ঢাকা ০৫:২৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ফেসবুক কালচার নিয়ে উদ্বেগ

তরুণ প্রজন্ম ‘ইনস্ট্যান্ট কফির’ মতো : শিক্ষামন্ত্রী

দেশের বর্তমান তরুণ প্রজন্মের চারিত্রিক ও মানসিক বিবর্তন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি তরুণদের তুলনা করেছেন ‘ইনস্ট্যান্ট কফির’ সঙ্গে, যারা দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা বা গভীর বিশ্লেষণের চেয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখাতেই বেশি পছন্দ করে। মন্ত্রীর মতে, এই প্রবণতা দেশের গবেষণা ও উদ্ভাবনী ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় অন্তরায়।

আজ রোববার (২৬ এপ্রিল) ‘বিশ্ব মেধাস্বত্ব দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) আয়োজিত এক বিশেষ কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গবেষণা ও উদ্ভাবন কার্যক্রমকে গতিশীল করা এবং উদ্ভাবকদের স্বার্থ সুরক্ষার লক্ষ্যেই এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়।

তরুণদের ‘ইনস্ট্যান্ট’ আচরণের সমালোচনা
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার ২৭ শতাংশই তরুণ। এটি একটি বিশাল শক্তি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই প্রজন্ম ‘ইনস্ট্যান্ট কফির’ মতো আচরণ করছে। তারা ফেসবুকে ইনস্ট্যান্ট কমেন্ট করে, ইনস্ট্যান্ট রিয়েক্ট করে। কোনো বিষয় নিয়ে গভীরভাবে ভাবার বা বিশ্লেষণ করার ধৈর্য তাদের নেই। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তারা সঠিক বিষয়টি বোঝার সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে।”

তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি দেশের এক-চতুর্থাংশ জনশক্তি কেবল তাৎক্ষণিক আবেগের বশবর্তী হয়ে কাজ করে, তবে দেশ কীভাবে বিশ্বমানের গবেষণা ও উদ্ভাবনের দিকে এগিয়ে যাবে? তিনি মনে করেন, মেধার সঠিক বিকাশ ঘটাতে হলে ধৈর্য এবং গভীর পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন, যা বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে ক্রমহ্রাসমান।

ফেসবুক ও ‘ভাইরাল’ হওয়ার নেশা
বক্তব্যের এক পর্যায়ে শিক্ষামন্ত্রী বর্তমান সময়ের সোশ্যাল মিডিয়া সংস্কৃতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “এখনকার তরুণদের কাছে জীবনের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া। এমনকি স্কুল-কলেজের ইউনিফর্ম পরে ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষক ও মন্ত্রীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করতে দ্বিধা করছে না। প্রশ্ন জাগে, আমরা আমাদের তরুণ প্রজন্মকে নৈতিকতা বিবর্জিত কোন গহ্বরে নিয়ে যাচ্ছি? আমরা কোনো কিছুই যেন নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না।”

ফেসবুক লাইভ এবং সেখানে আসা অসংলগ্ন মন্তব্যের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “অনেকেই লাইভে এসে ‘হাই’, ‘গো অ্যাহেড’ বা ‘ডু আ রিসার্চ’-এর মতো উদ্দেশ্যহীন মন্তব্য করেন। এগুলো কোনো গঠনমূলক আলোচনার অংশ নয়, বরং এক ধরনের সাময়িক উন্মাদনা যা উদ্দেশ্যহীনভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।”

মেধাস্বত্ব রক্ষায় প্রশাসনিক দুর্বলতা
বিশ্ব মেধাস্বত্ব দিবসের গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব বা ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি (IP) ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “আমাদের দেশের উদ্ভাবকদের অনেক সৃজনশীল কাজ এবং মেধাস্বত্ব অন্য দেশে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন ও ট্রেডমার্ক পাচ্ছে। আমরা নিজের দেশে তা যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারছি না। এর পেছনে আমাদের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার দুর্বলতা অনেকাংশে দায়ী।”

তিনি ইউজিসি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্ভাবকদের স্বার্থ রক্ষায় আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি মনে করেন, যদি উদ্ভাবকদের মেধাস্বত্ব সুরক্ষা দেওয়া না যায়, তবে তরুণরা গবেষণার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।

গবেষণামুখী প্রজন্ম গড়ার ডাক
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, কেবল ভাইরাল হওয়ার পেছনে না ছুটে তরুণদের মৌলিক গবেষণা ও সৃজনশীল কাজে মনোনিবেশ করতে হবে। দেশের উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে উদ্ভাবনী মেধার বিকল্প নেই। তিনি শিক্ষক এবং অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান যেন তারা সন্তানদের প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং নৈতিকতা শিক্ষা দেন।

ইউজিসি আয়োজিত এই কর্মশালায় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, গবেষক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা মন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে মেধাস্বত্ব আইন আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

