বাংলাদেশে হৃদরোগে প্রতিদিন গড়ে ৫৬২ থেকে ৭৭৭ জনের মৃত্যু হচ্ছে বলে জানা গেছে। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন প্রায় ২ হাজার ৭২০ জন। বর্তমানে দেশে কোনো না কোনো হৃদরোগে ভুগছেন আনুমানিক ১ কোটি ২ লাখ ৬২ হাজার ১৯০ জন। অথচ বেশির ভাগ সরকারি মেডিকেল কলেজে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। কোথাও ক্যাথল্যাব আছে, কিন্তু যন্ত্র অচল। কোথাও যন্ত্র সচল থাকলেও চালানোর মতো দক্ষ জনবল নেই।
২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হার্ট দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘ডোন্ট মিস আ বিট’, অর্থাৎ ‘হৃৎস্পন্দনকে গুরুত্ব দিন’।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর নতুন করে হৃদরোগে আক্রান্ত হন ৯ লাখ ৯২ হাজার ৭৩৬ জন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর দুই লাখের বেশি মানুষ হৃদরোগে মারা যান।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসান বলেন, দেশে অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর তিন ভাগের এক ভাগের জন্য দায়ী হৃদরোগ। তাঁর ভাষ্য, গত তিন দশকে হৃদরোগের চিকিৎসায় অভূতপূর্ব উন্নতি হলেও তার ৯০ শতাংশই ঢাকাকেন্দ্রিক। অথচ ৯০ শতাংশ রোগী থাকেন ঢাকার বাইরে। তাই উন্নত চিকিৎসা রাজধানীর বাইরে পৌঁছে দিতে তিনি উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দেন।
চিকিৎসকদের মতে, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, স্থূলতা, অস্বাস্থ্যকর খাবার, বেশি লবণ ও চর্বি গ্রহণ এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা হৃদরোগের প্রধান ঝুঁকি।
বিশেষজ্ঞ ও ক্যাথল্যাবের ঘাটতি
সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারি মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে সাধারণত অধ্যাপকেরা বিভাগীয় প্রধান এবং সহযোগী অধ্যাপকেরা বিভাগীয় বা ইউনিট প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু বেশির ভাগ মেডিকেল কলেজের কার্ডিওলজি বিভাগে পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ নেই। কোথাও অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকের পদ শূন্য। এতে রোগীর চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে, উচ্চশিক্ষাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক কলেজে এফসিপিএস ও ডিপ্লোমা কোর্স চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ঢাকা, মুগদা, বরিশাল ও ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের ক্যাথল্যাব নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। বগুড়া মেডিকেল কলেজের দুটি ক্যাথল্যাবের একটি অচল। চট্টগ্রামের একটি ক্যাথল্যাবও নষ্ট। রংপুরের ক্যাথল্যাবের যন্ত্রপাতি কখনো চলে, কখনো চলে না।
একজন অধ্যাপক জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সরকারি পর্যায়ে হৃদরোগ চিকিৎসায় বড় পরিবর্তন এসেছে। তাঁর ভাষ্য, কয়েকজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ অধ্যাপককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কাউকে এমন জায়গায় পদায়ন করা হয়েছে, যেখানে তাঁর দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ নেই।
আঞ্চলিক চিত্র
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রতি মিনিটে আটজন হৃদরোগে মারা যান। এসব মৃত্যুর প্রায় অর্ধেক ঘটে ৭০ বছর বয়সের আগে। এ অঞ্চলে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের ৮৫ শতাংশের রোগ নিয়ন্ত্রণে নেই। ‘সিহার্টস’ উদ্যোগের আওতায় ১০ কোটি রোগীকে প্রটোকলভিত্তিক চিকিৎসার আওতায় আনার লক্ষ্য ছিল। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৯ কোটির বেশি মানুষ এই সেবা পেয়েছেন।
অর্থায়নের ঘাটতি, প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় পরীক্ষার সরঞ্জাম ও ওষুধের অপ্রতুলতা এবং তামাক ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যপণ্য নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা এখনো বড় বাধা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বড় হাসপাতালের ওপর নির্ভর করে এত রোগীর চাপ সামলানো সম্ভব নয়। প্রাথমিক পর্যায়েই উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ, ওষুধের নিশ্চয়তা, দক্ষ জনবল তৈরি, সচল ক্যাথল্যাব এবং মেডিকেল কলেজে পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তামাক ও অস্বাস্থ্যকর খাবার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থাও জরুরি।
এস কে চন্দন, ঢাকা 



















