ইলিশ আমদানি বন্ধ, ১০৩ সনদ বাতিল, ক্ষতির মুখে ব্যবসায়ীরা

ভারত থেকে ইলিশ আমদানির প্রক্রিয়া হঠাৎ থমকে গেছে। মৎস্য অধিদপ্তরের জারি করা ১০৩টি অনাপত্তি সনদ একযোগে বাতিল হওয়ার পর দেশের সীমান্ত বাণিজ্যপথে ইলিশ ঢোকা বন্ধ হয়ে যায়, আর এতে বিপাকে পড়েছেন আমদানিকারকদের একটি বড় অংশ।

মৎস্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডঃ মোঃ খালেদ কনকের স্বাক্ষরে গত ২২ সেপ্টেম্বর এই ১০৩টি অনাপত্তি সনদ বাতিলের চিঠি জারি হয়। এরপর থেকেই ভারত থেকে ইলিশ আনার প্রক্রিয়া কার্যত স্থগিত হয়ে যায়।

আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান জিয়া বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মৎস্য অধিদপ্তরের একটি চিঠি তাদের কাছে পৌঁছেছে, যেখানে অনেকগুলো অনাপত্তি সনদ একযোগে বাতিল করা হয়েছে। তার ভাষায়, এই সিদ্ধান্তের ফলে ইলিশ আমদানি বন্ধ হয়ে পড়েছে এবং আমদানিকারকরা রীতিমতো বিপাকে পড়েছেন।

ইলিশ আমদানিকারক সৈয়দ মহিদুল হক রুবাই বলছেন, হঠাৎ করে আমদানি বন্ধ হওয়ায় তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তিনি জানান, সীমান্তের ওপারে আগে থেকেই কেনা ইলিশ মজুত করে রাখা হয়েছিল আমদানির উদ্দেশ্যে, কিন্তু এখন হঠাৎ প্রক্রিয়া থেমে যাওয়ায় সেই মাছ কম দামে ফেরত দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আমদানি প্রক্রিয়ার অন্যান্য খরচের লোকসানও।

এই সিদ্ধান্তের আগ পর্যন্ত গত দুই মাসে বেনাপোল বন্দর দিয়ে বিপুল পরিমাণ ইলিশ বাংলাদেশে এসেছে। যশোর জেলা মৎস্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই ও অগাস্ট—এই দুই মাসে ১৯টি প্রতিষ্ঠান মিলে প্রায় সাড়ে তিন লাখ কেজি বা সাড়ে তিনশ টন ইলিশ আমদানি করেছে, যার বাজারমূল্য প্রায় সাত কোটি টাকা। বেনাপোল স্থলবন্দরের মৎস্য কোয়ারেন্টাইন পরিদর্শক আশওয়াদুল আলমও এই তথ্য সমর্থন করেছেন।

এই আমদানি করা ইলিশের সিংহভাগ এসেছে ভারতের গুজরাট থেকে, পশ্চিমবঙ্গ হয়ে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্তপথে। পশ্চিমবঙ্গ চিল্ড ফিশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদের ভাষ্যমতে, গত প্রায় দুই মাসে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে প্রায় পাঁচশ মেট্রিক টন ইলিশ বাংলাদেশে গেছে, যার প্রায় পুরোটাই গুজরাট থেকে আসা। তার মতে, এবার গুজরাটে ইলিশের যোগান স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় সেখানে দাম কমে গেছে, আর সেই সুযোগেই বাংলাদেশের বাজারমুখী হয়েছে গুজরাটি ইলিশ। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের ক্রেতারা ডিমওয়ালা বড় আকারের ইলিশ পছন্দ করেন, আর গুজরাটের ইলিশে এই বৈশিষ্ট্য থাকায় চাহিদা মিটছে সহজেই।

আমদানি এত বেড়ে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে দামের ফারাক। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারত থেকে আসা ইলিশের সর্বোচ্চ ক্রয়মূল্য পড়ে দুই ডলারের কাছাকাছি বা তারও কম, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা আড়াইশ টাকার নিচে। শুল্ক ও অন্যান্য খরচ যোগ করার পরও এই মাছের দাম দেশের বাজারে একই ওজনের ইলিশের তুলনায় অনেকটাই কম পড়ে। ফলে ব্যবসায়ীদের জন্য এই আমদানি লাভজনক হয়ে ওঠে। একজন কর্মকর্তা জানান, গত দুই মাসে বাজারে দেশি ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় আমদানি করা মাছ যশোর অঞ্চলে দেদারসে বিক্রি হচ্ছিল।

যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ মনিরুল মামুন বলেছিলেন, মৎস্য অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়েই প্রতিষ্ঠানগুলো ইলিশ আমদানি করছিল, তবে ঠিক কী কারণে এই আমদানি প্রয়োজন হয়ে পড়েছে সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা তাদের ছিল না। তার ভাষায়, এবারই প্রথম এত বড় পরিসরে ইলিশ আমদানি হতে দেখেছেন তারা, যদিও গত বছরের জুলাই থেকেই এই প্রবণতা শুরু হয়েছিল।

মৎস্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডঃ মোঃ খালেদ কনক আগে জানিয়েছিলেন, ব্যবসায়ীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে সীমিত পরিসরে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তার ব্যাখ্যা ছিল, ইলিশ মূলত সমুদ্রের মাছ, প্রজননের জন্য নদীতে আসে। সমুদ্র থেকে প্রতিবেশী দেশের জেলেরা আগেভাগে ধরে ফেলায় বাংলাদেশের মজুত কমে যাচ্ছিল, আর সেই ঘাটতি মেটাতেই অল্প পরিসরে আমদানির অনুমতি মিলেছিল। তবে সবশেষ ১০৩টি সনদ বাতিলের মধ্য দিয়ে সেই অনুমতির ধারা আপাতত থেমে গেল।

এই পুরো ঘটনাপ্রবাহের প্রেক্ষাপটে রয়েছে দেশের ইলিশ উৎপাদনে ধারাবাহিক পতনের চিত্র। কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল পাঁচ লাখ একাত্তর হাজার মেট্রিক টন। পরের বছর তা নেমে আসে পাঁচ লাখ ঊনত্রিশ হাজার টনে, আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন দাঁড়ায় পাঁচ লাখ চার হাজার টনে। চলতি অর্থবছরের আনুষ্ঠানিক হিসাব এখনো প্রকাশিত না হলেও কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, উৎপাদন পাঁচ লাখ টনের নিচেই থাকবে।

ইলিশ গবেষক ডঃ আনিসুর রহমান মনে করেন, নদী দূষণ, কারেন্ট জাল ব্যবহার করে জাটকা নিধন এবং নদী থেকে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের কারণেই দেশের জলসীমায় ইলিশের সংকট তৈরি হয়েছে। তার আশঙ্কা, সমুদ্র থেকে নদীতে ইলিশের চলাচলের স্বাভাবিক পথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াও এই সংকটের একটি বড় কারণ হতে পারে। ক্ষতিকর উপায়ে মাছ ধরা ও কীটনাশকের ব্যবহার ইলিশের প্রজনন ও বেড়ে ওঠার জায়গাকে হুমকিতে ফেলেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

ইলিশ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০২০ সালে ছয় বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল, যার ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় চারশ কোটি টাকা। তবে সেই প্রকল্প বাস্তবে কতটা কাজে এসেছে, সে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ মৎস্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালকও। তিনি বলেছেন, আগের মেয়াদে প্রকল্পটি কতটা কার্যকর হয়েছিল বা কোথাও গাফিলতি ছিল কিনা—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি রপ্তানির পরিসংখ্যানও হতাশাজনক। কর্মকর্তাদের ভাষ্যে, গত অর্থবছরে বারশ টন ইলিশ রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও শেষ পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছিল একশ দশ টনেরও কম।

ভারতের দিক থেকে এই সরবরাহ শৃঙ্খল সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গুজরাটের ভারুচ থেকে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ার পাইকারি বাজার হয়ে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এক বাণিজ্যিক পথে চলছিল এই ইলিশ বাণিজ্য। ভারুচের ভাদভূত এলাকার মৎস্যব্যবসায়ীদের সংগঠনের সভাপতি চিমন ট্যান্ডেল জানিয়েছিলেন, গত পাঁচ বছরে গুজরাটে ইলিশের উৎপাদন ভালো হয়েছে, আর সেই মাছের বড় অংশই পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে যাচ্ছিল। তার তথ্য অনুযায়ী, ভাদভূত থেকে প্রতিদিন গড়ে তিনটি ট্রাক ছাড়ত, প্রতিটিতে প্রায় আড়াইশ বাক্স থাকত আর প্রতি বাক্সে থাকত প্রায় ষাট কেজি ইলিশ। পরিমাণ কম হলে রেলের কনটেইনারেও পাঠানো হতো মাছ।

