শিরোনাম :
নতুন প্রস্তাব

রুপিতে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য চায় রাশিয়া

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক লেনদেনে সৃষ্ট জটিলতা কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতীয় রুপির মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য নিষ্পত্তির প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া। একইসঙ্গে দুই দেশের মধ্যে একটি পৃথক পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং ঢাকায় একটি রুশ ব্যাংকের শাখা চালুর পুরনো প্রস্তাবটিও নতুন করে সামনে এনেছে মস্কো।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ বা ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, আগামী সেপ্টেম্বর অথবা অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশ-রাশিয়া “ইন্টারগভর্নমেন্টাল কমিশন অন ট্রেড, ইকোনমিক, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কোঅপারেশন”-এর বৈঠকে এই প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সেই বৈঠকের আগে বাংলাদেশের অবস্থান ও আলোচ্যসূচি চূড়ান্ত করতে একটি প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিষেধাজ্ঞার চাপে বিকল্প পথের খোঁজ
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে রুশ ব্যাংকগুলোর সঙ্গে প্রচলিত আর্থিক লেনদেন কার্যত থমকে গেছে বলে জানিয়েছেন ইআরডির কর্মকর্তারা। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা হিসেবে ভারতীয় রুপিতে বাণিজ্য নিষ্পত্তির প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া। পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক আর্থিক লেনদেনকে সহজতর করতে একটি স্বতন্ত্র পেমেন্ট অবকাঠামো তৈরিরও প্রস্তাব রেখেছে দেশটি।
এর পাশাপাশি ঢাকায় একটি রুশ ব্যাংকের শাখা চালুর বিষয়টিও ফের আলোচনায় এনেছে মস্কো। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও একই ধরনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়েছিল বটে, তবে বিষয়টি এরপর আর সামনে এগোয়নি।
রূপপুরের অর্থ পাঠানো নিয়ে জটিলতা
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ঋণের কিস্তির অর্থ রাশিয়ায় পাঠাতে পারছে না বাংলাদেশ। শুরুর দিকে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে অর্থ পরিশোধের একটি প্রস্তাব উঠলেও নিষেধাজ্ঞাজনিত ঝুঁকির আশঙ্কায় চীন ও বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো তাতে আগ্রহ দেখায়নি।
বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে সোনালী ব্যাংকে রাশিয়ার নামে খোলা একটি হিসাবে ঋণের কিস্তির অর্থ জমা রাখা হচ্ছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে সেই অর্থ রাশিয়ার ব্যাংকগুলোতে স্থানান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না। ইআরডি সূত্র জানিয়েছে, সোনালী ব্যাংকে জমে থাকা এই অর্থ বাংলাদেশেই বিনিয়োগ করার একটি প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল, তবে রাশিয়া সেই প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি।
রুপিতে বাণিজ্যের প্রেক্ষাপট
রাশিয়ার এই প্রস্তাব এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ভারত ও রাশিয়া নিজেদের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক কারেন্সি সোয়াপ চুক্তি ছাড়াই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভারতীয় রুপিতে পরিচালনা করে আসছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশও ভারতের সঙ্গে ডলারের পাশাপাশি রুপিতেও কিছু বাণিজ্য পরিচালনা করছে, ফলে এই প্রস্তাব একেবারে অপরিচিত কোনো ধারণা নয়।
বাণিজ্য পরিষদ গঠন ও নতুন বিনিয়োগ উদ্যোগ
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিধি বাড়াতে ও তা বহুমুখী করতে “রাশিয়া-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল” গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে মস্কো। একইসঙ্গে রাশিয়ার আমদানিকারকদের সুবিধার্থে নির্ভরযোগ্য বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারকদের একটি নিবন্ধিত তালিকা তৈরিরও প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় সহায়তা দিতেও আগ্রহ প্রকাশ করেছে রাশিয়া। মূলত জ্বালানি ও সামরিক খাতকেন্দ্রিক সম্পর্কের বাইরে গিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রকে বিস্তৃত করার লক্ষ্যেই এসব প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুদ্ধের প্রভাবে কমেছে রপ্তানি
