জীবন বাজি রেখে

ইউরোপের মরীচিকায় মরক্কোর তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা

দক্ষিণ মরক্কোর সমুদ্রতীরবর্তী শহর ইমসোয়ান। সেখানকার একটি সার্ফিং সরঞ্জামের দোকানে কাজ করেন ছাব্বিশ বছর বয়সী হামজা (আসল নাম নয়)। দিনের অলস মুহূর্তে হাতের মুঠোফোনটি খুলে বসেন তিনি, চোখ বোলান ইনস্টাগ্রামের পাতায়। স্ক্রিনজুড়ে ভেসে ওঠে শৈশবের সঙ্গীদের ছবি—সেই বন্ধুরা, যারা গত সেপ্টেম্বরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিল প্রতিবেশী ইউরোপীয় দেশ স্পেনের উদ্দেশে।

দোকানের বাইরে তখন সার্ফিং সেরে ক্লান্ত পায়ে ফিরছেন পর্যটকেরা। কাছেই একটি বিলাসবহুল বুটিক হোটেল, যার অতিথিদের বড় অংশই তরুণ ইউরোপীয় সার্ফপ্রেমী। এই দৃশ্যের ঠিক বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে হামজা মনে করিয়ে দেন এক ভিন্ন বাস্তবতার কথা।

তিনি বলেন, স্পেনে পৌঁছাতে গিয়ে তাঁর শৈশবের বন্ধুরা প্রাণও হারাতে পারত। তবু তাঁদের কাছে সেই ঝুঁকি নেওয়াটা মূল্যবান মনে হয়েছিল। হামজার ভাষায়, যাদের সঙ্গে তিনি বেড়ে উঠেছেন, তাদের অনেকেই দারিদ্র্যের এক অন্তহীন আবর্তে বাঁধা পড়ে গেছেন—যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছেন নিজের অজান্তেই।

সীমান্তমুখী এক ঢল

গত বছরের সেপ্টেম্বরে স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় প্রবেশের আশায় প্রায় চার হাজার মরক্কীয় তরুণ এবং সাব-সাহারা আফ্রিকার কিছু অভিবাসনপ্রত্যাশী সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা চালিয়েছিলেন। হামজা যে ঘটনার কথা বলছিলেন, সেটিই। ইউরোপে একটি উন্নত জীবনের স্বপ্ন বুকে নিয়ে যাত্রা করা সেই বিশাল জনস্রোতে ছিল তাঁর শৈশবের ছয় বন্ধুও।

সামাজিক মাধ্যমে সেউতায় ঢোকার আহ্বান দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পর এই তরুণেরা পাঁচশ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছান বেলিউনেশে—স্পেনের ওই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের সীমান্তসংলগ্ন এলাকা। ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা ছবিগুলো দেখে মনে হতে পারে, ইউরোপে পৌঁছানো প্রত্যেকেই যেন জীবনের সেরা সময়টা কাটাচ্ছেন। হামজা অবশ্য জানেন, বাস্তবতা এতটা রঙিন নয়। তাঁর কথায়, রাস্তায় ঘুমানোর ছবি কেউ কখনো পোস্ট করে না।

আফ্রিকা মহাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থলসীমান্ত এই সেউতা ও মেলিইয়া। তাই উন্নত জীবনের আশায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সীমান্ত পেরোনোর চেষ্টা সেখানে নতুন কিছু নয়। মরক্কো কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর দেশটির বিভিন্ন শহর থেকে আসা প্রায় তিন হাজার মানুষ সীমান্তবেষ্টনী টপকে সেউতায় ঢোকার চেষ্টাকালে আটক হন। এই উদ্যোগ সংগঠিত করায় জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয় প্রায় ষাটজনকে। কয়েকজন আলজেরীয় নাগরিকের সম্পৃক্ততারও অভিযোগ তোলে মরক্কো, যদিও আলজেরিয়ার পক্ষ থেকে তা অস্বীকার করা হয়।

ওই সময় নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বেশ কিছু ছবি ও ভিডিও। কর্মকর্তারা অভিযোগ অস্বীকার করলেও পরে তেতোয়ানের সরকারি কৌঁসুলি সেসব ভিডিওর সত্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দেন।

মরক্কোতে জীবন যেন থমকে আছে

সীমান্ত থেকে ফিরিয়ে দেওয়া শত শত মানুষের বিপরীতে হামজার বন্ধুরা ছিলেন সেউতায় পৌঁছাতে পারা হাতে গোনা কয়েকজনের একজন। তবে সাফল্যের পরও যোগাযোগ কমে গেছে তাঁদের সঙ্গে। হামজা বলেন, বন্ধুরা এখন কেমন আছেন, তা তিনি জানেন না। তাঁরা খুব একটা কথাও বলেন না, সম্ভবত কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ার আশঙ্কাতেই।

এটাই প্রথম চেষ্টা নয়। এর আগেও ইউরোপে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেছিলেন হামজার শৈশবের কয়েকজন সঙ্গী। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে হামজার নিজ শহর এল জাদিদা থেকে সতেরোজন তরুণ স্পেনের উদ্দেশে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা শুরু করেছিলেন। আটলান্টিক উপকূলের কাসাব্লাঙ্কার কাছের এই বন্দরনগরী থেকে তাঁরা নৌকায় করে পৌঁছান স্পেনের মূল ভূখণ্ডে।