গুজরাটের একজন মৎস্যজীবী জানিয়েছিলেন, ইলিশের মৌসুম চলে জুনের মাঝামাঝি থেকে নবরাত্রি পর্যন্ত, আর এই সময়ে প্রতি কেজি ইলিশের দাম থাকে ভারতীয় মুদ্রায় ছয়শ থেকে সাতশ রুপির মধ্যে। তিন মাসের এই মৌসুমে ছোট আকারের মৎস্যজীবীরাও ভালো আয় করতে পারেন বলে জানান তিনি।

তবে পশ্চিমবঙ্গের মৎস্যজীবী নেতাদের কেউ কেউ মনে করেন, সরবরাহের এই পরিবর্তনের পেছনে জলদূষণ ও শিল্পভিত্তিক মাছ ধরার প্রভাবও কাজ করছে। তাদের অভিযোগ, নিষিদ্ধ কীটনাশক ব্যবহার এবং নগর বর্জ্য জলে ফেলা বন্ধ না হওয়ায় পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, আর বড় মোটরচালিত নৌযান দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চালানো শিল্পভিত্তিক মাছ ধরাও সাধারণ জেলেদের জোগানে প্রভাব ফেলছে।

এখন প্রশ্ন উঠছে, অনাপত্তি সনদ বাতিলের এই সিদ্ধান্তের প্রভাব বাজারে কীভাবে পড়বে। আমদানি বন্ধ হওয়ায় স্বল্পমেয়াদে বাজারে সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা, যা দামের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে আমদানিকারকদের লোকসানের বিষয়টিও অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে, কারণ সীমান্তের ওপারে আগে থেকেই কেনা মাছের কী হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। আপাতত মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তের পেছনের সুনির্দিষ্ট কারণ বিস্তারিতভাবে জানানো হয়নি, ফলে আমদানিকারক ও ভোক্তা—উভয় পক্ষই অপেক্ষায় আছেন পরবর্তী সিদ্ধান্তের।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

ফার্মগেটের মসজিদ থেকে আটক ৫ জঙ্গি কারাগারে

২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

ইলিশ আমদানি বন্ধ, ১০৩ সনদ বাতিল, ক্ষতির মুখে ব্যবসায়ীরা

আপডেট সময় ০৩:০৭:২৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভারত থেকে ইলিশ আমদানির প্রক্রিয়া হঠাৎ থমকে গেছে। মৎস্য অধিদপ্তরের জারি করা ১০৩টি অনাপত্তি সনদ একযোগে বাতিল হওয়ার পর দেশের সীমান্ত বাণিজ্যপথে ইলিশ ঢোকা বন্ধ হয়ে যায়, আর এতে বিপাকে পড়েছেন আমদানিকারকদের একটি বড় অংশ।

মৎস্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডঃ মোঃ খালেদ কনকের স্বাক্ষরে গত ২২ সেপ্টেম্বর এই ১০৩টি অনাপত্তি সনদ বাতিলের চিঠি জারি হয়। এরপর থেকেই ভারত থেকে ইলিশ আনার প্রক্রিয়া কার্যত স্থগিত হয়ে যায়।

আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান জিয়া বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মৎস্য অধিদপ্তরের একটি চিঠি তাদের কাছে পৌঁছেছে, যেখানে অনেকগুলো অনাপত্তি সনদ একযোগে বাতিল করা হয়েছে। তার ভাষায়, এই সিদ্ধান্তের ফলে ইলিশ আমদানি বন্ধ হয়ে পড়েছে এবং আমদানিকারকরা রীতিমতো বিপাকে পড়েছেন।

ইলিশ আমদানিকারক সৈয়দ মহিদুল হক রুবাই বলছেন, হঠাৎ করে আমদানি বন্ধ হওয়ায় তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তিনি জানান, সীমান্তের ওপারে আগে থেকেই কেনা ইলিশ মজুত করে রাখা হয়েছিল আমদানির উদ্দেশ্যে, কিন্তু এখন হঠাৎ প্রক্রিয়া থেমে যাওয়ায় সেই মাছ কম দামে ফেরত দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আমদানি প্রক্রিয়ার অন্যান্য খরচের লোকসানও।