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল রাশিয়া। তবে এত বছরেও রুশ বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যায়নি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে দেশটিতে বাংলাদেশের বার্ষিক রপ্তানি ছিল ৫০ কোটি ডলারেরও বেশি। যুদ্ধ শুরুর পর সেই রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো বা ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় প্রায় ২৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পরিসংখ্যানের তুলনায় বেশ কম। অন্যদিকে বাংলাদেশ এখনও রাশিয়া থেকে সার, গমসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য নিয়মিত আমদানি করে চলেছে।
প্রযুক্তি হস্তান্তরে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার
আসন্ন কমিশন বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার থাকবে প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিত করা। এর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি নিরাপত্তা, ই-কমার্স, ডিজিটাল অর্থনীতি ও উদ্ভাবন খাতে সহযোগিতা জোরদারের প্রস্তাব দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কানেক্টিভিটি এবং লজিস্টিকস খাতেও সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ চাইছে সম্পর্কটিকে শুধু বাণিজ্যিক লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতায় রূপ দিতে।
দুই দেশের কমিশনের পটভূমি
বাংলাদেশ-রাশিয়া অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে ২০১৭ সালে দুই দেশের মধ্যে “ইন্টারগভর্নমেন্টাল কমিশন অন ট্রেড, ইকোনমিক, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কোঅপারেশন” গঠিত হয়েছিল। এই কমিশনের সর্বশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ২০২৩ সালের ১৫ মার্চ। এর আগে ২০১৮ সালে মস্কোতে, ২০১৯ সালে ঢাকায় এবং ২০২১ সালে ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় আসন্ন বৈঠকটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ এবার আলোচনার টেবিলে থাকছে মুদ্রা-সংক্রান্ত একটি সম্পূর্ণ নতুন প্রস্তাব।
কম দামে ইউরিয়া সার সরবরাহের প্রস্তাব
বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছে রাশিয়া। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় প্রতি টনে ১০ ডলার কম দামে বাংলাদেশকে ইউরিয়া সার সরবরাহের প্রস্তাবও দিয়েছে দেশটি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ার চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ভিয়াচেস্লাভ সেন্টিউরিনের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদলের বৈঠকে এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
রাশিয়ার পক্ষ থেকে সরকার-টু-সরকার বা জি-টু-জি ব্যবস্থায় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন বা বিসিআইসিকে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টন ইউরিয়া সার সরবরাহের আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি সূর্যমুখী তেল, হলুদ মটরশুঁটি, ছোলা, লাল মসুর ও সবুজ মসুর ডাল সরবরাহেরও প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা টিসিবি এবং রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান জেএসসি এফইসি প্রোডিনটর্গের মধ্যে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের আওতায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহে সহযোগিতা সম্প্রসারণ নিয়েও কথা হয়েছে বৈঠকে।
বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, পারস্পরিক স্বার্থ ও সুবিধার ভিত্তিতে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বাংলাদেশ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নিষেধাজ্ঞার কারণে সৃষ্ট আর্থিক প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে ওঠার একটি বাস্তবসম্মত পথ হিসেবে রাশিয়া এখন রুপিভিত্তিক বাণিজ্যের দিকে ঝুঁকছে। আসন্ন কমিশন বৈঠকেই স্পষ্ট হবে বাংলাদেশ এই প্রস্তাবগুলোর প্রতি কতটা ইতিবাচক সাড়া দেয়, এবং রূপপুরের আটকে থাকা অর্থ পরিশোধের দীর্ঘদিনের সংকটেরও কোনো সমাধান বেরিয়ে আসে কি না।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

