শিরোনাম :
হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে নতুন জল্পনা,আকস্মিক দিল্লি সফরে বাংলাদেশের গোয়েন্দাপ্রধান আদর্শবান সাংবাদিকরাই স্বৈরাচার পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন: রিজভী বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের ওপর গুরুত্বারোপ প্রধানমন্ত্রীর ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে ছিটকে গেলেন মেসি-এমবাপ্পে, জানাল এআই কাঁটাতারে আটকা ১৩০ হাতি, কূটনীতির টেবিলেও মিলছে না সমাধান সরকার অনুমতি দিলে ক্রসফায়ারেও পিছপা হবে না পুলিশ: আইজিপি ক্যাঙারু কোর্ট’ মন্তব্যে ট্রাইব্যুনালে হাজির আওয়ামীপন্থি দুই আইনজীবী, চাইলেন নিঃশর্ত ক্ষমা কে পাঠালেন উড়োজাহাজে করে পরীমনিকে শিউলি ফুল? ফেব্রুয়ারি ছেড়ে জানুয়ারিতে বইমেলা, প্রশ্ন উঠছে একুশের চেতনা নিয়ে পাঠ্যবইয়ে ‘দাঁড়িপাল্লা’ বিতর্কের রেশ না কাটতেই এবার ‘নৌকা’ নিয়ে তোলপাড়

ইঞ্জিনের অভাবে থমকে মালবাহী ট্রেন, পাঁচ বছরে সক্ষমতা প্রায় অর্ধেক

সড়ক বা নদীপথের চেয়ে ট্রেনে পণ্য আনা-নেওয়া অনেক সাশ্রয়ী। কিন্তু সেই সুবিধা পাওয়া এখন কঠিন হয়ে উঠেছে। রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে চলেছিল দুই হাজার ৭৭০টি ট্রেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চলেছে এক হাজার ৪৬৭টি। অর্থাৎ কমেছে এক হাজার ৩০৩টি।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এই দশার মূল কারণ ইঞ্জিনের সংকট। সঙ্গে আছে বগি, ওয়াগন ও লোকবলের ঘাটতি। ফলে এই খাত থেকে বিপুল রাজস্ব আয়ের যে সম্ভাবনা ছিল, তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

রেলের নেটওয়ার্কে যুক্ত আছে চট্টগ্রাম বন্দর, ঢাকার কমলাপুর আইসিডি, সিলেট, রংপুর, দিনাজপুর ও শ্রীমঙ্গল। আছে বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি ডিপো ও খাদ্যশস্যের মজুতাগারও। কনটেইনার, জ্বালানি তেল, খাদ্যশস্য, সার, পাথর, নির্মাণসামগ্রী, কৃষিপণ্য ও শিল্পের কাঁচামালসহ নানা পণ্য এসব স্থানে পরিবহন করে রেলওয়ে। তবু চাহিদার কাছাকাছিও পৌঁছানো যাচ্ছে না। এ নিয়ে বন্দর, কাস্টমস এজেন্ট ও ব্যবসায়ীরা রেলওয়েকে চিঠি দিয়েছেন।

কমেছে কনটেইনার ট্রেন

একসময় চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ড (সিজিপিওয়াই) থেকে প্রতিদিন কয়েকটি কনটেইনারবাহী ট্রেন ঢাকার কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে যেত। এখন যায় একটির বেশি নয়। চট্টগ্রাম থেকে সিলেট, শ্রীমঙ্গল ও রংপুরগামী তেলবাহী ট্রেন এবং বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্য, গম ও সার বহনকারী ট্রেনের চলাচলও অনেকটা কমে গেছে।

ইঞ্জিনের অপেক্ষায় তেলভর্তি ওয়াগন

বিপিসির বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের প্রধান ডিপো থেকে ওয়াগনে করে দেশের নানা অঞ্চলে জ্বালানি তেল পাঠানো হয়। কিন্তু ইঞ্জিনের অভাবে তেলভর্তি ওয়াগন অনেক সময় দিনের পর দিন পড়ে থাকে। কখনো কখনো ইঞ্জিন পেতে লেগে যায় ১৫ দিন পর্যন্ত।