এই সিদ্ধান্তের আগ পর্যন্ত গত দুই মাসে বেনাপোল বন্দর দিয়ে বিপুল পরিমাণ ইলিশ বাংলাদেশে এসেছে। যশোর জেলা মৎস্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই ও অগাস্ট—এই দুই মাসে ১৯টি প্রতিষ্ঠান মিলে প্রায় সাড়ে তিন লাখ কেজি বা সাড়ে তিনশ টন ইলিশ আমদানি করেছে, যার বাজারমূল্য প্রায় সাত কোটি টাকা। বেনাপোল স্থলবন্দরের মৎস্য কোয়ারেন্টাইন পরিদর্শক আশওয়াদুল আলমও এই তথ্য সমর্থন করেছেন।

এই আমদানি করা ইলিশের সিংহভাগ এসেছে ভারতের গুজরাট থেকে, পশ্চিমবঙ্গ হয়ে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্তপথে। পশ্চিমবঙ্গ চিল্ড ফিশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদের ভাষ্যমতে, গত প্রায় দুই মাসে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে প্রায় পাঁচশ মেট্রিক টন ইলিশ বাংলাদেশে গেছে, যার প্রায় পুরোটাই গুজরাট থেকে আসা। তার মতে, এবার গুজরাটে ইলিশের যোগান স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় সেখানে দাম কমে গেছে, আর সেই সুযোগেই বাংলাদেশের বাজারমুখী হয়েছে গুজরাটি ইলিশ। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের ক্রেতারা ডিমওয়ালা বড় আকারের ইলিশ পছন্দ করেন, আর গুজরাটের ইলিশে এই বৈশিষ্ট্য থাকায় চাহিদা মিটছে সহজেই।

আমদানি এত বেড়ে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে দামের ফারাক। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারত থেকে আসা ইলিশের সর্বোচ্চ ক্রয়মূল্য পড়ে দুই ডলারের কাছাকাছি বা তারও কম, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা আড়াইশ টাকার নিচে। শুল্ক ও অন্যান্য খরচ যোগ করার পরও এই মাছের দাম দেশের বাজারে একই ওজনের ইলিশের তুলনায় অনেকটাই কম পড়ে। ফলে ব্যবসায়ীদের জন্য এই আমদানি লাভজনক হয়ে ওঠে। একজন কর্মকর্তা জানান, গত দুই মাসে বাজারে দেশি ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় আমদানি করা মাছ যশোর অঞ্চলে দেদারসে বিক্রি হচ্ছিল।

যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ মনিরুল মামুন বলেছিলেন, মৎস্য অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়েই প্রতিষ্ঠানগুলো ইলিশ আমদানি করছিল, তবে ঠিক কী কারণে এই আমদানি প্রয়োজন হয়ে পড়েছে সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা তাদের ছিল না। তার ভাষায়, এবারই প্রথম এত বড় পরিসরে ইলিশ আমদানি হতে দেখেছেন তারা, যদিও গত বছরের জুলাই থেকেই এই প্রবণতা শুরু হয়েছিল।

মৎস্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডঃ মোঃ খালেদ কনক আগে জানিয়েছিলেন, ব্যবসায়ীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে সীমিত পরিসরে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তার ব্যাখ্যা ছিল, ইলিশ মূলত সমুদ্রের মাছ, প্রজননের জন্য নদীতে আসে। সমুদ্র থেকে প্রতিবেশী দেশের জেলেরা আগেভাগে ধরে ফেলায় বাংলাদেশের মজুত কমে যাচ্ছিল, আর সেই ঘাটতি মেটাতেই অল্প পরিসরে আমদানির অনুমতি মিলেছিল। তবে সবশেষ ১০৩টি সনদ বাতিলের মধ্য দিয়ে সেই অনুমতির ধারা আপাতত থেমে গেল।

এই পুরো ঘটনাপ্রবাহের প্রেক্ষাপটে রয়েছে দেশের ইলিশ উৎপাদনে ধারাবাহিক পতনের চিত্র। কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল পাঁচ লাখ একাত্তর হাজার মেট্রিক টন। পরের বছর তা নেমে আসে পাঁচ লাখ ঊনত্রিশ হাজার টনে, আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন দাঁড়ায় পাঁচ লাখ চার হাজার টনে। চলতি অর্থবছরের আনুষ্ঠানিক হিসাব এখনো প্রকাশিত না হলেও কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, উৎপাদন পাঁচ লাখ টনের নিচেই থাকবে।

