২০১৬ সালের ১ জুলাইয়ের সেই ভয়াল রাত। ঢাকার প্রাণকেন্দ্র গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে ঘটে যাওয়া নৃশংস জঙ্গি হামলা শুধু বাংলাদেশকেই নয়, স্তম্ভিত করেছিল পুরো বিশ্বকে। দেখতে দেখতে সেই বিভীষিকাময় ঘটনার দশটি বছর পেরিয়ে গেছে। আজ বুধবার (১ জুলাই), এক দশক পূর্তিতে বিনম্র শ্রদ্ধা আর অশ্রুসিক্ত নয়নে স্মরণ করা হলো সেই হামলায় প্রাণ হারানো সাহসী মানুষদের।
স্মরণানুষ্ঠানে উঠে আসা মূল বার্তাটি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট—জঙ্গি হামলাকারীরা বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাঝে যে ঘৃণার বীজ বপন করতে চেয়েছিল, তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। বরং তাদের সেই অপচেষ্টার বিপরীতে মানুষের মধ্যে সংহতি, পারস্পরিক সংলাপের মূল্যবোধ এবং যেকোনো ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে সম্মিলিত অঙ্গীকার আরও বেশি শক্তিশালী হয়েছে। তবে একইসঙ্গে এই সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে যে, বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদ যেন আর কখনোই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সে ব্যাপারে সবাইকে সবসময় সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
স্মরণের আবহে শোক ও শ্রদ্ধা
বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর গুলশানে ইতালির রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে এক ভাবগম্ভীর পরিবেশে এই স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতেই নিহত ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
পুরো অনুষ্ঠানস্থল জুড়ে ছিল এক অদ্ভুত স্তব্ধতা। সেখানে স্থাপিত একটি নামফলকের সামনে একে একে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন ইতালি, জাপান, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকেরা।
হামলায় নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকেও জানানো হয় গভীর শ্রদ্ধা। তরুণ ফারাজ আইয়াজ হোসেন, যিনি নিজের জীবনের বিনিময়ে বন্ধুত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তাঁর বড় ভাই যারেফ আয়াত হোসেন পরিবারের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ পুলিশের সাহসী সদস্য এবং ঢাকায় বসবাসরত প্রবাসী ইতালীয় নাগরিকদের পক্ষ থেকেও ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হয়।
‘ঘৃণার বদলে সংহতি আরও শক্তিশালী হয়েছে’
এক দশক আগের ওই হামলায় নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছিলেন বেশ কয়েকজন ইতালি ও জাপানের নাগরিক। ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো তাঁর বক্তব্যে সেই শোকাবহ রাতের স্মৃতিচারণ করেন।
তিনি বলেন, “যাঁরা সেদিন প্রাণ হারিয়েছিলেন, তাঁরা এসেছিলেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত এবং ভিন্ন ভিন্ন পটভূমি থেকে। তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন তরুণ, অত্যন্ত মেধাবী এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখা মানুষ। আজ তাঁদের প্রতি এই শ্রদ্ধা নিবেদন করার অর্থ হলো, বাংলাদেশের একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ সমাজ গঠনে তরুণদের অপরিসীম ভূমিকার কথা স্মরণ করা।”
হামলার সময় নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে পুলিশ কর্মকর্তারা সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তাঁদের প্রতিও গভীর শ্রদ্ধা জানান ইতালির রাষ্ট্রদূত। তিনি উল্লেখ করেন, অন্যের নিরাপত্তা এবং দেশের সুরক্ষার প্রশ্নে একজন মানুষের দায়িত্ববোধ কতটা মহান হতে পারে, তাঁরা সেই দৃষ্টান্তই রেখে গেছেন।
এ সময় রাষ্ট্রদূত আলেসান্দ্রো ইতালির প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাত্তারেল্লার একটি বিশেষ বার্তা পড়ে শোনান:
“সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘৃণা ও বিভাজন ছড়াতে চেয়েছিল। কিন্তু এর পরিবর্তে আরও শক্তিশালী হয়েছে সংহতির বোধ, মানুষের মধ্যে সংলাপের মূল্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে যৌথ অঙ্গীকার। সভ্যতার মূলনীতি রক্ষার জন্য সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান প্রয়োজন, যাতে একটি নিরাপদ, উন্মুক্ত ও পারস্পরিক সংহতিতে গড়ে ওঠা সমাজ নির্মাণ করা যায়।”
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান
অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি শুধু নিহতদের স্মৃতিকেই নয়, তাঁদের পরিবারের অপরিসীম সাহস, সহনশীলতা এবং ঐক্যের প্রতিও সম্মান প্রদর্শন করেন।
একজন মা হিসেবে নিজের অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, “একজন মা ও অভিভাবক হিসেবে সন্তান এবং পরিবারের সদস্য হারানো পরিবারগুলোর প্রতি আমার হৃদয়ের গভীরতম সহমর্মিতা রইল। তাঁদের এই আত্মত্যাগ ও স্মৃতি যেন সবসময় ঘৃণা ও সংঘাতের বিরুদ্ধে আমাদের সঠিক পথ দেখায়। মানবতা, সহমর্মিতা ও সহনশীলতার যে চিরন্তন মূল্যবোধ, আমরা যেন তা কখনোই হারিয়ে না ফেলি।”
সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে বর্তমান সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই অপরাধের সঙ্গে যুক্তদের বিচারের আওতায় এনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়েছে।
“সরকার সব ধরনের সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। এ ধরনের অশুভ শক্তির বাংলাদেশে কোনো স্থান নেই। দেশের শান্তি, সম্প্রীতি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করার কোনো সুযোগ তাদের দেওয়া হবে না,” যোগ করেন শামা ওবায়েদ ইসলাম।
স্বজন ও বিশিষ্টজনদের মিলনমেলা
স্মরণানুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক এবং নিহতদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। নিহত ফারাজ আইয়াজ হোসেনের মা এবং ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে তাঁর সন্তানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
এছাড়া স্মরণ আয়োজনে অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত উপরাষ্ট্রদূত আলবার্ট সিয়া, ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী, জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি, ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ রামাদান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ।
দশ বছর পেরিয়ে গেলেও হোলি আর্টিজানের ক্ষত হয়তো পুরোপুরি শুকায়নি। তবে এই এক দশকে বাংলাদেশ বিশ্বকে অন্তত এটুকু প্রমাণ করে দেখিয়েছে যে, বুলেটের শব্দ কিংবা উগ্রবাদের আস্ফালন দিয়ে একটি জাতির ঘুরে দাঁড়ানোর স্পৃহাকে কখনোই দমিয়ে রাখা যায় না।
চলমান বার্তা ডেস্ক : 