মুঠোফোনে সেই বন্ধুদের একজনের পাঠানো একটি বার্তা দেখান হামজা। বর্তমানে আইবেরীয় উপদ্বীপে বসবাসরত সেই বন্ধুর সবশেষ ইনস্টাগ্রাম পোস্টে দেখা যায়, সমুদ্রসৈকতের কাছে রোদঝলমলে এক খোলা চত্বরে বসে পানীয় হাতে সময় কাটাচ্ছেন তিনি, পেছনে বাজছে প্রাণবন্ত সংগীত। দেখে মনে হয় যেন ছুটি কাটছে তাঁর। হামজা জানেন, বাস্তবে স্পেনে তাঁর জীবন মোটেও সহজ নয়।

তিনি বলেন, সেই বন্ধুর প্রতিভা আছে, একজন ফুটবলার হিসেবে স্পেনে সুযোগ পাওয়ার প্রত্যাশায় আছেন তিনি। কিন্তু বৈধ কাগজপত্রের অভাবে এখন পর্যন্ত সব ক্লাবই তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছে।

হোটেলের সার্ফিং আবহের সঙ্গে মানানসই পোশাকে দাঁড়িয়ে হামজা জানান, সেউতায় থেকে যাওয়া বাকি ছয় বন্ধুর ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর মনে জমে আছে মিশ্র অনুভূতি। এমদিক-ফেনিদেক প্রদেশে জন্ম নেওয়া সতেরো বছর বয়সী স্কুলছাত্রী বুশরা আবজাইউর মতে, বিশেষত করোনা মহামারির পর তৈরি হওয়া হতাশাই মানুষকে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিচ্ছে।

ভালো বেতন, শিক্ষিত মা-বাবা এবং ভূতত্ত্বে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকায় অবৈধ পথে ইউরোপযাত্রার কথা কখনো ভাবেননি হামজা। তবু বন্ধুদের সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ তিনি বোঝেন। তাঁর ভাষায়, সামাজিক মাধ্যমে ইউরোপীয়দের জীবনযাত্রা দেখে অনেকের মনে হয়, মরক্কোয় থেকে তাঁরা কেবল জীবনটাই নষ্ট করছেন। হয়তো এটাই তাঁদের জন্য নতুন সুযোগের দরজা।

পর্দায় স্বপ্ন, বাস্তবে সংগ্রাম

সেউতার ঘটনা ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল এক ভাইরাল প্রবণতা। টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে বহু তরুণ ভাগাভাগি করেছিলেন নিজেদের ইউরোপযাত্রার স্বপ্ন ও পরিকল্পনার গল্প। এসব পোস্টে ঘুরেফিরে এসেছে ‘হাররাগা’ শব্দটি—উত্তর আফ্রিকার কথ্য আরবি থেকে আসা এই শব্দের অর্থ হলো, পরিচয় গোপন রাখতে অবৈধ অভিবাসনের আগে নিজের পরিচয়পত্র পুড়িয়ে ফেলা মানুষ।

মরক্কোর অভিবাসনবিষয়ক পরামর্শক ও গবেষক আলী জুবেইদি বলেন, অভিবাসীদের একজোট হওয়ার আহ্বান জানিয়ে যখন সামাজিক মাধ্যমে বার্তা ছড়াতে শুরু করে, তখন প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন এটি নিছক মজা। পরে বুঝতে পারেন, বিষয়টি সত্যিই ঘটছে।

মরক্কোর নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক খালিদ মুনার মতে, গত সেপ্টেম্বরের ঘটনা শুধু উন্নত জীবনের খোঁজে তরুণদের দেশত্যাগের আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি এক ধরনের রাজনৈতিক প্রতিবাদ। তরুণেরা অভিবাসনকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করছেন, এর মধ্য দিয়ে প্রকাশ করছেন মরক্কোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের অসন্তোষ।

জুবেইদির মতে, গত সেপ্টেম্বরের ঘটনা ২০২১ সালের গণ-অভিবাসনের প্রচেষ্টার তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। ২০২১ সালে আট হাজারের বেশি মানুষ সেউতায় ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন—কেউ সীমান্তদেয়াল টপকে, কেউ সাঁতরে। সেই সময় পশ্চিম সাহারা প্রশ্নে মাদ্রিদের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধের জেরে মরক্কো কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষকে সীমান্তমুখী হতে দিয়েছিল বলে অভিযোগ তুলেছিল স্পেন।

কিন্তু গত সেপ্টেম্বরের চিত্র ছিল একেবারে ভিন্ন। তখন সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে নিজেরাই সংগঠিত হয়েছিলেন তরুণেরা, মানব পাচারকারী বা দালালদের কোনো ভূমিকা ছাড়াই। আগে সীমান্ত পেরোনোর বেশির ভাগ চেষ্টা করতেন সাব-সাহারা আফ্রিকার অভিবাসীরা। কিন্তু সেপ্টেম্বরে সেউতামুখী মানুষদের বড় অংশই ছিলেন মরক্কোর নাগরিক, তাঁদের পরিচিতিও ছিল ভিন্ন।

জুবেইদি বলেন, সাধারণত যাঁরা অবৈধ অভিবাসনের চেষ্টা করেন, তাঁরা দীর্ঘদিন রাস্তায় থাকা, কর্মহীন, পরিবারের সহায়তাবিহীন তরুণ। কিন্তু সেপ্টেম্বরে এমন অনেককে দেখা গেছে, যাঁদের চাকরি আছে এবং মাসে চার থেকে পাঁচ হাজার দিরহাম—প্রায় সাড়ে চারশ মার্কিন ডলার—আয়ও করেন। তাঁর মতে, এই সিদ্ধান্তের মূলে ছিল হতাশা ও অসন্তোষ।

