অবহেলিত কুচিয়া মাছকে ঘিরে বাংলাদেশের মৎস্য খাতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছেন একদল গবেষক। হাওর, বিল আর গ্রামীণ জলাশয়ে অবাধে মেলে এই মাছ, অথচ দেশের বেশিরভাগ মানুষের পাতে তার তেমন জায়গা হয় না। এই উপেক্ষাই যেন কুচিয়াকে ঠেলে দিয়েছিল বিস্মৃতির কোণে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে চিত্রটা একেবারে ভিন্ন। উচ্চমাত্রার প্রোটিন, ক্যালসিয়াম-ফসফরাস-আয়রনের মতো খনিজ, ভিটামিন-বি কমপ্লেক্স আর ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডে ভরপুর এই মাছকে সেখানে গণ্য করা হয় ‘হাই ভ্যালু অ্যাকুয়াটিক রিসোর্স’ হিসেবে। মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ানো থেকে শুরু করে হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো, সহজপাচ্য হওয়ায় হজমশক্তি উন্নত করা—পুষ্টিগুণের এই দীর্ঘ তালিকা কুচিয়াকে অনেক আগেই এগিয়ে রাখার কথা ছিল। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রক্রিয়াজাত শিল্পে এই সম্পদকে রূপান্তরের উদ্যোগ ছিল হাতে গোনা।
এই শূন্যস্থান পূরণে এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। সোমবার (১৭ আগস্ট) বিকেলে গবেষক দলের প্রধান ড. পরেশ কুমার শর্মা জানান, আধুনিক ক্যানিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা কুচিয়া মাছ থেকে নিরাপদ, পুষ্টিসমৃদ্ধ ও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণযোগ্য ক্যানড ফিশ পণ্য তৈরি করেছেন, আর পরীক্ষামূলক পর্যায়ে তা সফলও হয়েছে। উন্নত তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, জীবাণুমুক্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ, মানসম্মত প্যাকেজিং ও সংরক্ষণ প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি এই পণ্যের স্বাদ, গুণগত মান আর নিরাপত্তা—তিনটি ক্ষেত্রেই মিলেছে সন্তোষজনক ফল।
বাণিজ্যিক সম্ভাবনার প্রসঙ্গে ড. পরেশ কুমার শর্মা বলেন, কুচিয়া মাছ চাষ ও রপ্তানি ইতিমধ্যে বাংলাদেশের মৎস্য খাতে একটি দ্রুত বিকাশমান ধারা হয়ে উঠেছে। বর্তমানে জাপান, চীন, মঙ্গোলিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ প্রায় ১৫টি দেশে যাচ্ছে এই মাছ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের হিসাব বলছে, মোট উৎপাদন হয়েছিল ১৫ হাজার ৭৯০ মেট্রিক টন, যার মধ্যে ৯ হাজার ৯৪৭ মেট্রিক টন রপ্তানি করে আয় হয়েছে প্রায় ৭৫২ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা। (উল্লেখ্য, এই পরিসংখ্যান সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে পাওয়া, হালনাগাদ তথ্যের জন্য মৎস্য অধিদপ্তরের সরকারি তথ্যভাণ্ডার যাচাই করে নেওয়া যেতে পারে।)
তবে সম্ভাবনাময় এই খাতের পথে বাধাও কম নয়। অপর্যাপ্ত কোল্ড-চেইন ব্যবস্থা, দুর্বল পরিবহণ অবকাঠামো, অনুন্নত সংরক্ষণ প্রযুক্তি আর আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণের ঘাটতির কারণে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাছ আহরণ-পরবর্তী ক্ষতির মুখে পড়ে। এতে শুধু আর্থিক ক্ষতিই হয় না, কমে যায় পুষ্টিগুণ, নামে বাজারমূল্যও। গবেষকদের মতে, আধুনিক পোস্ট-হারভেস্ট প্রযুক্তি, নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ, উন্নত শুকানোর ব্যবস্থা, ক্যানিং প্রযুক্তি আর ভ্যালু অ্যাডেড পণ্য উন্নয়নের মধ্য দিয়ে এই ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
