কি ভাবছেন? আমেরিকার মত মহাপরাশক্তি এবং ইসরাইলের মত পরাশক্তি একত্রিত হয়ে ইরানের উপরে আগ্রাসন চালাচ্ছে, হেরে যাবে ইরান? আমার মনে হয় না। পৃথিবীতে সর্বশ্রেষ্ঠ পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকাকে ধরা হয়, সেই আমেরিকা ইরানের হৃদয়কে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে প্রথম দিনেই। তারপরও কি ইরান হাল ছেড়ে দিয়েছে? কিংবা আমেরিকা যে ভেবেছিল তারা সফল, তারা কি তার দেখা পেয়েছে, পায়নি। ১৯৬৭ সালে ছয় দিনের যুদ্ধে একদিকে ছিল ইসরাইল আর অন্যদিকে ছিল কয়েকটি আরব দেশ। যুদ্ধে অংশ নেওয়া দেশ মিশর, সিরিয়া ও জর্ডান সরাসরি পরাজিত হয়েছিল এবং তাদের সাথে ছিল ইরাক, সৌদি আরব ও কুয়েত সহ কয়েকটি আরব দেশ। এতগুলো দেশ সম্মিলিতভাবে ইসরাইলকে শায়েস্তা করতে পারেনি উল্টো মাত্র ছয় দিনে যুদ্ধে হেরে মুসলিম বিশ্বের মান ইজ্জত ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল। ইসরাইল মাত্র ৬ দিনের মধ্যেই বড় জয় পায় এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখল করে—
Gaza Strip ও Sinai Peninsula (মিশর থেকে)
West Bank ও East Jerusalem (জর্ডান থেকে)
Golan Heights (সিরিয়া থেকে) যা আজও ইসরাইলের অধিকৃত ভূমি হিসাবে স্বীকৃত।
সেই পরাশক্তি ইসরাইল ও মহা পরাশক্তি আমেরিকার সাথে ইরান একাই লড়ছে নির্ভীকভাবে সাতদিন হয়ে গেছে, এটাই তো ইরানের জয়। খামেনি হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে তারা কাস্পিয়ান সাগর, ভুমধ্য সাগর, লোহিত সাগর ও পারস্যের উপকূলে যেভাবে আঘাত হেনেছে তা অকল্পনীয় ও অভাবিত। যেখানে ছয়টি দেশ এক ইসরাইলের কাছেই পরাজিত হয়েছিল শোচনীয়ভাবে এবং ভূমি হারিয়েছিল মাত্র ছয় দিনে সেখানে ইরান দুই দুইটা পরাশক্তির সাথে বুকের পাটা দেখিয়ে যেভাবে লড়ছে সেটাই তো জয়। আমেরিকা ও ইসরাইল গত সাত দিনে ইরানে সাড়ে চার হাজার বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে যা ইরানকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার শামিল এবং ইরানের তেল শোধনাগার ও ডিপোতে যে আঘাত এসেছে ইরানের আকাশে কালো বৃষ্টি, এসিড বৃষ্টি হওয়ার অপেক্ষা তবু ইরান ভয় পায়নি।
আরব সাগর থেকে মার খেয়ে আমেরিকার রণতরী আব্রাহাম লিংকন ভারত মহাসাগরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে এখানেও ইরানের জয়। যেই রণতরীর কথা শুনলে পৃথিবীর অনেক দেশেরই পিলে চমকে ওঠে সেই রনতরী ইরানের মার খেয়ে ভারত মহাসাগরে আশ্রয় নিয়েছে, ভাবা যায়? ইরান আগেই বলেছিল তারা আক্রান্ত হলে গালফ কান্ট্রি গুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো অক্ষত রাখবে না, এবং ইসরাইলকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিবে। বর্তমানে কার্যত ইসরাইল মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে সময়ের অপেক্ষা মাত্র, ইরান কথা রেখেছে। যা পৃথিবীর কোন দেশ করে দেখাতে পারেনি ইরান সেটা করে দেখিয়েছে এখানেও ইরানের সাফল্য। আমেরিকা ও ইসরাইল তাদের ক্ষতির কথা মিডিয়া বা কোথাও তুলে ধরে না এবং নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে ।তবুও যতটুকু দেখা যায় তাতে তাদের ক্ষতি কম নয়, পরাশক্তি হিসেবে যা লজ্জার। আমেরিকা ও ইসরাইল তাদের প্রযুক্তিগত যত মারণাস্ত্র আছে সবই ইরানে প্রয়োগ করেছে । তারপরও ইরানকে দমাতে পারছে না, উল্টো মার খাচ্ছে এটাও বিস্ময়। গত ৪০ বছরের সময়কাল ধরে ইরান নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আছে। তাদের অর্থনীতি, তাদের শিল্পোদ্যোগ সবকিছুই ভঙ্গুর অবস্থায় আছে তারপরও তারা ধীরে ধীরে দীর্ঘযুদ্ধের জন্য যে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে তা জাতীয়তাবাদী শক্তি, নৈতিকতা ও ঐক্য ছাড়া সম্ভব নয়।