পর্দার আড়ালের বাস্তবতা

হামজার জন্মশহরের বাসিন্দাদের কাছে দেশ ছেড়ে বিদেশে যাওয়াই যেন সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। তরুণদের আলোচনার মূল বিষয়ও থাকে বিদেশযাত্রা। ফোনে আরও কিছু পোস্ট দেখান হামজা, যেখানে সীমান্ত পার হতে পারা মানুষদের অভিনন্দন জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, তাঁদের কেউ কেউ পাচারকারীদের অর্থ জোগাতে বছরের পর বছর পরিশ্রম করেছেন।

এই আলাপে যোগ দেন হামজার এক বন্ধুও। তিনি জানান, এমন মানুষকে তিনি চেনেন, যাঁরা মরক্কো থেকে সেউতার সাত কিলোমিটার দূরত্ব সাঁতরে পাড়ি দেওয়ার জন্য মাসের পর মাস অনুশীলন করেছেন।

ইউরোপে পৌঁছাতে পারা মানুষেরা সামাজিক মাধ্যমে বেশ সক্রিয় থাকেন—ঐতিহাসিক স্থাপনার সামনে সেলফি, পার্টির ভিডিও, নানা রঙিন মুহূর্ত। তবে হামজা জানেন, সেই ঝলমলে ছবির সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক অনেক। বুশরার ভাইও ২০২১ সালের গণ-অভিবাসনের সময় দেশ ছেড়েছিলেন। চার বছর পরও স্পেনে টিকে থাকার সংগ্রাম করছেন তিনি, বহুবার কাটিয়েছেন রাস্তায় রাত। তবু তাঁর তথাকথিত সাফল্যের গল্প অনুপ্রাণিত করেছে বুশরার এক চাচাতো ভাইকে, যিনি গত সেপ্টেম্বরে সীমান্ত পেরোনোর চেষ্টা করেছিলেন।

অর্থনৈতিক ধাক্কা আর বন্ধ হওয়া সুযোগ

সেউতা সীমান্তের কোলঘেঁষা এমদিক-ফেনিদেক প্রদেশের তরুণদের কাছে ইউরোপযাত্রার স্বপ্ন একসময় ছিল হাতের নাগালের বিষয়। তাঞ্জার-তেতোয়ান অঞ্চলের বাসিন্দাদের একটি বড় অংশ এভাবেই দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেছেন।

করোনা মহামারির পর সীমান্ত-বাণিজ্য ও সীমান্ত পেরিয়ে কর্মসংস্থানের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এরপর স্পেনের সঙ্গে মরক্কোর কূটনৈতিক টানাপোড়েন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে ওই অঞ্চলের বাসিন্দাদের অর্থনৈতিক জীবনে। সাময়িক হিসেবে শুরু হওয়া এসব বিধিনিষেধ পরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মরক্কোর মধ্যে নানা চুক্তির মাধ্যমে স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়। ২০২১ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে অভিবাসন ঠেকানো এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদারের বিনিময়ে মরক্কোকে পঞ্চাশ কোটি ইউরো দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় ব্রাসেলস।

মরক্কোর সঙ্গে এই সহযোগিতা এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তৃতীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুরূপ চুক্তি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শরণার্থীদের ইউরোপে পৌঁছানো ঠেকাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন জেনেশুনেই মরক্কোসহ তৃতীয় দেশগুলোকে সম্ভাব্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে ফেলেছে।

এসব নীতির ক্ষতিকর প্রভাবের একটি উদাহরণ হিসেবে উঠে আসে ২০২২ সালের জুনে স্পেনের মেলিইয়া সীমান্তে ঘটে যাওয়া সহিংস ঘটনা। সীমান্তরক্ষীদের সঙ্গে উত্তেজনার জেরে সেই ঘটনায় প্রাণ হারান অন্তত সাঁইত্রিশ জন।

এসব নীতির মানবিক মূল্য সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়েছে ফেনিদেকে। এক সময় প্রতিদিন হাজারো মরক্কীয় বাসিন্দা কাজের জন্য সেউতায় যাতায়াত করতেন। সেই সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এলাকাটিতে বেকারত্ব বেড়ে গেছে। গত পাঁচ বছরে ফেনিদেকের মানুষের আয় কমেছে সত্তর শতাংশ পর্যন্ত।

‘সোজা পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিলাম’

এমদিক-ফেনিদেক প্রদেশেরই মেয়ে বুশরা মনে করেন, করোনা-পরবর্তী হতাশাই মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পথে। তাঁর ভাষায়, মরক্কোতে তরুণদের পরিস্থিতি খুবই কঠিন, আশপাশে যাদের তিনি দেখেন, প্রায় সবাই বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর।

সেউতার একটি অপ্রাপ্তবয়স্কদের আশ্রয়কেন্দ্রে এখন থাকছে সতেরো বছর বয়সী ইব্রাহিম (ছদ্মনাম)। সে জানায়, সামাজিক মাধ্যমের কোনো আহ্বান দেখে বা পরিকল্পনা করে সে সীমান্ত পেরোয়নি। তার ভাষায়, ফেনিদেকের বাসিন্দা হওয়ায় সীমান্তে প্রতিদিন কী ঘটে, তা সে নিজের চোখেই দেখেছে, আলাদা করে জানার প্রয়োজন হয়নি তার।

