জাতিসংঘ অধিবেশনে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক উপস্থিতি

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম বার্ষিক অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে নিউইয়র্কে, এমন এক সময়ে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ, ইউক্রেন-রাশিয়ার চার বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন ঝুঁকি এবং খোদ জাতিসংঘের নিজের অস্তিত্ব রক্ষার সংকট একসঙ্গে বিশ্বমঞ্চে আলোচনায় উঠে এসেছে। নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় অনুযায়ী ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া সাধারণ বিতর্কে বিশ্বের প্রায় ১৩০টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান অংশ নিচ্ছেন। জাতিসংঘের বিভিন্ন কর্মসূচিতে বাজেট ছাঁটাই এবং সংস্থাটির শীর্ষ নেতৃত্বে আসন্ন পরিবর্তনের বিষয়টিও এবারের অধিবেশনে গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার সম্পর্কের টানাপোড়েনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা এখন যে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, বিশ্বনেতাদের বক্তব্যে সেই প্রসঙ্গও গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এবারের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, যিনি গত জুনে সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর আবারও সাধারণ পরিষদের মঞ্চে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইতিমধ্যে জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গ সংস্থা থেকে ওয়াশিংটনের অনুদান প্রত্যাহার এবং উচ্চ মাত্রায় পারস্পরিক শুল্কারোপের সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। জাতিসংঘের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের বকেয়া চাঁদা নিয়েও দেখা দিয়েছে সংকট। চলতি সপ্তাহেই ৭২৫ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হলেও ওয়াশিংটনের বকেয়া এখনো এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বলে জানা গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ চলতি বছরই শেষ হওয়ার বিষয়টি। নতুন নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের অধিবেশন এড়িয়ে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশ্বমঞ্চে সংস্থাটির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।

এই অধিবেশন ঘিরে বাংলাদেশের জন্যও রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। একদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান পুরো অধিবেশনের সভাপতিত্ব করছেন, অন্যদিকে নতুন গণতান্ত্রিক ধারায় যাত্রা শুরুর পর সরকারপ্রধান হিসেবে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে এই দ্বৈত উপস্থিতিকে একটি অনন্য অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক যাত্রা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান ও সফরসঙ্গীদের নিয়ে তুর্কি এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তুরস্কের স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ১০ মিনিটে ইস্তাম্বুল ছেড়ে নিউইয়র্কের উদ্দেশে রওনা হন। ইস্তাম্বুলে দুই ঘণ্টা ৩৫ মিনিটের যাত্রাবিরতি শেষে তাঁকে বহনকারী টার্কিশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটি স্থানীয় সময় সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টা ২০ মিনিটে) নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন জুবাইদা খান এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম।

জেএফকে বিমানবন্দর থেকে মোটরশোভাযাত্রা সহকারে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে যাওয়া হয় ‘হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্ক’ হোটেলে, নিউইয়র্ক সফরকালে যেখানে তিনি অবস্থান করবেন। হোটেলের সামনে ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন হাতে মিছিল ও স্লোগান দিয়ে তাঁকে স্বাগত জানান বিএনপির নেতাকর্মী ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা, আর প্রধানমন্ত্রী হাসিমুখে হাত নেড়ে তাদের শুভেচ্ছার জবাব দেন। হোটেলে তাঁকে স্বাগত জানান জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান।

সনাতন রীতি থেকে সরে এসে এবার তুলনামূলক ছোট প্রতিনিধিদল নিয়ে নিউইয়র্ক গেছেন প্রধানমন্ত্রী। সফরসঙ্গী হিসেবে সঙ্গে রয়েছেন স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ও শামা ওবায়েদ এবং ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন জানান, আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিনিধিদলে মাত্র ৩৫ জন রয়েছেন, তার সঙ্গে রয়েছেন শুধু অত্যাবশ্যকীয় মিডিয়া, নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত স্টাফ। যাতায়াতের দুই দিন বাদ দিলে প্রধানমন্ত্রী মাঝখানে মাত্র চার কর্মদিবস নিউইয়র্কে অবস্থান করবেন এবং সেই সময়ে বেশ কিছু দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেবেন।

নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাত ৯টায় হোটেলের লবিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মাহ্দী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের বার্তা তুলে ধরবেন। তিনি বলেন, ‘দেশপ্রেম, আবেগ, অনুভূতি এবং আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে দেশের ভবিষ্যৎ রূপকল্প কী হওয়া উচিত, কীভাবে বাংলাদেশের স্বার্থকে সুরক্ষিত রাখতে হবে এবং কীভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করা যাবে, সেগুলো বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।’ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পক্ষে নিজেদের অবস্থান, ভিশন ও পরিকল্পনা তুলে ধরেছিলেন। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আজকে তাদের সন্তান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঠিক একইভাবে বাবা-মায়ের মতো দেশপ্রেমকে ধারণ করে বাংলাদেশের স্বার্থ ও অধিকারের কথা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবেন।’ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানান, এবারের সফরের মূল উদ্দেশ্য জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদান হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলাদা কোনো বৈঠকের তেমন সুযোগ এবার থাকছে না।

আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সকালে জাতিসংঘ মহাসচিবের আমন্ত্রণে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের জন্য আয়োজিত এক স্বাগত প্রাতঃরাশে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হবে। এরপর তিনি অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্য বিশ্বনেতার সঙ্গে অংশ নেবেন, যেখানে সব দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা উপস্থিত থাকবেন। সন্ধ্যায় তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট আয়োজিত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাঁদের সহধর্মিণীদের সম্মানে অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।

২৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতঃরাশ বৈঠকে মতবিনিময় করবেন। এরপর তিনি ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে ও স্পেন আয়োজিত বৈশ্বিক বৈষম্য সংকট মোকাবিলাবিষয়ক এক সভায় বক্তব্য দেবেন। বিকেলে যোগ দেবেন জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সভায়। একই দিন বাংলাদেশের আয়োজনে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক একটি সাইড ইভেন্টেও অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী, যেখানে তিনি রোহিঙ্গাদের দ্রুততম সময়ে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা চাইবেন। বর্তমানে বাংলাদেশে ১৩ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে, এবং প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনে জোরালো আহ্বান জানাবেন বলে জানা গেছে।

২৪ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার, প্রধানমন্ত্রী দুটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। সকালে অধিবেশনের সভাপতি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত অস্তিত্বগত হুমকি মোকাবিলাবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সভায় উদ্বোধনী বক্তব্য দেবেন, যেখানে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, লস অ্যান্ড ড্যামেজ এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরবেন। বিকেলে সাধারণ বিতর্ক পর্বে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী—জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বৈশ্বিক মঞ্চে এটিই তাঁর প্রথম ভাষণ। এ ছাড়া একই দিন মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং মিডওয়াইফারি বিষয়ক আরেকটি সাইড ইভেন্টে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেবেন, যেখানে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের উদ্যোগ ও দক্ষ ধাত্রীসেবার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরবেন।

সম্মেলনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্সসহ ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন, যেখানে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য-বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা ও রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা হবে। এ ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত, শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার, মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার এবং ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও সাক্ষাতের কথা রয়েছে তাঁর। অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে ওয়াল স্ট্রিট ও মেটাসহ কিছু শীর্ষ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী, যেখানে বাংলাদেশের অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশ, উৎপাদন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা এবং তরুণদের জন্য মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে। সফর শেষে ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক সময় রাত ১১টায় এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে জেএফকে বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী।

নিউইয়র্ক থেকে পাঠানো এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রতিনিধিদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে, একের পর এক প্রতিনিধিদল এসে জড়ো হচ্ছে সদর দপ্তরে। এই অধিবেশনকে ঘিরে যেমন গোটা বিশ্বের দৃষ্টি নিউইয়র্কের দিকে, তেমনি বাংলাদেশেরও রয়েছে অনেক প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষা।