বিপিসি ও রেলওয়ের সূত্র জানায়, গত ২০ আগস্ট শ্রীমঙ্গলে পাঠানোর জন্য ২০টি ওয়াগনে তেল বোঝাই করে সিজিপিওয়াইয়ে রাখা হয়েছিল। ইঞ্জিন না মেলায় ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেগুলো ইয়ার্ডেই পড়ে ছিল। সিলেট ডিপোর জন্য তেল ভর্তি আরেকটি ওয়াগন রেককে অপেক্ষা করতে হয়েছে দুই সপ্তাহের বেশি। গত ২৫ মে থেকে সিলেটগামী একটি এবং ২৩ মে থেকে শ্রীমঙ্গলগামী একটি জ্বালানিবাহী ট্রেন নির্ধারিত সময়ে ছাড়তে পারেনি। ওই সময় সিলেট অঞ্চলে তেলের সংকট দেখা দিয়েছিল।

চট্টগ্রাম থেকে চারটি রুটে তেল পরিবহনে প্রতিদিন অন্তত দুটি ট্রেন লাগে। মাসে চাহিদা ৬০টির, কিন্তু মেলে ৪০ থেকে ৪৫টির বেশি নয়। নির্ধারিত সময়ে তেল না পৌঁছালে সংকট তৈরি হয়, তাই বিষয়টি স্পর্শকাতর। বিপিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এ নিয়ে তাঁদের প্রায়ই উদ্বেগে থাকতে হয়।

ইঞ্জিন কেনায় কম গুরুত্ব

রেলওয়ের উন্নয়নে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হলেও ইঞ্জিন সংগ্রহ তেমন গুরুত্ব পায়নি। রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ১৫ বছরে খরচ হয়েছে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে কেনা হয়েছে মাত্র ৪০টি ইঞ্জিন। একই সময়ে বহর থেকে বাদ পড়েছে ৯০টির বেশি পুরোনো ইঞ্জিন।

৭০টি নতুন ইঞ্জিন কেনার পরিকল্পনা ছিল। এক যুগের বেশি সময়েও তা বাস্তবায়ন হয়নি; ২০২৪ সালে সেই পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। চট্টগ্রাম-দোহাজারী ডাবল লাইন প্রকল্পের আওতায় ৩০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন আমদানির কথা আছে, তবে সেগুলো পেতে আরও তিন থেকে চার বছর লাগতে পারে।

বন্দর ও ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ

পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল ব্যাহত হলে বন্দরেও তার প্রভাব পড়ে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, অনেক সময় কনটেইনারের জট লেগে যায়। সমাধানে কাস্টমস ও রেলওয়েকে চিঠি দিয়ে তাগাদা দেওয়া হয়, কিন্তু তাতে খুব একটা কাজ হয় না।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হকের মতে, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারেনি রেলওয়ে। তিনি বলেন, ট্রেনে পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে ব্যবসায়ীদের খরচ অনেকটাই কমত, আর তার সুফল পৌঁছাত ভোক্তা পর্যন্ত। বাস্তবে এখন বেশি খরচে সড়ক ও নৌপথেই পণ্য পাঠাতে হচ্ছে।

৫৩ দিনে ৪৯টি ট্রেনের বিলম্ব

রেলওয়ের তথ্য বলছে, গত ১ জুন থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৫৩ দিনে শুধু ইঞ্জিন সংকটের কারণে ৪৯টি পণ্যবাহী ট্রেন সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি। ট্রেনগুলোর বিলম্ব হয়েছে ১ হাজার ১৪৭ ঘণ্টা। এর মধ্যে ৪০ শতাংশের বেশি ট্রেনের বিলম্বের কারণ, পণ্যবাহী ট্রেনের ইঞ্জিন খুলে যাত্রীবাহী ট্রেনে লাগিয়ে দেওয়া। সম্প্রতি চট্টগ্রামগামী একটি জ্বালানিবাহী ট্রেনের ইঞ্জিন খুলে অন্য ট্রেনে যুক্ত করায় সেটি আখাউড়ায় টানা ১২ দিনের বেশি আটকে ছিল। গত বছরের ১৯ থেকে ২৯ ডিসেম্বর ইঞ্জিন না থাকায় ১১ দিন পণ্যবাহী ট্রেন একেবারেই চলেনি।

