২০২৪ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া বড় ধরনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই প্রথম দুই দেশের মধ্যে বড় কোনো অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত প্রকল্পের স্থবিরতা কাটতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিয়ে, আগামী জুলাই মাসেই ভারত থেকে যাত্রীবাহী রেল কোচ রপ্তানি পুনরায় শুরু হতে যাচ্ছে।
ভারতীয় রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী মাসের মধ্যেই ২০টি আধুনিক ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচের একটি সম্পূর্ণ রেক বাংলাদেশে পাঠানোর চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে। ঢাকার রাজনৈতিক প্রশাসনের পরিবর্তনের পর তৈরি হওয়া সাময়িক ধীরগতি কাটিয়ে এই প্রকল্পের অগ্রগতি দুই দেশের রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৯১৫ কোটি রুপির মেগা প্রকল্প এবং ইউরোপীয় অর্থায়ন
ভারতের রাষ্ট্রীয় রেলওয়ের অন্যতম শীর্ষ রপ্তানি সংস্থা ‘রাইটস’ (RITES) বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের আধুনিকায়নের জন্য ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ সরবরাহের একটি বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে ২০২৪ সালের মে মাসে এই চুক্তিটি লাভ করে ভারতীয় সংস্থাটি।
পুরো প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯১৫ কোটি ভারতীয় রুপি। তবে এই প্রকল্পের একটি অন্যতম বিশেষ দিক হলো এর অর্থায়ন। ভারত ও বাংলাদেশের এই রেল প্রকল্পে মূল অর্থ জোগাচ্ছে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ‘ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক’ (EIB)।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী প্রথম দফার কোচ রেকটি আগামী জুলাই মাসেই পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে যাবে। বর্তমানে ভারতীয় রেলওয়ে ও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে এই কোচগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তরের প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রক্রিয়া নিয়ে জোর প্রস্তুতি চলছে।
কাপুরথালা ফ্যাক্টরি এবং কোচের নকশাগত আধুনিকায়ন
বাংলাদেশের জন্য তৈরি হতে যাওয়া এই বিশেষ ব্রডগেজ কোচগুলো নির্মিত হচ্ছে ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের কাপুরথালা রেল কোচ ফ্যাক্টরিতে (RCF)। কাপুরথালার এই কারখানাটি আন্তর্জাতিক মানের এবং উন্নত প্রযুক্তির রেল কোচ তৈরির জন্য বিশেষভাবে সমাদৃত।
রাইটসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই চুক্তির আওতায় তারা কেবল রেল কোচ সরবরাহ করেই খালাস নয়; এর সাথে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- নকশাগত সহায়তা (Design Support): বাংলাদেশের রেললাইনের ধারণক্ষমতা এবং আবহাওয়ার কথা বিবেচনা করে বিশেষ নকশায় এই কোচগুলো তৈরি করা হচ্ছে।
- খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ: রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধার্থে প্রয়োজনীয় স্পেয়ার পার্টস বা খুচরা যন্ত্রাংশও সরবরাহ করবে ভারত।
- বাংলাদেশি কর্মীদের প্রশিক্ষণ: আধুনিক এই কোচগুলো পরিচালনা এবং ত্রুটি মেরামতের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রকৌশলী ও কর্মীদের বিশেষ কারিগরি প্রশিক্ষণ দেবে রাইটস।
পুরো প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছে ৩৬ মাস, যার মধ্যে সরবরাহ ও কমিশনিং (চালুকরণ) সম্পন্ন করতে হবে। এর পাশাপাশি, পরবর্তী ২৪ মাস বা দুই বছরের জন্য ওয়ারেন্টি সুবিধা দেবে ভারতীয় প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানটি।
রাজনৈতিক রূপান্তর এবং প্রকল্পের সাময়িক ধীরগতি
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক গণঅভ্যুত্থান এবং সরকার পরিবর্তনের পর, ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত বেশ কিছু উন্নয়ন প্রকল্পের গতি থমকে গিয়েছিল। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে এক ধরনের নীরবতা এবং নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার কারণে এই ব্রডগেজ কোচ সরবরাহের কাজও কিছুটা পিছিয়ে পড়ে।
ভারতীয় কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন যে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক রূপান্তরের কারণে মাঠপর্যায়ের কাজ এবং নথিপত্রের আদান-প্রদান সাময়িকভাবে ধীর হয়ে পড়েছিল। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন ও নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থার অধীনে প্রকল্পটির গুরুত্ব বিবেচনা করে গতি পুনরায় বৃদ্ধি করা হয়েছে। ভারতীয় কূটনৈতিক মহলের মতে, এই রপ্তানি প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু হওয়া এটিই প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক ও কৌশলগত যোগাযোগ সচল রাখা জরুরি।
বাংলাদেশ রেলওয়েতে ভারতের পূর্ববর্তী অবদান
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রেল সংযোগের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। এর আগেও ভারত বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ রেলওয়েকে উন্নতমানের রোলিং স্টক (ইঞ্জিন ও কোচ) সরবরাহ করেছে। পূর্ববর্তী চুক্তিগুলোর অধীনে ভারত বাংলাদেশ সংস্থাকে—
- ১২০টি আধুনিক ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ,
- ৩৬টি শক্তিশালী ব্রডগেজ লোকোমোটিভ (রেল ইঞ্জিন), এবং
- ১০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ সরবরাহ করেছে।
নতুন ২০০টি ব্রডগেজ কোচ যুক্ত হলে বাংলাদেশ রেলওয়ের দূরপাল্লার রুটগুলোতে কোচের তীব্র সংকট অনেকটাই কেটে যাবে। বিশেষ করে দেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় রেল রুটে, যেখানে ব্রডগেজ লাইনের আধিক্য বেশি, সেখানে যাত্রীসেবার মান বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করছেন বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তারা।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 