রুপিতে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য চায় রাশিয়া

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের সাধারণ আসনে দায়িত্ব

২৮ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

নতুন প্রস্তাব

রুপিতে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য চায় রাশিয়া

আপডেট সময় ০৬:৫৪:৩৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক লেনদেনে সৃষ্ট জটিলতা কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতীয় রুপির মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য নিষ্পত্তির প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া। একইসঙ্গে দুই দেশের মধ্যে একটি পৃথক পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং ঢাকায় একটি রুশ ব্যাংকের শাখা চালুর পুরনো প্রস্তাবটিও নতুন করে সামনে এনেছে মস্কো।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ বা ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, আগামী সেপ্টেম্বর অথবা অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশ-রাশিয়া “ইন্টারগভর্নমেন্টাল কমিশন অন ট্রেড, ইকোনমিক, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কোঅপারেশন”-এর বৈঠকে এই প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সেই বৈঠকের আগে বাংলাদেশের অবস্থান ও আলোচ্যসূচি চূড়ান্ত করতে একটি প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিষেধাজ্ঞার চাপে বিকল্প পথের খোঁজ
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে রুশ ব্যাংকগুলোর সঙ্গে প্রচলিত আর্থিক লেনদেন কার্যত থমকে গেছে বলে জানিয়েছেন ইআরডির কর্মকর্তারা। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা হিসেবে ভারতীয় রুপিতে বাণিজ্য নিষ্পত্তির প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া। পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক আর্থিক লেনদেনকে সহজতর করতে একটি স্বতন্ত্র পেমেন্ট অবকাঠামো তৈরিরও প্রস্তাব রেখেছে দেশটি।
এর পাশাপাশি ঢাকায় একটি রুশ ব্যাংকের শাখা চালুর বিষয়টিও ফের আলোচনায় এনেছে মস্কো। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও একই ধরনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়েছিল বটে, তবে বিষয়টি এরপর আর সামনে এগোয়নি।
রূপপুরের অর্থ পাঠানো নিয়ে জটিলতা
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ঋণের কিস্তির অর্থ রাশিয়ায় পাঠাতে পারছে না বাংলাদেশ। শুরুর দিকে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে অর্থ পরিশোধের একটি প্রস্তাব উঠলেও নিষেধাজ্ঞাজনিত ঝুঁকির আশঙ্কায় চীন ও বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো তাতে আগ্রহ দেখায়নি।
বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে সোনালী ব্যাংকে রাশিয়ার নামে খোলা একটি হিসাবে ঋণের কিস্তির অর্থ জমা রাখা হচ্ছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে সেই অর্থ রাশিয়ার ব্যাংকগুলোতে স্থানান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না। ইআরডি সূত্র জানিয়েছে, সোনালী ব্যাংকে জমে থাকা এই অর্থ বাংলাদেশেই বিনিয়োগ করার একটি প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল, তবে রাশিয়া সেই প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি।
রুপিতে বাণিজ্যের প্রেক্ষাপট
রাশিয়ার এই প্রস্তাব এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ভারত ও রাশিয়া নিজেদের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক কারেন্সি সোয়াপ চুক্তি ছাড়াই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভারতীয় রুপিতে পরিচালনা করে আসছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশও ভারতের সঙ্গে ডলারের পাশাপাশি রুপিতেও কিছু বাণিজ্য পরিচালনা করছে, ফলে এই প্রস্তাব একেবারে অপরিচিত কোনো ধারণা নয়।
বাণিজ্য পরিষদ গঠন ও নতুন বিনিয়োগ উদ্যোগ
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিধি বাড়াতে ও তা বহুমুখী করতে “রাশিয়া-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল” গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে মস্কো। একইসঙ্গে রাশিয়ার আমদানিকারকদের সুবিধার্থে নির্ভরযোগ্য বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারকদের একটি নিবন্ধিত তালিকা তৈরিরও প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় সহায়তা দিতেও আগ্রহ প্রকাশ করেছে রাশিয়া। মূলত জ্বালানি ও সামরিক খাতকেন্দ্রিক সম্পর্কের বাইরে গিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রকে বিস্তৃত করার লক্ষ্যেই এসব প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুদ্ধের প্রভাবে কমেছে রপ্তানি
