা” ছদ্মনামে লিখতেন।

জন্ম ও পরিচয়
কামিনী রায় ১৮৬৪ সালের ১২ই অক্টোবর পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশের) বাকেরগঞ্জের বাসণ্ডা গ্রামে (বর্তমানে ঝালকাঠি জেলার অংশ) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা চণ্ডীচরণ সেন ছিলেন একজন ব্রাহ্মধর্মাবলম্বী, বিচারক ও ঐতিহাসিক লেখক। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে চণ্ডীচরণ ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা লাভ করেন। পরের বছর তার স্ত্রী-কন্যাও কলকাতায় তার কাছে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন। তিনি ব্রাহ্ম সমাজের বিশিষ্ট নেতা ছিলেন। তাঁর ভগিনী যামিনী সেন লেডি ডাক্তার হিসেবে খ্যাতিলাভ করেছিলেন। ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে কামিনী রায় স্টাটুটারি সিভিলিয়ান কেদারনাথ রায়ের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

শিক্ষাজীবন
কামিনী রায়ের প্রাথমিক শিক্ষার ভার পিতা চণ্ডীচরণ সেন নিজে গ্রহণ করেন। বার বৎসর বয়সে তাকে স্কুলে ভর্তি করে বোর্ডিংয়ে প্রেরণ করেন। ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে তিনি কলকাতা বেথুন স্কুল হতে এন্ট্রান্স (মাধ্যমিক) পরীক্ষায় ও ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে এফ.এ বা ফার্স্ট আর্টস (উচ্চ মাধ্যমিক সমমানের) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। বেথুন কলেজ হতে তিনি ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতের প্রথম নারী হিসাবে সংস্কৃত ভাষায় সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

কর্মজীবন
১৮৮৬ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর পরই তিনি বেথুন কলেজের স্কুল বিভাগে শিক্ষিকা পদে নিযুক্ত হন। পরবর্তীকালে তিনি ঐ কলেজে অধ্যাপনাও করেছিলেন। যে যুগে মেয়েদের শিক্ষাও বিরল ঘটনা ছিল, সেই সময়ে কামিনী রায় নারীবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। তার অনেক প্রবন্ধেও এর প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি নারী শ্রম তদন্ত কমিশন (১৯২২-২৩) এর সদস্য ছিলেন।

সাহিত্যকর্ম
শৈশবে তাঁর পিতামহ তাকে কবিতা ও স্তোত্র আবৃত্তি করতে শেখাতেন। এভাবেই খুব কম বয়স থেকেই কামিনী রায় সাহিত্য রচনা করেন ও কবিত্ব শক্তির স্ফুরণ ঘটান। তাঁর জননীও তাকে গোপনে বর্ণমালা শিক্ষা দিতেন। কারণ তখনকার যুগে হিন্দু পুরমহিলাগণের লেখাপড়া শিক্ষা করাকে একান্তই নিন্দনীয় ও গর্হিত কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। মাত্র ৮ বছর বয়স থেকে তিনি কবিতা লিখতেন। রচিত কবিতাগুলোতে জীবনের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাক্সক্ষা, আনন্দ-বেদনার সহজ-সরল ও সাবলীল প্রকাশ ঘটেছে। পনেরো বছর বয়সে তার প্রথম কাব্য গ্রন্থ আলো ও ছায়া প্রকাশিত হয় ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে। এ গ্রন্থটির ভূমিকা লিখেছিলেন হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু প্রথমে এতে গ্রন্থকর্ত্রী হিসেবে কামিনী রায়ের নাম প্রকাশিত হয় নাই। গ্রন্থটি প্রকাশিত হলে তার কবি খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- আলো ও ছায়া (১৮৮৯), নির্মাল্য (১৮৯১), পৌরাণিকী (১৮৯৭), গুঞ্জন (১৯০৫), মাল্য ও নির্মাল্য (১৯১৩), অশোক সঙ্গীত (সনেট সংগ্রহ, ১৯১৪), অম্বা (নাট্যকাব্য, ১৯১৫), দীপ ও ধূপ (১৯২৯), জীবন পথে (১৯৩০), একলব্য, দ্রোণ-ধৃষ্টদ্যুম্ন, শ্রাদ্ধিকী অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত মহাশ্বেতা ও পুণ্ডরীক তার দুটি প্রসিদ্ধ দীর্ঘ কবিতা। এছাড়াও, ১৯০৫ সালে তিনি শিশুদের জন্য গুঞ্জন নামের কবিতা সংগ্রহ ও প্রবন্ধ গ্রন্থ বালিকা শিক্ষার আদর্শ রচনা করেন।

