ঢাকায় পরপর বোমা উদ্ধার,কি রহস্য নেপথ্যে কারা

গত কয়েক দিনের মধ্যে রাজধানী ঢাকার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বোমাসদৃশ বস্তু ও শক্তিশালী বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনা নতুন করে জনমনে নিরাপত্তা-উদ্বেগ ছড়িয়ে দিয়েছে। মতিঝিল, মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশন এলাকা এবং সাভারের আশুলিয়ায় ধারাবাহিকভাবে এমন ঘটনা ঘটায় প্রশ্ন উঠেছে, এগুলো নিছক বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা, নাকি বিশেষ কোনো মহল পরিকল্পিতভাবে জনমনে ভীতি ছড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। এই চারটি ঘটনার মধ্যে দুটিতে প্রকৃত ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস বা আইইডি উদ্ধার হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অন্যদিকে মিরপুর-১০ ও ফার্মগেটে পাওয়া সন্দেহজনক বস্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে কোনো ধরনের বিস্ফোরকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে দেশজুড়ে পুলিশের মাঠপর্যায়ের সব ইউনিটকে তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শনিবার পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশন্স কন্ট্রোল থেকে পাঠানো এক জরুরি বার্তায় সারা দেশে এই সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

কী ঘটেছিল একে একে

গত ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি পরিত্যক্ত ছাতার ভেতর থেকে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি পাইপ বোমা উদ্ধার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের বোম ডিসপোজাল ইউনিট। বোমাটির ওজন ছিল প্রায় দেড় কেজি পর্যন্ত। নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে সেটি নিষ্ক্রিয় করার সময় পথচারী একজন আহত হন। এর ঠিক ছয় দিনের মাথায়, ৩০ জুলাই রাতে সাভারের আশুলিয়ায় একটি মুদি দোকান থেকে উদ্ধার হয় আরও একটি আইইডি। ট্রাভেল ব্যাগের ভেতরে রাখা একটি প্রেসার কুকারের মধ্যে বোমাটি তৈরি করা হয়েছিল এবং তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এতে টাইমার সংযুক্ত ছিল, যা নির্দিষ্ট একটি সময়ে বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্যই প্রস্তুত করা হয়েছিল। এই দুটি ঘটনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে সংশ্লিষ্ট বাহিনী।

এরই মধ্যে শনিবার সকালে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয় মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে বোমাসদৃশ বস্তু নজরে আসায়। স্থানীয় বাসিন্দারা বিষয়টি দেখে দ্রুত পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে বোম ডিসপোজাল ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে পরীক্ষা চালায়। পরীক্ষা শেষে জানা যায়, মিরপুরে পাওয়া বস্তুটি আসলে ছিল পান-সুপারি রাখার একটি কৌটা, আর ফার্মগেটে পাওয়া বস্তার মধ্যে ছিল পরিত্যক্ত আবর্জনা। পরবর্তীতে এক সংবাদ সম্মেলনে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান জানান, এই দুটি ঘটনায় জননিরাপত্তার জন্য কোনো প্রকৃত হুমকি ছিল না। তবে মতিঝিল ও আশুলিয়ায় উদ্ধার হওয়া প্রকৃত বিস্ফোরকের ঘটনা দুটি নিয়ে তদন্ত থেমে নেই, বরং তা চলছে পূর্ণ গুরুত্বের সঙ্গে।

তদন্তে যা উঠে আসছে

কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক জানিয়েছেন, মতিঝিল ও আশুলিয়ার ঘটনায় জড়িত কাউকে এখনো শনাক্ত করা যায়নি। তবে একাধিক তদন্তকারী দল বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, গ্রেফতারের পরই স্পষ্ট হবে এই ঘটনার পেছনে প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, কারা এর সঙ্গে যুক্ত এবং কেন এমন নাশকতার চেষ্টা করা হয়েছিল। একইসঙ্গে তিনি আশ্বস্ত করেন, যে কোনো ধরনের নাশকতা মোকাবিলায় তার বাহিনী সর্বোচ্চ প্রস্তুত রয়েছে এবং উগ্রবাদী তথা অন্যান্য সন্ত্রাসী সংগঠনের কার্যক্রম নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা অবশ্য বলছেন, সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলোতে সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার তেমন কারণ নেই। তাদের ভাষ্যমতে, একটি দুষ্কৃতিকারী চক্র মূলত জনমনে ভয় ও বিভ্রান্তি তৈরি করতেই এসব অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তারপরও যে কোনো ধরনের নাশকতা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এ কারণে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে বরং সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আশুলিয়ায় উদ্ধার হওয়া আইইডির নির্মাণকৌশল কী ছিল, তাতে কোন ধরনের বিস্ফোরক উপাদান ব্যবহার করা হয়েছিল এবং টাইমিং ডিভাইসটি কীভাবে সাজানো হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং সম্ভাব্য জড়িত ব্যক্তিদের গতিবিধিও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি।