ফেসবুক কালচার নিয়ে উদ্বেগ

তরুণ প্রজন্ম ‘ইনস্ট্যান্ট কফির’ মতো : শিক্ষামন্ত্রী

আপডেট সময় ০২:০৯:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬

দেশের বর্তমান তরুণ প্রজন্মের চারিত্রিক ও মানসিক বিবর্তন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি তরুণদের তুলনা করেছেন ‘ইনস্ট্যান্ট কফির’ সঙ্গে, যারা দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা বা গভীর বিশ্লেষণের চেয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখাতেই বেশি পছন্দ করে। মন্ত্রীর মতে, এই প্রবণতা দেশের গবেষণা ও উদ্ভাবনী ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় অন্তরায়।

আজ রোববার (২৬ এপ্রিল) ‘বিশ্ব মেধাস্বত্ব দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) আয়োজিত এক বিশেষ কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গবেষণা ও উদ্ভাবন কার্যক্রমকে গতিশীল করা এবং উদ্ভাবকদের স্বার্থ সুরক্ষার লক্ষ্যেই এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়।

তরুণদের ‘ইনস্ট্যান্ট’ আচরণের সমালোচনা
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার ২৭ শতাংশই তরুণ। এটি একটি বিশাল শক্তি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই প্রজন্ম ‘ইনস্ট্যান্ট কফির’ মতো আচরণ করছে। তারা ফেসবুকে ইনস্ট্যান্ট কমেন্ট করে, ইনস্ট্যান্ট রিয়েক্ট করে। কোনো বিষয় নিয়ে গভীরভাবে ভাবার বা বিশ্লেষণ করার ধৈর্য তাদের নেই। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তারা সঠিক বিষয়টি বোঝার সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে।”

তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি দেশের এক-চতুর্থাংশ জনশক্তি কেবল তাৎক্ষণিক আবেগের বশবর্তী হয়ে কাজ করে, তবে দেশ কীভাবে বিশ্বমানের গবেষণা ও উদ্ভাবনের দিকে এগিয়ে যাবে? তিনি মনে করেন, মেধার সঠিক বিকাশ ঘটাতে হলে ধৈর্য এবং গভীর পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন, যা বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে ক্রমহ্রাসমান।

ফেসবুক ও ‘ভাইরাল’ হওয়ার নেশা
বক্তব্যের এক পর্যায়ে শিক্ষামন্ত্রী বর্তমান সময়ের সোশ্যাল মিডিয়া সংস্কৃতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “এখনকার তরুণদের কাছে জীবনের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া। এমনকি স্কুল-কলেজের ইউনিফর্ম পরে ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষক ও মন্ত্রীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করতে দ্বিধা করছে না। প্রশ্ন জাগে, আমরা আমাদের তরুণ প্রজন্মকে নৈতিকতা বিবর্জিত কোন গহ্বরে নিয়ে যাচ্ছি? আমরা কোনো কিছুই যেন নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না।”

ফেসবুক লাইভ এবং সেখানে আসা অসংলগ্ন মন্তব্যের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “অনেকেই লাইভে এসে ‘হাই’, ‘গো অ্যাহেড’ বা ‘ডু আ রিসার্চ’-এর মতো উদ্দেশ্যহীন মন্তব্য করেন। এগুলো কোনো গঠনমূলক আলোচনার অংশ নয়, বরং এক ধরনের সাময়িক উন্মাদনা যা উদ্দেশ্যহীনভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।”

মেধাস্বত্ব রক্ষায় প্রশাসনিক দুর্বলতা
বিশ্ব মেধাস্বত্ব দিবসের গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব বা ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি (IP) ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “আমাদের দেশের উদ্ভাবকদের অনেক সৃজনশীল কাজ এবং মেধাস্বত্ব অন্য দেশে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন ও ট্রেডমার্ক পাচ্ছে। আমরা নিজের দেশে তা যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারছি না। এর পেছনে আমাদের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার দুর্বলতা অনেকাংশে দায়ী।”

তিনি ইউজিসি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্ভাবকদের স্বার্থ রক্ষায় আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি মনে করেন, যদি উদ্ভাবকদের মেধাস্বত্ব সুরক্ষা দেওয়া না যায়, তবে তরুণরা গবেষণার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।

গবেষণামুখী প্রজন্ম গড়ার ডাক
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, কেবল ভাইরাল হওয়ার পেছনে না ছুটে তরুণদের মৌলিক গবেষণা ও সৃজনশীল কাজে মনোনিবেশ করতে হবে। দেশের উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে উদ্ভাবনী মেধার বিকল্প নেই। তিনি শিক্ষক এবং অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান যেন তারা সন্তানদের প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং নৈতিকতা শিক্ষা দেন।

ইউজিসি আয়োজিত এই কর্মশালায় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, গবেষক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা মন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে মেধাস্বত্ব আইন আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।