কামিনী রায় সবসময় অন্য সাহিত্যিকদের উৎসাহ দিতেন। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি বরিশাল সফরের সময় কবি সুফিয়া কামালকে লেখালেখিতে মনোনিবেশ করতে বলেন।

তার কবিতা পড়ে বিমোহিত হন সিভিলিয়ান কেদারনাথ রায় এবং তাকে বিয়ে করেন। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে কামিনী রায়ের স্বামীর অপঘাতে মৃত্যু ঘটেছিল। সেই শোক ও দুঃখ তার ব্যক্তিগত জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে, যা তার কবিতায় প্রকাশ পায়। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সংস্কৃত সাহিত্য দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন।

সম্মাননা
১৯২৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক কামিনী রায়কে ‘জগত্তারিণী পদক’ প্রদান করে সম্মানিত করেন। তিনি ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় লিটারারি কনফারেন্সের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৩২-৩৩ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদেরও সহ-সভাপতি ছিলেন কামিনী রায়।

প্রয়াণ
জীবনের শেষ ভাগে তিনি হাজারীবাগে বাস করেছেন। ১৯৩৩ খিস্টাব্দর ২৭শে সেপ্টেম্বর তার জীবনাবসান ঘটে।

কামিনী রায়ে একগুচ্ছ কবিতা

স্মৃতিচিহ্ন

ওরা ভেবেছিল মনে আপনার নাম
মনোহর হর্ম্মরূপে বিশাল অক্ষরে
ইষ্টক প্রস্তরে রচি চিরদিন তরে
রেখে যাবে! মূঢ় ওরা, ব্যর্থ মনস্কাম।
প্রস্তর খসিয়াছে ভূমে প্রস্তরের পরে,
চারিদিকে ভগ্নস্তূপ, তাহাদের তলে
লুপ্ত স্মৃতি; শুষ্ক তৃণ কাল-নদী-জলে
ভেসে যায় নামগুলি, কেবা রক্ষা করে!
মানব হৃদয় ভুমি করি অধিকার,
করেছে প্রতিষ্ঠা যারা দৃঢ় সিংহাসন,
দরিদ্র আছিল তারা, ছিল না সম্বল
প্রস্তরের এত বোঝা জড় করিবার ;
তাদের রাজত্ব হের অক্ষুণ্ণ কেমন
কাল স্রোতে ধৌত নাম নিত্যসমুজ্জ্বল।

চাহিবে না ফিরে?

পথে দেখে ঘৃণাভরে কত কেহ গেল সরে
উপহাস করি’ কেহ যায় পায়ে ঠেলে;
কেহ বা নিকটে আসি, বরষি সান্ত্বনারাশি
ব্যথিতেরে ব্যথা দিয়ে যায় শেষে ফেলে ।
পতিত মানব তরে নাহি কি গো এ সংসারে
একটি ব্যথিত প্রাণ, দুটি অশ্রুধার?
পথে পড়ে, অসহায় পদতলে দলে যায়
দু’খানি স্নেহের কর নাহি বাড়াবার?
সত্য, দোষে আপনার চরণ স্খলিত তার;
তাই তোমাদের পদ উঠিবে ও শিরে?
তাই তার আর্তরবে সকলে বধির হবে।
যে যাহার চলে যাবে—চাহিবে না ফিরে?
বর্তিকা লইয়া হাতে চলেছিল এক সাথে
পথে নিভে গেল আলো পড়িয়াছে তাই;
তোমরা কি দয়া করে তুলিবে না হাত ধরে
অর্ধদণ্ড তার লাগি থামিবে না ভাই?
তোমাদের বাতি দিয়া প্রদীপ জ্বালিয়া নিয়া
তোমাদের হাত ধরি হোক অগ্রসর;
পঙ্কমাঝে অন্ধকারে ফেলে যদি দাও তারে,
আঁধার রজনী তার রবে নিরন্তর ।

