ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য আর সম্প্রীতির অনন্য মেলবন্ধনে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে অনুষ্ঠিত হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব জগন্নাথদেবের রথযাত্রা। নানা আয়োজন ও রীতি মেনে আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে অনুষ্ঠিত এই উৎসবে অংশ নেন হাজারো নারী-পুরুষ, যাদের অংশগ্রহণে গোটা এলাকা পরিণত হয় এক ভক্তিমূলক উৎসবের নগরীতে।
বিকেল গড়াতেই শাহজাদপুর কেন্দ্রীয় মন্দির প্রাঙ্গণে জড়ো হতে শুরু করেন ভক্তরা। রথযাত্রা শুরুর আগে অনুষ্ঠিত হয় পূজা-অর্চনা ও বিশেষ প্রার্থনা, যেখানে অংশ নেন সব বয়সী মানুষ। মন্দির প্রাঙ্গণজুড়ে ভেসে বেড়ায় শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনির মিশ্র সুর, যা উৎসবকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত। এরপর কীর্তনের মধুর সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ, ভক্তদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় হরিনাম সংকীর্তন। এই ভক্তিমূলক পরিবেশেই শুরু হয় জগন্নাথদেবের রথযাত্রার মূল আয়োজন।
শোভাযাত্রা সহকারে রথ যখন এগিয়ে চলে, তখন রাস্তার দুই ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ঢল যেন আরও স্পষ্ট করে তোলে এই উৎসবের ব্যাপকতা। রথের রশি টানতে উদগ্রীব হয়ে ওঠেন অসংখ্য ভক্ত, কারণ প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী রথের রশি স্পর্শ করা কিংবা টানা পুণ্যের কাজ বলে বিবেচিত হয়। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ উৎসবকে দিয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা।
শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন গোটা আয়োজন
শাহজাদপুর কেন্দ্রীয় মন্দিরে অনুষ্ঠিত এই রথযাত্রা সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে পুরো অনুষ্ঠান পরিচালনা করা হয়, যেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাও ছিল যথেষ্ট মজবুত। স্থানীয় প্রশাসনের সার্বক্ষণিক তদারকিতে উৎসব আয়োজন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন উপস্থিত ভক্তরা।
উৎসবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাবরিনা শারমিন। তার উপস্থিতি আয়োজনের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয় এবং স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার এক দৃঢ় বার্তা বহন করে। এছাড়া নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা অফিসার ইনচার্জ সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশ প্রশাসনও ছিল তৎপর, যা উৎসবকে নির্বিঘ্ন রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃত্বে সফল আয়োজন
উৎসবের সার্বিক আয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অসীম সাহা এবং সাধারণ সম্পাদক বাসুদেব দত্ত। তাদের নেতৃত্বেই সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় এই ধর্মীয় আয়োজন। মনোরঞ্জন সাহা ও তুষার সাহাসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দের প্রচেষ্টায় উৎসব আয়োজনে আসে বাড়তি সাংগঠনিক সুশৃঙ্খলা। তাদের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই শত শত ভক্তবৃন্দের উপস্থিতিতে উৎসবটি সফলভাবে আয়োজিত হয়।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে জগন্নাথদেবের রথযাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং ভক্তি, বিশ্বাস আর সামাজিক মেলবন্ধনের এক অনন্য প্রতীক। প্রতি বছর এই উৎসব ঘিরে যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস আর ধর্মীয় ঐক্যের চিত্র ফুটে ওঠে, তা শুধু ধর্মীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না—বরং সমগ্র জনপদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয় সম্প্রীতির বার্তা। শাহজাদপুরের এবারের রথযাত্রাও তার ব্যতিক্রম নয়। ভক্তদের অংশগ্রহণ, প্রশাসনের সহযোগিতা এবং আয়োজকদের নিষ্ঠার মিশেলে এই উৎসব আরও একবার প্রমাণ করল, ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষায় স্থানীয় জনগণ ও প্রশাসনের যৌথ প্রচেষ্টা কতটা কার্যকর হতে পারে।
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে শেষ হয় রথযাত্রার আনুষ্ঠানিকতা, তবে ভক্তদের মনে রয়ে যায় এক গভীর প্রশান্তি ও তৃপ্তির অনুভূতি। আগামী বছর আবারও এমন উৎসবমুখর পরিবেশে জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উদযাপনের প্রত্যাশা নিয়েই আজকের মতো সমাপ্তি ঘটে এই ধর্মীয় আয়োজনের।
বাসুদেব দত্ত (শাহজাদপুর প্রতিনিধি) 



















