কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের জেরে দেশজুড়ে তৈরি হওয়া গ্যাস সংকট এখনই কাটছে না। বিশেষজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী, স্বাভাবিক সরবরাহ ফিরতে আরও অন্তত দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম, যেখানে গত এক সপ্তাহ ধরে রান্নাবান্না থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন—সবকিছুতেই পড়েছে সংকটের ছায়া।
গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটিতে বৈদ্যুতিক ত্রুটি থেকে আগুন লাগে। এতে টার্মিনালের দুটি বয়লারের একটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বন্ধ হয়ে যায় পুরো স্থাপনা। দেশে সচল এমন দুটি এলএনজি টার্মিনালের একটি হুট করে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে—যার প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ে চট্টগ্রাম ও ঢাকাসহ আশপাশের এলাকার গ্রাহকদের ওপর।
রান্নাঘরে নিভু নিভু আঁচ
নগরীর বহদ্দারহাট এলাকার বাসিন্দা মুনতাসির উদ্দিনের ভাষ্য, গত কয়েক দিনে সংকট আরও তীব্র হয়েছে। সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে অনেক এলাকায় গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে যাচ্ছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে তার চুলায় আগুন জ্বলছে কোনোরকমে মিটমিট করে। বাধ্য হয়ে অনেক পরিবারই এখন বিকল্প উপায়ে রান্নার পথ খুঁজছে।
সিএনজি স্টেশনে রাতভর অপেক্ষা
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সড়ক পরিবহনেও। শহরের সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনে তৈরি হচ্ছে যানবাহনের দীর্ঘ সারি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও মিলছে না জ্বালানি। রাঙ্গুনিয়া উপজেলার অটোরিকশাচালক মোস্তাক হোসেন জানান, সোমবার সন্ধ্যায় কাপ্তাই সড়কের নজুমিয়াহাট এলাকার একটি সিএনজি স্টেশনে লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি গ্যাস পেয়েছেন পরদিন ভোর ৬টায়। অনেক চালক গ্যাসের অভাবে গাড়িই বের করতে পারছেন না, ফলে সড়কে কমেছে যানবাহনের সংখ্যাও।
শিল্পোৎপাদনেও ধাক্কা
গ্যাসের নিম্নচাপ ও ঘাটতির প্রভাব পড়েছে শিল্পাঞ্চলেও। প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন সচল রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন কারখানার মালিকেরা। এতে একদিকে যেমন বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, অন্যদিকে সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
কেন এই সংকট
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মুহাম্মদ নাছির উদ্দীন জানান, স্বাভাবিক অবস্থায় মহেশখালীর দুটি টার্মিনাল থেকে দৈনিক ১০০ থেকে ১০৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ হতো। কারিগরি ত্রুটির কারণে তা এখন ৬০ কোটি ঘনফুটেরও নিচে নেমে গেছে, ফলে পাইপলাইনে চাপ কমে গেছে ব্যাপকভাবে। দেশি প্রকৌশলীদের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, রোমানিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে আসা বিশেষজ্ঞ দল মেরামতের কাজ শুরু করেছে, তবে প্রয়োজনীয় কিছু সরঞ্জাম বিদেশ থেকে আনতে হবে বলে জানান তিনি।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন ডিভিশন) প্রকৌশলী মু. রইস উদ্দিন আহমেদ বলেন, পুরো চট্টগ্রাম এলএনজিনির্ভর হওয়ায় মহেশখালীর টার্মিনাল বিকল হওয়ার প্রভাব সরাসরি পড়েছে নগরীতে। টার্মিনালটি পুনরায় সচল হতে আরও ১০ থেকে ১২ দিন সময় লাগতে পারে বলে জানান তিনি। কেজিডিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে মোট গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৪৬ হাজার, যাদের মধ্যে ৯৬২ জন শিল্পগ্রাহক ও ২০৪ জন ক্যাপটিভ পাওয়ার গ্রাহক।
কবে মিলবে স্বস্তি
সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, আগস্টের প্রথম সপ্তাহ থেকে সংকট কিছুটা কমতে শুরু করবে এবং পরের সপ্তাহের শেষ নাগাদ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এই সম্ভাব্য সময়সীমা নিশ্চিত করেছেন। এদিকে সমুদ্রে দুটি এলএনজি কার্গো অপেক্ষায় থাকলেও টার্মিনাল বিকল থাকায় তা খালাস করা যাচ্ছে না—যা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার আরেকটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 




















