বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার জাপান। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে টোকিও এবং ঢাকার মধ্যে এক ধরনের নীরব টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। তবে বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই সম্পর্কের বরফ গলাতে শুরু করেছে।
স্থগিত থাকা মেট্রোরেলের দুটি বড় প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে, ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহুল আলোচিত তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্বও শেষ পর্যন্ত জাপানি কনসোর্টিয়ামের হাতেই যাচ্ছে।
তবে কি জাপান যা চাইছে তা-ই মেনে নিচ্ছে ঢাকা? সরকারি সূত্রগুলো বলছে, সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের স্বার্থ রক্ষায় প্রকল্পগুলোর ব্যয় কমাতে জাপানের সঙ্গে জোরালো দর-কষাকষিও চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।
মেট্রোরেলের খরচের গেরো: কেন এত ব্যয়?
জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা বা জাইকার অর্থায়নে ঢাকায় নতুন দুটি মেট্রোরেল প্রকল্পের (এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫) কাজ চলছে। কিন্তু এই প্রকল্প দুটির অস্বাভাবিক ব্যয় নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আপত্তি ওঠে, যার জেরে প্রক্রিয়াগত কাজ স্থগিত রাখা হয়েছিল।
পরিসংখ্যান বলছে, দেশের বৈদেশিক ঋণের প্রায় ১৮ শতাংশই আসে জাপানের কাছ থেকে। কিন্তু মেট্রোরেল নির্মাণে জাপানি কোম্পানিগুলোর দেওয়া প্রাক্কলিত ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে খোদ ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)।
ব্যয়ের একটি তুলনামূলক চিত্র:
-
উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রথম মেট্রোরেল নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছিল ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা।
-
নতুন দুটি পথে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ৩ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা।
-
২০১৯ সালে এমআরটি লাইন-১ এবং লাইন-৫ এর প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল যথাক্রমে ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি এবং ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা।
-
বিস্তারিত সমীক্ষা শেষে জাইকা এমআরটি-১ প্রকল্পের ব্যয় ৮৪ শতাংশ বাড়িয়ে ৯৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং এমআরটি-৫ প্রকল্পের ব্যয় ১১৩ শতাংশ বাড়িয়ে ৮৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব করে।
এশিয়া প্যাসিফিকের অন্যান্য দেশের তুলনায় এই ব্যয় অনেক বেশি বলে আপত্তি জানিয়েছিলেন ডিএমটিসিএল-এর তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদ। তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদ জানিয়েছেন, “সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হচ্ছে জাপানের অর্থায়নেই মেট্রোরেল দুটি নির্মিত হবে। তবে প্রকল্পের ব্যয় কমাতে জাইকার সঙ্গে আলোচনা চলছে। আশা করছি, দ্রুতই একটি সম্মানজনক সুরাহা হবে।”
জাপানের যুক্তি বনাম ঢাকার অবস্থান
ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে জাইকার নিজস্ব কিছু যুক্তি রয়েছে। তাদের দাবি, নতুন দুটি মেট্রোরেলের একটি বড় অংশ মাটির নিচ দিয়ে (পাতাল রেল) যাবে, তাই স্বাভাবিকভাবেই খরচ বেশি। এছাড়া ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, নির্মাণ সামগ্রীর দাম এবং নকশায় পরিবর্তনও একটি বড় কারণ। যেমন, গাবতলী স্টেশনের দৈর্ঘ্য ৩০০ মিটার থেকে বাড়িয়ে ৬৫০ মিটার করা হয়েছে। ভাটারা ও কচুক্ষেত স্টেশনের গভীরতাও বাড়াতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, ঢাকার নীতিনির্ধারকদের যুক্তি ভিন্ন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জাপানি ঋণের শর্তগুলো এমনভাবে সাজানো থাকে যে, সেখানে ঘুরেফিরে দু-তিনটি জাপানি কোম্পানিই কেবল দরপত্রে অংশ নিতে পারে। আন্তর্জাতিক অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জন্য দরপত্র উন্মুক্ত না থাকায় প্রতিযোগিতামূলক বাজারদর পাওয়া যায় না।
এই অচলাবস্থা কাটাতে গত ২০ মে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি, এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এম শামীমুজ্জামান বসুনিয়াকে আহ্বায়ক করে ৭ সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছে সরকার। ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা যাচাই করে দেখবে এই কমিটি।
তৃতীয় টার্মিনালের চাবি জাপানের হাতেই
মেট্রোরেলের পাশাপাশি আরও একটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান সরকার। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং বা পরিচালনার কাজ নিয়ে দীর্ঘদিনের সিদ্ধান্তহীনতার অবসান হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশের পর তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনায় জাপানের সঙ্গে চুক্তির কাজ দ্রুত এগোচ্ছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম জানিয়েছেন, “চলতি মাসের মধ্যেই জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তির জোর চেষ্টা চলছে।”
এই চুক্তির আওতায় টার্মিনাল পরিচালনার রাজস্বের ৭৩ শতাংশ পাবে জাপান, আর বাংলাদেশ পাবে ২৭ শতাংশ। জাপানি কনসোর্টিয়ামে থাকছে—জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন, নিপ্পন কোয়েই এবং নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট করপোরেশন।
সুদের হার বৃদ্ধি: চিঠি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী
জাপানের সঙ্গে প্রকল্প নিয়ে যখন দর-কষাকষি চলছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশের জন্য নতুন চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ঋণের সুদের হার। গত ১ এপ্রিল থেকে সাধারণ জাপানি ঋণের সুদের হার ২ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে পুরনো বা নমনীয় সুদের হার বহাল রাখার অনুরোধ জানিয়ে জাপানের অর্থমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের সময়সীমা ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত পিছিয়েছে। এই ক্রান্তিকালে জাপানের কাছ থেকে অন্তত আগামী তিন বছরের জন্য নমনীয় সুদের হার প্রত্যাশা করছে ঢাকা।
সম্পর্কের ভবিষ্যৎ ও বিশ্লেষকদের মত
আজ ১ জুলাই। ঠিক এক দশক আগে ২০১৬ সালের এই দিনে ঢাকার হোলি আর্টিজান বেকারিতে ঘটেছিল ভয়াবহ জঙ্গি হামলা, যেখানে সাতজন জাপানি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছিলেন। নিহতদের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পাঁচ দিনের সফরে আজ ঢাকায় আসছেন জাইকার প্রেসিডেন্ট তানাকা আকিহিকো।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, তাঁর এই সফরে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হবে, যেখানে মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ নিয়ে চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা আসতে পারে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন:
“জাপানি কোম্পানিগুলোর দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু বাংলাদেশে তাদের প্রকল্পগুলোর অস্বাভাবিক ব্যয় নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার কারণ কী বা কার দায় কতটুকু—তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। ভূরাজনীতি ও অর্থনীতির প্রয়োজনে জাপানের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখাটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে একইসঙ্গে, দেশের স্বার্থে প্রকল্পে ব্যয় কমানোর দর-কষাকষিও চালিয়ে যেতে হবে।”
বিএনপি সরকার একদিকে যেমন জাপানের মতো পরীক্ষিত বন্ধুর সঙ্গে উন্নয়ন অংশীদারিত্বের সম্পর্ক মসৃণ করতে চাইছে, অন্যদিকে তেমনি দেশের অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপের ঝুঁকি কমাতেও সতর্ক পা ফেলছে। এখন দেখার বিষয়, এই দ্বিমুখী কৌশলে ঢাকা কতটা সফল হয়।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 