ইউনূসের আহ্বান: সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তি

অধিবেশনের উদ্বোধনী দিনে সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ‘সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তি’ বিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টের ১১তম আসরে বক্তব্য দেন শান্তিতে নোবেলজয়ী ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি সামাজিক ব্যবসা, তরুণ প্রজন্ম ও প্রযুক্তির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি ইতিবাচক পৃথিবী গড়ে তোলার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, তিমুর-লেস্তের প্রেসিডেন্ট হোসে রামোস-হোর্তা এবং ব্রাজিলের সামাজিক উন্নয়ন ও সহায়তা, পরিবার ও ক্ষুধামুক্তিমন্ত্রী ওয়েলিংটন দিয়াসসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, বর্তমান বিশ্ব কূটনীতিতে শব্দের প্রকৃত অর্থ প্রায়ই হারিয়ে যায়, যে কারণে যুদ্ধ ও শান্তির মতো মৌলিক ধারণার মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবারের অধিবেশন শব্দের স্পষ্টতা ও প্রকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখবে, কারণ বিশ্বের সাধারণ মানুষের বড় আকাঙ্ক্ষা এখন এই অধিবেশনের দিকেই নিবদ্ধ। ক্ষুদ্রঋণের ৫০ বছর পূর্তির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত ‘গ্রামীণ আমেরিকা’ কর্মসূচি দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে উন্নত বিশ্বেও প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব। ২০০৮ সালে নিউইয়র্কে মাত্র ৫০০ ডলারের সর্বোচ্চ ঋণসীমা দিয়ে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম আজ আট বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ বিতরণ করেছে, যার পরিশোধের হার প্রায় শতভাগ। হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের পাশাপাশি পুরুষদেরও এই কাঠামোর আওতায় সফলভাবে যুক্ত করা হচ্ছে, তবে আমানত গ্রহণ বা সঞ্চয় ব্যবস্থাপনায় এখনও কিছু আইনি বাধা রয়ে গেছে বলে জানান তিনি।

সামাজিক ব্যবসার তাৎপর্য তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, অর্থ উপার্জন মানুষকে সুখ দিতে পারে, তবে অন্যের জীবনকে ইতিবাচকভাবে স্পর্শ করতে পারাটাই পরম আনন্দের। মুনাফাকেন্দ্রিক না হয়ে মানুষের সমস্যা সমাধানের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজ করে সামাজিক ব্যবসা। বাংলাদেশে এই মডেলের আওতায় ১৫৩টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে, আর গ্রামীণ ফোনের সুবিধার মাধ্যমে দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষ সরাসরি চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে সেবা পাচ্ছেন। পাশাপাশি চক্ষু হাসপাতালের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে, যা নিজেদের উদ্বৃত্ত আয় থেকেই নতুন নতুন হাসপাতাল নির্মাণে সক্ষম।

তরুণদের উদ্দেশে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে মূলত চাকরিপ্রত্যাশী বানিয়ে তোলে, অথচ মানুষ জন্মগতভাবেই উদ্যোক্তা। এই ধারণা বাস্তবায়নে আগামী ডিসেম্বরে ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’ কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। ‘তিন শূন্যের পৃথিবী’ গড়ার লক্ষ্য সামনে রেখে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয় তরুণদের শুধু সনদের পেছনে না ছুটে সরাসরি উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে। দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও নেট কার্বন নিঃসরণমুক্ত পৃথিবী গড়তে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

