শিরোনাম :
সাদমানের সেঞ্চুরি, ধস ও তাইজুলের জোড়া আঘাতে নাটকীয় দ্বিতীয় দিন হাম, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর মিছিল থামছেই না ফাস্ট ফুডের মোহে স্বাস্থ্যহানি: শিশুদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখনই চাই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ রাতে মাকে ফোনে জানায় বাসায় ফিরছি, কিন্তু আর ফেরা হলো না তাহসিফের তুরাগ নদে উদ্ধার তাহসিফের মরদেহ, ময়নাতদন্তের পর বিস্তারিত জানা যাবে: স্বরাষ্ট মন্ত্রী ছয় বছরের শিশুকে হত্যার অভিযোগ, বাবা কুপিয়ে জখম পাকিস্তান থেকে আমদানি করা ১৫০ টন তামাক জব্দ বাবা ডাব খাচ্ছিলেন তিনজন এসে লাথি মেরে বুকে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করেন সচিবালয় স্থানান্তরের প্রতিবাদে শেকৃবির শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ ইসরায়েলে কেউই পায়নি ৬১ আসন, ঝুলে গেল ক্ষমতার সমীকরণ

ফাস্ট ফুডের মোহে স্বাস্থ্যহানি: শিশুদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখনই চাই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ

বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বেড়াতে যাওয়া কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে অবসর কাটানো—এসব আনন্দের মুহূর্তে বার্গার, পিৎজা, ফ্রাইড চিকেন, হট ডগ, স্যান্ডউইচ, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ও কোমল পানীয় যেন আধুনিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। রাজধানীর ঝলমলে রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে পাড়ার ছোট্ট ফুড কর্নার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনের দোকান কিংবা মুঠোফোনের ফুড ডেলিভারি অ্যাপ—সবখানেই মুখরোচক খাবারের হাতছানি। কিন্তু বাহারি মোড়ক, লোভনীয় বিজ্ঞাপন আর সুস্বাদু পরিবেশনার আড়ালে আমরা কি একবারও ভাবছি, প্রতিদিনের এই অভ্যাস আমাদের শরীর ও আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? সমস্যা ফাস্ট ফুডের অস্তিত্বে নয়, সমস্যা এর অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত গ্রহণে। সব ফাস্ট ফুড সমান ক্ষতিকরও নয়। তবে যেসব খাবারে অতিরিক্ত লবণ, মুক্ত চিনি, অস্বাস্থ্যকর চর্বি ও ক্যালরি রয়েছে, অথচ প্রয়োজনীয় আঁশ, ভিটামিন ও খনিজের পরিমাণ কম, সেগুলো নিয়মিত গ্রহণ স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। সাময়িক তৃপ্তির বিনিময়ে আমরা যদি দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়াই, তবে সেই আনন্দের মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হয় ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রকে।

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে শিশুদের অতিরিক্ত ওজনের উদ্বেগ :
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ হালনাগাদ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের মধ্যে প্রায় ৪০ কোটি অতিরিক্ত ওজনের শিকার ছিল; তাদের মধ্যে প্রায় ১৭ কোটি স্থূলতার সঙ্গে বসবাস করছিল। একই বয়সী জনগোষ্ঠীর অতিরিক্ত ওজনের হার ১৯৯০ সালের ৮ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে বেড়ে ২০ শতাংশে পৌঁছেছে। এই পরিসংখ্যান কেবল শারীরিক গঠনের পরিবর্তনের গল্প নয়; এটি ভবিষ্যতের ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ এবং অন্যান্য অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি সম্পর্কেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। শিশুদের স্থূলতা কোনো একক কারণে সৃষ্টি হয় না। খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, পারিবারিক পরিবেশ, আর্থসামাজিক অবস্থা, ঘুম এবং বিপণনব্যবস্থা—সবকিছুই এর সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই শিশুদের দোষারোপ করে কিংবা তাদের ইচ্ছাশক্তির অভাবকে দায়ী করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাদের সামনে যদি প্রতিনিয়ত অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিজ্ঞাপন, সস্তা ফাস্ট ফুড ও চিনিযুক্ত পানীয়ের প্রলোভন থাকে, অথচ স্বাস্থ্যকর খাবার তুলনামূলক ব্যয়বহুল বা সহজলভ্য না হয়, তাহলে সুস্থ পছন্দ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরীদের খাদ্যাভ্যাস:
সতর্ক হওয়ার সময় এখনই : বাংলাদেশেও বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় গ্রামীণ বাংলাদেশের ২ হাজার ৪৬৩ জন কিশোর-কিশোরীর খাদ্যাভ্যাস বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রায় ৮২ দশমিক ৯ শতাংশ আগের ২৪ ঘণ্টায় অন্তত একটি অতি-প্রক্রিয়াজাত অথবা ভাজাপোড়া খাবার গ্রহণ করেছিল। গবেষণায় ৫৩ দশমিক ৫ শতাংশ কিশোর-কিশোরী মিষ্টি ও মিষ্টিজাতীয় প্যাকেটজাত খাবার এবং ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ ভাজাপোড়া খাবার গ্রহণের কথা জানিয়েছিল। এটি জাতীয় পর্যায়ের সব শিশু-কিশোরের প্রতিনিধিত্বকারী পরিসংখ্যান নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট গ্রামীণ এলাকার গবেষণালব্ধ চিত্র। তবু এটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি আকর্ষণ শুধু বড় শহরের সমস্যা নয়। গ্রাম থেকে শহর, নিম্ন আয়ের পরিবার থেকে সচ্ছল পরিবার—বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন ঘটছে। দোকানে সহজলভ্য চিপস, বিস্কুট, মিষ্টিজাতীয় খাবার, ইনস্ট্যান্ট নুডলস ও চিনিযুক্ত পানীয়ও এই বৃহত্তর সমস্যার অংশ। এখন প্রয়োজন দেশব্যাপী প্রতিনিধিত্বশীল গবেষণা, যাতে শিশুদের খাদ্যাভ্যাস, পুষ্টির ঘাটতি, অতিরিক্ত ওজন ও খাদ্যনিরাপত্তার প্রকৃত চিত্র নির্ণয় করা যায়।

পেট ভরলেই কি শরীরের প্রয়োজন মেটে?
মানবদেহের জন্য খাবার শুধু ক্ষুধা নিবারণের উপকরণ নয়; এটি শক্তি, বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশের ভিত্তি। শিশুর হাড়, পেশি, রক্ত ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশের জন্য প্রয়োজন সুষম খাদ্য। অথচ অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, চিনি ও লবণযুক্ত খাবার নিয়মিত খেলে মাছ, ডিম, ডাল, দুধ, ফল ও শাকসবজির মতো পুষ্টিকর খাবারের জায়গা সংকুচিত হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্যকর খাদ্যবিষয়ক নির্দেশনায় মুক্ত চিনির পরিমাণ দৈনিক মোট শক্তির ১০ শতাংশের নিচে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে; আরও কমিয়ে ৫ শতাংশ বা তার নিচে আনলে অতিরিক্ত স্বাস্থ্যগত সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। একজন প্রাপ্তবয়স্কের দৈনিক প্রায় ২ হাজার কিলোক্যালরির খাদ্যগ্রহণের উদাহরণে ১০ শতাংশের সমতুল্য প্রায় ৫০ গ্রাম বা ১২ চা-চামচ চিনি। এটি কোনো ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট অনুমোদিত লক্ষ্য নয়; প্রকৃত চাহিদা বয়স, শক্তির প্রয়োজন ও স্বাস্থ্যাবস্থার ওপর নির্ভর করে।