‘বুড়ো ইঞ্জিনে’ ভর

রেলের বহরে ইঞ্জিন আছে ২৯৭টি; এর ১৬৭টি মিটারগেজ, ১৩০টি ব্রডগেজ। সাধারণত একটি ইঞ্জিনের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ধরা হয় ২০ বছর। সেই সময়সীমার মধ্যে আছে ১৪৭টি, বাকি ১৫০টির আয়ুষ্কাল অনেক আগেই ফুরিয়েছে। তাই চলার পথে প্রায়ই বিকল হয়ে পড়ে এই ‘বুড়ো ইঞ্জিন’।

যাত্রীবাহী ট্রেনেও একই সংকট

রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইঞ্জিন, বগি ও লোকবলের সংকটে বেশ কয়েক বছর ধরে ৯৯টি ট্রেন বন্ধ। করোনাকালে বন্ধ করা অনেক ট্রেনের বড় অংশ আর চালু করা যায়নি। বন্ধ ট্রেনের ৫০টি পূর্বাঞ্চলে, ৪৯টি পশ্চিমাঞ্চলে। চালু থাকা ট্রেনের মধ্যেও শুধু পূর্বাঞ্চলেই প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টি মেইল, লোকাল ও কমিউটার ট্রেন চালানো যায় না।

রেলওয়ে যা বলছে

রেলপথ মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইঞ্জিনসহ নানা সংকটের কারণেই পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল সীমিত রাখতে হচ্ছে। রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সর্বশেষ সংসদ অধিবেশনে এ সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, চাহিদা থাকলেও নানা সমস্যায় মালবাহী ট্রেনে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য পরিবহন করা যাচ্ছে না। সক্ষমতা বাড়াতে নতুন ওয়াগন ও লোকোমোটিভ সংগ্রহ, আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক রেল সংযোগ সম্প্রসারণ এবং আইসিডি ও লজিস্টিকস হাব তৈরির বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট মোহাম্মদ সফিকুর রহমান বলেন, পণ্যবাহী ট্রেন সচল রাখতে প্রতিদিন ১০-১২টি ইঞ্জিন দরকার, কিন্তু সংকটের কারণে চার-পাঁচটির বেশি মেলে না। এর মধ্যেই বিদ্যমান সক্ষমতায় সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

সিরাজগঞ্জে জামতৈল রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ পুলিশ সুপারের

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

পাঠ্যবইয়ে ‘দাঁড়িপাল্লা’ বিতর্কের রেশ না কাটতেই এবার ‘নৌকা’ নিয়ে তোলপাড়

২৬ অক্টোবর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

ইঞ্জিনের অভাবে থমকে মালবাহী ট্রেন, পাঁচ বছরে সক্ষমতা প্রায় অর্ধেক

আপডেট সময় ০১:২০:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

সড়ক বা নদীপথের চেয়ে ট্রেনে পণ্য আনা-নেওয়া অনেক সাশ্রয়ী। কিন্তু সেই সুবিধা পাওয়া এখন কঠিন হয়ে উঠেছে। রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে চলেছিল দুই হাজার ৭৭০টি ট্রেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চলেছে এক হাজার ৪৬৭টি। অর্থাৎ কমেছে এক হাজার ৩০৩টি।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এই দশার মূল কারণ ইঞ্জিনের সংকট। সঙ্গে আছে বগি, ওয়াগন ও লোকবলের ঘাটতি। ফলে এই খাত থেকে বিপুল রাজস্ব আয়ের যে সম্ভাবনা ছিল, তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

