শিরোনাম :
‘বাংলা কিউআর’-এর ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে ক্যাশলেস অর্থনীতির চিত্র এলপিজির দাম কমল ৩৫৭ টাকা,১২ কেজির নতুন দাম হয়েছে ১ হাজার ৫২৮ টাকা। নির্বাচনে শিক্ষকদের অংশগ্রহণে ‘চাকরি ছেড়ে ভোটে আসতে হবে’, আইন করার দাবি শিক্ষামন্ত্রীর নতুন দায়িত্বে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী : ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ পুনর্গঠন বাজেট ২০২৬-২৭: সংসদে সরব বিরোধী দল, তবে অর্থবিলে নেই কোনো সংশোধনী প্রস্তাব—কী বার্তা দিচ্ছে এই নীরবতা? সামনে নরওয়ে জুজু! যাদের বিপক্ষে কখনই জয় পায়নি ব্রাজিল:ভাঙবে কি ইতিহাস? বাংলাদেশে আর সন্ত্রাসবাদ নয় মেট্রোরেল–টার্মিনালসহ নানা ইস্যুতে জাপানের সঙ্গে ‘টানাপোড়েন’  সম্পর্ক ঠিক রাখতে চায় সরকার কেরানীগঞ্জে বিস্ফোরণ : নব্য জেএমবির পুনরুত্থান ও নিরাপত্তা ঝুঁকি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান: ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হাসানুল হক ইনু

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান: ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হাসানুল হক ইনু

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

আজ মঙ্গলবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) সরাসরি সম্প্রচারিত এই রায়ের মধ্য দিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের ষষ্ঠ মামলার রায় ঘোষিত হলো।

মামলার পটভূমি ও আইনি প্রক্রিয়া

হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে এই মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ। দীর্ঘ তদন্ত শেষে একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এরপর ২৫ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) গঠন করে প্রসিকিউশন। উভয় পক্ষের শুনানির পর গত বছরের ২ নভেম্বর আদালত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।

গত বছরের ৩০ নভেম্বর সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার কাজ শুরু হয় এবং ১ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয় সাক্ষ্য গ্রহণ। পুরো বিচার প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ (প্রসিকিউশন) মোট ১০ জন সাক্ষী আদালতে হাজির করে। অন্যদিকে, আসামিপক্ষ নিজেদের সমর্থনে ২ জন সাফাই সাক্ষী উপস্থাপন করে।

চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল শুরু হওয়া যুক্তিতর্ক উপস্থাপন এক মাস ধরে চলার পর ১৩ মে শেষ হয়। এরপর থেকে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) ছিল। গত ২২ জুন ট্রাইব্যুনাল রায়ের জন্য আজকের দিনটি (৩০ জুন) ধার্য করেছিলেন।

ইনুর বিরুদ্ধে প্রমাণিত আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ

মামলার একমাত্র আসামি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন মোট আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনেছিল, যার মধ্যে আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়ন ও হত্যার উসকানি দেওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। অভিযোগগুলো নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

১. ভারতীয় গণমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য ও হত্যার নির্দেশ

২০২৪ সালের ১৮ জুলাই আন্দোলন যখন তীব্র রূপ নেয়, তখন ভারতীয় একটি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেন হাসানুল হক ইনু। সেখানে তিনি জুলাই আন্দোলনকারীদের ‘জামায়াত’, ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘সাম্প্রদায়িক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে বলপ্রয়োগের উসকানি, প্ররোচনা এবং পরোক্ষভাবে হত্যার নির্দেশ দেন বলে আদালতে প্রমাণিত হয়।

২. গণভবনের বৈঠকে ‘শুট অ্যাট সাইট’ সিদ্ধান্তের সমর্থন

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনে ১৪-দলীয় জোটের একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। দেশব্যাপী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে সেই সভায় ‘শুট অ্যাট সাইট’ বা দেখামাত্র গুলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। হাসানুল হক ইনু জাসদ সভাপতি হিসেবে ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরাসরি প্ররোচনা, উসকানি ও সহায়তা করেন।

৩. কুষ্টিয়ার এসপিকে ফোনে নির্যাতন ও আটকের নির্দেশ

আন্দোলন চলাকালে ছবি দেখে দেখে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার তালিকা প্রণয়ন করার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে ইনুর বিরুদ্ধে। তিনি কুষ্টিয়ার তৎকালীন পুলিশ সুপারকে (এসপি) ফোনে তালিকাভুক্তদের আটক ও নির্যাতন করার জন্য বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেন।

৪. মারণাস্ত্র ও হেলিকপ্টার থেকে বম্বিংয়ের পরিকল্পনা

আদালতে উপস্থাপিত অভিযোগে বলা হয়, ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রাণঘাতী মারণাস্ত্র ব্যবহারের পরামর্শ দেন ইনু। একই সাথে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে ছত্রীসেনা নামানো এবং হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বম্বিং বা বোমা হামলার পরিকল্পনা প্রণয়নে তিনি যুক্ত ছিলেন।

