ঢাকার মাদক বাজারে শিশুদের উপস্থিতি কতটা গভীর, তার একটি চিত্র উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়। রাজধানীতে মাদক বিক্রির সঙ্গে যুক্ত এক হাজার ১৬ জনের সাক্ষাৎকার নিয়ে করা ওই গবেষণায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের ২৭ দশমিক ৪ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের নিচে।
গত ১২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর থেকে অটোরিকশায় মোহাম্মদপুরের দিকে যাচ্ছিল এক কিশোর। সন্দেহ হওয়ায় বছিলা চেকপোস্টে রিকশাটি থামায় পুলিশ। কিশোরের ট্রাভেল ব্যাগ তল্লাশি করে পাওয়া যায় ছয় কেজি গাঁজা। এরপর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মাদক ব্যবসায় যুক্ত থাকার অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঝেমধ্যেই এভাবে কিশোরদের গ্রেপ্তার করে।
‘আনভেইলিং প্যাটার্নস অ্যান্ড সোশিওডেমোগ্রাফিক ক্যারেক্টারিস্টিকস অব ড্রাগ ট্রাফিকিং ইন ঢাকা সিটি, বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাটি গত ১০ আগস্ট আন্তর্জাতিক সাময়িকী পিএলওএস ওয়ানে প্রকাশিত হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা মিলে এটি করেছেন। ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
কারা জড়িত
গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারীদের বড় অংশই আর্থসামাজিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিলেন। তাঁদের গড় বয়স ২৬ দশমিক ৭ বছর। ৫৫ দশমিক ৭ শতাংশের পড়ালেখা প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত বা তারও কম। প্রায় ২৯ শতাংশ ফুটপাতে থাকেন। আরও প্রায় ১০ শতাংশ নিজেদের গৃহহীন বা ভাসমান বলে পরিচয় দিয়েছেন। নারী অংশগ্রহণকারীদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা পেশাদার যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করেন।
কে কোন মাদক বেচে, তাতেও পার্থক্য আছে। ১৫ বছর বা তার কম বয়সী শিশুদের সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে ইয়াবা বিক্রিতে। হেরোইন বিক্রিতেও তাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে গাঁজা ও ইয়াবা বিক্রির প্রবণতা বেশি। যৌনকর্মী নারীদের মধ্যে ইয়াবা বিক্রির সংশ্লিষ্টতা বেশি পাওয়া গেছে। অন্য নারীদের ক্ষেত্রে হেরোইন ও গাঁজা বিক্রির হার তুলনামূলক বেশি।
কেন এ পথে
মাদক ব্যবসায় জড়ানোর কারণ জানতে চাইলে শিশুদের বেশির ভাগ কর্মসংস্থানের অভাবের কথা বলেছে। নারীদের ক্ষেত্রেও কাজ না পাওয়ার কথাই বেশি এসেছে। তবে শিশু, বিশেষ করে মেয়েশিশুর ক্ষেত্রে বাধ্য করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। পুরুষরা বেশি উল্লেখ করেছেন আর্থিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক সুযোগের অভাবের কথা।
কোন এলাকায় কী
এলাকাভেদে বিক্রির ধরনও আলাদা। এক হাজার ১৬ জনের মধ্যে ২৫৩ জন শুধু গাঁজা বিক্রির কথা জানিয়েছেন। তাঁদের বেশি দেখা গেছে পল্টন ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়। শুধু ইয়াবা বিক্রি করেন ২৮৫ জন, যাঁদের উপস্থিতি বেশি কমলাপুর রেলস্টেশন ও বাড্ডায়। গাঁজা ও ইয়াবা দুটোই বিক্রি করেন ২২৮ জন, মূলত ফার্মগেট ও তেজগাঁওয়ে। গাঁজা ও হেরোইন একসঙ্গে বিক্রির কথা বলেছেন ২৫০ জন, যাঁদের বেশি দেখা গেছে সাভার ও পল্টনে।