ঘরে বসেই তৈরি হচ্ছে বোমা তৈরির দক্ষতা

কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশে এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছে, যারা ঘরে বসেই আইইডি তৈরির সক্ষমতা অর্জন করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সাভার, কেরানীগঞ্জ ও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ইতিমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে এমন তথ্যও যে, গ্রেফতার হওয়া এসব ব্যক্তির কেউ কেউ বিদেশে গিয়ে বিস্ফোরক তৈরির প্রশিক্ষণ নিয়েছিল।

উদ্বেগের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানভিত্তিক তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান তথা টিটিপি এবং লস্কর-ই-তৈয়বা তথা এলইটির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করার ঘটনাও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নজরে রয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, এই ধরনের নেটওয়ার্কগুলো অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, এনক্রিপটেড অ্যাপ এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের নানা মাধ্যম ব্যবহার করে সদস্য সংগ্রহ এবং নিজস্ব মতাদর্শ প্রচারের চেষ্টা চালাচ্ছে। ফলে প্রকাশ্যে সক্রিয় সংগঠনগুলোর পাশাপাশি ছোট ছোট গোপন নেটওয়ার্ক বা তথাকথিত ‘স্লিপার সেল’ এখন নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য নতুন এক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের চোখে পরিস্থিতি

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, জঙ্গিবাদ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। তার মতে, বড় কোনো হামলা না হওয়াকে জঙ্গিবাদের অবসান হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বরং অনলাইন প্রচারণা, গোপন যোগাযোগ এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নেটওয়ার্ক তৈরির প্রবণতা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য একেবারে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তিনি মনে করেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের মধ্য দিয়েই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বরং পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং সমাজের সবাই মিলে সমন্বিত উদ্যোগ নিলেই উগ্রবাদ প্রতিরোধ কার্যকর হতে পারে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, বর্তমানে বড় ধরনের কোনো হামলার সুনির্দিষ্ট তথ্য তাদের হাতে নেই। তবে সম্ভাব্য যে কোনো নাশকতা ঠেকাতে সব ধরনের সন্দেহজনক গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।

এদিকে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এমজেডএম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, যে নামেই বা যে আদর্শের আড়ালেই উগ্রবাদ পরিচালিত হোক না কেন, তা মোকাবিলায় তার বাহিনী কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তিনি জানান, গোয়েন্দা নজরদারি এবং সাইবার মনিটরিং সার্বক্ষণিকভাবে চালু রয়েছে এবং কোনো বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া মাত্রই তা যাচাই করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলো একদিকে যেমন গুজব ও আতঙ্কের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনি অন্যদিকে প্রকৃত বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের প্রয়োজনীয়তাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। তাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করা, প্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা তৎপরতাকে আরও জোরদার করা এবং জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা—এই তিনটি পদক্ষেপই ভবিষ্যতে সম্ভাব্য যে কোনো নাশকতা প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।

পুলিশের যানবাহনের নিরাপত্তায় বিশেষ নির্দেশনা

সারা দেশে পুলিশের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ সতর্কতাও জারি করা হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য বা দুষ্কৃতকারীরা পুলিশের জিপ, পিকআপ ভ্যান, বাসসহ বিভিন্ন যানবাহনের ওপর হামলা চালাতে পারে। এই আশঙ্কা থেকেই পুলিশের মাঠপর্যায়ের সব ইউনিটকে তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শনিবার পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশন্স কন্ট্রোল থেকে পাঠানো জরুরি বার্তার মাধ্যমে সারা দেশে এই সতর্কতা কার্যকর করা হয়েছে।