৫. গণমাধ্যমে মিথ্যাচার ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের সমর্থন

সাবেক তথ্যমন্ত্রী হিসেবে হাসানুল হক ইনু বিভিন্ন গণমাধ্যমে সরকারের দমন-পীড়নকে যৌক্তিক প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। সরকারের গ্রহণ করা গণ-হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও নিপীড়নকে তিনি সুকৌশলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে সমর্থন জুগিয়েছিলেন।

৬. জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত

১৪-দলীয় জোটের নীতিগত সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে মোড় নিতে জামায়াতে ইসলামীকে রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ইনু ওই সভায় উপস্থিত থেকে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

৭. শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে ষড়যন্ত্র

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে নিয়মিত টেলিফোনে যোগাযোগ রক্ষা করে আন্দোলন নস্যাৎ করার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক ও কৌশলগত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার ডিজিটাল ও পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ আদালতে পেশ করা হয়।

৮. কুষ্টিয়ায় হত্যাকাণ্ড ও দেশব্যাপী সহিংসতার দায়

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। এতে ইউসুফ শেখ, উসামা, সুরুজ আলী, আশরাফুল ইসলাম, বাবলু ফরাজী ও আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন—এই ছয়জন আন্দোলনকারী নিহত হন। ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয় যে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ইনুর প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ছিল। এ ছাড়া, আন্দোলনের সময় দেশজুড়ে ১ হাজার ৪০০ মানুষকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি ছাত্র-জনতাকে আহত করার রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের পেছনে তার প্ররোচনা ছিল।

আদালতের পর্যবেক্ষণ ও প্রতিক্রিয়া

রায় ঘোষণার সময় আদালত মন্তব্য করেন, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল এবং স্বৈরাচারী সরকারকে টিকিয়ে রাখতে হাসানুল হক ইনু যেভাবে গণমাধ্যমের অপব্যবহার এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত দিয়ে হত্যাকাণ্ডকে উসকে দিয়েছেন, তা মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। তবে তার বয়স এবং সার্বিক দিক বিবেচনা করে আদালত তাকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন।

রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “এই রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে, মাঠপর্যায়ে সরাসরি অস্ত্র চালানো ব্যক্তিই শুধু অপরাধী নন, বরং পর্দার আড়াল থেকে যারা উসকানি ও নির্দেশ দিয়েছেন, তারাও সমভাবে অপরাধী।” অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা জানিয়েছেন।

Share this news as a Photo Card

© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

জনপ্রিয় সংবাদ

‘বাংলা কিউআর’-এর ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে ক্যাশলেস অর্থনীতির চিত্র

সম্পাদক ও প্রকাশক

মোঃ মাহমুদুন্নবী জ্যোতি

অফিসঃ ২/২ আরকে মিশন রোড , ঢাকা।

ইমেলঃ chalomanbarta@yahoo.com, chalomanbarta@gmail.com

মোবাইলঃ ০১৭১১০৫৬৮৬৬, ০১৬৮১৯২৪০০০

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান: ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হাসানুল হক ইনু

৩০ জুন ২০২৬
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
facebook.com/dailycholomanbarta
www.cholomanbarta.com

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান: ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হাসানুল হক ইনু

আপডেট সময় ০৪:৫৫:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

আজ মঙ্গলবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) সরাসরি সম্প্রচারিত এই রায়ের মধ্য দিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের ষষ্ঠ মামলার রায় ঘোষিত হলো।

মামলার পটভূমি ও আইনি প্রক্রিয়া

হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে এই মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ। দীর্ঘ তদন্ত শেষে একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এরপর ২৫ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) গঠন করে প্রসিকিউশন। উভয় পক্ষের শুনানির পর গত বছরের ২ নভেম্বর আদালত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।

গত বছরের ৩০ নভেম্বর সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার কাজ শুরু হয় এবং ১ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয় সাক্ষ্য গ্রহণ। পুরো বিচার প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ (প্রসিকিউশন) মোট ১০ জন সাক্ষী আদালতে হাজির করে। অন্যদিকে, আসামিপক্ষ নিজেদের সমর্থনে ২ জন সাফাই সাক্ষী উপস্থাপন করে।

চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল শুরু হওয়া যুক্তিতর্ক উপস্থাপন এক মাস ধরে চলার পর ১৩ মে শেষ হয়। এরপর থেকে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) ছিল। গত ২২ জুন ট্রাইব্যুনাল রায়ের জন্য আজকের দিনটি (৩০ জুন) ধার্য করেছিলেন।