ইব্রাহিম বলে, মরক্কো ভেঙে পড়েছে, দারিদ্র্যই তাকে সাগরে ঝাঁপ দিতে বাধ্য করেছে। যেদিন সে সেউতার উদ্দেশে সাঁতরে রওনা দেয়, সেদিন সীমান্তসংলগ্ন আকাশ ছিল মেঘলা ও কুয়াশাচ্ছন্ন। সাত কিলোমিটারের সেই যাত্রার কথা মনে করে সে বলে, জীবনে এমন সুযোগ হয়তো আর আসবে না—এমনটাই ভেবেছিল সে। তার কাছে সাঁতারের কোনো সরঞ্জাম ছিল না, পথও চেনা ছিল না, তবু সোজা পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিল সে।

ইব্রাহিম ভাগ্যবান ছিল। কিন্তু গত বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সমুদ্রপথে সেউতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে অন্তত সাঁইত্রিশ জনের মৃত্যু হয়েছে, তাঁদের মরদেহ ভেসে উঠেছে স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহরের উপকূলের কাছে। অনেকে আবার মরক্কো পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন, পরে বাসে করে তাঁদের পাঠানো হয়েছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে। সেউতাভিত্তিক একটি স্প্যানিশ বেসরকারি সংস্থার মুখপাত্র ফ্রানচেসকা ফুসারো জানান, তরুণেরা যাতে ফের সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা না করেন, সে জন্য কর্তৃপক্ষ নিয়মিতই এই পদ্ধতি অনুসরণ করে।

ইব্রাহিমের ভাষায়, সমুদ্রে কাটানো সেই কয়েক ঘণ্টা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। সে বলে, মনে হচ্ছিল জীবনের সব স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠছে, মনে হচ্ছিল হয়তো সে মারা যাবে। তখন ভবিষ্যতের কথা, প্রিয়জনদের কথা ভাবছিল সে, আর বারবার মনে পড়ছিল মায়ের মুখ।

এদিকে সম্প্রতি সেউতায় একদিনের মধ্যেই অর্ধলক্ষাধিক অভিবাসনপ্রত্যাশী প্রবেশ করেন। স্থল ও সমুদ্রপথে সীমান্ত পার হতে গিয়ে সে সময় ঘটে বহু হতাহতের ঘটনা। সীমান্তের স্পেন অংশে উদ্ধার হয় সাতান্নটি মরদেহ, মরক্কোর দিকেও ঘটে প্রাণহানি।

নীরব প্রতিবাদের ভাষা

খালিদ মুনার ভাষায়, দমন-পীড়নের মুখে সামাজিক মাধ্যম এখন তরুণদের জন্য এক শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। জনপরিসরে দমন-পীড়ন সব সময়ই ছিল, তবে সামাজিক মাধ্যম এখন প্রান্তিক অঞ্চলের তরুণদের একত্র হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাও দীর্ঘদিন ধরে মরক্কোতে মানবাধিকার দমনের অভিযোগ তুলে আসছে।

আন্তর্জাতিক একটি মানবাধিকার সংস্থার সাম্প্রতিক বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মরক্কোতে মতপ্রকাশ ও সংগঠনের স্বাধীনতার ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রয়েছে। এর প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে উচ্চপর্যায়ের মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের কারাবরণ এবং হয়রানির ঘটনা, যার মধ্যে রয়েছে বিতর্কিত পশ্চিম সাহারা অঞ্চল সংশ্লিষ্ট বিষয়ও।

মুনা ও জুবেইদি উভয়েরই মত, মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের দুর্বল অবস্থাও তরুণ মরক্কীয়দের দেশত্যাগে উৎসাহিত করছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মরক্কোর ৬ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ—প্রায় পঁচিশ লাখ—বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছেন। অর্থাৎ শুধু আয়ের অভাব নয়, শিক্ষা, মৌলিক অবকাঠামো ও সেবার ক্ষেত্রেও তাঁরা বঞ্চিত।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, করোনা মহামারির কারণে আরও দশ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের কবলে পড়েছেন। বিগত বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে দেশটির বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে।

বুশরার মতে, সামাজিক মাধ্যমে ইউরোপ সম্পর্কে ছড়িয়ে পড়া অবাস্তব ও বিভ্রান্তিকর ধারণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। স্পেনে পৌঁছাতে পারা মানুষদের গল্প আর অভিবাসনে উৎসাহ জোগানো অসংখ্য গান তরুণদের আগ্রহ আরও উসকে দেয়। তাঁর কথায়, মরক্কোর তরুণদের মধ্যে বারবার এই চিন্তা ফিরে আসছে, আর তা নিয়ে তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

স্বপ্ন আর বাস্তবতার মাঝামাঝি

দক্ষিণ মরক্কোর সমুদ্রতীরে নিজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন হামজা। চলতি বছর তিনি ইউরোপে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন এবং শিক্ষার্থী ভিসার জন্য আবেদন করতে চান। তবে তিনি জানেন, পরিবারের সহায়তা না থাকায় তাঁর বন্ধুদের সামনে সে পথ খোলা নেই।

আরও একবার মুঠোফোন হাতে বন্ধুদের খোঁজ নেন হামজা। ইউরোপে কষ্টে দিন কাটালেও লজ্জায় তাঁরা পরিবার ও পরিচিতজনদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেন সুখী জীবনের ছবি। হামজা জানেন, তাঁদের কেউ কেউ রাতে রাস্তায় ঘুমান। তবু স্বজনদের চোখে তাঁরা যেন পূরণ করে ফেলেছেন ইউরোপযাত্রার সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