গুতেরেসের হুঁশিয়ারি: নিরাপত্তা পরিষদ কার্যত অচল

আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, যুদ্ধগুলোতে ‘পরাশক্তি’ ও নিরাপত্তা পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের সম্পৃক্ততা এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ধারাবাহিকতা বিশ্বে সংকট তৈরি করেছে। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ বাড়ছে এবং সংঘাতগুলো ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে; একই সঙ্গে ভূরাজনৈতিক বিভাজন গভীর হওয়ায় নিরাপত্তা পরিষদ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে, ফলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও অসহায় মানুষগুলো অত্যন্ত সংকটজনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। এর ফলে এমন এক দায়মুক্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে মাঝারি শক্তির দেশগুলো মনে করছে তারা যা খুশি করতে পারে, কারণ এজন্য তাদের কোনো পরিণতি ভোগ করতে হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ সাধারণ মানুষের জীবনে কী প্রভাব ফেলছে, বিশেষত খাদ্যের প্রাপ্যতা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ওপর—তা তুলে ধরে গুতেরেস বলেন, কৃষিপণ্য, সার ও জ্বালানি রপ্তানির ক্ষেত্রে কৃষ্ণসাগরকেন্দ্রিক সমস্যার সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধকে যদি হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল স্থাপনায় হামলার বিষয়গুলোর সঙ্গে একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়, তাহলে বিশ্বজুড়ে বহু অর্থনীতির ওপর এর ধ্বংসাত্মক প্রভাব স্পষ্ট হয়। উন্নত দেশগুলোতে সুদের হার ও জ্বালানির দাম বেড়ে গেলেও তা একসময় সামাল দেওয়া সম্ভব, কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বের মানুষ ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ও খাদ্য ব্যয় এবং সারের সংকটের কারণে চরম সংকটজনক পরিস্থিতিতে রয়েছে বলে জানান তিনি।

সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে গুতেরেস বলেন, একাধিক সংকটে জর্জরিত জাতিসংঘকে বৈশ্বিক অঙ্গনে প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ রাখতে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন, বিশেষত নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দেন তিনি। তাঁর ভাষায়, নিরাপত্তা পরিষদ এখনও মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বিশ্বব্যবস্থাকেই প্রতিনিধিত্ব করছে।

পর্তুগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সাবেক হাইকমিশনার গুতেরেস ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি মহাসচিবের দায়িত্ব নেন। তাঁর বর্তমান মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা, তবে উত্তরসূরি এখনও নির্ধারিত হয়নি। এই দৌড়ে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি, সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল এবং ইকুয়েডরের কূটনীতিক মারিয়া ফার্নান্দা এস্পিনোসা। মহাসচিব পদে কোনো প্রার্থীকে সুপারিশ করতে নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের মধ্যে অন্তত ৯ জনের সমর্থন প্রয়োজন, আর পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের কারও ভেটো পাওয়া যাবে না। এরপর সাধারণ পরিষদের ভোটে চূড়ান্ত হয় মহাসচিব নিয়োগ।

ইরানের অভিযোগ: আস্থা হারিয়েছে জাতিসংঘ

এদিকে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় ব্যর্থতার কারণে জাতিসংঘের ওপর থেকে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা পুরোপুরি হারিয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে পৌঁছে নিজের টেলিগ্রাম চ্যানেলে দেওয়া এক বার্তায় তিনি এ কথা জানান। আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর চাপিয়ে দেওয়া এক যুদ্ধের চরম উত্তেজনার মধ্যেই তাঁরা এই সফরে এসেছেন, আর এই বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে ইরানি জনগণের আইনি অধিকার, মর্যাদা ও স্বার্থ রক্ষা করাই তাঁদের মূল উদ্দেশ্য।

মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য ‘আস্থা পুনরুদ্ধার’ রাখা হয়েছে উল্লেখ করে আরাগচি বলেন, এতেই স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে আন্তর্জাতিক শান্তি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় জাতিসংঘের ওপর থেকে বিশ্ববাসীর আস্থা বিলুপ্ত হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু দেশ নিজেদের আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক বিবেকের ঊর্ধ্বে মনে করে ইচ্ছেমতো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, আর স্বজনপ্রীতির কারণে ইসরায়েল এর ফলে ছাড় পাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, মানবাধিকারের দাবিদার পশ্চিমা দেশগুলো এসব ঘটনার বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করছে।

সব মিলিয়ে, জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন সংস্থাটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন যেমন জোরালো হচ্ছে, তেমনি সংস্কারের দাবিও উঠছে ভিন্ন ভিন্ন কণ্ঠে। মহাসচিব গুতেরেসের হুঁশিয়ারি, ইরানের অভিযোগ আর বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর নতুন কূটনৈতিক প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে এবারের অধিবেশন হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী

২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

জাতিসংঘ অধিবেশনে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক উপস্থিতি

আপডেট সময় ০২:৩৯:৩২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম বার্ষিক অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে নিউইয়র্কে, এমন এক সময়ে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ, ইউক্রেন-রাশিয়ার চার বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন ঝুঁকি এবং খোদ জাতিসংঘের নিজের অস্তিত্ব রক্ষার সংকট একসঙ্গে বিশ্বমঞ্চে আলোচনায় উঠে এসেছে। নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় অনুযায়ী ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া সাধারণ বিতর্কে বিশ্বের প্রায় ১৩০টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান অংশ নিচ্ছেন। জাতিসংঘের বিভিন্ন কর্মসূচিতে বাজেট ছাঁটাই এবং সংস্থাটির শীর্ষ নেতৃত্বে আসন্ন পরিবর্তনের বিষয়টিও এবারের অধিবেশনে গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার সম্পর্কের টানাপোড়েনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা এখন যে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, বিশ্বনেতাদের বক্তব্যে সেই প্রসঙ্গও গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এবারের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, যিনি গত জুনে সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর আবারও সাধারণ পরিষদের মঞ্চে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইতিমধ্যে জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গ সংস্থা থেকে ওয়াশিংটনের অনুদান প্রত্যাহার এবং উচ্চ মাত্রায় পারস্পরিক শুল্কারোপের সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। জাতিসংঘের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের বকেয়া চাঁদা নিয়েও দেখা দিয়েছে সংকট। চলতি সপ্তাহেই ৭২৫ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হলেও ওয়াশিংটনের বকেয়া এখনো এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বলে জানা গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ চলতি বছরই শেষ হওয়ার বিষয়টি। নতুন নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের অধিবেশন এড়িয়ে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশ্বমঞ্চে সংস্থাটির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।

এই অধিবেশন ঘিরে বাংলাদেশের জন্যও রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। একদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান পুরো অধিবেশনের সভাপতিত্ব করছেন, অন্যদিকে নতুন গণতান্ত্রিক ধারায় যাত্রা শুরুর পর সরকারপ্রধান হিসেবে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে এই দ্বৈত উপস্থিতিকে একটি অনন্য অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক যাত্রা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান ও সফরসঙ্গীদের নিয়ে তুর্কি এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তুরস্কের স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ১০ মিনিটে ইস্তাম্বুল ছেড়ে নিউইয়র্কের উদ্দেশে রওনা হন। ইস্তাম্বুলে দুই ঘণ্টা ৩৫ মিনিটের যাত্রাবিরতি শেষে তাঁকে বহনকারী টার্কিশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটি স্থানীয় সময় সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টা ২০ মিনিটে) নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন জুবাইদা খান এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম।

জেএফকে বিমানবন্দর থেকে মোটরশোভাযাত্রা সহকারে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে যাওয়া হয় ‘হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্ক’ হোটেলে, নিউইয়র্ক সফরকালে যেখানে তিনি অবস্থান করবেন। হোটেলের সামনে ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন হাতে মিছিল ও স্লোগান দিয়ে তাঁকে স্বাগত জানান বিএনপির নেতাকর্মী ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা, আর প্রধানমন্ত্রী হাসিমুখে হাত নেড়ে তাদের শুভেচ্ছার জবাব দেন। হোটেলে তাঁকে স্বাগত জানান জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান।

সনাতন রীতি থেকে সরে এসে এবার তুলনামূলক ছোট প্রতিনিধিদল নিয়ে নিউইয়র্ক গেছেন প্রধানমন্ত্রী। সফরসঙ্গী হিসেবে সঙ্গে রয়েছেন স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ও শামা ওবায়েদ এবং ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন জানান, আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিনিধিদলে মাত্র ৩৫ জন রয়েছেন, তার সঙ্গে রয়েছেন শুধু অত্যাবশ্যকীয় মিডিয়া, নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত স্টাফ। যাতায়াতের দুই দিন বাদ দিলে প্রধানমন্ত্রী মাঝখানে মাত্র চার কর্মদিবস নিউইয়র্কে অবস্থান করবেন এবং সেই সময়ে বেশ কিছু দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেবেন।

নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাত ৯টায় হোটেলের লবিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মাহ্দী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের বার্তা তুলে ধরবেন। তিনি বলেন, ‘দেশপ্রেম, আবেগ, অনুভূতি এবং আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে দেশের ভবিষ্যৎ রূপকল্প কী হওয়া উচিত, কীভাবে বাংলাদেশের স্বার্থকে সুরক্ষিত রাখতে হবে এবং কীভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করা যাবে, সেগুলো বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।’ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পক্ষে নিজেদের অবস্থান, ভিশন ও পরিকল্পনা তুলে ধরেছিলেন। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আজকে তাদের সন্তান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঠিক একইভাবে বাবা-মায়ের মতো দেশপ্রেমকে ধারণ করে বাংলাদেশের স্বার্থ ও অধিকারের কথা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবেন।’ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানান, এবারের সফরের মূল উদ্দেশ্য জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদান হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলাদা কোনো বৈঠকের তেমন সুযোগ এবার থাকছে না।

আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সকালে জাতিসংঘ মহাসচিবের আমন্ত্রণে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের জন্য আয়োজিত এক স্বাগত প্রাতঃরাশে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হবে। এরপর তিনি অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্য বিশ্বনেতার সঙ্গে অংশ নেবেন, যেখানে সব দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা উপস্থিত থাকবেন। সন্ধ্যায় তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট আয়োজিত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাঁদের সহধর্মিণীদের সম্মানে অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।

২৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতঃরাশ বৈঠকে মতবিনিময় করবেন। এরপর তিনি ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে ও স্পেন আয়োজিত বৈশ্বিক বৈষম্য সংকট মোকাবিলাবিষয়ক এক সভায় বক্তব্য দেবেন। বিকেলে যোগ দেবেন জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সভায়। একই দিন বাংলাদেশের আয়োজনে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক একটি সাইড ইভেন্টেও অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী, যেখানে তিনি রোহিঙ্গাদের দ্রুততম সময়ে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা চাইবেন। বর্তমানে বাংলাদেশে ১৩ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে, এবং প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনে জোরালো আহ্বান জানাবেন বলে জানা গেছে।

২৪ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার, প্রধানমন্ত্রী দুটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। সকালে অধিবেশনের সভাপতি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত অস্তিত্বগত হুমকি মোকাবিলাবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সভায় উদ্বোধনী বক্তব্য দেবেন, যেখানে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, লস অ্যান্ড ড্যামেজ এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরবেন। বিকেলে সাধারণ বিতর্ক পর্বে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী—জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বৈশ্বিক মঞ্চে এটিই তাঁর প্রথম ভাষণ। এ ছাড়া একই দিন মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং মিডওয়াইফারি বিষয়ক আরেকটি সাইড ইভেন্টে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেবেন, যেখানে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের উদ্যোগ ও দক্ষ ধাত্রীসেবার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরবেন।

সম্মেলনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্সসহ ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন, যেখানে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য-বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা ও রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা হবে। এ ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত, শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার, মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার এবং ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও সাক্ষাতের কথা রয়েছে তাঁর। অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে ওয়াল স্ট্রিট ও মেটাসহ কিছু শীর্ষ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী, যেখানে বাংলাদেশের অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশ, উৎপাদন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা এবং তরুণদের জন্য মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে। সফর শেষে ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক সময় রাত ১১টায় এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে জেএফকে বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী।

নিউইয়র্ক থেকে পাঠানো এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রতিনিধিদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে, একের পর এক প্রতিনিধিদল এসে জড়ো হচ্ছে সদর দপ্তরে। এই অধিবেশনকে ঘিরে যেমন গোটা বিশ্বের দৃষ্টি নিউইয়র্কের দিকে, তেমনি বাংলাদেশেরও রয়েছে অনেক প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষা।