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল রাশিয়া। তবে এত বছরেও রুশ বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যায়নি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে দেশটিতে বাংলাদেশের বার্ষিক রপ্তানি ছিল ৫০ কোটি ডলারেরও বেশি। যুদ্ধ শুরুর পর সেই রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো বা ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় প্রায় ২৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পরিসংখ্যানের তুলনায় বেশ কম। অন্যদিকে বাংলাদেশ এখনও রাশিয়া থেকে সার, গমসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য নিয়মিত আমদানি করে চলেছে।
প্রযুক্তি হস্তান্তরে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার
আসন্ন কমিশন বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার থাকবে প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিত করা। এর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি নিরাপত্তা, ই-কমার্স, ডিজিটাল অর্থনীতি ও উদ্ভাবন খাতে সহযোগিতা জোরদারের প্রস্তাব দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, কানেক্টিভিটি এবং লজিস্টিকস খাতেও সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ চাইছে সম্পর্কটিকে শুধু বাণিজ্যিক লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতায় রূপ দিতে।
দুই দেশের কমিশনের পটভূমি
বাংলাদেশ-রাশিয়া অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে ২০১৭ সালে দুই দেশের মধ্যে “ইন্টারগভর্নমেন্টাল কমিশন অন ট্রেড, ইকোনমিক, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কোঅপারেশন” গঠিত হয়েছিল। এই কমিশনের সর্বশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ২০২৩ সালের ১৫ মার্চ। এর আগে ২০১৮ সালে মস্কোতে, ২০১৯ সালে ঢাকায় এবং ২০২১ সালে ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় আসন্ন বৈঠকটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ এবার আলোচনার টেবিলে থাকছে মুদ্রা-সংক্রান্ত একটি সম্পূর্ণ নতুন প্রস্তাব।
কম দামে ইউরিয়া সার সরবরাহের প্রস্তাব
বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছে রাশিয়া। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় প্রতি টনে ১০ ডলার কম দামে বাংলাদেশকে ইউরিয়া সার সরবরাহের প্রস্তাবও দিয়েছে দেশটি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ার চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ভিয়াচেস্লাভ সেন্টিউরিনের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদলের বৈঠকে এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
রাশিয়ার পক্ষ থেকে সরকার-টু-সরকার বা জি-টু-জি ব্যবস্থায় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন বা বিসিআইসিকে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টন ইউরিয়া সার সরবরাহের আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি সূর্যমুখী তেল, হলুদ মটরশুঁটি, ছোলা, লাল মসুর ও সবুজ মসুর ডাল সরবরাহেরও প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা টিসিবি এবং রাশিয়ার প্রতিষ্ঠান জেএসসি এফইসি প্রোডিনটর্গের মধ্যে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের আওতায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহে সহযোগিতা সম্প্রসারণ নিয়েও কথা হয়েছে বৈঠকে।
বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, পারস্পরিক স্বার্থ ও সুবিধার ভিত্তিতে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বাংলাদেশ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নিষেধাজ্ঞার কারণে সৃষ্ট আর্থিক প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে ওঠার একটি বাস্তবসম্মত পথ হিসেবে রাশিয়া এখন রুপিভিত্তিক বাণিজ্যের দিকে ঝুঁকছে। আসন্ন কমিশন বৈঠকেই স্পষ্ট হবে বাংলাদেশ এই প্রস্তাবগুলোর প্রতি কতটা ইতিবাচক সাড়া দেয়, এবং রূপপুরের আটকে থাকা অর্থ পরিশোধের দীর্ঘদিনের সংকটেরও কোনো সমাধান বেরিয়ে আসে কি না।

Share this news as a Photo Card