ঢাকায় পরপর বোমা উদ্ধার রহস্য নেপথ্যে কারা

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

অবশেষে খুলে গেছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

৩০ জুলাই ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

জীবন বাজি রেখে

ইউরোপের মরীচিকায় মরক্কোর তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা

আপডেট সময় ০১:১৩:৪৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬

দক্ষিণ মরক্কোর সমুদ্রতীরবর্তী শহর ইমসোয়ান। সেখানকার একটি সার্ফিং সরঞ্জামের দোকানে কাজ করেন ছাব্বিশ বছর বয়সী হামজা (আসল নাম নয়)। দিনের অলস মুহূর্তে হাতের মুঠোফোনটি খুলে বসেন তিনি, চোখ বোলান ইনস্টাগ্রামের পাতায়। স্ক্রিনজুড়ে ভেসে ওঠে শৈশবের সঙ্গীদের ছবি—সেই বন্ধুরা, যারা গত সেপ্টেম্বরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিল প্রতিবেশী ইউরোপীয় দেশ স্পেনের উদ্দেশে।

দোকানের বাইরে তখন সার্ফিং সেরে ক্লান্ত পায়ে ফিরছেন পর্যটকেরা। কাছেই একটি বিলাসবহুল বুটিক হোটেল, যার অতিথিদের বড় অংশই তরুণ ইউরোপীয় সার্ফপ্রেমী। এই দৃশ্যের ঠিক বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে হামজা মনে করিয়ে দেন এক ভিন্ন বাস্তবতার কথা।

তিনি বলেন, স্পেনে পৌঁছাতে গিয়ে তাঁর শৈশবের বন্ধুরা প্রাণও হারাতে পারত। তবু তাঁদের কাছে সেই ঝুঁকি নেওয়াটা মূল্যবান মনে হয়েছিল। হামজার ভাষায়, যাদের সঙ্গে তিনি বেড়ে উঠেছেন, তাদের অনেকেই দারিদ্র্যের এক অন্তহীন আবর্তে বাঁধা পড়ে গেছেন—যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছেন নিজের অজান্তেই।

সীমান্তমুখী এক ঢল

গত বছরের সেপ্টেম্বরে স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় প্রবেশের আশায় প্রায় চার হাজার মরক্কীয় তরুণ এবং সাব-সাহারা আফ্রিকার কিছু অভিবাসনপ্রত্যাশী সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা চালিয়েছিলেন। হামজা যে ঘটনার কথা বলছিলেন, সেটিই। ইউরোপে একটি উন্নত জীবনের স্বপ্ন বুকে নিয়ে যাত্রা করা সেই বিশাল জনস্রোতে ছিল তাঁর শৈশবের ছয় বন্ধুও।

সামাজিক মাধ্যমে সেউতায় ঢোকার আহ্বান দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পর এই তরুণেরা পাঁচশ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছান বেলিউনেশে—স্পেনের ওই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের সীমান্তসংলগ্ন এলাকা। ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা ছবিগুলো দেখে মনে হতে পারে, ইউরোপে পৌঁছানো প্রত্যেকেই যেন জীবনের সেরা সময়টা কাটাচ্ছেন। হামজা অবশ্য জানেন, বাস্তবতা এতটা রঙিন নয়। তাঁর কথায়, রাস্তায় ঘুমানোর ছবি কেউ কখনো পোস্ট করে না।

আফ্রিকা মহাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থলসীমান্ত এই সেউতা ও মেলিইয়া। তাই উন্নত জীবনের আশায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সীমান্ত পেরোনোর চেষ্টা সেখানে নতুন কিছু নয়। মরক্কো কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর দেশটির বিভিন্ন শহর থেকে আসা প্রায় তিন হাজার মানুষ সীমান্তবেষ্টনী টপকে সেউতায় ঢোকার চেষ্টাকালে আটক হন। এই উদ্যোগ সংগঠিত করায় জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয় প্রায় ষাটজনকে। কয়েকজন আলজেরীয় নাগরিকের সম্পৃক্ততারও অভিযোগ তোলে মরক্কো, যদিও আলজেরিয়ার পক্ষ থেকে তা অস্বীকার করা হয়।

ওই সময় নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বেশ কিছু ছবি ও ভিডিও। কর্মকর্তারা অভিযোগ অস্বীকার করলেও পরে তেতোয়ানের সরকারি কৌঁসুলি সেসব ভিডিওর সত্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দেন।

মরক্কোতে জীবন যেন থমকে আছে

সীমান্ত থেকে ফিরিয়ে দেওয়া শত শত মানুষের বিপরীতে হামজার বন্ধুরা ছিলেন সেউতায় পৌঁছাতে পারা হাতে গোনা কয়েকজনের একজন। তবে সাফল্যের পরও যোগাযোগ কমে গেছে তাঁদের সঙ্গে। হামজা বলেন, বন্ধুরা এখন কেমন আছেন, তা তিনি জানেন না। তাঁরা খুব একটা কথাও বলেন না, সম্ভবত কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ার আশঙ্কাতেই।

এটাই প্রথম চেষ্টা নয়। এর আগেও ইউরোপে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেছিলেন হামজার শৈশবের কয়েকজন সঙ্গী। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে হামজার নিজ শহর এল জাদিদা থেকে সতেরোজন তরুণ স্পেনের উদ্দেশে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা শুরু করেছিলেন। আটলান্টিক উপকূলের কাসাব্লাঙ্কার কাছের এই বন্দরনগরী থেকে তাঁরা নৌকায় করে পৌঁছান স্পেনের মূল ভূখণ্ডে।