বিশ্বের পরাশক্তি গুলো ইরানকে নিজ থেকে ভেঙ্গে দিতে চেয়েছে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে। ইরান সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করে সিংহের গর্জন দিয়ে এখনো দাঁড়িয়েছে আছে। তারা আক্রান্ত হয়েছে তারা আগ্রাসী নয়, তাদের প্রত্যাঘাতে যেভাবে আরব দেশগুলো ভয়ে চুপসে রয়েছে এটাও ইরানের বিজয়। আরব দেশগুলো মার খাওয়ার পরও ইরানের বিরুদ্ধে টু শব্দটি করার মত সাহস দেখাতে পারছে না। পক্ষান্তরে তাদের বিলাসবহুল জীবন, সাজানো বাগান তছনছ হবার ভয় এবং ক্ষমতা হারানোর ভয় তাদেরকে পেয়ে বসেছে। আরব দেশগুলো আমেরিকার কাছে তাদের তল্পিতল্পা তুলে দিয়েছে। তাদের গ্যাস, তাদের তেল, তাদের অর্থ, তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে আমেরিকা! হায় সেলুকাস এটা কোন দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার মূল মন্ত্র হতে পারে? যে আমেরিকার কাছে তারা সবকিছু তুলে দিয়ে বসে আছে সেই আমেরিকা ইরানের মার খেয়ে ঘাঁটি ছেড়ে পালিয়েছে, লোকালয়ে। আরব বিশ্বকে কে রক্ষা করবে?
আমেরিকাতে আরব বিশ্বের বিনিয়োগ বিলিয়ন ডলার থেকে ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে । মূলত আমেরিকায় সৌদি আরব, আরব আমিরাত ও কাতার বিনিয়োগে সবচেয়ে বেশি। আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে আমেরিকা নিজের বুদ্ধিতে চলে না, চলে ইসরাইলি বুদ্ধিতে। ইসরাইলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে আমেরিকা ফেঁসে গেছে। ইসরাইল আমেরিকার মাথায় বন্দুক রেখে ফায়ার করছে এবং আমেরিকার অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে যেটা ইসরাইলের চালাকি ছাড়া অন্য কিছু নয়। ইরানে আগ্রাসনের পর আমেরিকার কয়েক বিলিয়ন ডলার সাত দিনেই ক্ষতি হয়েছে, আমেরিকার রাডার সিস্টেম ধ্বংস, গালফ কান্ট্রি গুলোতে তাদের ঘাঁটিগুলো ধ্বংস, আমেরিকাকে ইমেজ সংকটে ফেলে দিয়েছে। এত বড় পরাশক্তি হয়েও এত এত প্রতিরক্ষা সিস্টেম থাকার পরেও তারা তাদের ঘাঁটিগুলোকে রক্ষা করতে পারেনি। আর আরব বিশ্ব বসে আছে আমেরিকা তাদেরকে রক্ষা করবে আমরা কোন বোধের স্বর্গে বাস করছি এটাই প্রশ্নবিদ্ধ, এটাই ইসলামী উম্মা?
ইরানের ক্ষতিও কম নয়, মানবিক, অবকাঠামো, অর্থনৈতিক এবং সামরিক ক্ষতি অকল্পনীয়। তবুও দুই দুইটা পরাশক্তির বিরুদ্ধে নেতিয়ে পড়েনি, ভয় পায়নি, বুক চেতিয়ে, মাথা উঁচিয়ে যুদ্ধ করে যাচ্ছে এটাই ইরানের জয়। ইরানের মিসাইল সিটিতে আমেরিকা ও ইসরাইলের হামলা করেছে। তারপরও তারা দমে যায়নি, এবং আমেরিকান ঘাঁটি ও ইসরাইলে মিসাইল হামলা চালাচ্ছে তার মানে তাদের সক্ষমতা ফুরায়নি। তাদের সস্তা ড্রোন আমেরিকা ও ইসরাইলের মাথা ব্যাথার প্রধান কারণ যা মানবিক ও অবকাঠামো ধ্বংস করছে, আবার ড্রোন রুখতে গিয়ে এন্টিসেপ্টর ব্যবহারে অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস হচ্ছে , কথায় বলে লাখ টাকার বাগান খাইলো দুই টাকার ছাগলে। বিশ হাজার ডলারের একটি ড্রোনকে ঠেকাতে তিন চারটি দেড় কোটি টাকা দামের এন্টিসেপ্টর ব্যবহার করতে হয় ভাবতে পারছেন। বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সমরবিদ এবং প্রযুক্তি নিয়ে আমেরিকা ইরানকে দমাতে হিমশীম খাচ্ছে। ইরানকে নেতৃত্ব শূন্য করতে ইসরাইল ও আমেরিকার দীর্ঘদিনের আঘাত এবং হত্যাকাণ্ডের পরেও ইরানকে নেতৃত্ব শূন্য করতে পারেনি এবং তারা বীর দর্পে সম্মুখ সমরে অগ্রগামী কারণ তারা আদর্শিক এবং দেশ রক্ষায় অকুতোভয় প্রেম। আসলে ইরানকে নেতৃত্বশুণ্য করাই আমেরিকার উদ্দেশ্য নয়, আমেরিকা হামলা করেছে ইরানের তেলের লোভে। এবং ইরানের তেল সমৃদ্ধ এলাকাগুলো নিয়ে আমেরিকা নতুন রাষ্ট্র গঠন করতে চাচ্ছে, ইতিহাস জানা থাকলে এমনটা হতো না, যা পারস্য ইতিহাসে নজিরবিহীন। ৫০০০ বছর যাবত ইরান তার অখন্ডতা এবং মানচিত্র ধরে রেখেছে।