ওই বার্তায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, পুলিশের যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের শিথিলতা বা অবহেলার সুযোগ নেই। বিশেষভাবে ডিউটির সময় এবং ডিউটি শেষে পার্কিং করে রাখা যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ডিউটিরত কোনো যানবাহন সাময়িকভাবে থামানোর প্রয়োজন হলে সেটি অবশ্যই নিরাপদ কোনো স্থানে পার্ক করতে হবে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের সার্বক্ষণিক নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে। কোনো অবস্থাতেই চালক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য ছাড়া কোনো যানবাহন ফেলে রাখা যাবে না বলে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ডিউটি শেষে থানা, পুলিশ লাইন্স, অফিস কম্পাউন্ড কিংবা অন্য যে কোনো নির্ধারিত স্থানে রাখা সব সরকারি যানবাহনের নিরাপত্তা বাড়ানোরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এসব স্থানে নিয়মিত টহল পরিচালনা, প্রয়োজনীয় নজরদারি বজায় রাখা এবং সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তি বা বস্তু নজরে এলে তা দ্রুত শনাক্তে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে নির্দেশনায়।

সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক এই ঘটনাপ্রবাহ একদিকে যেমন নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সক্রিয়তা ও প্রস্তুতির প্রমাণ বহন করছে, তেমনি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে দেশের ভেতরে উগ্রবাদী তৎপরতা এখনো পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। প্রযুক্তির সহজলভ্যতার সুযোগ নিয়ে ঘরে বসেই বিস্ফোরক তৈরির দক্ষতা অর্জন করা ব্যক্তিদের উপস্থিতি, গোপন নেটওয়ার্কের বিস্তার এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ—এই সব মিলিয়ে আগামী দিনগুলোতে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য সতর্কতা ও প্রস্তুতি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জিভেরও পেসমেকার হয়? নাক ডাকা ও স্লিপ অ্যাপনিয়া দূর করবে নতুন যন্ত্র

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

জ্বালানি তেলের নতুন দাম নির্ধারণ

৩১ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

ঢাকায় পরপর বোমা উদ্ধার,কি রহস্য নেপথ্যে কারা

আপডেট সময় ০২:১৫:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬

গত কয়েক দিনের মধ্যে রাজধানী ঢাকার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বোমাসদৃশ বস্তু ও শক্তিশালী বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনা নতুন করে জনমনে নিরাপত্তা-উদ্বেগ ছড়িয়ে দিয়েছে। মতিঝিল, মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশন এলাকা এবং সাভারের আশুলিয়ায় ধারাবাহিকভাবে এমন ঘটনা ঘটায় প্রশ্ন উঠেছে, এগুলো নিছক বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা, নাকি বিশেষ কোনো মহল পরিকল্পিতভাবে জনমনে ভীতি ছড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। এই চারটি ঘটনার মধ্যে দুটিতে প্রকৃত ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস বা আইইডি উদ্ধার হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অন্যদিকে মিরপুর-১০ ও ফার্মগেটে পাওয়া সন্দেহজনক বস্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে কোনো ধরনের বিস্ফোরকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে দেশজুড়ে পুলিশের মাঠপর্যায়ের সব ইউনিটকে তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শনিবার পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশন্স কন্ট্রোল থেকে পাঠানো এক জরুরি বার্তায় সারা দেশে এই সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

কী ঘটেছিল একে একে

গত ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি পরিত্যক্ত ছাতার ভেতর থেকে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি পাইপ বোমা উদ্ধার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের বোম ডিসপোজাল ইউনিট। বোমাটির ওজন ছিল প্রায় দেড় কেজি পর্যন্ত। নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে সেটি নিষ্ক্রিয় করার সময় পথচারী একজন আহত হন। এর ঠিক ছয় দিনের মাথায়, ৩০ জুলাই রাতে সাভারের আশুলিয়ায় একটি মুদি দোকান থেকে উদ্ধার হয় আরও একটি আইইডি। ট্রাভেল ব্যাগের ভেতরে রাখা একটি প্রেসার কুকারের মধ্যে বোমাটি তৈরি করা হয়েছিল এবং তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এতে টাইমার সংযুক্ত ছিল, যা নির্দিষ্ট একটি সময়ে বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্যই প্রস্তুত করা হয়েছিল। এই দুটি ঘটনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে সংশ্লিষ্ট বাহিনী।