মুঠোফোনে সেই বন্ধুদের একজনের পাঠানো একটি বার্তা দেখান হামজা। বর্তমানে আইবেরীয় উপদ্বীপে বসবাসরত সেই বন্ধুর সবশেষ ইনস্টাগ্রাম পোস্টে দেখা যায়, সমুদ্রসৈকতের কাছে রোদঝলমলে এক খোলা চত্বরে বসে পানীয় হাতে সময় কাটাচ্ছেন তিনি, পেছনে বাজছে প্রাণবন্ত সংগীত। দেখে মনে হয় যেন ছুটি কাটছে তাঁর। হামজা জানেন, বাস্তবে স্পেনে তাঁর জীবন মোটেও সহজ নয়।

তিনি বলেন, সেই বন্ধুর প্রতিভা আছে, একজন ফুটবলার হিসেবে স্পেনে সুযোগ পাওয়ার প্রত্যাশায় আছেন তিনি। কিন্তু বৈধ কাগজপত্রের অভাবে এখন পর্যন্ত সব ক্লাবই তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছে।

হোটেলের সার্ফিং আবহের সঙ্গে মানানসই পোশাকে দাঁড়িয়ে হামজা জানান, সেউতায় থেকে যাওয়া বাকি ছয় বন্ধুর ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর মনে জমে আছে মিশ্র অনুভূতি। এমদিক-ফেনিদেক প্রদেশে জন্ম নেওয়া সতেরো বছর বয়সী স্কুলছাত্রী বুশরা আবজাইউর মতে, বিশেষত করোনা মহামারির পর তৈরি হওয়া হতাশাই মানুষকে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিচ্ছে।

ভালো বেতন, শিক্ষিত মা-বাবা এবং ভূতত্ত্বে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকায় অবৈধ পথে ইউরোপযাত্রার কথা কখনো ভাবেননি হামজা। তবু বন্ধুদের সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ তিনি বোঝেন। তাঁর ভাষায়, সামাজিক মাধ্যমে ইউরোপীয়দের জীবনযাত্রা দেখে অনেকের মনে হয়, মরক্কোয় থেকে তাঁরা কেবল জীবনটাই নষ্ট করছেন। হয়তো এটাই তাঁদের জন্য নতুন সুযোগের দরজা।

পর্দায় স্বপ্ন, বাস্তবে সংগ্রাম

সেউতার ঘটনা ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল এক ভাইরাল প্রবণতা। টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে বহু তরুণ ভাগাভাগি করেছিলেন নিজেদের ইউরোপযাত্রার স্বপ্ন ও পরিকল্পনার গল্প। এসব পোস্টে ঘুরেফিরে এসেছে ‘হাররাগা’ শব্দটি—উত্তর আফ্রিকার কথ্য আরবি থেকে আসা এই শব্দের অর্থ হলো, পরিচয় গোপন রাখতে অবৈধ অভিবাসনের আগে নিজের পরিচয়পত্র পুড়িয়ে ফেলা মানুষ।

মরক্কোর অভিবাসনবিষয়ক পরামর্শক ও গবেষক আলী জুবেইদি বলেন, অভিবাসীদের একজোট হওয়ার আহ্বান জানিয়ে যখন সামাজিক মাধ্যমে বার্তা ছড়াতে শুরু করে, তখন প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন এটি নিছক মজা। পরে বুঝতে পারেন, বিষয়টি সত্যিই ঘটছে।

মরক্কোর নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক খালিদ মুনার মতে, গত সেপ্টেম্বরের ঘটনা শুধু উন্নত জীবনের খোঁজে তরুণদের দেশত্যাগের আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি এক ধরনের রাজনৈতিক প্রতিবাদ। তরুণেরা অভিবাসনকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করছেন, এর মধ্য দিয়ে প্রকাশ করছেন মরক্কোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের অসন্তোষ।

জুবেইদির মতে, গত সেপ্টেম্বরের ঘটনা ২০২১ সালের গণ-অভিবাসনের প্রচেষ্টার তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। ২০২১ সালে আট হাজারের বেশি মানুষ সেউতায় ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন—কেউ সীমান্তদেয়াল টপকে, কেউ সাঁতরে। সেই সময় পশ্চিম সাহারা প্রশ্নে মাদ্রিদের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধের জেরে মরক্কো কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষকে সীমান্তমুখী হতে দিয়েছিল বলে অভিযোগ তুলেছিল স্পেন।

কিন্তু গত সেপ্টেম্বরের চিত্র ছিল একেবারে ভিন্ন। তখন সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে নিজেরাই সংগঠিত হয়েছিলেন তরুণেরা, মানব পাচারকারী বা দালালদের কোনো ভূমিকা ছাড়াই। আগে সীমান্ত পেরোনোর বেশির ভাগ চেষ্টা করতেন সাব-সাহারা আফ্রিকার অভিবাসীরা। কিন্তু সেপ্টেম্বরে সেউতামুখী মানুষদের বড় অংশই ছিলেন মরক্কোর নাগরিক, তাঁদের পরিচিতিও ছিল ভিন্ন।

জুবেইদি বলেন, সাধারণত যাঁরা অবৈধ অভিবাসনের চেষ্টা করেন, তাঁরা দীর্ঘদিন রাস্তায় থাকা, কর্মহীন, পরিবারের সহায়তাবিহীন তরুণ। কিন্তু সেপ্টেম্বরে এমন অনেককে দেখা গেছে, যাঁদের চাকরি আছে এবং মাসে চার থেকে পাঁচ হাজার দিরহাম—প্রায় সাড়ে চারশ মার্কিন ডলার—আয়ও করেন। তাঁর মতে, এই সিদ্ধান্তের মূলে ছিল হতাশা ও অসন্তোষ।