আয়াতুল্লাহ আলী খামিনির মৃত্যুর পর বর্তমান নেতৃত্ব আরো বেশি তেজস্বী ও আগ্রাসী, খামিনীর ডিফেন্সিভ ফর্মুলা থেকে বর্তমান নেতৃত্ব অফেন্সিভ। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামিনি ধীরস্থিরভাবে সিদ্ধান্ত নিতেন কিন্তু বর্তমান নেতৃত্ব এতটা ধীর স্থির নয়, তারা প্রচন্ডভাবে অফেন্সিভ, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য তাদের অলআউট পারফরম্যান্স বিশ্বকে ভাবিয়ে তুলেছে এবং বিশ্বকে অর্থনৈতিকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। আমেরিকা এত হুমকি ধামকি দিয়েও হরমুজ প্রণালীতে একটা জাহাজও অতিক্রম করাতে পারেনি এখানেও ইরান অপরাজেয়। ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা এবং বিমান বাহিনী উল্লেখযোগ্য নয় এবং অনেক দুর্বল, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার ফলে তারা বিমানবাহিনীকে উন্নত করতে পারেনি কিন্তু তা পুষিয়ে দিয়েছে আকাশ জয় করা মিসাইল দিয়ে। ইরানের নৌ-বাহিনী অসামান্য তেজ ও সাহসী হয়ে আমেরিকা ও ইসরাইলকে সাগরে রুখে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালীর কাছে তারা গত আট দিনেও আসতে পারেনি, সমুদ্রে অজেয় আমেরিকা এতদিনে হরমুজ প্রণালী দখল করতে পারেনি এটাও ইরানের জয়।
রাশিয়া ও চীন ইরানের পক্ষে সম্মুখ সমরে আসবেনা কারণ তারা ব্যবসায়ী, তারা লাভ ছাড়া কিছুই বোঝে না। ব্যবসায়ীদের চরিত্রই এমন সবসময়ই লাভ করতে চায়। আমাদের দেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। আমাদের জাতীয় সংসদে রাজনীতিবিদের চেয়ে বেশিরভাগ সদস্য ব্যবসায়ী, বিধায় জনগণের কথা বলার মত সংসদ সদস্য খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই ব্যবসায়ী নেতাদেরই উন্নয়ন ঘটে, মানুষের উন্নয়ন ঘটে না। চীন সস্তায় আমেরিকার রক্তচক্ষু ও সমস্ত নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইরান থেকে তেল কিনে, যা ইরানের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছে। অন্য কোন দেশ ইরানের তেল কেনার সাহস পায় না। ইরান তেল বিক্রি করতে না পারলে তাদের অর্থনীতির পাশাপাশি সামরিক খাতেও বিপর্যস্ত হয়ে পড়তো। মিসাইল সিটি এবং ড্রোন উৎপাদন করার মত অর্থনৈতিক সক্ষমতা থাকত না, বিধায় ইরান চীনকে বন্ধুই মনে করে আর চীন করে ব্যবসা, কম দামে তেল কিনে নিজে লাভবান হয়, ইরানের পক্ষে চীন আসবে বলে আমার মনে হয়নি। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া ফেঁসে যাবার পর ইরান থেকে শাহেদ ড্রোন কিনে নিজেদের সক্ষমতা টিকিয়ে রেখেছে এবং এক পরাশক্তি রাশিয়ার কাছে শিল্পোন্নত এবং সামরিক খাতে অপ্রতিরোধ্য ন্যাটো ভুক্ত দেশ সমূহ বা ইউরোপ আমেরিকা গত চার বছর যাবত মার খাচ্ছে। একটি পরাশক্তি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়েও কূল করতে পারছে না। সেখানে দুই দুইটি পরাশক্তি আমেরিকা ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইরানের টিকে থাকার সক্ষমতা! এটাই তো ইরানের জয়।
লেখক : কবি, সংগঠক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক।
মুহাম্মদ আমির হোসেন 






