অতিরিক্ত লবণ উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়। অতিরিক্ত ক্যালরি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাদ্যাভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত ওজন, স্থূলতা ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। চিনিযুক্ত পানীয় ও ঘন ঘন মিষ্টিজাতীয় খাবার গ্রহণ দাঁতের ক্ষয়েও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কোনো একটি খাবার খেলেই ক্যানসার, ডিমেনশিয়া বা অন্য জটিল রোগ হবে—এমন সরল সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে যথাযথ নয়। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস উন্নত করা, আতঙ্ক ছড়ানো নয়।

শিশুর পাতে খাবার, নাকি ভবিষ্যতের ভিত্তি?
শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। মা-বাবা যখন নিয়মিত কোমল পানীয় পান করেন, টেলিভিশন দেখতে দেখতে চিপস খান কিংবা বাইরে থেকে বার্গার এনে আনন্দের উপলক্ষ তৈরি করেন, তখন শিশুরাও সেই অভ্যাসকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়। আবার অনেক অভিভাবক কর্মব্যস্ততার কারণে প্রতিদিন ঘরে খাবার তৈরি করতে পারেন না। সন্তানকে খুশি রাখতে কিংবা দ্রুত ক্ষুধা মেটাতে তাঁরা বাইরে থেকে খাবার কিনে দেন। বাস্তবতার এই সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার করা যাবে না; বরং পরিবারকে সহায়তা করার মতো ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। শৈশবে গড়ে ওঠা খাদ্যাভ্যাস অনেক সময় সারা জীবন বহাল থাকে। তাই শিশুকে শুধু ‘এটা খাবে না’ বলে শাসন করলেই হবে না। কেন স্বাস্থ্যকর খাবার প্রয়োজন, কোন খাবার শরীরকে শক্তি দেয়, কেন অতিরিক্ত চিনি ও লবণ কমাতে হয় এসব সহজ ভাষায় বোঝাতে হবে। শিশুকে বাজার করা, ফল বাছাই, সবজি ধোয়া কিংবা পরিবারের জন্য স্বাস্থ্যকর নাশতা তৈরিতে অংশ নিতে উৎসাহিত করা যেতে পারে। খাবারকে শাস্তি বা পুরস্কারের উপকরণ না বানিয়ে আনন্দ, যত্ন ও সুস্থতার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

বিজ্ঞাপনের আকর্ষণ: শিশুমনের ওপর বাণিজ্যের প্রভাব :
আজকের শিশু শুধু দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে খাবারের বিজ্ঞাপন দেখে না। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ভিডিও, গেম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে খাবারের প্রচারণা তার প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার অংশ। কার্টুন চরিত্র, জনপ্রিয় তারকা, খেলনা, উপহার, প্রতিযোগিতা কিংবা সীমিত সময়ের বিশেষ ছাড়—বিভিন্ন কৌশলে শিশুদের আকৃষ্ট করা হয়। অনেক সময় বিজ্ঞাপনটি সরাসরি বিক্রির প্রচার বলে মনে না হলেও তার প্রভাব শিশুর পছন্দ ও পরিবারের কেনাকাটার সিদ্ধান্তে পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৩ সালে শিশুদের খাদ্যবিপণনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষায় বিশেষ নির্দেশনা প্রকাশ করে। এতে অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ট্রান্স ফ্যাট, মুক্ত চিনি ও সোডিয়ামসমৃদ্ধ খাবারের বিপণন নিয়ন্ত্রণে বাধ্যতামূলক, বিস্তৃত ও সরকারনেতৃত্বাধীন নীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সব বয়সী শিশুকে সুরক্ষার আওতায় আনা, পুষ্টিমানভিত্তিক মানদণ্ড ব্যবহার এবং কার্টুন, উপহার ও তারকানির্ভর প্রচারণার প্রভাব সীমিত করার কথাও বলা হয়েছে। বাংলাদেশেও এ নির্দেশনা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। শিশুদের উদ্দেশে অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিজ্ঞাপন, অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সারদের প্রচারণা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক বিপণন নিয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। ব্যবসার স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শিশুর অপরিণত বিচারবোধকে কাজে লাগিয়ে ক্ষতিকর খাদ্যাভ্যাস তৈরি করার সুযোগ সীমাহীন হতে পারে না।

যুক্তরাজ্যের পদক্ষেপ: বিজ্ঞাপনের লাগাম টানার উদ্যোগ :
শিশুদের খাদ্যাভ্যাস উন্নয়নে যুক্তরাজ্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটিতে গত ৫ জানুয়ারি থেকে নির্দিষ্ট কম স্বাস্থ্যকর খাবার ও পানীয়ের বিজ্ঞাপন টেলিভিশনে রাত ৯টার আগে প্রচার এবং অনলাইনে অর্থের বিনিময়ে বিজ্ঞাপন দেওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ কার্যকর হয়েছে। নিয়মগুলোর উদ্দেশ্য শিশুদের অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিজ্ঞাপনের সংস্পর্শ কমানো এবং স্থূলতা প্রতিরোধে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা। যুক্তরাজ্য সরকারের প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, এই উদ্যোগের ফলে বছরে শিশুদের খাদ্যগ্রহণ থেকে সর্বোচ্চ ৭ দশমিক ২ বিলিয়ন কিলোক্যালরি কমানো সম্ভব হতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হয়েছে। এটি সরকারের প্রাক্কলন, ইতিমধ্যে অর্জিত ফল নয়। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কোনো নীতি কার্যকর হওয়ার পর তার প্রকৃত প্রভাব নিরূপণে নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন। [৬]

বাংলাদেশের বাস্তবতায় হুবহু একই আইন প্রয়োগের আগে স্থানীয় গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও বিজ্ঞাপনশিল্পের কাঠামো বিবেচনা করতে হবে। তবে মূল শিক্ষাটি পরিষ্কার—শিশুদের স্বাস্থ্য রক্ষায় শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতার ওপর নির্ভর না করে বিজ্ঞাপনের পরিবেশকেও দায়িত্বশীল করতে হয়।

সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা: খাবারের পুষ্টিমান জানার অধিকার :
সিঙ্গাপুর চিনিযুক্ত পানীয়ের ব্যবহার কমাতে ‘নিউট্রি-গ্রেড’ নামে পুষ্টিমানভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস চালু করেছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে নির্দিষ্ট প্যাকেটজাত ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রে সরবরাহ করা পানীয়ের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা কার্যকর হয়। পরে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে নির্দিষ্ট পরিবেশে বিক্রি হওয়া সদ্য প্রস্তুত পানীয়ের ক্ষেত্রেও বিধান সম্প্রসারিত করা হয়। বেশি চিনি ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত ‘ডি’ শ্রেণির পানীয়ের বিজ্ঞাপনেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্যাকেটজাত পানীয়ের মধ্যম চিনি-ঘনত্ব ২০১৭ সালের ৭ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ৪ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে দৈনিক গড় চিনি গ্রহণ ২০১৮ সালের ৬০ গ্রাম থেকে ২০২২ সালে ৫৬ গ্রামে কমেছে। এই পরিবর্তনের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে; তাই পুরো ফলকে শুধু একটি নীতির অবদান বলা ঠিক হবে না। তবে পুষ্টিমান প্রকাশ ও খাদ্যপণ্যের গঠন উন্নত করার উদ্যোগ যে নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তা স্পষ্ট। বাংলাদেশে প্যাকেটজাত খাবারের মোড়কে সহজবোধ্য সতর্কবার্তা, চিনিযুক্ত পানীয়ের পুষ্টিমান স্পষ্টভাবে প্রকাশ এবং অনলাইন মেনুতে পুষ্টিসংক্রান্ত তথ্য প্রদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। ভোক্তা কী কিনছেন, তাতে কত চিনি, লবণ ও চর্বি রয়েছে—তা জানার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

রাজধানীর ফাস্ট ফুড দোকান: স্বাদ ও নিরাপত্তার প্রশ্ন :
ঢাকার মতিঝিল, পল্টন, মিরপুর, উত্তরা, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, রামপুরা কিংবা পুরান ঢাকার অলিগলি সর্বত্রই নানা ধরনের ফাস্ট ফুডের দোকান দেখা যায়। ছোট দোকান, ফুটপাতসংলগ্ন ফুড কর্নার, শপিং মলের রেস্তোরাঁ এবং অনলাইনভিত্তিক খাবার সরবরাহ সব মিলিয়ে এই খাত নগরজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে এবং মানুষের সময় ও চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেবা দিচ্ছে। তাই সব দোকানকে এক কাতারে ফেলে দোষারোপ করা উচিত নয়। তবে অপরিচ্ছন্ন রান্নাঘর, খাবার সংরক্ষণে অনুপযুক্ত তাপমাত্রা, বারবার ব্যবহৃত ভাজার তেল, মেয়াদোত্তীর্ণ উপকরণ এবং খাবার তৈরির সময় ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা উপেক্ষার অভিযোগ থাকলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা দরকার। অনিরাপদ খাবার থেকে খাদ্যবাহিত অসুস্থতা হতে পারে; আর দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যাভ্যাসের সমস্যা থেকে বাড়তে পারে স্থূলতা ও অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি। এই দুই সমস্যার প্রকৃতি আলাদা, কিন্তু দুটিরই প্রতিকারে কার্যকর তদারকি প্রয়োজন। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগে নিয়মিত পরিদর্শন, স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ এবং আইনভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে স্বচ্ছ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবসার বৈধতা, পরিচ্ছন্নতা ও খাদ্যনিরাপত্তা যাচাইয়ের তথ্য জনসাধারণের কাছে সহজলভ্য করা গেলে ভোক্তার আস্থাও বাড়বে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য জনস্বাস্থ্যের অগ্রাধিকার :

শিশুদের সুস্থতা কোনো বিচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যখাতের বিষয় নয়;
এটি শিক্ষা, অর্থনীতি, উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে জনস্বাস্থ্যকে প্রতিরোধমূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে এগিয়ে নেওয়া এবং খাদ্যাভ্যাস উন্নয়নকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ করা। এ উদ্যোগ কোনো দলীয় স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; প্রয়োজন পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য, দায়িত্ব বণ্টন, নির্দিষ্ট সময়সীমা ও নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশ।

প্রথমত, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, খাদ্য, বাণিজ্য এবং স্থানীয় সরকার-সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সমন্বয়ে একটি জাতীয় স্বাস্থ্যকর খাদ্যনীতি প্রণয়ন করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, শিশু-কিশোরদের খাদ্যাভ্যাস, পুষ্টির ঘাটতি, অতিরিক্ত ওজন এবং স্থূলতা নিয়ে নিয়মিত জাতীয় জরিপ চালাতে হবে। তৃতীয়ত, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ করে শিশুদের লক্ষ্য করে অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণে আইনগত কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। চতুর্থত, পুষ্টিমানভিত্তিক খাদ্যমান নির্ধারণ, মোড়কে সতর্কবার্তা এবং চিনিযুক্ত পানীয়ের ব্যবহার কমানোর উপযোগী নীতি বিবেচনা করতে হবে। সরকারের সাফল্য শুধু কতটি অভিযান পরিচালিত হলো, কতটি দোকানকে জরিমানা করা হলো কিংবা কতটি সভা অনুষ্ঠিত হলো তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। বরং শিশুদের স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ কতটা বাড়ল, বিদ্যালয়ে নিরাপদ খাবার কতটা সহজলভ্য হলো এবং পরিবারগুলো পুষ্টিকর খাদ্য বেছে নিতে কতটা সক্ষম হলো, সেসব সূচক দিয়ে অগ্রগতি পরিমাপ করতে হবে।

বিদ্যালয় হোক স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের প্রথম পাঠশালা :
শিশুর জীবনের একটি বড় অংশ কাটে বিদ্যালয়ে। সেখানে যদি বিরতির সময় সস্তা চিপস, অতিরিক্ত লবণযুক্ত স্ন্যাকস, চিনিযুক্ত পানীয় ও ভাজাপোড়াই সবচেয়ে সহজলভ্য খাবার হয়, তবে কেবল পাঠ্যবইয়ে পুষ্টিশিক্ষা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন। বিদ্যালয়ের খাদ্যপরিবেশকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে স্বাস্থ্যকর খাবারই হয় সহজ ও আকর্ষণীয় পছন্দ। সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রির জন্য পুষ্টিমানভিত্তিক নির্দেশিকা প্রণয়ন করা যেতে পারে। পরিষ্কার পানি, মৌসুমি ফল, ডিম, ডাল, সবজি, ঘরে তৈরি পুষ্টিকর নাশতা এবং সাশ্রয়ী দামের সুষম খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিক্রি সীমিত করার পাশাপাশি বিকল্প খাবারের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু নিষেধাজ্ঞা দিলে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের বাইরে গিয়ে একই খাবার কিনতে পারে; তাই আশপাশের দোকানগুলোকেও কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে। পুষ্টিশিক্ষাকে বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য ও দৈনন্দিন জীবনের পাঠের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের দিয়ে খাবারের লেবেল পড়ানো, চিনির পরিমাণ তুলনা করানো, স্বাস্থ্যকর নাশতার তালিকা তৈরি এবং বিদ্যালয়ের বাগানে সবজি চাষের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এভাবেই বইয়ের জ্ঞান বাস্তব জীবনের অভ্যাসে রূপ নেবে।

শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর সম্মিলিত দায়িত্ব :
একটি স্বাস্থ্যকর প্রজন্ম গড়ে তোলার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। শিক্ষক, অভিভাবক, চিকিৎসক, পুষ্টিবিদ, সাংবাদিক, খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষার্থীদেরও এতে ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে বিজ্ঞানভিত্তিক ধারণা দিতে পারেন। অভিভাবক ঘরে খাবারের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেন। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই পানির বোতল সঙ্গে রাখা, নিয়মিত ফল খাওয়া, অতিরিক্ত কোমল পানীয় এড়িয়ে চলা এবং বন্ধুদের সঙ্গে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস ভাগ করে নিতে পারে। অভিভাবকদের মনে রাখতে হবে, শিশুর ওজন নিয়ে কটূক্তি করা, খাবার নিয়ে লজ্জা দেওয়া কিংবা শাস্তি দেওয়া সমাধান নয়। এতে শিশুর আত্মবিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং খাবার নিয়ে অস্বাস্থ্যকর মানসিক সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। বরং বয়সোপযোগী পরামর্শ, পরিবারের সবার অংশগ্রহণ এবং ইতিবাচক উদাহরণের মাধ্যমে পরিবর্তন আনতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিভাবক সভা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পুষ্টিবিষয়ক আলোচনা এবং নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সহজবোধ্য, তথ্যসমৃদ্ধ ও আকর্ষণীয় প্রচারণা দরকার। স্বাস্থ্যকর খাবারকে শাস্তিমূলক বিধিনিষেধের বিষয় না বানিয়ে আনন্দময় জীবনযাপনের অংশ হিসেবে তুলে ধরতে হবে।

খাদ্যশিল্পের দায়িত্ব: মুনাফার সঙ্গে নৈতিকতার সমন্বয় :
ফাস্ট ফুড ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া বাস্তবসম্মত কিংবা প্রয়োজনীয় সমাধান নয়। এই খাতের সঙ্গে উদ্যোক্তা, কর্মচারী, সরবরাহকারী, কৃষক ও পরিবহনকর্মীর জীবিকা জড়িত। বরং ব্যবসাকে নিরাপদ, স্বচ্ছ ও স্বাস্থ্যসম্মত করে তোলাই হওয়া উচিত লক্ষ্য। খাদ্য উৎপাদনকারী ও রেস্তোরাঁ পরিচালকদের উপকরণের মান নিশ্চিত করা, পরিষ্কার রান্নাঘর বজায় রাখা, নিরাপদ তাপমাত্রায় খাবার সংরক্ষণ এবং কর্মীদের নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি প্রশিক্ষণ দেওয়ার দায়িত্ব নিতে হবে। খাদ্যপণ্যে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কমানোর জন্য ধাপে ধাপে সংস্কার কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। খাবারের মোড়কে উপাদান ও পুষ্টিমান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা, ভোক্তাকে বিভ্রান্ত করে এমন স্বাস্থ্যসংক্রান্ত দাবি বন্ধ করা এবং শিশুদের লক্ষ্য করে দায়িত্বশীল বিজ্ঞাপন প্রচার করা জরুরি। অনলাইন ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মেরও দায়িত্ব রয়েছে, যাতে তারা কেবল বিক্রির পরিমাণ বাড়ানোর চিন্তা না করে খাবারের নিরাপত্তা ও ভোক্তার তথ্য জানার অধিকারকে গুরুত্ব দেয়। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ, স্বল্প ব্যয়ে স্বাস্থ্যসম্মত রান্নাঘর তৈরিতে সহায়তা এবং সহজ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। একই সঙ্গে গুরুতর অনিয়মের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। শাস্তি ও সহায়তা—দুই ব্যবস্থার সমন্বয়েই খাদ্যশিল্পে টেকসই পরিবর্তন সম্ভব।

স্বাস্থ্যকর খাবারকে সাশ্রয়ী করা এখন সময়ের দাবি :
মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বাস্তবতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পরিবার যদি নিয়মিত মাছ, ডিম, দুধ, ফল ও সবজি কেনার সামর্থ্য না রাখে, তাহলে তাদের শুধু ফাস্ট ফুড এড়িয়ে চলার উপদেশ দিয়ে লাভ হবে না। স্বাস্থ্যকর খাবারকে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করতে হবে। কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা, মৌসুমি ফল ও সবজির অপচয় কমানো, নিরাপদ খাদ্য সংরক্ষণ এবং ন্যায্যমূল্যে পুষ্টিকর খাবার পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ প্রয়োজন। বাংলাদেশের নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতিতেই রয়েছে পুষ্টিকর খাবারের সমৃদ্ধ ভান্ডার। ভাত, ডাল, মাছ, ডিম, শাকসবজি, মৌসুমি ফল, ছোলা কিংবা ঘরে তৈরি নানা নাশতা—সঠিক পরিমাণ ও বৈচিত্র্য বজায় রেখে এগুলো দিয়ে সুষম খাদ্যতালিকা তৈরি করা সম্ভব। সব স্বাস্থ্যকর খাবার ব্যয়বহুল হতে হবে, এমন ধারণাও সঠিক নয়। পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী স্থানীয় ও মৌসুমি উপকরণ ব্যবহার করেই পুষ্টিকর খাবারের পরিকল্পনা করা যায়।

সরকার সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, বিদ্যালয়ের খাবার কর্মসূচি এবং নিম্ন আয়ের পরিবারের পুষ্টিসহায়তায় বিশেষ গুরুত্ব দিতে পারে। তবে যেকোনো ভর্তুকি বা কর্মসূচির নকশা হতে হবে স্বচ্ছ, লক্ষ্যভিত্তিক ও ফলাফল পরিমাপযোগ্য। সুস্থ নাগরিক গড়ে তোলার বিনিয়োগ শেষ পর্যন্ত দেশের উৎপাদনশীলতা, কর্মক্ষমতা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে অবদান রাখবে।

পরিশেষে, আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিটি শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার অধিকার রয়েছে। একটি শিশু কী খাবে, কীভাবে বেড়ে উঠবে এবং তার সামনে কেমন খাদ্যপরিবেশ তৈরি হবে এসব প্রশ্নকে শুধু পরিবারের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্বের মধ্য দিয়েই শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষিত হয়।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে প্রত্যাশা, শিশু-কিশোরদের পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করা হবে। বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যালয়ের খাবারের মানদণ্ড, প্যাকেটজাত খাবারে সহজবোধ্য পুষ্টিতথ্য, নিয়মিত বাজার তদারকি, সাশ্রয়ী পুষ্টিকর খাবার এবং জনসচেতনতা এই পদক্ষেপগুলোকে একটি সমন্বিত কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি গবেষণা, নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ এবং নীতির ফলাফল প্রকাশের মাধ্যমে জনগণের আস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

দিনের শেষে প্রশ্নটি খুব সহজ আমরা কি সন্তানদের হাতে শুধু ক্ষণিকের স্বাদ তুলে দেব, নাকি তাদের হাতে তুলে দেব সুস্থ জীবনের ভিত্তি? একটি বার্গার কিংবা এক প্যাকেট চিপস নিজে থেকেই কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না; কিন্তু প্রতিদিনের অসংখ্য ছোট সিদ্ধান্ত মিলে তৈরি হয় তার খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রা। তাই কাউকে ভয় দেখিয়ে নয়, কাউকে দোষারোপ করে নয় জ্ঞান, সচেতনতা, সহমর্মিতা ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবর্তন আনতে হবে। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, কৃষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা ও রাষ্ট্রনায়ক। তাদের সুস্থ শরীর, সতেজ মন ও শক্তিশালী মেধার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। আসুন, স্বাদের সঙ্গে পুষ্টির, ব্যবসার সঙ্গে দায়িত্বের এবং ব্যক্তিগত পছন্দের সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের সমন্বয় ঘটাই। ফাস্ট ফুডের মোহে যেন হারিয়ে না যায় আমাদের শিশুদের সুস্থ শৈশব। একটি স্বাস্থ্যকর প্রজন্ম গড়ে তোলার অঙ্গীকার হোক পরিবার থেকে রাষ্ট্র—সবার।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

