সারাদেশের ন্যায় সিলেট-০৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) সংসদীয় আসনে বইতে শুরু করেছে ভোটের হাওয়া। চায়ের টং থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সবখানেই এখন নির্বাচনী আলাপ। ইতিমধ্যে প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন এবং সীমান্তবর্তী এ দুই জনপদে নির্বাচনী আমেজ বেশ ভালোভাবে বইছে। এবারের নির্বাচনে এ আসনে মোট ০৬ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। গত প্রায় তিন দশক ধরে এই আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কোনো দলীয় প্রার্থী দেয়নি। ফলে এবার স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মাঝে দলীয় প্রার্থীর হাতে ‘ধানের শীষ’ দেখার প্রবল আকাঙ্ক্ষা থাকলেও জোটগত রাজনীতির কারণে তা আর পূরণ হয়নি। বিএনপি-জমিয়ত জোট হওয়ার ফলে আসনটি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুককে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে নির্বাচনী মাঠে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছেন সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি মামুনুর রশীদ (চাকসু মামুন)। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নিজের অবস্থানে অনড়। ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশের সমর্থনকে পুঁজি করে তিনি নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চান। সাধারণ ভোটারদের মতে, দলীয় প্রার্থীর অভাব মেটাতে তৃণমূলের কর্মীরা চাকসু মামুনের ওপর ভরসা করলে তা জোটের প্রার্থীর জন্য বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থী মুফতি আবুল হাসান এবং জামায়াতে ইসলামী মনোনীত হাফিজ মাওলানা আনোয়ার হোসাইন খানের প্রার্থিতা নির্বাচনী লড়াইকে আরও জমজমাট করে তুলেছে। ২০০১ সালের নির্বাচনে এ আসন থেকে জামায়াত নেতা মাওলানা ফরীদ উদ্দিন চৌধুরী এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় পর এবার হাফিজ মাওলানা আনোয়ার হোসাইন খানের হাত ধরে সেই হারানো আসনটি পুনরুদ্ধার করতে চায় জামায়াত। তবে জামায়াত, খেলাফত মজলিসসহ এগারো দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে শেষ পর্যন্ত কে মাঠে থাকবেন এখনো স্পষ্ট নয়। গুঞ্জন রয়েছে সমঝোতা না হলে উভয়েই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। এ আসনে জাতীয় পার্টির সাইফুদ্দিন খালেদ এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগের বিলাল উদ্দিনও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
স্থানীয় ভোটারদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সিলেট-০৫ আসনে এবার ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা প্রবল। প্রতিদ্বন্দ্বিতার মূল কেন্দ্রে থাকতে পারেন মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, চাকসু মামুন এবং এগারো দলীয় জোটের প্রার্থী। এ আসনের রাজনীতির অন্যতম বড় নিয়ন্ত্রক বা ‘বিগ ফ্যাক্টর’ হিসেবে পরিচিত প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (রহ.)-এর অনুসারীরা। সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণে এলাকায় অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হলেও এবার তিনি পারিবারিক সিদ্ধান্তে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না। তার এই অনুপস্থিতি ভোটের মাঠে নতুন এক সমীকরণ তৈরি করেছে।
কওমী ঘরানার দুজন পরিচিত মুখ মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ও মুফতী আবুল হাসান প্রার্থী হওয়ায় এই ঘরানার ভোট ব্যাংক দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আঞ্চলিকতার দিক থেকে মুফতী আবুল হাসান জকিগঞ্জে বেশ পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য হলেও কানাইঘাটে তার প্রভাব কিছুটা সীমিত হতে পারে বলে মনে করছেন সাধারণ ভোটাররা। তবে এগারো দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর সমর্থন তার জন্য ইতিবাচক হতে পারে। অন্যদিকে মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক কানাইঘাটে নিজ দলের শক্তিশালী অবস্থান এবং বিএনপির একটি বড় অংশের ভোট পাওয়ার আশা রাখছেন।
সব মিলিয়ে ধর্মীয় পরিচয়, আঞ্চলিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার এক জটিল লড়াইয়ের অপেক্ষায় জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট। শেষ পর্যন্ত কার মাথায় বিজয়ের মুকুট উঠবে, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল পর্যন্ত।
আবির আল নাহিয়ান, জকিগঞ্জ (সিলেট) প্রতিনিধি 


