ইউনূসের আহ্বান: সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তি

অধিবেশনের উদ্বোধনী দিনে সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ‘সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তি’ বিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টের ১১তম আসরে বক্তব্য দেন শান্তিতে নোবেলজয়ী ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি সামাজিক ব্যবসা, তরুণ প্রজন্ম ও প্রযুক্তির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি ইতিবাচক পৃথিবী গড়ে তোলার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, তিমুর-লেস্তের প্রেসিডেন্ট হোসে রামোস-হোর্তা এবং ব্রাজিলের সামাজিক উন্নয়ন ও সহায়তা, পরিবার ও ক্ষুধামুক্তিমন্ত্রী ওয়েলিংটন দিয়াসসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, বর্তমান বিশ্ব কূটনীতিতে শব্দের প্রকৃত অর্থ প্রায়ই হারিয়ে যায়, যে কারণে যুদ্ধ ও শান্তির মতো মৌলিক ধারণার মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবারের অধিবেশন শব্দের স্পষ্টতা ও প্রকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখবে, কারণ বিশ্বের সাধারণ মানুষের বড় আকাঙ্ক্ষা এখন এই অধিবেশনের দিকেই নিবদ্ধ। ক্ষুদ্রঋণের ৫০ বছর পূর্তির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত ‘গ্রামীণ আমেরিকা’ কর্মসূচি দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে উন্নত বিশ্বেও প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব। ২০০৮ সালে নিউইয়র্কে মাত্র ৫০০ ডলারের সর্বোচ্চ ঋণসীমা দিয়ে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম আজ আট বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ বিতরণ করেছে, যার পরিশোধের হার প্রায় শতভাগ। হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের পাশাপাশি পুরুষদেরও এই কাঠামোর আওতায় সফলভাবে যুক্ত করা হচ্ছে, তবে আমানত গ্রহণ বা সঞ্চয় ব্যবস্থাপনায় এখনও কিছু আইনি বাধা রয়ে গেছে বলে জানান তিনি।

সামাজিক ব্যবসার তাৎপর্য তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, অর্থ উপার্জন মানুষকে সুখ দিতে পারে, তবে অন্যের জীবনকে ইতিবাচকভাবে স্পর্শ করতে পারাটাই পরম আনন্দের। মুনাফাকেন্দ্রিক না হয়ে মানুষের সমস্যা সমাধানের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজ করে সামাজিক ব্যবসা। বাংলাদেশে এই মডেলের আওতায় ১৫৩টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে, আর গ্রামীণ ফোনের সুবিধার মাধ্যমে দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষ সরাসরি চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে সেবা পাচ্ছেন। পাশাপাশি চক্ষু হাসপাতালের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে, যা নিজেদের উদ্বৃত্ত আয় থেকেই নতুন নতুন হাসপাতাল নির্মাণে সক্ষম।

তরুণদের উদ্দেশে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে মূলত চাকরিপ্রত্যাশী বানিয়ে তোলে, অথচ মানুষ জন্মগতভাবেই উদ্যোক্তা। এই ধারণা বাস্তবায়নে আগামী ডিসেম্বরে ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’ কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। ‘তিন শূন্যের পৃথিবী’ গড়ার লক্ষ্য সামনে রেখে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয় তরুণদের শুধু সনদের পেছনে না ছুটে সরাসরি উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে। দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও নেট কার্বন নিঃসরণমুক্ত পৃথিবী গড়তে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