সাদমানের সেঞ্চুরি, ধস ও তাইজুলের জোড়া আঘাতে নাটকীয় দ্বিতীয় দিন

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

ইসরায়েলে কেউই পায়নি ৬১ আসন, ঝুলে গেল ক্ষমতার সমীকরণ

২৯ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

ফাস্ট ফুডের মোহে স্বাস্থ্যহানি: শিশুদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখনই চাই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ

আপডেট সময় ০৪:৫১:০২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বেড়াতে যাওয়া কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে অবসর কাটানো—এসব আনন্দের মুহূর্তে বার্গার, পিৎজা, ফ্রাইড চিকেন, হট ডগ, স্যান্ডউইচ, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ও কোমল পানীয় যেন আধুনিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। রাজধানীর ঝলমলে রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে পাড়ার ছোট্ট ফুড কর্নার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনের দোকান কিংবা মুঠোফোনের ফুড ডেলিভারি অ্যাপ—সবখানেই মুখরোচক খাবারের হাতছানি। কিন্তু বাহারি মোড়ক, লোভনীয় বিজ্ঞাপন আর সুস্বাদু পরিবেশনার আড়ালে আমরা কি একবারও ভাবছি, প্রতিদিনের এই অভ্যাস আমাদের শরীর ও আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? সমস্যা ফাস্ট ফুডের অস্তিত্বে নয়, সমস্যা এর অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত গ্রহণে। সব ফাস্ট ফুড সমান ক্ষতিকরও নয়। তবে যেসব খাবারে অতিরিক্ত লবণ, মুক্ত চিনি, অস্বাস্থ্যকর চর্বি ও ক্যালরি রয়েছে, অথচ প্রয়োজনীয় আঁশ, ভিটামিন ও খনিজের পরিমাণ কম, সেগুলো নিয়মিত গ্রহণ স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। সাময়িক তৃপ্তির বিনিময়ে আমরা যদি দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়াই, তবে সেই আনন্দের মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হয় ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রকে।

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে শিশুদের অতিরিক্ত ওজনের উদ্বেগ :
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ হালনাগাদ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের মধ্যে প্রায় ৪০ কোটি অতিরিক্ত ওজনের শিকার ছিল; তাদের মধ্যে প্রায় ১৭ কোটি স্থূলতার সঙ্গে বসবাস করছিল। একই বয়সী জনগোষ্ঠীর অতিরিক্ত ওজনের হার ১৯৯০ সালের ৮ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে বেড়ে ২০ শতাংশে পৌঁছেছে। এই পরিসংখ্যান কেবল শারীরিক গঠনের পরিবর্তনের গল্প নয়; এটি ভবিষ্যতের ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ এবং অন্যান্য অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি সম্পর্কেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। শিশুদের স্থূলতা কোনো একক কারণে সৃষ্টি হয় না। খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, পারিবারিক পরিবেশ, আর্থসামাজিক অবস্থা, ঘুম এবং বিপণনব্যবস্থা—সবকিছুই এর সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই শিশুদের দোষারোপ করে কিংবা তাদের ইচ্ছাশক্তির অভাবকে দায়ী করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাদের সামনে যদি প্রতিনিয়ত অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিজ্ঞাপন, সস্তা ফাস্ট ফুড ও চিনিযুক্ত পানীয়ের প্রলোভন থাকে, অথচ স্বাস্থ্যকর খাবার তুলনামূলক ব্যয়বহুল বা সহজলভ্য না হয়, তাহলে সুস্থ পছন্দ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরীদের খাদ্যাভ্যাস:
সতর্ক হওয়ার সময় এখনই : বাংলাদেশেও বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় গ্রামীণ বাংলাদেশের ২ হাজার ৪৬৩ জন কিশোর-কিশোরীর খাদ্যাভ্যাস বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রায় ৮২ দশমিক ৯ শতাংশ আগের ২৪ ঘণ্টায় অন্তত একটি অতি-প্রক্রিয়াজাত অথবা ভাজাপোড়া খাবার গ্রহণ করেছিল। গবেষণায় ৫৩ দশমিক ৫ শতাংশ কিশোর-কিশোরী মিষ্টি ও মিষ্টিজাতীয় প্যাকেটজাত খাবার এবং ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ ভাজাপোড়া খাবার গ্রহণের কথা জানিয়েছিল। এটি জাতীয় পর্যায়ের সব শিশু-কিশোরের প্রতিনিধিত্বকারী পরিসংখ্যান নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট গ্রামীণ এলাকার গবেষণালব্ধ চিত্র। তবু এটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি আকর্ষণ শুধু বড় শহরের সমস্যা নয়। গ্রাম থেকে শহর, নিম্ন আয়ের পরিবার থেকে সচ্ছল পরিবার—বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন ঘটছে। দোকানে সহজলভ্য চিপস, বিস্কুট, মিষ্টিজাতীয় খাবার, ইনস্ট্যান্ট নুডলস ও চিনিযুক্ত পানীয়ও এই বৃহত্তর সমস্যার অংশ। এখন প্রয়োজন দেশব্যাপী প্রতিনিধিত্বশীল গবেষণা, যাতে শিশুদের খাদ্যাভ্যাস, পুষ্টির ঘাটতি, অতিরিক্ত ওজন ও খাদ্যনিরাপত্তার প্রকৃত চিত্র নির্ণয় করা যায়।

পেট ভরলেই কি শরীরের প্রয়োজন মেটে?
মানবদেহের জন্য খাবার শুধু ক্ষুধা নিবারণের উপকরণ নয়; এটি শক্তি, বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশের ভিত্তি। শিশুর হাড়, পেশি, রক্ত ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশের জন্য প্রয়োজন সুষম খাদ্য। অথচ অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, চিনি ও লবণযুক্ত খাবার নিয়মিত খেলে মাছ, ডিম, ডাল, দুধ, ফল ও শাকসবজির মতো পুষ্টিকর খাবারের জায়গা সংকুচিত হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্যকর খাদ্যবিষয়ক নির্দেশনায় মুক্ত চিনির পরিমাণ দৈনিক মোট শক্তির ১০ শতাংশের নিচে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে; আরও কমিয়ে ৫ শতাংশ বা তার নিচে আনলে অতিরিক্ত স্বাস্থ্যগত সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। একজন প্রাপ্তবয়স্কের দৈনিক প্রায় ২ হাজার কিলোক্যালরির খাদ্যগ্রহণের উদাহরণে ১০ শতাংশের সমতুল্য প্রায় ৫০ গ্রাম বা ১২ চা-চামচ চিনি। এটি কোনো ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট অনুমোদিত লক্ষ্য নয়; প্রকৃত চাহিদা বয়স, শক্তির প্রয়োজন ও স্বাস্থ্যাবস্থার ওপর নির্ভর করে।