গবেষক দলটি জানায়, কুচিয়া মাছ থেকে এই প্রথমবারের মতো তারা ক্যানিং প্রক্রিয়ায় পণ্য তৈরি করেছেন। এতে ব্যবহৃত হয়েছে উন্নত তাপ নিয়ন্ত্রণ, সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং মানসম্মত প্যাকেজিং, যার ফলে পণ্যের স্বাদ, পুষ্টিগুণ ও নিরাপত্তা থেকেছে সম্পূর্ণ অক্ষত—আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য যা একেবারে অপরিহার্য শর্ত। মানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে গবেষকরা নমুনা পাঠিয়েছিলেন ভারতের পরীক্ষাগার ‘শিভা এনালাইটিক্যাল প্রাইভেট লিমিটেড’-এ, যা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত টেকনা গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। (এই পরীক্ষাগার ও প্রতিষ্ঠানের বিবরণ গবেষক দলের বক্তব্য অনুযায়ী উপস্থাপিত; স্বাধীনভাবে যাচাই করার সুযোগ এখানে নেই।)
পরীক্ষার ফলাফল আশাব্যঞ্জক বলে জানান গবেষকরা। মাইক্রোবায়োলজিক্যাল সেফটি, পুষ্টিমান, আর্দ্রতা, সংরক্ষণ সক্ষমতা ও খাদ্য নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি সূচকে মিলেছে সন্তোষজনক ফল। তাদের ভাষায়, এই পণ্য এখন বৈশ্বিক রপ্তানির জন্য শতভাগ প্রস্তুত। আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী পণ্যের গুণগত স্থায়িত্ব আর নিরাপদ ভোক্তা উপযোগিতা নিশ্চিত হওয়ায় এটি রপ্তানিযোগ্য পণ্য হিসেবে তৈরি করেছে নতুন সম্ভাবনা।
২০২৫ সালে শুরু হওয়া এই গবেষণা প্রকল্প চলে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত। গবেষক দলটি বলছে, প্রাথমিক এই সাফল্য কুচিয়া মাছভিত্তিক ক্যানড ফুডের সম্ভাবনাকে নতুনভাবে সামনে আনলেও এর ভবিষ্যৎ গতিপথ, ব্যবসায়িক মডেল আর সম্ভাব্য দেশীয়-আন্তর্জাতিক বাজার নিয়ে আরও গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষভাবে জরুরি উৎপাদন ব্যয়, বাজার চাহিদা, রপ্তানি সক্ষমতা, ভোক্তার গ্রহণযোগ্যতা আর সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে আরও গবেষণা। একই সঙ্গে এই উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে ব্যবসায়িক উদ্যোক্তা, কৃষক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি দাতা সংস্থা আর বিনিয়োগকারীদের একসঙ্গে এগিয়ে আসা প্রয়োজন বলে মনে করেন গবেষকরা। তাহলেই অবহেলিত কুচিয়া মাছ হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় বৈদেশিক আয় আর টেকসই উদ্যোক্তা উন্নয়নের খাত।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিশেষজ্ঞ দলের ভাষায়, ছোট্ট একটি ক্যানের ভেতরেই লুকিয়ে আছে অপার সম্ভাবনা। কুচিয়া শুধু একটি পণ্য নয়, এটি বাংলাদেশের মৎস্য খাতের এক সম্ভাব্য ‘গেম চেঞ্জার’। এই মাছ দেখাচ্ছে বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক আয়ের স্বপ্ন। আধুনিক ক্যানিং প্রযুক্তি আর আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃতি—এই দুই হাতিয়ারেই বাংলাদেশ একসময়ের অবহেলিত এই মাছকে পরিণত করতে পারে বৈদেশিক মুদ্রার নির্ভরযোগ্য উৎসে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের অর্থনীতি, পুষ্টি নিরাপত্তা আর গ্রামীণ জীবিকায় মৎস্য খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের মোট প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশেরও বেশি আসে মাছ থেকে বলে জানা যায়। বাংলাদেশের মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বর্তমানে দেশের মৎস্য রপ্তানির একটি বড় অংশ ঝুঁকছে মূল্য সংযোজিত পণ্যের দিকে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদার ইঙ্গিত বহন করে। এই প্রেক্ষাপটে কুচিয়া মাছের ক্যানিং প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণার এই সূচনা দেশের মৎস্য অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হয়ে থাকতে পারে, যদি একে যথাযথ নীতিসহায়তা ও বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে বাণিজ্যিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 



