এরই মধ্যে শনিবার সকালে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয় মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে বোমাসদৃশ বস্তু নজরে আসায়। স্থানীয় বাসিন্দারা বিষয়টি দেখে দ্রুত পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে বোম ডিসপোজাল ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে পরীক্ষা চালায়। পরীক্ষা শেষে জানা যায়, মিরপুরে পাওয়া বস্তুটি আসলে ছিল পান-সুপারি রাখার একটি কৌটা, আর ফার্মগেটে পাওয়া বস্তার মধ্যে ছিল পরিত্যক্ত আবর্জনা। পরবর্তীতে এক সংবাদ সম্মেলনে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান জানান, এই দুটি ঘটনায় জননিরাপত্তার জন্য কোনো প্রকৃত হুমকি ছিল না। তবে মতিঝিল ও আশুলিয়ায় উদ্ধার হওয়া প্রকৃত বিস্ফোরকের ঘটনা দুটি নিয়ে তদন্ত থেমে নেই, বরং তা চলছে পূর্ণ গুরুত্বের সঙ্গে।

তদন্তে যা উঠে আসছে

কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক জানিয়েছেন, মতিঝিল ও আশুলিয়ার ঘটনায় জড়িত কাউকে এখনো শনাক্ত করা যায়নি। তবে একাধিক তদন্তকারী দল বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, গ্রেফতারের পরই স্পষ্ট হবে এই ঘটনার পেছনে প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, কারা এর সঙ্গে যুক্ত এবং কেন এমন নাশকতার চেষ্টা করা হয়েছিল। একইসঙ্গে তিনি আশ্বস্ত করেন, যে কোনো ধরনের নাশকতা মোকাবিলায় তার বাহিনী সর্বোচ্চ প্রস্তুত রয়েছে এবং উগ্রবাদী তথা অন্যান্য সন্ত্রাসী সংগঠনের কার্যক্রম নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা অবশ্য বলছেন, সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলোতে সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার তেমন কারণ নেই। তাদের ভাষ্যমতে, একটি দুষ্কৃতিকারী চক্র মূলত জনমনে ভয় ও বিভ্রান্তি তৈরি করতেই এসব অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তারপরও যে কোনো ধরনের নাশকতা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এ কারণে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে বরং সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আশুলিয়ায় উদ্ধার হওয়া আইইডির নির্মাণকৌশল কী ছিল, তাতে কোন ধরনের বিস্ফোরক উপাদান ব্যবহার করা হয়েছিল এবং টাইমিং ডিভাইসটি কীভাবে সাজানো হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং সম্ভাব্য জড়িত ব্যক্তিদের গতিবিধিও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি।

ঘরে বসেই তৈরি হচ্ছে বোমা তৈরির দক্ষতা

কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশে এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছে, যারা ঘরে বসেই আইইডি তৈরির সক্ষমতা অর্জন করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সাভার, কেরানীগঞ্জ ও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ইতিমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে এমন তথ্যও যে, গ্রেফতার হওয়া এসব ব্যক্তির কেউ কেউ বিদেশে গিয়ে বিস্ফোরক তৈরির প্রশিক্ষণ নিয়েছিল।

উদ্বেগের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানভিত্তিক তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান তথা টিটিপি এবং লস্কর-ই-তৈয়বা তথা এলইটির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করার ঘটনাও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নজরে রয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, এই ধরনের নেটওয়ার্কগুলো অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, এনক্রিপটেড অ্যাপ এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের নানা মাধ্যম ব্যবহার করে সদস্য সংগ্রহ এবং নিজস্ব মতাদর্শ প্রচারের চেষ্টা চালাচ্ছে। ফলে প্রকাশ্যে সক্রিয় সংগঠনগুলোর পাশাপাশি ছোট ছোট গোপন নেটওয়ার্ক বা তথাকথিত ‘স্লিপার সেল’ এখন নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য নতুন এক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের চোখে পরিস্থিতি