অতিরিক্ত লবণ উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়। অতিরিক্ত ক্যালরি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাদ্যাভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত ওজন, স্থূলতা ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। চিনিযুক্ত পানীয় ও ঘন ঘন মিষ্টিজাতীয় খাবার গ্রহণ দাঁতের ক্ষয়েও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কোনো একটি খাবার খেলেই ক্যানসার, ডিমেনশিয়া বা অন্য জটিল রোগ হবে—এমন সরল সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে যথাযথ নয়। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস উন্নত করা, আতঙ্ক ছড়ানো নয়।

শিশুর পাতে খাবার, নাকি ভবিষ্যতের ভিত্তি?
শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। মা-বাবা যখন নিয়মিত কোমল পানীয় পান করেন, টেলিভিশন দেখতে দেখতে চিপস খান কিংবা বাইরে থেকে বার্গার এনে আনন্দের উপলক্ষ তৈরি করেন, তখন শিশুরাও সেই অভ্যাসকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়। আবার অনেক অভিভাবক কর্মব্যস্ততার কারণে প্রতিদিন ঘরে খাবার তৈরি করতে পারেন না। সন্তানকে খুশি রাখতে কিংবা দ্রুত ক্ষুধা মেটাতে তাঁরা বাইরে থেকে খাবার কিনে দেন। বাস্তবতার এই সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার করা যাবে না; বরং পরিবারকে সহায়তা করার মতো ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। শৈশবে গড়ে ওঠা খাদ্যাভ্যাস অনেক সময় সারা জীবন বহাল থাকে। তাই শিশুকে শুধু ‘এটা খাবে না’ বলে শাসন করলেই হবে না। কেন স্বাস্থ্যকর খাবার প্রয়োজন, কোন খাবার শরীরকে শক্তি দেয়, কেন অতিরিক্ত চিনি ও লবণ কমাতে হয় এসব সহজ ভাষায় বোঝাতে হবে। শিশুকে বাজার করা, ফল বাছাই, সবজি ধোয়া কিংবা পরিবারের জন্য স্বাস্থ্যকর নাশতা তৈরিতে অংশ নিতে উৎসাহিত করা যেতে পারে। খাবারকে শাস্তি বা পুরস্কারের উপকরণ না বানিয়ে আনন্দ, যত্ন ও সুস্থতার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

বিজ্ঞাপনের আকর্ষণ: শিশুমনের ওপর বাণিজ্যের প্রভাব :
আজকের শিশু শুধু দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে খাবারের বিজ্ঞাপন দেখে না। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ভিডিও, গেম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে খাবারের প্রচারণা তার প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার অংশ। কার্টুন চরিত্র, জনপ্রিয় তারকা, খেলনা, উপহার, প্রতিযোগিতা কিংবা সীমিত সময়ের বিশেষ ছাড়—বিভিন্ন কৌশলে শিশুদের আকৃষ্ট করা হয়। অনেক সময় বিজ্ঞাপনটি সরাসরি বিক্রির প্রচার বলে মনে না হলেও তার প্রভাব শিশুর পছন্দ ও পরিবারের কেনাকাটার সিদ্ধান্তে পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৩ সালে শিশুদের খাদ্যবিপণনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষায় বিশেষ নির্দেশনা প্রকাশ করে। এতে অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ট্রান্স ফ্যাট, মুক্ত চিনি ও সোডিয়ামসমৃদ্ধ খাবারের বিপণন নিয়ন্ত্রণে বাধ্যতামূলক, বিস্তৃত ও সরকারনেতৃত্বাধীন নীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সব বয়সী শিশুকে সুরক্ষার আওতায় আনা, পুষ্টিমানভিত্তিক মানদণ্ড ব্যবহার এবং কার্টুন, উপহার ও তারকানির্ভর প্রচারণার প্রভাব সীমিত করার কথাও বলা হয়েছে। বাংলাদেশেও এ নির্দেশনা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। শিশুদের উদ্দেশে অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিজ্ঞাপন, অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সারদের প্রচারণা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক বিপণন নিয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। ব্যবসার স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শিশুর অপরিণত বিচারবোধকে কাজে লাগিয়ে ক্ষতিকর খাদ্যাভ্যাস তৈরি করার সুযোগ সীমাহীন হতে পারে না।

যুক্তরাজ্যের পদক্ষেপ: বিজ্ঞাপনের লাগাম টানার উদ্যোগ :
শিশুদের খাদ্যাভ্যাস উন্নয়নে যুক্তরাজ্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটিতে গত ৫ জানুয়ারি থেকে নির্দিষ্ট কম স্বাস্থ্যকর খাবার ও পানীয়ের বিজ্ঞাপন টেলিভিশনে রাত ৯টার আগে প্রচার এবং অনলাইনে অর্থের বিনিময়ে বিজ্ঞাপন দেওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ কার্যকর হয়েছে। নিয়মগুলোর উদ্দেশ্য শিশুদের অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিজ্ঞাপনের সংস্পর্শ কমানো এবং স্থূলতা প্রতিরোধে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা। যুক্তরাজ্য সরকারের প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, এই উদ্যোগের ফলে বছরে শিশুদের খাদ্যগ্রহণ থেকে সর্বোচ্চ ৭ দশমিক ২ বিলিয়ন কিলোক্যালরি কমানো সম্ভব হতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হয়েছে। এটি সরকারের প্রাক্কলন, ইতিমধ্যে অর্জিত ফল নয়। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কোনো নীতি কার্যকর হওয়ার পর তার প্রকৃত প্রভাব নিরূপণে নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন। [৬]

বাংলাদেশের বাস্তবতায় হুবহু একই আইন প্রয়োগের আগে স্থানীয় গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও বিজ্ঞাপনশিল্পের কাঠামো বিবেচনা করতে হবে। তবে মূল শিক্ষাটি পরিষ্কার—শিশুদের স্বাস্থ্য রক্ষায় শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতার ওপর নির্ভর না করে বিজ্ঞাপনের পরিবেশকেও দায়িত্বশীল করতে হয়।

সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা: খাবারের পুষ্টিমান জানার অধিকার :
সিঙ্গাপুর চিনিযুক্ত পানীয়ের ব্যবহার কমাতে ‘নিউট্রি-গ্রেড’ নামে পুষ্টিমানভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস চালু করেছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে নির্দিষ্ট প্যাকেটজাত ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রে সরবরাহ করা পানীয়ের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা কার্যকর হয়। পরে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে নির্দিষ্ট পরিবেশে বিক্রি হওয়া সদ্য প্রস্তুত পানীয়ের ক্ষেত্রেও বিধান সম্প্রসারিত করা হয়। বেশি চিনি ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত ‘ডি’ শ্রেণির পানীয়ের বিজ্ঞাপনেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্যাকেটজাত পানীয়ের মধ্যম চিনি-ঘনত্ব ২০১৭ সালের ৭ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ৪ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে দৈনিক গড় চিনি গ্রহণ ২০১৮ সালের ৬০ গ্রাম থেকে ২০২২ সালে ৫৬ গ্রামে কমেছে। এই পরিবর্তনের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে; তাই পুরো ফলকে শুধু একটি নীতির অবদান বলা ঠিক হবে না। তবে পুষ্টিমান প্রকাশ ও খাদ্যপণ্যের গঠন উন্নত করার উদ্যোগ যে নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তা স্পষ্ট। বাংলাদেশে প্যাকেটজাত খাবারের মোড়কে সহজবোধ্য সতর্কবার্তা, চিনিযুক্ত পানীয়ের পুষ্টিমান স্পষ্টভাবে প্রকাশ এবং অনলাইন মেনুতে পুষ্টিসংক্রান্ত তথ্য প্রদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। ভোক্তা কী কিনছেন, তাতে কত চিনি, লবণ ও চর্বি রয়েছে—তা জানার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