ইনুর বিরুদ্ধে প্রমাণিত আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ

মামলার একমাত্র আসামি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন মোট আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনেছিল, যার মধ্যে আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়ন ও হত্যার উসকানি দেওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। অভিযোগগুলো নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

১. ভারতীয় গণমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য ও হত্যার নির্দেশ

২০২৪ সালের ১৮ জুলাই আন্দোলন যখন তীব্র রূপ নেয়, তখন ভারতীয় একটি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেন হাসানুল হক ইনু। সেখানে তিনি জুলাই আন্দোলনকারীদের ‘জামায়াত’, ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘সাম্প্রদায়িক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে বলপ্রয়োগের উসকানি, প্ররোচনা এবং পরোক্ষভাবে হত্যার নির্দেশ দেন বলে আদালতে প্রমাণিত হয়।

২. গণভবনের বৈঠকে ‘শুট অ্যাট সাইট’ সিদ্ধান্তের সমর্থন

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনে ১৪-দলীয় জোটের একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। দেশব্যাপী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে সেই সভায় ‘শুট অ্যাট সাইট’ বা দেখামাত্র গুলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। হাসানুল হক ইনু জাসদ সভাপতি হিসেবে ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরাসরি প্ররোচনা, উসকানি ও সহায়তা করেন।

৩. কুষ্টিয়ার এসপিকে ফোনে নির্যাতন ও আটকের নির্দেশ

আন্দোলন চলাকালে ছবি দেখে দেখে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার তালিকা প্রণয়ন করার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে ইনুর বিরুদ্ধে। তিনি কুষ্টিয়ার তৎকালীন পুলিশ সুপারকে (এসপি) ফোনে তালিকাভুক্তদের আটক ও নির্যাতন করার জন্য বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেন।

৪. মারণাস্ত্র ও হেলিকপ্টার থেকে বম্বিংয়ের পরিকল্পনা

আদালতে উপস্থাপিত অভিযোগে বলা হয়, ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রাণঘাতী মারণাস্ত্র ব্যবহারের পরামর্শ দেন ইনু। একই সাথে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে ছত্রীসেনা নামানো এবং হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বম্বিং বা বোমা হামলার পরিকল্পনা প্রণয়নে তিনি যুক্ত ছিলেন।

৫. গণমাধ্যমে মিথ্যাচার ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের সমর্থন

সাবেক তথ্যমন্ত্রী হিসেবে হাসানুল হক ইনু বিভিন্ন গণমাধ্যমে সরকারের দমন-পীড়নকে যৌক্তিক প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। সরকারের গ্রহণ করা গণ-হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও নিপীড়নকে তিনি সুকৌশলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে সমর্থন জুগিয়েছিলেন।

৬. জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত

১৪-দলীয় জোটের নীতিগত সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে মোড় নিতে জামায়াতে ইসলামীকে রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ইনু ওই সভায় উপস্থিত থেকে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

৭. শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে ষড়যন্ত্র

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে নিয়মিত টেলিফোনে যোগাযোগ রক্ষা করে আন্দোলন নস্যাৎ করার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক ও কৌশলগত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার ডিজিটাল ও পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ আদালতে পেশ করা হয়।

৮. কুষ্টিয়ায় হত্যাকাণ্ড ও দেশব্যাপী সহিংসতার দায়

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। এতে ইউসুফ শেখ, উসামা, সুরুজ আলী, আশরাফুল ইসলাম, বাবলু ফরাজী ও আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন—এই ছয়জন আন্দোলনকারী নিহত হন। ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয় যে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ইনুর প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ছিল। এ ছাড়া, আন্দোলনের সময় দেশজুড়ে ১ হাজার ৪০০ মানুষকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি ছাত্র-জনতাকে আহত করার রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের পেছনে তার প্ররোচনা ছিল।

আদালতের পর্যবেক্ষণ ও প্রতিক্রিয়া

রায় ঘোষণার সময় আদালত মন্তব্য করেন, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল এবং স্বৈরাচারী সরকারকে টিকিয়ে রাখতে হাসানুল হক ইনু যেভাবে গণমাধ্যমের অপব্যবহার এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত দিয়ে হত্যাকাণ্ডকে উসকে দিয়েছেন, তা মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। তবে তার বয়স এবং সার্বিক দিক বিবেচনা করে আদালত তাকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন।

রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “এই রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে, মাঠপর্যায়ে সরাসরি অস্ত্র চালানো ব্যক্তিই শুধু অপরাধী নন, বরং পর্দার আড়াল থেকে যারা উসকানি ও নির্দেশ দিয়েছেন, তারাও সমভাবে অপরাধী।” অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা জানিয়েছেন।

Share this news as a Photo Card