বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের অংশগ্রহণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা মহলে বিতর্ক রয়েছে। শিক্ষকরা স্থানীয় রাজনীতিতে জড়ালে শ্রেণিকক্ষে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কি না, তা নিয়ে আলোচনা কম হয়নি। এবার সেই বিতর্কে একটি স্পষ্ট ও কঠোর বার্তা দিলেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ পুরোপুরি বন্ধ করতে একটি সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
শিক্ষামন্ত্রীর মতে, একজন শিক্ষক যদি জনপ্রতিনিধি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা রাখেন, তবে তাকে প্রথমেই তার শিক্ষকতার মহান পেশা থেকে অব্যাহতি নিতে হবে। চাকরি ও রাজনীতি—দুটি বিষয় একসঙ্গে চলতে পারে না বলে তিনি জোরালো মত প্রকাশ করেছেন।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেসকো)-র উদ্যোগে আয়োজিত শিক্ষা খাতের এক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই যুগান্তকারী প্রস্তাবনার কথা তুলে ধরেন।
রাজনীতির মাঠে নয়, শিক্ষকের স্থান শ্রেণিকক্ষে
শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি ব্রত। একজন শিক্ষকের মূল ধ্যান ও জ্ঞান হওয়া উচিত তার শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলা। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচন, যেমন—ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ বা পৌরসভা নির্বাচনে শিক্ষকরা যখন প্রার্থী হিসেবে অবতীর্ণ হন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের মনোযোগ বিভক্ত হয়ে পড়ে। নির্বাচনী প্রচার, দলীয় রাজনীতি এবং স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার কারণে ব্যাহত হয় শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম।
এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, “আগামী দিনের নির্বাচনগুলোতে শিক্ষকরা যেন কোনোভাবেই অংশ নিতে না পারেন, সে জন্য সরকারকে এখন থেকেই ভাবতে হবে এবং একটি কার্যকর আইন প্রণয়ন করতে হবে। শিক্ষকরা যদি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে চান, তবে তাদের জন্য দরজা খোলা রয়েছে, কিন্তু তার আগে তাদের অবশ্যই নিজ নিজ চাকরি ছেড়ে দিতে হবে।”
তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভবিষ্যৎ নীতিমালার একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, শিক্ষাঙ্গনকে সম্পূর্ণভাবে রাজনীতিকরণ মুক্ত রাখতে এবং শিক্ষকদের কেবল জ্ঞান বিতরণের কাজেই সীমাবদ্ধ রাখতে সরকার আগামীতে কঠোর কোনো আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে।
শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের শতভাগ কার্যকর ব্যবহার
ইউনেসকোর ওই মঞ্চে দাঁড়িয়ে শিক্ষামন্ত্রী কেবল নির্বাচন ও আইনের বিষয়েই কথা বলেননি, তিনি দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন এবং সরকারের বিনিয়োগের সঠিক ব্যবহারের ওপরও ব্যাপক আলোকপাত করেন।
বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার শিক্ষা খাতে প্রচুর অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে। অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে শুরু করে আধুনিক পাঠ্যক্রম প্রণয়ন—সবখানেই বিনিয়োগের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এই বিপুল বিনিয়োগের সুফল কতটুকু সাধারণ শিক্ষার্থীদের দোরগোড়ায় পৌঁছাচ্ছে, সেটি নিয়ে মন্ত্রী নিজের ভাবনার কথা জানান।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, “শিক্ষা খাতে যে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ করা হচ্ছে, তা যেন অত্যন্ত সঠিকভাবে এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজে লাগে, সেটি আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। অর্থের অপচয় রোধ করে বিনিয়োগের প্রতিটি পয়সা যেন শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়, সেদিকে কড়া নজরদারি প্রয়োজন।”
বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষা সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানান।
শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ: একটি দক্ষ জাতি গঠনের মূল চাবিকাঠি
যেকোনো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হলেন সেই দেশের শিক্ষকরা। ভবন, বই বা প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, একজন দক্ষ শিক্ষকের বিকল্প কোনো কিছুই হতে পারে না। এই ধ্রুব সত্যটি স্মরণ করিয়ে দিয়ে ড. এহছানুল হক মিলন শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, “শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক মান উন্নয়নে যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষকদের উন্নয়নের জন্য যে অর্থ ও সময় বিনিয়োগ করা হচ্ছে, তা যদি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তবেই ভবিষ্যতে একটি দক্ষ, আধুনিক এবং সুন্দর জাতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে।”
শিক্ষকদের আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের নতুন নতুন পদ্ধতি, মনস্তাত্ত্বিক উপায়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে একজন শিক্ষক নিজেকে আরও শানিত করতে পারেন। মন্ত্রীর বক্তব্যে এই বিষয়গুলোর প্রতিই প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত ছিল।
ভবিষ্যতের বাংলাদেশ বিনির্মাণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চ্যালেঞ্জ
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে শিক্ষামন্ত্রী আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অপরিসীম ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। একটি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিতে উৎকর্ষ সাধন সরাসরি নির্ভর করে সেই দেশের শিক্ষা কাঠামোর ওপর।
ড. মিলন দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, “দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটি জাতির ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তা আজকের শ্রেণিকক্ষেই নির্ধারিত হয়। তাই যেকোনো মূল্যে আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে আমাদের শিক্ষা খাতকে আরও বেশি শক্তিশালী, আধুনিক এবং যুগোপযোগী করে তুলতে হবে।”
তাঁর এই বক্তব্যের মাধ্যমে এটা পরিষ্কার যে, বর্তমান সরকার শিক্ষা খাতকে একটি নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর। আর সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে অন্যতম প্রধান শর্ত হলো—শিক্ষকদের রাজনীতি ও নির্বাচন থেকে দূরে রেখে শুধুমাত্র পাঠদানে মনোযোগী করা এবং তাদের দক্ষতাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া।
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের এই বক্তব্য দেশের শিক্ষা অঙ্গনে একটি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ বন্ধে যদি সত্যিই কোনো আইন প্রণীত হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ সুন্দর রাখা, শিক্ষকদের পেশাদারিত্ব বজায় রাখা এবং রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে একটি সুশিক্ষিত জাতি গঠনের যে রূপরেখা মন্ত্রী ইউনেসকোর অনুষ্ঠানে তুলে ধরেছেন, তা বাস্তবায়িত হলে দেশের সামগ্রিক শিক্ষা কাঠামোতে এক ইতিবাচক ও দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা
চলমান বার্তা ডেস্ক : 