পর্দার আড়ালের বাস্তবতা

হামজার জন্মশহরের বাসিন্দাদের কাছে দেশ ছেড়ে বিদেশে যাওয়াই যেন সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। তরুণদের আলোচনার মূল বিষয়ও থাকে বিদেশযাত্রা। ফোনে আরও কিছু পোস্ট দেখান হামজা, যেখানে সীমান্ত পার হতে পারা মানুষদের অভিনন্দন জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, তাঁদের কেউ কেউ পাচারকারীদের অর্থ জোগাতে বছরের পর বছর পরিশ্রম করেছেন।

এই আলাপে যোগ দেন হামজার এক বন্ধুও। তিনি জানান, এমন মানুষকে তিনি চেনেন, যাঁরা মরক্কো থেকে সেউতার সাত কিলোমিটার দূরত্ব সাঁতরে পাড়ি দেওয়ার জন্য মাসের পর মাস অনুশীলন করেছেন।

ইউরোপে পৌঁছাতে পারা মানুষেরা সামাজিক মাধ্যমে বেশ সক্রিয় থাকেন—ঐতিহাসিক স্থাপনার সামনে সেলফি, পার্টির ভিডিও, নানা রঙিন মুহূর্ত। তবে হামজা জানেন, সেই ঝলমলে ছবির সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক অনেক। বুশরার ভাইও ২০২১ সালের গণ-অভিবাসনের সময় দেশ ছেড়েছিলেন। চার বছর পরও স্পেনে টিকে থাকার সংগ্রাম করছেন তিনি, বহুবার কাটিয়েছেন রাস্তায় রাত। তবু তাঁর তথাকথিত সাফল্যের গল্প অনুপ্রাণিত করেছে বুশরার এক চাচাতো ভাইকে, যিনি গত সেপ্টেম্বরে সীমান্ত পেরোনোর চেষ্টা করেছিলেন।

অর্থনৈতিক ধাক্কা আর বন্ধ হওয়া সুযোগ

সেউতা সীমান্তের কোলঘেঁষা এমদিক-ফেনিদেক প্রদেশের তরুণদের কাছে ইউরোপযাত্রার স্বপ্ন একসময় ছিল হাতের নাগালের বিষয়। তাঞ্জার-তেতোয়ান অঞ্চলের বাসিন্দাদের একটি বড় অংশ এভাবেই দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেছেন।

করোনা মহামারির পর সীমান্ত-বাণিজ্য ও সীমান্ত পেরিয়ে কর্মসংস্থানের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এরপর স্পেনের সঙ্গে মরক্কোর কূটনৈতিক টানাপোড়েন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে ওই অঞ্চলের বাসিন্দাদের অর্থনৈতিক জীবনে। সাময়িক হিসেবে শুরু হওয়া এসব বিধিনিষেধ পরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মরক্কোর মধ্যে নানা চুক্তির মাধ্যমে স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়। ২০২১ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে অভিবাসন ঠেকানো এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদারের বিনিময়ে মরক্কোকে পঞ্চাশ কোটি ইউরো দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় ব্রাসেলস।

মরক্কোর সঙ্গে এই সহযোগিতা এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তৃতীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুরূপ চুক্তি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শরণার্থীদের ইউরোপে পৌঁছানো ঠেকাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন জেনেশুনেই মরক্কোসহ তৃতীয় দেশগুলোকে সম্ভাব্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে ফেলেছে।

এসব নীতির ক্ষতিকর প্রভাবের একটি উদাহরণ হিসেবে উঠে আসে ২০২২ সালের জুনে স্পেনের মেলিইয়া সীমান্তে ঘটে যাওয়া সহিংস ঘটনা। সীমান্তরক্ষীদের সঙ্গে উত্তেজনার জেরে সেই ঘটনায় প্রাণ হারান অন্তত সাঁইত্রিশ জন।

এসব নীতির মানবিক মূল্য সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়েছে ফেনিদেকে। এক সময় প্রতিদিন হাজারো মরক্কীয় বাসিন্দা কাজের জন্য সেউতায় যাতায়াত করতেন। সেই সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এলাকাটিতে বেকারত্ব বেড়ে গেছে। গত পাঁচ বছরে ফেনিদেকের মানুষের আয় কমেছে সত্তর শতাংশ পর্যন্ত।

‘সোজা পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিলাম’

এমদিক-ফেনিদেক প্রদেশেরই মেয়ে বুশরা মনে করেন, করোনা-পরবর্তী হতাশাই মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পথে। তাঁর ভাষায়, মরক্কোতে তরুণদের পরিস্থিতি খুবই কঠিন, আশপাশে যাদের তিনি দেখেন, প্রায় সবাই বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর।

সেউতার একটি অপ্রাপ্তবয়স্কদের আশ্রয়কেন্দ্রে এখন থাকছে সতেরো বছর বয়সী ইব্রাহিম (ছদ্মনাম)। সে জানায়, সামাজিক মাধ্যমের কোনো আহ্বান দেখে বা পরিকল্পনা করে সে সীমান্ত পেরোয়নি। তার ভাষায়, ফেনিদেকের বাসিন্দা হওয়ায় সীমান্তে প্রতিদিন কী ঘটে, তা সে নিজের চোখেই দেখেছে, আলাদা করে জানার প্রয়োজন হয়নি তার।