রাজধানীর ফাস্ট ফুড দোকান: স্বাদ ও নিরাপত্তার প্রশ্ন :
ঢাকার মতিঝিল, পল্টন, মিরপুর, উত্তরা, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, রামপুরা কিংবা পুরান ঢাকার অলিগলি সর্বত্রই নানা ধরনের ফাস্ট ফুডের দোকান দেখা যায়। ছোট দোকান, ফুটপাতসংলগ্ন ফুড কর্নার, শপিং মলের রেস্তোরাঁ এবং অনলাইনভিত্তিক খাবার সরবরাহ সব মিলিয়ে এই খাত নগরজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে এবং মানুষের সময় ও চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেবা দিচ্ছে। তাই সব দোকানকে এক কাতারে ফেলে দোষারোপ করা উচিত নয়। তবে অপরিচ্ছন্ন রান্নাঘর, খাবার সংরক্ষণে অনুপযুক্ত তাপমাত্রা, বারবার ব্যবহৃত ভাজার তেল, মেয়াদোত্তীর্ণ উপকরণ এবং খাবার তৈরির সময় ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা উপেক্ষার অভিযোগ থাকলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা দরকার। অনিরাপদ খাবার থেকে খাদ্যবাহিত অসুস্থতা হতে পারে; আর দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যাভ্যাসের সমস্যা থেকে বাড়তে পারে স্থূলতা ও অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি। এই দুই সমস্যার প্রকৃতি আলাদা, কিন্তু দুটিরই প্রতিকারে কার্যকর তদারকি প্রয়োজন। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগে নিয়মিত পরিদর্শন, স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ এবং আইনভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে স্বচ্ছ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবসার বৈধতা, পরিচ্ছন্নতা ও খাদ্যনিরাপত্তা যাচাইয়ের তথ্য জনসাধারণের কাছে সহজলভ্য করা গেলে ভোক্তার আস্থাও বাড়বে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য জনস্বাস্থ্যের অগ্রাধিকার :

শিশুদের সুস্থতা কোনো বিচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যখাতের বিষয় নয়;
এটি শিক্ষা, অর্থনীতি, উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে জনস্বাস্থ্যকে প্রতিরোধমূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে এগিয়ে নেওয়া এবং খাদ্যাভ্যাস উন্নয়নকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ করা। এ উদ্যোগ কোনো দলীয় স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; প্রয়োজন পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য, দায়িত্ব বণ্টন, নির্দিষ্ট সময়সীমা ও নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশ।

প্রথমত, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, খাদ্য, বাণিজ্য এবং স্থানীয় সরকার-সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সমন্বয়ে একটি জাতীয় স্বাস্থ্যকর খাদ্যনীতি প্রণয়ন করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, শিশু-কিশোরদের খাদ্যাভ্যাস, পুষ্টির ঘাটতি, অতিরিক্ত ওজন এবং স্থূলতা নিয়ে নিয়মিত জাতীয় জরিপ চালাতে হবে। তৃতীয়ত, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ করে শিশুদের লক্ষ্য করে অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণে আইনগত কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। চতুর্থত, পুষ্টিমানভিত্তিক খাদ্যমান নির্ধারণ, মোড়কে সতর্কবার্তা এবং চিনিযুক্ত পানীয়ের ব্যবহার কমানোর উপযোগী নীতি বিবেচনা করতে হবে। সরকারের সাফল্য শুধু কতটি অভিযান পরিচালিত হলো, কতটি দোকানকে জরিমানা করা হলো কিংবা কতটি সভা অনুষ্ঠিত হলো তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। বরং শিশুদের স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ কতটা বাড়ল, বিদ্যালয়ে নিরাপদ খাবার কতটা সহজলভ্য হলো এবং পরিবারগুলো পুষ্টিকর খাদ্য বেছে নিতে কতটা সক্ষম হলো, সেসব সূচক দিয়ে অগ্রগতি পরিমাপ করতে হবে।

বিদ্যালয় হোক স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের প্রথম পাঠশালা :
শিশুর জীবনের একটি বড় অংশ কাটে বিদ্যালয়ে। সেখানে যদি বিরতির সময় সস্তা চিপস, অতিরিক্ত লবণযুক্ত স্ন্যাকস, চিনিযুক্ত পানীয় ও ভাজাপোড়াই সবচেয়ে সহজলভ্য খাবার হয়, তবে কেবল পাঠ্যবইয়ে পুষ্টিশিক্ষা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন। বিদ্যালয়ের খাদ্যপরিবেশকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে স্বাস্থ্যকর খাবারই হয় সহজ ও আকর্ষণীয় পছন্দ। সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রির জন্য পুষ্টিমানভিত্তিক নির্দেশিকা প্রণয়ন করা যেতে পারে। পরিষ্কার পানি, মৌসুমি ফল, ডিম, ডাল, সবজি, ঘরে তৈরি পুষ্টিকর নাশতা এবং সাশ্রয়ী দামের সুষম খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিক্রি সীমিত করার পাশাপাশি বিকল্প খাবারের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু নিষেধাজ্ঞা দিলে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের বাইরে গিয়ে একই খাবার কিনতে পারে; তাই আশপাশের দোকানগুলোকেও কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে। পুষ্টিশিক্ষাকে বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য ও দৈনন্দিন জীবনের পাঠের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের দিয়ে খাবারের লেবেল পড়ানো, চিনির পরিমাণ তুলনা করানো, স্বাস্থ্যকর নাশতার তালিকা তৈরি এবং বিদ্যালয়ের বাগানে সবজি চাষের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এভাবেই বইয়ের জ্ঞান বাস্তব জীবনের অভ্যাসে রূপ নেবে।

শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর সম্মিলিত দায়িত্ব :
একটি স্বাস্থ্যকর প্রজন্ম গড়ে তোলার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। শিক্ষক, অভিভাবক, চিকিৎসক, পুষ্টিবিদ, সাংবাদিক, খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষার্থীদেরও এতে ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে বিজ্ঞানভিত্তিক ধারণা দিতে পারেন। অভিভাবক ঘরে খাবারের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেন। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই পানির বোতল সঙ্গে রাখা, নিয়মিত ফল খাওয়া, অতিরিক্ত কোমল পানীয় এড়িয়ে চলা এবং বন্ধুদের সঙ্গে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস ভাগ করে নিতে পারে। অভিভাবকদের মনে রাখতে হবে, শিশুর ওজন নিয়ে কটূক্তি করা, খাবার নিয়ে লজ্জা দেওয়া কিংবা শাস্তি দেওয়া সমাধান নয়। এতে শিশুর আত্মবিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং খাবার নিয়ে অস্বাস্থ্যকর মানসিক সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। বরং বয়সোপযোগী পরামর্শ, পরিবারের সবার অংশগ্রহণ এবং ইতিবাচক উদাহরণের মাধ্যমে পরিবর্তন আনতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিভাবক সভা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পুষ্টিবিষয়ক আলোচনা এবং নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সহজবোধ্য, তথ্যসমৃদ্ধ ও আকর্ষণীয় প্রচারণা দরকার। স্বাস্থ্যকর খাবারকে শাস্তিমূলক বিধিনিষেধের বিষয় না বানিয়ে আনন্দময় জীবনযাপনের অংশ হিসেবে তুলে ধরতে হবে।