কত ভালবাসি

জড়ায়ে মায়ের গলা শিশু কহে আসি,-
“মা, তোমারে কত ভালোবাসি!”
“কত ভালবাস ধন?” জননী শুধায়।
“এ-ত।” বলি দুই হাত প্রসারি’ দেখায়।

“তুমি মা আমারে ভালবাস কতখানি?”
মা বলেন “মাপ তার আমি নাহি জানি।”
“তবু কতখানি, বল।”

“যতখানি ধরে
তোমার মায়ের বুকে।”
“নহে তার পরে?”

“তার বাড়া ভালবাসা পারি না বাসিতে।”
“আমি পারি।” বলে শিশু হাসিতে হাসিতে!

আরো পড়ুন : ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর; বাংলা গদ্যের সার্থক রূপকার

ট্যাগস

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

অনেক পরীক্ষক খাতা না দেখে ‘হেলপার’ দিয়ে মূল্যায়ন করেন : শিক্ষামন্ত্রী

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

কামিনী রায়; প্রথিতযশা বাঙালি মহিলা কবি

আপডেট সময় ১২:৫৭:৩৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ অক্টোবর ২০২৪

প্রথিতযশা বাঙালি মহিলা কবি
কামিনী রায়
(১২ই অক্টোবর ১৮৬৪-২৭শে সেপ্টেম্বর ১৯৩৩)
মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

কামিনী রায় একজন প্রথিতযশা বাঙালি মহিলা কবি, সমাজকর্মী এবং নারীবাদী লেখিকা। তিনি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম মহিলা স্নাতক ডিগ্রিধারী ব্যক্তিত্ব। তিনি একসময় “জনৈক বঙ্গমহিলা” ছদ্মনামে লিখতেন।

জন্ম ও পরিচয়
কামিনী রায় ১৮৬৪ সালের ১২ই অক্টোবর পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশের) বাকেরগঞ্জের বাসণ্ডা গ্রামে (বর্তমানে ঝালকাঠি জেলার অংশ) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা চণ্ডীচরণ সেন ছিলেন একজন ব্রাহ্মধর্মাবলম্বী, বিচারক ও ঐতিহাসিক লেখক। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে চণ্ডীচরণ ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা লাভ করেন। পরের বছর তার স্ত্রী-কন্যাও কলকাতায় তার কাছে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন। তিনি ব্রাহ্ম সমাজের বিশিষ্ট নেতা ছিলেন। তাঁর ভগিনী যামিনী সেন লেডি ডাক্তার হিসেবে খ্যাতিলাভ করেছিলেন। ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে কামিনী রায় স্টাটুটারি সিভিলিয়ান কেদারনাথ রায়ের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

শিক্ষাজীবন
কামিনী রায়ের প্রাথমিক শিক্ষার ভার পিতা চণ্ডীচরণ সেন নিজে গ্রহণ করেন। বার বৎসর বয়সে তাকে স্কুলে ভর্তি করে বোর্ডিংয়ে প্রেরণ করেন। ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে তিনি কলকাতা বেথুন স্কুল হতে এন্ট্রান্স (মাধ্যমিক) পরীক্ষায় ও ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে এফ.এ বা ফার্স্ট আর্টস (উচ্চ মাধ্যমিক সমমানের) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। বেথুন কলেজ হতে তিনি ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতের প্রথম নারী হিসাবে সংস্কৃত ভাষায় সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

