গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর। সকাল ১০টা ৩০ মিনিট। রাজধানীর উপকণ্ঠ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ হাউজিং এলাকায় একটি বাড়ি থেকে ভেসে আসে বিকট শব্দ। মুহূর্তেই কেঁপে ওঠে এলাকা। জানা যায়, ‘উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসা’ হিসেবে পরিচিত ভাড়া নেওয়া ওই বাড়িটিতে ঘটেছে শক্তিশালী বিস্ফোরণ। সেই বিস্ফোরণের রেশ শুধু ওই ভবনটির দেয়াল বা ছাদ ধসিয়ে দেয়নি, বরং তা উন্মোচিত করেছে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার এক গভীর সংকটের চিত্র।
বিস্ফোরণের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বাড়িটি থেকে যে পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার করেছে, তা রীতিমতো শিহরিত করার মতো। হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, এসিটোন, নাইট্রিক অ্যাসিডসহ প্রায় ৪০০ লিটার তরল রাসায়নিক এবং নয়টি তাজা বোমা—সব মিলিয়ে বোঝা যায়, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি পরিকল্পিত নাশকতার প্রস্তুতি।
পুনরুত্থানের নেপথ্যে কারা?
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্যমতে, এই মাদ্রাসার পরিচালক শেখ আল আমিনের নেতৃত্বে সেখানে সক্রিয় ছিল আইএস-মতাদর্শী উগ্রপন্থী সংগঠন নব্য জেএমবি। গ্রেপ্তারকৃত ১৭ জনের মধ্যে শেখ আল আমিন, অলি উল্লাহ জনি ও শাহীন ওরফে আবু বকর আগে থেকেই উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন।
তদন্তে উঠে এসেছে, বিস্ফোরণের আগের রাতে আল আমিন নিজেই বোমাগুলো তৈরি করেছিলেন। অসতর্কতাবশত বিস্ফোরণ ঘটলে তিনি তাঁর স্ত্রী ও সন্তানকে হাসপাতালে রেখেই পালিয়ে যান। এরপর সাভার ও দোলাইরপাড়ে বিভিন্ন সহযোগীর আশ্রয়ে আত্মগোপন করেন তিনি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শেষ পর্যন্ত ধরা পড়েন আল আমিন। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী নাজমুল হাসান মামুন ও মোহাম্মদ আরিফ এখনো গোয়েন্দাদের ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
এক সুতোয় গাঁথা ধারাবাহিক নাশকতা
কেরানীগঞ্জের বিস্ফোরণকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটা তিনটি ঘটনার সঙ্গে এই উগ্রবাদী গোষ্ঠীর যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন কর্মকর্তারা।
১. যাত্রাবাড়ী ঘটনা: ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার কুতুবখালীতে পুলিশের ওপর হামলার সময় ফেলে যাওয়া ব্যাগ থেকে পাওয়া বোমার সঙ্গে কেরানীগঞ্জের বোমার হুবহু মিল রয়েছে।
২. সায়েদাবাদ বিস্ফোরণ: মার্চে সায়দাবাদের জনপদ মোড়ে পুলিশের তল্লাশির সময় বিস্ফোরণ।
৩. কুমিল্লা শিবমন্দির: একই সময়ে কুমিল্লার মন্দিরে বিস্ফোরণ।
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে, এই তিনটি ঘটনার পেছনেই রয়েছে নাজমুল হাসান মামুন ও মোহাম্মদ আরিফের মতো ব্যক্তিরা।
নিরাপত্তা নজরদারিতে কেন শৈথিল্য?
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কারামুক্ত ও জামিনে থাকা উগ্রপন্থীদের পুনরায় সক্রিয় হওয়ার খবর নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, কারাগার থেকে বেরিয়ে আসার পর থেকেই এই গোষ্ঠীটি সুপরিকল্পিতভাবে বিস্ফোরক মজুত শুরু করে।
তবে প্রশ্ন উঠছে, রাষ্ট্রযন্ত্রের নজরদারি এখন কোন পর্যায়ে? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর (এটিইউ ও সিটিটিসি) কার্যক্রমে এখন আগের মতো গতি নেই। এর পেছনে রয়েছে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে তৈরি হওয়া এক ধরনের অস্বস্তি। বিশেষ কোনো অভিযানে গেলে বা কঠোর পদক্ষেপ নিলে তা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার ভয়ে অনেক কর্মকর্তা এখন সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন। পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের সীমান্তভিত্তিক উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাউকে গ্রেপ্তার করার পর কর্মকর্তাদের বিভিন্ন বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছিল, যা তাঁদের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলেছে।
সতর্কতা
সহিংস উগ্রবাদ এখন একটি বৈশ্বিক হুমকি। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো শাফকাত মুনির মনে করেন, পরিস্থিতির উন্নতি হলেও আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, “সহিংস উগ্রবাদ ও উগ্রবাদী হুমকিকে কোনোভাবেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। পরিস্থিতি অনুকূলে রাখতে হলে বিশেষায়িত সংস্থা ও বাহিনীগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে উগ্রবাদ দমনের পুরো প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করতে হবে।”
পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিটগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তাধীন বলে মন্তব্য করলেও, বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। অনলাইন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, সন্দেহভাজনদের গতিবিধি এবং বিদেশ-যোগাযোগের ওপর কঠোর নজরদারির অভাব নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনগুলোকে ফের মাথাচাড়া দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে কি না—সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
কেরানীগঞ্জের সেই বিকট শব্দ কেবল একটি বিস্ফোরণের সংকেত ছিল না, বরং তা ছিল দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা। যখন একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পায় এবং ধারাবাহিকভাবে পুলিশের ওপর হামলা বা জনস্থানে বিস্ফোরণ ঘটানোর মতো দুঃসাহস দেখায়, তখন তা রাষ্ট্রের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের বিষয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারিত্ব এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার সমন্বয়েই কেবল এই হুমকি মোকাবিলা করা সম্ভব। নতুবা, এই ছোট ছোট বিস্ফোরণগুলোই একদিন বড় ধরনের সংকটের রূপ নিতে পারে।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 