খাদ্যশিল্পের দায়িত্ব: মুনাফার সঙ্গে নৈতিকতার সমন্বয় :
ফাস্ট ফুড ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া বাস্তবসম্মত কিংবা প্রয়োজনীয় সমাধান নয়। এই খাতের সঙ্গে উদ্যোক্তা, কর্মচারী, সরবরাহকারী, কৃষক ও পরিবহনকর্মীর জীবিকা জড়িত। বরং ব্যবসাকে নিরাপদ, স্বচ্ছ ও স্বাস্থ্যসম্মত করে তোলাই হওয়া উচিত লক্ষ্য। খাদ্য উৎপাদনকারী ও রেস্তোরাঁ পরিচালকদের উপকরণের মান নিশ্চিত করা, পরিষ্কার রান্নাঘর বজায় রাখা, নিরাপদ তাপমাত্রায় খাবার সংরক্ষণ এবং কর্মীদের নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি প্রশিক্ষণ দেওয়ার দায়িত্ব নিতে হবে। খাদ্যপণ্যে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কমানোর জন্য ধাপে ধাপে সংস্কার কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। খাবারের মোড়কে উপাদান ও পুষ্টিমান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা, ভোক্তাকে বিভ্রান্ত করে এমন স্বাস্থ্যসংক্রান্ত দাবি বন্ধ করা এবং শিশুদের লক্ষ্য করে দায়িত্বশীল বিজ্ঞাপন প্রচার করা জরুরি। অনলাইন ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মেরও দায়িত্ব রয়েছে, যাতে তারা কেবল বিক্রির পরিমাণ বাড়ানোর চিন্তা না করে খাবারের নিরাপত্তা ও ভোক্তার তথ্য জানার অধিকারকে গুরুত্ব দেয়। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ, স্বল্প ব্যয়ে স্বাস্থ্যসম্মত রান্নাঘর তৈরিতে সহায়তা এবং সহজ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। একই সঙ্গে গুরুতর অনিয়মের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। শাস্তি ও সহায়তা—দুই ব্যবস্থার সমন্বয়েই খাদ্যশিল্পে টেকসই পরিবর্তন সম্ভব।

স্বাস্থ্যকর খাবারকে সাশ্রয়ী করা এখন সময়ের দাবি :
মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বাস্তবতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পরিবার যদি নিয়মিত মাছ, ডিম, দুধ, ফল ও সবজি কেনার সামর্থ্য না রাখে, তাহলে তাদের শুধু ফাস্ট ফুড এড়িয়ে চলার উপদেশ দিয়ে লাভ হবে না। স্বাস্থ্যকর খাবারকে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করতে হবে। কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা, মৌসুমি ফল ও সবজির অপচয় কমানো, নিরাপদ খাদ্য সংরক্ষণ এবং ন্যায্যমূল্যে পুষ্টিকর খাবার পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ প্রয়োজন। বাংলাদেশের নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতিতেই রয়েছে পুষ্টিকর খাবারের সমৃদ্ধ ভান্ডার। ভাত, ডাল, মাছ, ডিম, শাকসবজি, মৌসুমি ফল, ছোলা কিংবা ঘরে তৈরি নানা নাশতা—সঠিক পরিমাণ ও বৈচিত্র্য বজায় রেখে এগুলো দিয়ে সুষম খাদ্যতালিকা তৈরি করা সম্ভব। সব স্বাস্থ্যকর খাবার ব্যয়বহুল হতে হবে, এমন ধারণাও সঠিক নয়। পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী স্থানীয় ও মৌসুমি উপকরণ ব্যবহার করেই পুষ্টিকর খাবারের পরিকল্পনা করা যায়।

সরকার সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, বিদ্যালয়ের খাবার কর্মসূচি এবং নিম্ন আয়ের পরিবারের পুষ্টিসহায়তায় বিশেষ গুরুত্ব দিতে পারে। তবে যেকোনো ভর্তুকি বা কর্মসূচির নকশা হতে হবে স্বচ্ছ, লক্ষ্যভিত্তিক ও ফলাফল পরিমাপযোগ্য। সুস্থ নাগরিক গড়ে তোলার বিনিয়োগ শেষ পর্যন্ত দেশের উৎপাদনশীলতা, কর্মক্ষমতা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে অবদান রাখবে।

পরিশেষে, আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিটি শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার অধিকার রয়েছে। একটি শিশু কী খাবে, কীভাবে বেড়ে উঠবে এবং তার সামনে কেমন খাদ্যপরিবেশ তৈরি হবে এসব প্রশ্নকে শুধু পরিবারের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্বের মধ্য দিয়েই শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষিত হয়।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে প্রত্যাশা, শিশু-কিশোরদের পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করা হবে। বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যালয়ের খাবারের মানদণ্ড, প্যাকেটজাত খাবারে সহজবোধ্য পুষ্টিতথ্য, নিয়মিত বাজার তদারকি, সাশ্রয়ী পুষ্টিকর খাবার এবং জনসচেতনতা এই পদক্ষেপগুলোকে একটি সমন্বিত কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি গবেষণা, নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ এবং নীতির ফলাফল প্রকাশের মাধ্যমে জনগণের আস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

দিনের শেষে প্রশ্নটি খুব সহজ আমরা কি সন্তানদের হাতে শুধু ক্ষণিকের স্বাদ তুলে দেব, নাকি তাদের হাতে তুলে দেব সুস্থ জীবনের ভিত্তি? একটি বার্গার কিংবা এক প্যাকেট চিপস নিজে থেকেই কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না; কিন্তু প্রতিদিনের অসংখ্য ছোট সিদ্ধান্ত মিলে তৈরি হয় তার খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রা। তাই কাউকে ভয় দেখিয়ে নয়, কাউকে দোষারোপ করে নয় জ্ঞান, সচেতনতা, সহমর্মিতা ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবর্তন আনতে হবে। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, কৃষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা ও রাষ্ট্রনায়ক। তাদের সুস্থ শরীর, সতেজ মন ও শক্তিশালী মেধার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। আসুন, স্বাদের সঙ্গে পুষ্টির, ব্যবসার সঙ্গে দায়িত্বের এবং ব্যক্তিগত পছন্দের সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের সমন্বয় ঘটাই। ফাস্ট ফুডের মোহে যেন হারিয়ে না যায় আমাদের শিশুদের সুস্থ শৈশব। একটি স্বাস্থ্যকর প্রজন্ম গড়ে তোলার অঙ্গীকার হোক পরিবার থেকে রাষ্ট্র—সবার।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Share this news as a Photo Card