রেলের নেটওয়ার্কে যুক্ত আছে চট্টগ্রাম বন্দর, ঢাকার কমলাপুর আইসিডি, সিলেট, রংপুর, দিনাজপুর ও শ্রীমঙ্গল। আছে বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি ডিপো ও খাদ্যশস্যের মজুতাগারও। কনটেইনার, জ্বালানি তেল, খাদ্যশস্য, সার, পাথর, নির্মাণসামগ্রী, কৃষিপণ্য ও শিল্পের কাঁচামালসহ নানা পণ্য এসব স্থানে পরিবহন করে রেলওয়ে। তবু চাহিদার কাছাকাছিও পৌঁছানো যাচ্ছে না। এ নিয়ে বন্দর, কাস্টমস এজেন্ট ও ব্যবসায়ীরা রেলওয়েকে চিঠি দিয়েছেন।

কমেছে কনটেইনার ট্রেন

একসময় চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ড (সিজিপিওয়াই) থেকে প্রতিদিন কয়েকটি কনটেইনারবাহী ট্রেন ঢাকার কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে যেত। এখন যায় একটির বেশি নয়। চট্টগ্রাম থেকে সিলেট, শ্রীমঙ্গল ও রংপুরগামী তেলবাহী ট্রেন এবং বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্য, গম ও সার বহনকারী ট্রেনের চলাচলও অনেকটা কমে গেছে।

ইঞ্জিনের অপেক্ষায় তেলভর্তি ওয়াগন

বিপিসির বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের প্রধান ডিপো থেকে ওয়াগনে করে দেশের নানা অঞ্চলে জ্বালানি তেল পাঠানো হয়। কিন্তু ইঞ্জিনের অভাবে তেলভর্তি ওয়াগন অনেক সময় দিনের পর দিন পড়ে থাকে। কখনো কখনো ইঞ্জিন পেতে লেগে যায় ১৫ দিন পর্যন্ত।

বিপিসি ও রেলওয়ের সূত্র জানায়, গত ২০ আগস্ট শ্রীমঙ্গলে পাঠানোর জন্য ২০টি ওয়াগনে তেল বোঝাই করে সিজিপিওয়াইয়ে রাখা হয়েছিল। ইঞ্জিন না মেলায় ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেগুলো ইয়ার্ডেই পড়ে ছিল। সিলেট ডিপোর জন্য তেল ভর্তি আরেকটি ওয়াগন রেককে অপেক্ষা করতে হয়েছে দুই সপ্তাহের বেশি। গত ২৫ মে থেকে সিলেটগামী একটি এবং ২৩ মে থেকে শ্রীমঙ্গলগামী একটি জ্বালানিবাহী ট্রেন নির্ধারিত সময়ে ছাড়তে পারেনি। ওই সময় সিলেট অঞ্চলে তেলের সংকট দেখা দিয়েছিল।

চট্টগ্রাম থেকে চারটি রুটে তেল পরিবহনে প্রতিদিন অন্তত দুটি ট্রেন লাগে। মাসে চাহিদা ৬০টির, কিন্তু মেলে ৪০ থেকে ৪৫টির বেশি নয়। নির্ধারিত সময়ে তেল না পৌঁছালে সংকট তৈরি হয়, তাই বিষয়টি স্পর্শকাতর। বিপিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এ নিয়ে তাঁদের প্রায়ই উদ্বেগে থাকতে হয়।

ইঞ্জিন কেনায় কম গুরুত্ব

রেলওয়ের উন্নয়নে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হলেও ইঞ্জিন সংগ্রহ তেমন গুরুত্ব পায়নি। রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ১৫ বছরে খরচ হয়েছে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে কেনা হয়েছে মাত্র ৪০টি ইঞ্জিন। একই সময়ে বহর থেকে বাদ পড়েছে ৯০টির বেশি পুরোনো ইঞ্জিন।

৭০টি নতুন ইঞ্জিন কেনার পরিকল্পনা ছিল। এক যুগের বেশি সময়েও তা বাস্তবায়ন হয়নি; ২০২৪ সালে সেই পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। চট্টগ্রাম-দোহাজারী ডাবল লাইন প্রকল্পের আওতায় ৩০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন আমদানির কথা আছে, তবে সেগুলো পেতে আরও তিন থেকে চার বছর লাগতে পারে।