ফলাফলের সীমাবদ্ধতা
গবেষকেরা জানিয়েছেন, অংশগ্রহণকারী বাছাইয়ে ‘পারপাসিভ’ ও ‘স্নোবল স্যাম্পলিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ নমুনাগুলো এলোমেলোভাবে নির্বাচিত নয়। অবৈধ ও গোপন কর্মকাণ্ডে যুক্ত মানুষের কাছে পৌঁছাতে পরিচিতজন ও বিভিন্ন নেটওয়ার্কের সাহায্য নিতে হয়েছে। তাই ফলাফলকে পুরো ঢাকার মাদক বিক্রেতাদের প্রতিনিধিত্বকারী পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহাম ও ঢাকার ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ড. শাফায়াত হোসেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষক গ্যারেথ জে হল্যান্ডস, সৌদি আরবের ইমাম মোহাম্মদ ইবনে সৌদ ইসলামিক ইউনিভার্সিটির ডিন মো. আলামিন, চীনের চাংঝু ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মো. রোকনুজ্জামান, ঢাকার মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মাহদী হাসান এবং সিরাজগঞ্জের মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলের শিক্ষার্থী সামিয়া আক্তার।
ড. শাফায়াত হোসেনের মতে, অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ২৮ শতাংশের বয়স ১৫ বছর বা তার কম হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, এ থেকে বোঝা যায়, ঢাকার মাদক বাণিজ্যের কাঠামোয় শিশুশ্রমের মতো অপরাধমূলক শিশু-শোষণ গভীরে শিকড় গেড়েছে। তাঁর ব্যাখ্যা, এই বয়সের শিশুরা সাধারণত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সন্দেহের বাইরে থাকে। তাই মাদক সিন্ডিকেট জোর করে বা কৌশলে তাদের ব্যবহার করছে। তাঁর মতে, এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের সরাসরি প্রতিফলন।
মাদক আসে যে পথে
গবেষণায় হেরোইন, গাঁজা ও ইয়াবা ঢাকায় পৌঁছানোর কয়েকটি পথ চিহ্নিত করা হয়েছে। হেরোইন আসে পাকিস্তানের লাহোর থেকে ওয়াঘা সীমান্ত হয়ে ভারতের পাটনায়, সেখান থেকে বাংলাদেশে। ঢাকায় এসে তা সাভার, মিরপুর, মহাখালী ও মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
গাঁজা ঢোকে দুটি প্রধান পথে। একটি ভারত থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে, অন্যটি কুমিল্লা হয়ে। দুই পথ ঢাকায় এসে মিলিত হয়, তারপর গাঁজা নগরীর নানা এলাকায় ছড়ায়।
ইয়াবার উৎস মিয়ানমার। টেকনাফ সীমান্ত ছাড়াও ভারতের মিজোরাম ও মেঘালয় হয়ে সেটি বাংলাদেশে ঢোকে। পরে একাধিক পথে সিলেট ও সুনামগঞ্জ হয়ে ঢাকায় পৌঁছায়। মিজোরাম ও মেঘালয় হয়ে আসা পথটিকে গবেষণায় বৃহত্তর ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ মাদক পাচার নেটওয়ার্কের অংশ বলা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এসব পথে ওই অঞ্চলের উৎপাদনকেন্দ্র থেকে সরাসরি ঢাকার বাজারে মাদক আসে।
ভারতের দিক থেকে আরও কয়েকটি পথের কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে আছে জামালপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ। গবেষণার মানচিত্রে তিনটি প্রধান আন্তঃসীমান্ত পথ আলাদাভাবে দেখানো হয়েছে: পাকিস্তান-লাহোর-ওয়াঘা-পাটনা-বাংলাদেশ, ভারত-মিজোরাম-মেঘালয়-বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার-টেকনাফ-ঢাকা।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 


















