দেশের ঔষধ শিল্পের সম্প্রসারণ, নীতিগত দিকনির্দেশনা জোরদার এবং জাতীয় ঔষধনীতি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ‘জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ’ পুনর্গঠন করেছে সরকার। আগের জারি করা একটি প্রজ্ঞাপন বাতিল করে নতুন এই ২৪ সদস্যবিশিষ্ট পরিষদ গঠন করা হয়েছে। নতুন এই কমিটিতে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি শিল্প ও বাণিজ্য খাতের প্রতিনিধিদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা দেশের ঔষধ খাতকে আরও সুসংগঠিত করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সম্প্রতি দেশের ঔষধ খাতের নীতি নির্ধারণী এই পরিষদ নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করে সরকার। এর আগে গত ২১ জুন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল, যেখানে মন্ত্রীকে সভাপতি করে ২২ সদস্যবিশিষ্ট একটি পরিষদ গঠন করা হয়।
তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও ঔষধ খাতের বহুমুখী চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকার সেই সিদ্ধান্তে পরিবর্তন এনেছে। নতুন প্রজ্ঞাপনে সুস্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, ২১ জুন ২০২৬ তারিখে জারি করা আগের প্রজ্ঞাপনটি বাতিল করা হয়েছে। নতুন এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। এর ফলে পূর্বের ২২ সদস্যের পরিবর্তে এখন ২৪ সদস্যের একটি বিস্তৃত এবং শক্তিশালী পরিষদ আত্মপ্রকাশ করল।
নেতৃত্বে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, নতুন যুক্ত হলেন যারা পুনর্গঠিত এই পরিষদের নেতৃত্বভার থাকছে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের হাতে। পদাধিকার বলে এই পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী। আর সদস্য সচিবের গুরুদায়িত্ব পালন করবেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব।
তবে নতুন এই পরিষদে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো কিছু নতুন ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদের অন্তর্ভুক্তি। দেশের স্বাস্থ্য খাতের সার্বিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টি মাথায় রেখে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারীকে নতুন করে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে।
পাশাপাশি, ঔষধ শিল্পে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আমদানি-রপ্তানির শুল্ক জটিলতা নিরসনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানকেও এই পরিষদের সদস্য করা হয়েছে। অর্থনীতি ও বিনিয়োগ খাতের এই শীর্ষ কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্তি ঔষধ শিল্পে একটি বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যাদের নিয়ে গঠিত হলো পূর্ণাঙ্গ পরিষদ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর এবং পেশাজীবী সংগঠনগুলোর মধ্যে একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধন তৈরির লক্ষ্যেই এই পরিষদের সদস্য তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, উপর্যুক্ত সদস্যদের বাইরেও এই পরিষদে থাকছেন:
-
মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি: অর্থ বিভাগের সচিব, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব, খাদ্য, শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিববৃন্দ।
-
অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তা: ঔষধ খাতের সরাসরি নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।
-
শিক্ষাবিদ ও গবেষক: বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি ও রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান।
-
পেশাজীবী ও শিল্প প্রতিনিধি: বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিলের সচিব, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই-এর সভাপতি, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (বিএপিআই) এবং বাংলাদেশ ফার্মাসিউটিক্যাল সোসাইটির সভাপতি।
কী করবে এই উপদেষ্টা পরিষদ? এই পরিষদের মূল কাজ হবে দেশের ঔষধ খাতের জন্য একটি সুস্থ ও যুগোপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা। প্রজ্ঞাপনে তাদের কর্মপরিধি অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথমত, সরকারকে জাতীয় ঔষধনীতি বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা ও পরামর্শ দেওয়া এই পরিষদের প্রধান কাজ। দেশীয় ঔষধ শিল্পের কীভাবে আরও উন্নয়ন ঘটানো যায় এবং দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত ঔষধের উৎপাদন ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে তারা দিকনির্দেশনা দেবে।
দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যসেবায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো ‘অত্যাবশ্যকীয় ঔষধের তালিকা’। এই তালিকাটি প্রণয়ন এবং প্রতি দুই বছর অন্তর তা আধুনিক ও হালনাগাদ করার গুরুদায়িত্ব থাকবে এই পরিষদের কাঁধে।
তৃতীয়ত, ঔষধ এবং এর কাঁচামাল আমদানি, দেশে উৎপাদন এবং বিদেশে রপ্তানি সংক্রান্ত নীতিগত ও জটিল বিষয়গুলোতে সরকারকে সঠিক ও সময়োপযোগী পরামর্শ প্রদান করবে এই কমিটি।
সমন্বয় ও জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় যেকোনো মহামারি বা জাতীয় দুর্যোগের সময় ঔষধের সরবরাহ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, এ ধরনের যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় ঔষধের মজুত ও সরবরাহের বিষয়ে সরকারকে তাৎক্ষণিক ও কার্যকরী পরামর্শ দেবে এই পরিষদ।
পাশাপাশি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা এবং ঔষধ উৎপাদন, আমদানি, বিতরণ ও বিক্রয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে একটি সুষ্ঠু সমন্বয় সাধন করাও তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
নিয়ম অনুযায়ী, এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ বছরে অন্তত দু’বার বৈঠকে মিলিত হবে। তবে সরকার বা পরিষদের সভাপতি যদি মনে করেন, তবে দেশের প্রয়োজনে এর চেয়ে বেশি সভাও আয়োজন করা যাবে। এছাড়া, নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে বিশেষ জ্ঞানের প্রয়োজন হলে, পরিষদের বাইরে থেকেও বিশেষজ্ঞ সদস্যদের সাময়িকভাবে কমিটিতে (কো-অপ্ট) যুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে নতুন এই নীতিমালায়।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 