ইলিশ গবেষক ডঃ আনিসুর রহমান মনে করেন, নদী দূষণ, কারেন্ট জাল ব্যবহার করে জাটকা নিধন এবং নদী থেকে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের কারণেই দেশের জলসীমায় ইলিশের সংকট তৈরি হয়েছে। তার আশঙ্কা, সমুদ্র থেকে নদীতে ইলিশের চলাচলের স্বাভাবিক পথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াও এই সংকটের একটি বড় কারণ হতে পারে। ক্ষতিকর উপায়ে মাছ ধরা ও কীটনাশকের ব্যবহার ইলিশের প্রজনন ও বেড়ে ওঠার জায়গাকে হুমকিতে ফেলেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

ইলিশ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০২০ সালে ছয় বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল, যার ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় চারশ কোটি টাকা। তবে সেই প্রকল্প বাস্তবে কতটা কাজে এসেছে, সে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ মৎস্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালকও। তিনি বলেছেন, আগের মেয়াদে প্রকল্পটি কতটা কার্যকর হয়েছিল বা কোথাও গাফিলতি ছিল কিনা—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি রপ্তানির পরিসংখ্যানও হতাশাজনক। কর্মকর্তাদের ভাষ্যে, গত অর্থবছরে বারশ টন ইলিশ রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও শেষ পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছিল একশ দশ টনেরও কম।

ভারতের দিক থেকে এই সরবরাহ শৃঙ্খল সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গুজরাটের ভারুচ থেকে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ার পাইকারি বাজার হয়ে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এক বাণিজ্যিক পথে চলছিল এই ইলিশ বাণিজ্য। ভারুচের ভাদভূত এলাকার মৎস্যব্যবসায়ীদের সংগঠনের সভাপতি চিমন ট্যান্ডেল জানিয়েছিলেন, গত পাঁচ বছরে গুজরাটে ইলিশের উৎপাদন ভালো হয়েছে, আর সেই মাছের বড় অংশই পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে যাচ্ছিল। তার তথ্য অনুযায়ী, ভাদভূত থেকে প্রতিদিন গড়ে তিনটি ট্রাক ছাড়ত, প্রতিটিতে প্রায় আড়াইশ বাক্স থাকত আর প্রতি বাক্সে থাকত প্রায় ষাট কেজি ইলিশ। পরিমাণ কম হলে রেলের কনটেইনারেও পাঠানো হতো মাছ।

গুজরাটের একজন মৎস্যজীবী জানিয়েছিলেন, ইলিশের মৌসুম চলে জুনের মাঝামাঝি থেকে নবরাত্রি পর্যন্ত, আর এই সময়ে প্রতি কেজি ইলিশের দাম থাকে ভারতীয় মুদ্রায় ছয়শ থেকে সাতশ রুপির মধ্যে। তিন মাসের এই মৌসুমে ছোট আকারের মৎস্যজীবীরাও ভালো আয় করতে পারেন বলে জানান তিনি।

তবে পশ্চিমবঙ্গের মৎস্যজীবী নেতাদের কেউ কেউ মনে করেন, সরবরাহের এই পরিবর্তনের পেছনে জলদূষণ ও শিল্পভিত্তিক মাছ ধরার প্রভাবও কাজ করছে। তাদের অভিযোগ, নিষিদ্ধ কীটনাশক ব্যবহার এবং নগর বর্জ্য জলে ফেলা বন্ধ না হওয়ায় পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, আর বড় মোটরচালিত নৌযান দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চালানো শিল্পভিত্তিক মাছ ধরাও সাধারণ জেলেদের জোগানে প্রভাব ফেলছে।

এখন প্রশ্ন উঠছে, অনাপত্তি সনদ বাতিলের এই সিদ্ধান্তের প্রভাব বাজারে কীভাবে পড়বে। আমদানি বন্ধ হওয়ায় স্বল্পমেয়াদে বাজারে সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা, যা দামের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে আমদানিকারকদের লোকসানের বিষয়টিও অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে, কারণ সীমান্তের ওপারে আগে থেকেই কেনা মাছের কী হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। আপাতত মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তের পেছনের সুনির্দিষ্ট কারণ বিস্তারিতভাবে জানানো হয়নি, ফলে আমদানিকারক ও ভোক্তা—উভয় পক্ষই অপেক্ষায় আছেন পরবর্তী সিদ্ধান্তের।

Share this news as a Photo Card