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, জঙ্গিবাদ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। তার মতে, বড় কোনো হামলা না হওয়াকে জঙ্গিবাদের অবসান হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বরং অনলাইন প্রচারণা, গোপন যোগাযোগ এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নেটওয়ার্ক তৈরির প্রবণতা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য একেবারে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তিনি মনে করেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের মধ্য দিয়েই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বরং পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং সমাজের সবাই মিলে সমন্বিত উদ্যোগ নিলেই উগ্রবাদ প্রতিরোধ কার্যকর হতে পারে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, বর্তমানে বড় ধরনের কোনো হামলার সুনির্দিষ্ট তথ্য তাদের হাতে নেই। তবে সম্ভাব্য যে কোনো নাশকতা ঠেকাতে সব ধরনের সন্দেহজনক গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।

এদিকে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এমজেডএম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, যে নামেই বা যে আদর্শের আড়ালেই উগ্রবাদ পরিচালিত হোক না কেন, তা মোকাবিলায় তার বাহিনী কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তিনি জানান, গোয়েন্দা নজরদারি এবং সাইবার মনিটরিং সার্বক্ষণিকভাবে চালু রয়েছে এবং কোনো বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া মাত্রই তা যাচাই করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলো একদিকে যেমন গুজব ও আতঙ্কের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনি অন্যদিকে প্রকৃত বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের প্রয়োজনীয়তাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। তাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করা, প্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা তৎপরতাকে আরও জোরদার করা এবং জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা—এই তিনটি পদক্ষেপই ভবিষ্যতে সম্ভাব্য যে কোনো নাশকতা প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।

পুলিশের যানবাহনের নিরাপত্তায় বিশেষ নির্দেশনা

সারা দেশে পুলিশের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ সতর্কতাও জারি করা হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য বা দুষ্কৃতকারীরা পুলিশের জিপ, পিকআপ ভ্যান, বাসসহ বিভিন্ন যানবাহনের ওপর হামলা চালাতে পারে। এই আশঙ্কা থেকেই পুলিশের মাঠপর্যায়ের সব ইউনিটকে তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শনিবার পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশন্স কন্ট্রোল থেকে পাঠানো জরুরি বার্তার মাধ্যমে সারা দেশে এই সতর্কতা কার্যকর করা হয়েছে।

ওই বার্তায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, পুলিশের যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের শিথিলতা বা অবহেলার সুযোগ নেই। বিশেষভাবে ডিউটির সময় এবং ডিউটি শেষে পার্কিং করে রাখা যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ডিউটিরত কোনো যানবাহন সাময়িকভাবে থামানোর প্রয়োজন হলে সেটি অবশ্যই নিরাপদ কোনো স্থানে পার্ক করতে হবে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের সার্বক্ষণিক নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে। কোনো অবস্থাতেই চালক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য ছাড়া কোনো যানবাহন ফেলে রাখা যাবে না বলে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ডিউটি শেষে থানা, পুলিশ লাইন্স, অফিস কম্পাউন্ড কিংবা অন্য যে কোনো নির্ধারিত স্থানে রাখা সব সরকারি যানবাহনের নিরাপত্তা বাড়ানোরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এসব স্থানে নিয়মিত টহল পরিচালনা, প্রয়োজনীয় নজরদারি বজায় রাখা এবং সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তি বা বস্তু নজরে এলে তা দ্রুত শনাক্তে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে নির্দেশনায়।

সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক এই ঘটনাপ্রবাহ একদিকে যেমন নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সক্রিয়তা ও প্রস্তুতির প্রমাণ বহন করছে, তেমনি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে দেশের ভেতরে উগ্রবাদী তৎপরতা এখনো পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। প্রযুক্তির সহজলভ্যতার সুযোগ নিয়ে ঘরে বসেই বিস্ফোরক তৈরির দক্ষতা অর্জন করা ব্যক্তিদের উপস্থিতি, গোপন নেটওয়ার্কের বিস্তার এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ—এই সব মিলিয়ে আগামী দিনগুলোতে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য সতর্কতা ও প্রস্তুতি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Share this news as a Photo Card