গুতেরেসের হুঁশিয়ারি: নিরাপত্তা পরিষদ কার্যত অচল

আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, যুদ্ধগুলোতে ‘পরাশক্তি’ ও নিরাপত্তা পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের সম্পৃক্ততা এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ধারাবাহিকতা বিশ্বে সংকট তৈরি করেছে। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ বাড়ছে এবং সংঘাতগুলো ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে; একই সঙ্গে ভূরাজনৈতিক বিভাজন গভীর হওয়ায় নিরাপত্তা পরিষদ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে, ফলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও অসহায় মানুষগুলো অত্যন্ত সংকটজনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। এর ফলে এমন এক দায়মুক্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে মাঝারি শক্তির দেশগুলো মনে করছে তারা যা খুশি করতে পারে, কারণ এজন্য তাদের কোনো পরিণতি ভোগ করতে হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ সাধারণ মানুষের জীবনে কী প্রভাব ফেলছে, বিশেষত খাদ্যের প্রাপ্যতা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ওপর—তা তুলে ধরে গুতেরেস বলেন, কৃষিপণ্য, সার ও জ্বালানি রপ্তানির ক্ষেত্রে কৃষ্ণসাগরকেন্দ্রিক সমস্যার সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধকে যদি হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল স্থাপনায় হামলার বিষয়গুলোর সঙ্গে একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়, তাহলে বিশ্বজুড়ে বহু অর্থনীতির ওপর এর ধ্বংসাত্মক প্রভাব স্পষ্ট হয়। উন্নত দেশগুলোতে সুদের হার ও জ্বালানির দাম বেড়ে গেলেও তা একসময় সামাল দেওয়া সম্ভব, কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বের মানুষ ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ও খাদ্য ব্যয় এবং সারের সংকটের কারণে চরম সংকটজনক পরিস্থিতিতে রয়েছে বলে জানান তিনি।

সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে গুতেরেস বলেন, একাধিক সংকটে জর্জরিত জাতিসংঘকে বৈশ্বিক অঙ্গনে প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ রাখতে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন, বিশেষত নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দেন তিনি। তাঁর ভাষায়, নিরাপত্তা পরিষদ এখনও মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বিশ্বব্যবস্থাকেই প্রতিনিধিত্ব করছে।

পর্তুগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সাবেক হাইকমিশনার গুতেরেস ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি মহাসচিবের দায়িত্ব নেন। তাঁর বর্তমান মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা, তবে উত্তরসূরি এখনও নির্ধারিত হয়নি। এই দৌড়ে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি, সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল এবং ইকুয়েডরের কূটনীতিক মারিয়া ফার্নান্দা এস্পিনোসা। মহাসচিব পদে কোনো প্রার্থীকে সুপারিশ করতে নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের মধ্যে অন্তত ৯ জনের সমর্থন প্রয়োজন, আর পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের কারও ভেটো পাওয়া যাবে না। এরপর সাধারণ পরিষদের ভোটে চূড়ান্ত হয় মহাসচিব নিয়োগ।

ইরানের অভিযোগ: আস্থা হারিয়েছে জাতিসংঘ

এদিকে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় ব্যর্থতার কারণে জাতিসংঘের ওপর থেকে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা পুরোপুরি হারিয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে পৌঁছে নিজের টেলিগ্রাম চ্যানেলে দেওয়া এক বার্তায় তিনি এ কথা জানান। আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর চাপিয়ে দেওয়া এক যুদ্ধের চরম উত্তেজনার মধ্যেই তাঁরা এই সফরে এসেছেন, আর এই বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে ইরানি জনগণের আইনি অধিকার, মর্যাদা ও স্বার্থ রক্ষা করাই তাঁদের মূল উদ্দেশ্য।

মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য ‘আস্থা পুনরুদ্ধার’ রাখা হয়েছে উল্লেখ করে আরাগচি বলেন, এতেই স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে আন্তর্জাতিক শান্তি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় জাতিসংঘের ওপর থেকে বিশ্ববাসীর আস্থা বিলুপ্ত হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু দেশ নিজেদের আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক বিবেকের ঊর্ধ্বে মনে করে ইচ্ছেমতো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, আর স্বজনপ্রীতির কারণে ইসরায়েল এর ফলে ছাড় পাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, মানবাধিকারের দাবিদার পশ্চিমা দেশগুলো এসব ঘটনার বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করছে।

সব মিলিয়ে, জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন সংস্থাটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন যেমন জোরালো হচ্ছে, তেমনি সংস্কারের দাবিও উঠছে ভিন্ন ভিন্ন কণ্ঠে। মহাসচিব গুতেরেসের হুঁশিয়ারি, ইরানের অভিযোগ আর বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর নতুন কূটনৈতিক প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে এবারের অধিবেশন হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র।

Share this news as a Photo Card