কর্মজীবন
১৮৮৬ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর পরই তিনি বেথুন কলেজের স্কুল বিভাগে শিক্ষিকা পদে নিযুক্ত হন। পরবর্তীকালে তিনি ঐ কলেজে অধ্যাপনাও করেছিলেন। যে যুগে মেয়েদের শিক্ষাও বিরল ঘটনা ছিল, সেই সময়ে কামিনী রায় নারীবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। তার অনেক প্রবন্ধেও এর প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি নারী শ্রম তদন্ত কমিশন (১৯২২-২৩) এর সদস্য ছিলেন।

সাহিত্যকর্ম
শৈশবে তাঁর পিতামহ তাকে কবিতা ও স্তোত্র আবৃত্তি করতে শেখাতেন। এভাবেই খুব কম বয়স থেকেই কামিনী রায় সাহিত্য রচনা করেন ও কবিত্ব শক্তির স্ফুরণ ঘটান। তাঁর জননীও তাকে গোপনে বর্ণমালা শিক্ষা দিতেন। কারণ তখনকার যুগে হিন্দু পুরমহিলাগণের লেখাপড়া শিক্ষা করাকে একান্তই নিন্দনীয় ও গর্হিত কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। মাত্র ৮ বছর বয়স থেকে তিনি কবিতা লিখতেন। রচিত কবিতাগুলোতে জীবনের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাক্সক্ষা, আনন্দ-বেদনার সহজ-সরল ও সাবলীল প্রকাশ ঘটেছে। পনেরো বছর বয়সে তার প্রথম কাব্য গ্রন্থ আলো ও ছায়া প্রকাশিত হয় ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে। এ গ্রন্থটির ভূমিকা লিখেছিলেন হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু প্রথমে এতে গ্রন্থকর্ত্রী হিসেবে কামিনী রায়ের নাম প্রকাশিত হয় নাই। গ্রন্থটি প্রকাশিত হলে তার কবি খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- আলো ও ছায়া (১৮৮৯), নির্মাল্য (১৮৯১), পৌরাণিকী (১৮৯৭), গুঞ্জন (১৯০৫), মাল্য ও নির্মাল্য (১৯১৩), অশোক সঙ্গীত (সনেট সংগ্রহ, ১৯১৪), অম্বা (নাট্যকাব্য, ১৯১৫), দীপ ও ধূপ (১৯২৯), জীবন পথে (১৯৩০), একলব্য, দ্রোণ-ধৃষ্টদ্যুম্ন, শ্রাদ্ধিকী অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত মহাশ্বেতা ও পুণ্ডরীক তার দুটি প্রসিদ্ধ দীর্ঘ কবিতা। এছাড়াও, ১৯০৫ সালে তিনি শিশুদের জন্য গুঞ্জন নামের কবিতা সংগ্রহ ও প্রবন্ধ গ্রন্থ বালিকা শিক্ষার আদর্শ রচনা করেন।

কামিনী রায় সবসময় অন্য সাহিত্যিকদের উৎসাহ দিতেন। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি বরিশাল সফরের সময় কবি সুফিয়া কামালকে লেখালেখিতে মনোনিবেশ করতে বলেন।

তার কবিতা পড়ে বিমোহিত হন সিভিলিয়ান কেদারনাথ রায় এবং তাকে বিয়ে করেন। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে কামিনী রায়ের স্বামীর অপঘাতে মৃত্যু ঘটেছিল। সেই শোক ও দুঃখ তার ব্যক্তিগত জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে, যা তার কবিতায় প্রকাশ পায়। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সংস্কৃত সাহিত্য দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন।

