আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তির দিকে থাকলেও দেশের ভেতরে এর প্রভাব পড়তে দিল না সরকার। আসন্ন আগস্ট মাসের জন্যও জ্বালানি তেলের মূল্য অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। বৃহস্পতিবার এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রণালয় জানিয়ে দিয়েছে, ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের বর্তমান দামই বহাল থাকবে আগামী মাসেও।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আগামী ১ আগস্ট থেকে ডিজেল আগের দামেই অর্থাৎ প্রতি লিটার ১১৫ টাকায় বিক্রি হবে। কেরোসিনের দামও অপরিবর্তিত থেকে দাঁড়াবে ১৩৫ টাকা লিটার। অকটেনের ক্ষেত্রে ভোক্তাদের গুনতে হবে প্রতি লিটারে ১৪৫ টাকা, আর পেট্রোলের দাম থাকছে ১৪০ টাকা লিটার। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে সর্বশেষ নির্ধারিত এই মূল্যহারই আগস্ট মাসজুড়ে বলবৎ থাকবে বলে প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করা হয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের ৩১ মে জ্বালানি তেলের দাম নতুন করে নির্ধারণ করেছিল সরকার। এরপর টানা তিন মাস—জুন, জুলাই ও এখন আগস্ট—কোনো ধরনের পরিবর্তন ছাড়াই একই দামে জ্বালানি তেল বিক্রি অব্যাহত থাকছে। বিশ্ববাজারে অস্থিরতা সত্ত্বেও দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে এই স্থিতিশীলতা সাধারণ ভোক্তা ও পরিবহন খাতের জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা বয়ে এনেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উল্লেখ্য, বৈশ্বিক বাজারের গতিপ্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল গত বছরের মার্চ মাস থেকে। এই ব্যবস্থার আওতায় প্রতি মাসেই নতুন করে দাম ঘোষণা করার কথা থাকলেও, বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন মনে করলে আগের দামও বহাল রাখতে পারে—যেমনটি ঘটল টানা তিন মাস ধরে। শুধু জ্বালানি তেল নয়, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে প্রতি মাসে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস তথা এলপিজির দামও নির্ধারণ করে থাকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে বছরে জ্বালানি তেলের মোট চাহিদা প্রায় ৭২ লাখ টন। এই বিপুল চাহিদার সিংহভাগ, প্রায় পঁচাত্তর শতাংশই দখল করে আছে ডিজেল। বাকি পঁচিশ শতাংশ চাহিদা মেটে পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন, জেট ফুয়েল এবং ফার্নেস অয়েলের মতো নানা ধরনের জ্বালানি দিয়ে। কৃষিক্ষেত্রে সেচকাজ থেকে শুরু করে পরিবহন খাত ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে জেনারেটর চালানো পর্যন্ত—সবখানেই ডিজেলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা যায়, যা এই জ্বালানিকে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের এক অপরিহার্য অনুষঙ্গে পরিণত করেছে।
আকাশপথে ব্যবহৃত জেট ফুয়েল এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের দাম নির্ধারণের দায়িত্ব একসময় নিয়মিতভাবে পালন করত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। তবে বর্তমানে এই দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন, যারা প্রতি মাসেই এসব জ্বালানির মূল্য পুনর্নির্ধারণ করে থাকে। অন্যদিকে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের মূল্যহার নির্ধারণের কাজটি করে থাকে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। এভাবে দুই সংস্থার সমন্বিত তত্ত্বাবধানে দেশের সামগ্রিক জ্বালানি বাজার পরিচালিত হয়ে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও দাম অপরিবর্তিত রাখার এই ধারাবাহিকতা ভোক্তাদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ধরনের আস্থা তৈরি করতে সহায়ক হতে পারে। বিশেষত পরিবহন ব্যয় ও কৃষি উৎপাদন খরচের হিসাব-নিকাশে যারা প্রতিনিয়ত জ্বালানি তেলের দামের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই স্থিতিশীলতা একটি ইতিবাচক দিক হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপ্রকৃতি কেমন থাকে এবং তার প্রেক্ষাপটে সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট সবার।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 



