ইব্রাহিম বলে, মরক্কো ভেঙে পড়েছে, দারিদ্র্যই তাকে সাগরে ঝাঁপ দিতে বাধ্য করেছে। যেদিন সে সেউতার উদ্দেশে সাঁতরে রওনা দেয়, সেদিন সীমান্তসংলগ্ন আকাশ ছিল মেঘলা ও কুয়াশাচ্ছন্ন। সাত কিলোমিটারের সেই যাত্রার কথা মনে করে সে বলে, জীবনে এমন সুযোগ হয়তো আর আসবে না—এমনটাই ভেবেছিল সে। তার কাছে সাঁতারের কোনো সরঞ্জাম ছিল না, পথও চেনা ছিল না, তবু সোজা পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিল সে।

ইব্রাহিম ভাগ্যবান ছিল। কিন্তু গত বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সমুদ্রপথে সেউতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে অন্তত সাঁইত্রিশ জনের মৃত্যু হয়েছে, তাঁদের মরদেহ ভেসে উঠেছে স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহরের উপকূলের কাছে। অনেকে আবার মরক্কো পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন, পরে বাসে করে তাঁদের পাঠানো হয়েছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে। সেউতাভিত্তিক একটি স্প্যানিশ বেসরকারি সংস্থার মুখপাত্র ফ্রানচেসকা ফুসারো জানান, তরুণেরা যাতে ফের সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা না করেন, সে জন্য কর্তৃপক্ষ নিয়মিতই এই পদ্ধতি অনুসরণ করে।

ইব্রাহিমের ভাষায়, সমুদ্রে কাটানো সেই কয়েক ঘণ্টা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। সে বলে, মনে হচ্ছিল জীবনের সব স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠছে, মনে হচ্ছিল হয়তো সে মারা যাবে। তখন ভবিষ্যতের কথা, প্রিয়জনদের কথা ভাবছিল সে, আর বারবার মনে পড়ছিল মায়ের মুখ।

এদিকে সম্প্রতি সেউতায় একদিনের মধ্যেই অর্ধলক্ষাধিক অভিবাসনপ্রত্যাশী প্রবেশ করেন। স্থল ও সমুদ্রপথে সীমান্ত পার হতে গিয়ে সে সময় ঘটে বহু হতাহতের ঘটনা। সীমান্তের স্পেন অংশে উদ্ধার হয় সাতান্নটি মরদেহ, মরক্কোর দিকেও ঘটে প্রাণহানি।

নীরব প্রতিবাদের ভাষা

খালিদ মুনার ভাষায়, দমন-পীড়নের মুখে সামাজিক মাধ্যম এখন তরুণদের জন্য এক শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। জনপরিসরে দমন-পীড়ন সব সময়ই ছিল, তবে সামাজিক মাধ্যম এখন প্রান্তিক অঞ্চলের তরুণদের একত্র হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাও দীর্ঘদিন ধরে মরক্কোতে মানবাধিকার দমনের অভিযোগ তুলে আসছে।

আন্তর্জাতিক একটি মানবাধিকার সংস্থার সাম্প্রতিক বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মরক্কোতে মতপ্রকাশ ও সংগঠনের স্বাধীনতার ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রয়েছে। এর প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে উচ্চপর্যায়ের মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের কারাবরণ এবং হয়রানির ঘটনা, যার মধ্যে রয়েছে বিতর্কিত পশ্চিম সাহারা অঞ্চল সংশ্লিষ্ট বিষয়ও।

মুনা ও জুবেইদি উভয়েরই মত, মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের দুর্বল অবস্থাও তরুণ মরক্কীয়দের দেশত্যাগে উৎসাহিত করছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মরক্কোর ৬ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ—প্রায় পঁচিশ লাখ—বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছেন। অর্থাৎ শুধু আয়ের অভাব নয়, শিক্ষা, মৌলিক অবকাঠামো ও সেবার ক্ষেত্রেও তাঁরা বঞ্চিত।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, করোনা মহামারির কারণে আরও দশ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের কবলে পড়েছেন। বিগত বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে দেশটির বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে।

বুশরার মতে, সামাজিক মাধ্যমে ইউরোপ সম্পর্কে ছড়িয়ে পড়া অবাস্তব ও বিভ্রান্তিকর ধারণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। স্পেনে পৌঁছাতে পারা মানুষদের গল্প আর অভিবাসনে উৎসাহ জোগানো অসংখ্য গান তরুণদের আগ্রহ আরও উসকে দেয়। তাঁর কথায়, মরক্কোর তরুণদের মধ্যে বারবার এই চিন্তা ফিরে আসছে, আর তা নিয়ে তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

স্বপ্ন আর বাস্তবতার মাঝামাঝি

দক্ষিণ মরক্কোর সমুদ্রতীরে নিজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন হামজা। চলতি বছর তিনি ইউরোপে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন এবং শিক্ষার্থী ভিসার জন্য আবেদন করতে চান। তবে তিনি জানেন, পরিবারের সহায়তা না থাকায় তাঁর বন্ধুদের সামনে সে পথ খোলা নেই।

আরও একবার মুঠোফোন হাতে বন্ধুদের খোঁজ নেন হামজা। ইউরোপে কষ্টে দিন কাটালেও লজ্জায় তাঁরা পরিবার ও পরিচিতজনদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেন সুখী জীবনের ছবি। হামজা জানেন, তাঁদের কেউ কেউ রাতে রাস্তায় ঘুমান। তবু স্বজনদের চোখে তাঁরা যেন পূরণ করে ফেলেছেন ইউরোপযাত্রার সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন।

Share this news as a Photo Card