বন্দর ও ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ

পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল ব্যাহত হলে বন্দরেও তার প্রভাব পড়ে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, অনেক সময় কনটেইনারের জট লেগে যায়। সমাধানে কাস্টমস ও রেলওয়েকে চিঠি দিয়ে তাগাদা দেওয়া হয়, কিন্তু তাতে খুব একটা কাজ হয় না।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হকের মতে, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারেনি রেলওয়ে। তিনি বলেন, ট্রেনে পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে ব্যবসায়ীদের খরচ অনেকটাই কমত, আর তার সুফল পৌঁছাত ভোক্তা পর্যন্ত। বাস্তবে এখন বেশি খরচে সড়ক ও নৌপথেই পণ্য পাঠাতে হচ্ছে।

৫৩ দিনে ৪৯টি ট্রেনের বিলম্ব

রেলওয়ের তথ্য বলছে, গত ১ জুন থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৫৩ দিনে শুধু ইঞ্জিন সংকটের কারণে ৪৯টি পণ্যবাহী ট্রেন সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি। ট্রেনগুলোর বিলম্ব হয়েছে ১ হাজার ১৪৭ ঘণ্টা। এর মধ্যে ৪০ শতাংশের বেশি ট্রেনের বিলম্বের কারণ, পণ্যবাহী ট্রেনের ইঞ্জিন খুলে যাত্রীবাহী ট্রেনে লাগিয়ে দেওয়া। সম্প্রতি চট্টগ্রামগামী একটি জ্বালানিবাহী ট্রেনের ইঞ্জিন খুলে অন্য ট্রেনে যুক্ত করায় সেটি আখাউড়ায় টানা ১২ দিনের বেশি আটকে ছিল। গত বছরের ১৯ থেকে ২৯ ডিসেম্বর ইঞ্জিন না থাকায় ১১ দিন পণ্যবাহী ট্রেন একেবারেই চলেনি।

‘বুড়ো ইঞ্জিনে’ ভর

রেলের বহরে ইঞ্জিন আছে ২৯৭টি; এর ১৬৭টি মিটারগেজ, ১৩০টি ব্রডগেজ। সাধারণত একটি ইঞ্জিনের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ধরা হয় ২০ বছর। সেই সময়সীমার মধ্যে আছে ১৪৭টি, বাকি ১৫০টির আয়ুষ্কাল অনেক আগেই ফুরিয়েছে। তাই চলার পথে প্রায়ই বিকল হয়ে পড়ে এই ‘বুড়ো ইঞ্জিন’।

যাত্রীবাহী ট্রেনেও একই সংকট

রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইঞ্জিন, বগি ও লোকবলের সংকটে বেশ কয়েক বছর ধরে ৯৯টি ট্রেন বন্ধ। করোনাকালে বন্ধ করা অনেক ট্রেনের বড় অংশ আর চালু করা যায়নি। বন্ধ ট্রেনের ৫০টি পূর্বাঞ্চলে, ৪৯টি পশ্চিমাঞ্চলে। চালু থাকা ট্রেনের মধ্যেও শুধু পূর্বাঞ্চলেই প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টি মেইল, লোকাল ও কমিউটার ট্রেন চালানো যায় না।

রেলওয়ে যা বলছে

রেলপথ মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইঞ্জিনসহ নানা সংকটের কারণেই পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল সীমিত রাখতে হচ্ছে। রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সর্বশেষ সংসদ অধিবেশনে এ সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, চাহিদা থাকলেও নানা সমস্যায় মালবাহী ট্রেনে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য পরিবহন করা যাচ্ছে না। সক্ষমতা বাড়াতে নতুন ওয়াগন ও লোকোমোটিভ সংগ্রহ, আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক রেল সংযোগ সম্প্রসারণ এবং আইসিডি ও লজিস্টিকস হাব তৈরির বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট মোহাম্মদ সফিকুর রহমান বলেন, পণ্যবাহী ট্রেন সচল রাখতে প্রতিদিন ১০-১২টি ইঞ্জিন দরকার, কিন্তু সংকটের কারণে চার-পাঁচটির বেশি মেলে না। এর মধ্যেই বিদ্যমান সক্ষমতায় সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।

Share this news as a Photo Card