বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ঢাকার পাঠানো অনুরোধ এখনো খতিয়ে দেখছে নয়াদিল্লির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সম্প্রতি দেশটির পার্লামেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটিকে এই তথ্য জানিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার লোকসভায় উপস্থাপিত এক প্রতিবেদনে এ বিষয়টি উঠে আসে। কংগ্রেস সংসদ সদস্য শশী থারুরের নেতৃত্বাধীন এই কমিটি আগের একটি প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ পর্যালোচনা করে নতুন প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। “ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ” শিরোনামের এই দলিলে বলা হয়েছে, প্রচলিত আইন ও নিয়মিত প্রক্রিয়া মেনেই শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ অনুরোধ নিয়ে কাজ করছে কর্তৃপক্ষ।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের একটি আদালত শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়ার পর তাঁকে ফেরত পাঠানোর দাবি জোরালো হয়। এই অনুরোধের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল সংসদীয় কমিটি নিজেই।
২০২৪ সালের আগস্টে গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা। তখন থেকে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। তাঁর পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়, এবং সেই সরকারের পক্ষ থেকেই প্রথম শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছিল দিল্লিকে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হলেও একই অনুরোধ পুনরায় জানানো হয় ভারতকে।
রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে ভারতের অবস্থান
ভারতে অবস্থানকালে শেখ হাসিনা দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে যোগাযোগ রাখছেন এবং বিভিন্ন সময় বিবৃতিও দিচ্ছেন বলে জানা যায়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারও দিয়েছেন তিনি। তবে ভারত সরকারের দাবি, তাঁকে কোনো ধরনের সক্রিয় রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না।
সংসদীয় কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, চরম সংকট কিংবা অস্তিত্বের হুমকির মুখে থাকা ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়া ভারতের দীর্ঘদিনের মানবিক ঐতিহ্য ও সভ্যতাগত মূল্যবোধের একটি অংশ, আর সেই বিবেচনাতেই শেখ হাসিনাকে সেখানে থাকতে দেওয়া হচ্ছে।
কমিটি আরও জানায়, ভারত সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে দেশটির ভূখণ্ড বা কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে শেখ হাসিনাকে সক্রিয় রাজনীতি চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়নি। অন্য কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক তৎপরতার জন্য নিজেদের মাটি ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ার যে দীর্ঘদিনের নীতি ভারত অনুসরণ করে আসছে, প্রতিবেদনে সে কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে কমিটি সুপারিশ করেছে, ভারত সরকার যেন ভবিষ্যতেও এ বিষয়ে একটি নীতিনিষ্ঠ ও মানবিক অবস্থান বজায় রাখে এবং একই সঙ্গে যথাযথ কূটনৈতিক সংবেদনশীলতা ও আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিষয়টি সামলায়।
উল্লেখ্য, শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও নিয়মিত আলোচনা চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের আইন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করতে চাইলে তাঁকে আগেভাগেই গ্রেপ্তার করা হতে পারে। এর আগে বিএনপির একাধিক নেতা শেখ হাসিনাকে ফেরাতে ভারতের সদিচ্ছা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছিলেন।
সব মিলিয়ে, প্রায় দুই বছর পার হলেও শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি দিল্লি। তবে সংসদীয় কমিটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদন থেকে এটুকু স্পষ্ট যে, বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পর্যালোচনা প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে এটি একটি স্পর্শকাতর অধ্যায় হয়েই থাকছে
চলমান বার্তা ডেস্ক : 




