সম্মাননা
১৯২৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক কামিনী রায়কে ‘জগত্তারিণী পদক’ প্রদান করে সম্মানিত করেন। তিনি ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় লিটারারি কনফারেন্সের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৩২-৩৩ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদেরও সহ-সভাপতি ছিলেন কামিনী রায়।

প্রয়াণ
জীবনের শেষ ভাগে তিনি হাজারীবাগে বাস করেছেন। ১৯৩৩ খিস্টাব্দর ২৭শে সেপ্টেম্বর তার জীবনাবসান ঘটে।

কামিনী রায়ে একগুচ্ছ কবিতা

স্মৃতিচিহ্ন

ওরা ভেবেছিল মনে আপনার নাম
মনোহর হর্ম্মরূপে বিশাল অক্ষরে
ইষ্টক প্রস্তরে রচি চিরদিন তরে
রেখে যাবে! মূঢ় ওরা, ব্যর্থ মনস্কাম।
প্রস্তর খসিয়াছে ভূমে প্রস্তরের পরে,
চারিদিকে ভগ্নস্তূপ, তাহাদের তলে
লুপ্ত স্মৃতি; শুষ্ক তৃণ কাল-নদী-জলে
ভেসে যায় নামগুলি, কেবা রক্ষা করে!
মানব হৃদয় ভুমি করি অধিকার,
করেছে প্রতিষ্ঠা যারা দৃঢ় সিংহাসন,
দরিদ্র আছিল তারা, ছিল না সম্বল
প্রস্তরের এত বোঝা জড় করিবার ;
তাদের রাজত্ব হের অক্ষুণ্ণ কেমন
কাল স্রোতে ধৌত নাম নিত্যসমুজ্জ্বল।

চাহিবে না ফিরে?

পথে দেখে ঘৃণাভরে কত কেহ গেল সরে
উপহাস করি’ কেহ যায় পায়ে ঠেলে;
কেহ বা নিকটে আসি, বরষি সান্ত্বনারাশি
ব্যথিতেরে ব্যথা দিয়ে যায় শেষে ফেলে ।
পতিত মানব তরে নাহি কি গো এ সংসারে
একটি ব্যথিত প্রাণ, দুটি অশ্রুধার?
পথে পড়ে, অসহায় পদতলে দলে যায়
দু’খানি স্নেহের কর নাহি বাড়াবার?
সত্য, দোষে আপনার চরণ স্খলিত তার;
তাই তোমাদের পদ উঠিবে ও শিরে?
তাই তার আর্তরবে সকলে বধির হবে।
যে যাহার চলে যাবে—চাহিবে না ফিরে?
বর্তিকা লইয়া হাতে চলেছিল এক সাথে
পথে নিভে গেল আলো পড়িয়াছে তাই;
তোমরা কি দয়া করে তুলিবে না হাত ধরে
অর্ধদণ্ড তার লাগি থামিবে না ভাই?
তোমাদের বাতি দিয়া প্রদীপ জ্বালিয়া নিয়া
তোমাদের হাত ধরি হোক অগ্রসর;
পঙ্কমাঝে অন্ধকারে ফেলে যদি দাও তারে,
আঁধার রজনী তার রবে নিরন্তর ।

কত ভালবাসি

জড়ায়ে মায়ের গলা শিশু কহে আসি,-
“মা, তোমারে কত ভালোবাসি!”
“কত ভালবাস ধন?” জননী শুধায়।
“এ-ত।” বলি দুই হাত প্রসারি’ দেখায়।

“তুমি মা আমারে ভালবাস কতখানি?”
মা বলেন “মাপ তার আমি নাহি জানি।”
“তবু কতখানি, বল।”

“যতখানি ধরে
তোমার মায়ের বুকে।”
“নহে তার পরে?”

“তার বাড়া ভালবাসা পারি না বাসিতে।”
“আমি পারি।” বলে শিশু হাসিতে হাসিতে!

আরো পড়ুন : ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর; বাংলা গদ্যের সার্থক রূপকার